গুজবে ভর দিয়ে আমাদের খুনি হয়ে ওঠা

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৫:০৫, জুলাই ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৩, জুলাই ২২, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীন
বেশ কয়েক বছর ধরেই এই গণপিটুনির সংস্কৃতি বাংলাদেশে জায়গা করে নেয় এক ধরনের ‘সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা’ নিয়েই। আইন কী বলে জানা নেই, তবে সামাজিক বিচারে গণপিটুনিতে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেক মানুষই কিন্তু এক-একজন খুনি। এই খুনগুলো নিয়ে বাতচিত কম হয়। কারণ মানুষ ভাবে তারা একজন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পেরেছে। তারা একজন মানুষকে প্রকাশ্যে হত্যা করে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে হয়তো সমাজের বাহবাও পায়। একটি অপরাধ মোকাবিলায় তারা নিজেরাও যে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন, সেটি বিচার করার জ্ঞান সেই মুহূর্তে অনেকেরই থাকে না। বরং ‘অপরাধী’কে সামাজিকভাবে মোকাবিলামূলক ‘স্থায়ীভাবে শেষ’ করতে পেরেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে অপরাধ দমন হয়ে গেছে ভেবে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন। এতোদিন এই গণপিটুনির শিকার হয়েছে ছিনতাইকারী, পকেটমার কিংবা ডাকাতরা। যারা অপরাধ নির্মূল করার ক্ষেত্রে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে এই ধরনের কাজ করেন, তারা কিন্তু তাদের সচেতনতাকে আইনি রূপ দেওয়ার বিষয়ে অসেচতন থাকেন। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এই ধরনের অপরাধে যেহেতু কোনও মামলা হয় না, সেজন্য এটি এখন পর্যন্ত ‘সহনীয়’ সংস্কৃতির তকমায় চালু আছে। তবে এটাই বলা প্রাসঙ্গিক, এই ‘সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা’র পেছনে কাজ করেছে মূলত দেশের বিরাজমান বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের বিচার ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাহীনতাই ইঙ্গিত করে।

এবারের গণপিটুনির শিকার হয়েছেন একজন নারী। তার বিরুদ্ধে কোনও অপরাধের অভিযোগ নেই, বরং আছে ‘সন্দেহ’ নামক একটি রোগ, যে রোগে হয়তো এখন বেশিরভাগ মানুষই আক্রান্ত। আর এই সন্দেহের মূলে আছে গুজবের প্রতি আমাদের অগাধ বিশ্বাস। যে গুজবের কোনও ধরনের ভিত্তি নেই, শুধু আছে গুজব বিশ্বাসের অন্ধমনস্কতা। গত ২০ জুলাই রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে তাসলিমা বেগম রেণুকে হত্যা করা হয়েছে। এই প্রথমবারের মতো গণপিটুনির ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। তবে যেহেতু অজ্ঞাত ৪০০-৫০০ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে, তাই এই ধরনের মামলার ভবিষ্যৎ কেমন হবে, সেটিও খালি চোখেই বোঝা যায়। পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, তাসলিমা বেগম রেণু তার মেয়েকে ভর্তি করার জন্য উত্তর বাড্ডার একটি স্কুলে যান। তার আচরণ অস্বাভাবিক ছিল। সেটি হতেই পারে। পৃথিবীতে সবার আচরণ একরকম হবে না। এই কারণে স্কুলের প্রধান শিক্ষক তাসলিমার সঙ্গে কথা বলার জন্য কক্ষের ভেতরে নিয়ে যান, সেটিও শিক্ষকের দায়িত্বশীল আচরণই মনে হচ্ছে। তবে বাধা আসে অনেক অভিভাবক ও উৎসুক জনতা থেকে। সামনে বসে থাকা কিছু অভিভাবকের মনে হয়েছে তাসলিমা ছেলেধরা। তারা হইচই শুরু করেন। এরপর স্কুলের কিছু অভিভাবক ও বাইরে থেকে আসা উৎসুক জনতা কক্ষের দরজা ভেঙে রেণুকে ‘ছেলেধরা’ বলে টেনেহিঁচড়ে বাইরে নিয়ে আসে এবং মারধর করতে থাকে। পুরো এলাকায় গুজব রটানো হয়, স্কুলে এক ছেলেধরাকে আটক করা হয়েছে। এই গুজবে মুহূর্তেই ডালপালা গজায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে কেউ শোনেন, তাসলিমার ব্যাগে ছুরি, স্প্রে আছে। কেউ শোনেন, ব্যাগে একটি আস্ত কাটা মাথাই পাওয়া গেছে, আবার কেউ শোনেন, স্কুলের এক বাচ্চার মাথাই নাকি কাটা, ইতোমধ্যে কাটা হয়ে গেছে। কিন্তু ঘটনাটি আসলে কী? আদৌ এটি সম্ভব কিনা? তাকে মারার আগে কেউ তার ব্যাগ যাচাই করে দেখেছেন কী? আদৌ সেখানে কোনও কাটা মাথা ছিল কিনা? সেগুলো যাচাই করার বুদ্ধি এবং সামাজিক দায়িত্ব আমাদের অনেক আগেই লোপ পেয়ে গেছে। তাই আর যদি সত্যিই কাটা মাথা নিয়ে ঘুরছিলেন, তাহলে সেক্ষেত্রে সচেতন অভিভাবকরা কেন পুলিশকে খবর দিলেন না? এখন তো পুলিশকে খবর দেওয়া খুব বেশি কঠিন কাজ নয়। কিন্তু আমাদের সচেতনতার ধরনটি এখন ভিন্নভাবে চর্চিত হচ্ছে। আর তাই তো গুজবপ্রিয় এবং গুজব বিশ্বাসী মানুষরা আর বিলম্ব করেননি। শুরু করেন গণপিটুনি। একপর্যায়ে গণপিটুনিতে তিনি মারা যান। তাসলিমার স্বজনরা বলছেন তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন।

তাসলিমাকে নিয়ে অতি দ্রুত তৈরি হওয়া গুজবের সঙ্গে বেশ কিছুদিন ধরে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো একটি গুজবের সম্পর্ক আছে। ‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে’ বলে একটি গুজব ছড়ানো হচ্ছে। সম্প্রতি রোগ হিসেবে যেমন ডেঙ্গু আতঙ্ক, তেমনি সামাজিকভাবে ‘ছেলেধরা’ আতঙ্কে আছেন অনেকেই। এই গুজবকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সম্প্রতি ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনির ঘটনা ঘটছে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনায় কয়েকজন মারা গেছেন।

তাই এ ধরনের গুজব শুনে আইন নিজের হাতে তুলে না নিতে পুলিশ সদর দফতর থেকে অনুরোধ করা হলেও এতে খুব বেশি যে কাজ হচ্ছে না, তা বোঝাই যাচ্ছে গণপিটুনিতে হত্যা করার প্রবণতা দেখে। এই ধরনের গুজব ছড়োনোর জন্য ইতোমধ্যে গ্রেফতারও করা হয়েছে কয়েকজনকে। কিন্তু গুজব বিশ্বাস করা থেকে আমরা নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখতে পারছি না। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুজবে বিশ্বাস না করার জন্য বড় ধরনের প্রচারণার দরকার ছিল, আছে। আর কোনও মানুষকে কারো কাছে ‘অস্বাভাবিক’ মনে হলেই তিনি ছেলেধরা হবেন, অপরাধী হবেন—এই ধরনের সামাজিক তকমা লাগিয়ে তাকে নিপীড়ন করার দায়িত্ব এদেশের মানুষ সম্মিলিতভাবে কবে থেকে নেওয়া শুরু করলো? এর পেছনের মনস্তত্ত্ব আসলে কী? শুধু সমাজের গুটিকয়েক মানুষের একজন মানুষকে দেখে কী মনে হলো তার ওপর ভিত্তি করে একজন মানুষকে মেরে ফেলা—এ প্রবণতা এই সমাজে কীভাবে প্রতিনিয়তই উৎপাদন হচ্ছে? সেটি কীভাবে সমাজ এবং রাষ্ট্র কর্তৃক বৈধতা পাচ্ছে? কীভাবে আমরা প্রত্যেকেই কমবেশি খুন করার প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছি এবং ক্রমশ খুনি হয়ে উঠছি? কীভাবে গুজবগুলো অতিমাত্রায় ক্ষমতাবান হয়ে উঠছে, আমাদের সেই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়া এখন অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের দাবি।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইমেইল:zobaidanasreen@gmail.com.

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ