মেয়র সাহেবরা জনরোষকে ভয় করুন

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৫২, জুলাই ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১০, জুলাই ২৫, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীযুদ্ধ শেষে সম্রাট প্রধান সেনাপতিকে ডেকে জিজ্ঞেস করছেন, যুদ্ধে পরাজিত হলে কেন? সেনাপতি জবাব দিলেন—জাঁহাপনা, যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার ১০১টি কারণ আছে। প্রথম কারণ হচ্ছে আমাদের স্টকে বারুদ ছিল না। সম্রাট তাকে থামিয়ে বললেন, বাকিগুলো শোনার দরকার নেই। বারুদের অভাবে কামান চালাতে না পারলে যুদ্ধে পরাজয়ের জন্য এক কারণই যথেষ্ট।
আমাদের ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের অবস্থাও তাই। এতদিন বলেছে, মশা নিধনের বিষয়টা তাদের আয়ত্তের বাইরে নয়। ডেঙ্গু যখন মহামারী আকারে দেখা দিলো, তখন সিটি করপোরেশন বলছে, মশার ওষুধে নাকি মশা মরে না। ওষুধে যদি মশাই না মরে, তাহলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে অন্য কারণগুলো খোঁজার তো দরকার নেই। এখন প্রশ্ন হচ্ছে—যে ওষুধ কাজ করে না, করপোরেশন ওই ওষুধ ইমপোর্ট করলো কেন? এগুলো কি ওষুধ, নাকি মানুষকে ফাঁকি দেওয়ার কোনও আয়োজন?
দুই মেয়র দুই সাম্রাজ্যের তক্তে তাউসে বসার পর মনে হয় শুধু বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত আছেন, জনস্বার্থের খোঁজখবর নেওয়ার কোনও গরজই তাদের আমরা দেখছি না। আগে দেখতাম মানুষের অবিরাম জ্বর হলে অঙ্গহানি হতো। এখন ডাক্তাররা বলছেন ডেঙ্গুতেও নাকি অঙ্গহানি হচ্ছে। সেই ডেঙ্গু এখন সারা শহরে মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে।

সংবাদমাধ্যম বিবিসি বাংলার খবর অনুসারে, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার বলছেন, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ৭৭৬৩ জন মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত হয়েছেন ৪৭৩ জন।’ তাদের হিসাবে মারা গেছেন পাঁচজন। যদিও বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এ বছর মৃতের সংখ্যা বলা হচ্ছে অন্তত ২৬ জন। ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদফতর, আইইডিসিআর, আইসিডিডিআরবি, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন আর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। সচেতনতা তৈরি, মশার আবাস নষ্ট করা, ওষুধ ছিটানোর মধ্যেই এসব কর্মকাণ্ড সীমাবদ্ধ রয়েছে। সেই সঙ্গে ঢাকার হাসপাতালগুলোয় প্রতিদিনই রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। হাসপাতালের ওয়ার্ড ছাপিয়ে তাদের বারান্দাতেও আশ্রয় নিতে হচ্ছে।

আমাদের অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, তিনি এখন তার দফতরে অফিস করেন না, কারণ সেখানে নাকি ডেঙ্গু মশার যন্ত্রণায় বসা যায় না। গত দু’মাসে নাকি তার দু’বার ডেঙ্গু হয়েছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী সেরে উঠলেও আধমরা হয়ে যায়।

এই মেয়রদ্বয়কে কি কারও কাছে জবাবদিহি করতে হয় না? মানুষ ডেঙ্গুতে মরছে, অসহনীয় কষ্ট পাচ্ছে, আর তারা আছেন রিকশা বন্ধ করার আনন্দদায়ক সিদ্ধান্ত গ্রহণে। অথচ কোনও বিকল্প ট্রান্সপোর্ট নেই রাস্তায়। রিকশা বন্ধ হয়ে গেলো ঠিক আছে, কিন্তু সেই রাস্তায় মানুষ চলাচল করবে কীভাবে—সেই ব্যবস্থা তারা করেননি।

গুলশান আবাসিক এলাকায়, বনানী আবাসিক এলাকায়, বারিধারা আবাসিক এলাকায়, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সন্ধ্যার পরে ফ্লোরে পা রাখা যায় না। গত ২০-২৫ বছর ধরে এই পরিস্থিতির কোনও হেরফের দেখলাম না। অথচ এগুলো হলো সম্ভ্রান্ত আবাসিক এলাকা। এলাকাগুলোতে বিদেশি মিশনগুলোর অফিস রয়েছে আর মিশনের কর্মকর্তাও এখানে বসবাস করেন। বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় তো রাতে ঝাঁক ঝাঁক মশা। অনেক সময় নাক-মুখ দিয়ে মশা ঢুকে যায়।

বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণমান। তার এরিয়াটা চট্টগ্রাম, খুলনা, ঢাকা সিটি করপোরেশনের পরে আর যত জেলা শহর আছে কারও চেয়ে বড় ভিন্ন ছোট নয়। বসুন্ধরা কর্তৃপক্ষ রাস্তাঘাট করেছে প্রশংসনীয়। প্রশস্ততাসহকারে। কিন্তু মালিক কর্তৃপক্ষকে ব্যাপকভাবে কখনও মশা মারার উদ্যোগ নিতে দেখিনি। গুলশান, বারিধারা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় সমন্বিত মশা মারার পরিকল্পনা নেওয়া দরকার। না হয় মশা নির্মূলে সফলতা আসবে না।

মশা নিধন সম্পর্কে গত শতাব্দীর পাঁচ দশকের এক সফল অভিযানের কথা বলতে হয়। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যুর পর পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী স্যার নাজিমউদ্দিন পাকিস্তানের গভর্নর হয়ে করাচি চলে গেলে নূরুল আমিন সাহেব মুখ্যমন্ত্রী হন। তিনি তার মন্ত্রিসভার স্বাস্থ্যমন্ত্রী করেছিলেন হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরীকে। ফেনীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়ে ঢাকা শহরের মশা নিধনের অভিযান চালিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৩০ দিনের এই অভিযানে শহরের জঙ্গল পরিষ্কার, প্লেন থেকে মশার ওষুধ ছিটানো ইত্যাদি প্রায় যুদ্ধাবস্থার মতো চালিয়েছিলেন।

সেই অভিযানের পরে গত শতাব্দীর পাঁচ দশক থেকে ছয় দশক পর্যন্ত এই ১০ বছরে আর কোনও মশার উপদ্রব ছিল না। চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা শহরে এলে আমরা আলুবাজারের ঢাকা হোটেলে থাকতাম। তখন হোটেল কর্তৃপক্ষ কখনও মশারি সরবরাহ করেনি। গত শতাব্দীর পাঁচ দশকে সবেমাত্র ঢাকায় পূর্ব বাংলার রাজধানী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সবকিছু পাওয়া যেতো না। মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমিনকে তার এক বক্তৃতায় বলতে শুনেছি একবার তার কলমের নিব ভেঙে গিয়েছিল। তা ঢাকা শহরে না পেয়ে তিনি কলকাতা শহর থেকে আনিয়ে নিতে এক সপ্তাহ নাকি সময় লেগেছিল। ঢাকা শহরে সেই দুর্দিনে যদি হাবিবুল্লাহ বাহার চৌধুরী এত বড় এবং এত সফল মশা নিধন অভিযান চালাতে পারেন, তবে এখন সম্ভব হচ্ছে না কেন?

রাজধানীর এক লোকের স্ত্রী এবার ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হওয়ায় মেয়রকে উকিল নোটিশ পাঠিয়েছিলেন। মেয়র সাহেব তড়িঘড়ি করে ফলমূল নিয়ে তার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলেন। দক্ষিণের মেয়র সাহেবকে বলি, কয়জনের বাসায় ফল নিয়ে যাবেন? সমগ্র শহরটাতেই তো ঘরে ঘরে ডেঙ্গু রোগী। মেয়র সাহেবকে বলব, মশার ওষুধ আমদানি করার আগে সাপ্লায়ার্স থেকে নমুনা ওষুধ এনে পরীক্ষা করুন। প্রয়োজনে কয়েকজন থেকে নমুনা আনুন, আর প্রয়োগ করে দেখুন কারটা কার্যকরী। সবচেয়ে বেশি কার্যকরী ওষুধ আমদানি করুন, দেখবেন মশা নিধন সম্ভব হবে। এখন আপনারা তো কোনও মানসম্পন্ন ওষুধ আমদানি করেন না। সম্ভবত দামও দিচ্ছেন উচ্চমূল্যে। সুতরাং মশা নিধন হবে কীভাবে?

আপনারা বলছেন ওষুধে মশা মরছে না। উচ্চমানের ওষুধ কিনুন, মরবে। প্রয়োজনে প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশনের ব্যবস্থা রাখুন কেনার আগে। নমুনা সংগ্রহের এবং নমুনা পরীক্ষার পর কার্যকরী ওষুধটা কিনুন। এখন হয়তো আপনাদের ঘুষের পার্সেন্টেজটা এত বেশি যে সাপ্লায়ার্স বাধ্য হচ্ছে পানির সঙ্গে কিছু কেমিক্যাল মিশিয়ে পাঠিয়ে দিতে। না হয় মশার ওষুধে মশা মরবে না কেন!

লেখার শেষে ঢাকা সিটির দুই মেয়রকে অনুরোধ করবো, মানুষের আবেগ নিয়ে আর খেলবেন না। কারও মাতা-পিতা, কারও আদরের ছেলেমেয়ে মরছে বা অঙ্গহানি হচ্ছে ডেঙ্গুর কারণে। ক্ষতিগ্রস্ত সবাই উত্তেজিত হচ্ছে। সবাই কিন্তু জানে—এসব হচ্ছে সিটি করপোরেশনের দুর্নীতি আর অবহেলার কারণে। জনরোষ খুবই মারাত্মক জিনিস। পৃথিবীর বহু দেশের বহু বড় জনপ্রতিনিধি জেলে গেছেন, আক্রোশে পড়ে হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার নজিরও জানা আছে। মেয়র সাহেবরা জনরোষকে ভয় করুন।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ