প্রিয়া কাহিনি

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৮:২৪, জুলাই ২৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৫, জুলাই ২৫, ২০১৯

মো. জাকির হোসেনইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ষড়যন্ত্র, শোষণ, নৃশংসতা ও বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া বাঙালির ললাট লিখন। ১৭৫৭ সালে মীরজাফর, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণবল্লভ, মানিক চন্দ্র আর ঘষেটি বেগমরা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা করে বাংলার স্বাধীনতা তুলে দেয় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে। এরপর টানা ১৯০ বছর ধরে বাঙালির ললাট লিখন ইংরেজদের গোলামি করা। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের অংশ হিসেবে বাংলাদেশ কাগুজে স্বাধীনতা পেলেও, পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠে। পাকিস্তানিদের ষড়যন্ত্রের দোসর হয় এ দেশেরই কিছু বিশ্বাসঘাতক। ’৭১ সালে অসম মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নৃশংসতায় জীবন দিতে হয় ৩০ লাখ বাঙালিকে। বাঙালি জাতিসত্তাকে পাল্টে দিতে পরিকল্পিতভাবে ২-৩ লাখ বাঙালি নারীকে ধর্ষণ করা হয়। বাঙালি জাতিকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পঙ্গু করে দিতে এ দেশের বিশ্বাসঘাতকদের সহায়তায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। বাংলার স্বাধীনতা নস্যাৎ করতে পাকিস্তান-পেন্টাগনসহ দেশি-বিদেশি মদতে বাঙালি জাতির প্রাণভোমরা বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এরপর ক্রমেই বাংলাদেশের উল্টো পথে দীর্ঘ যাত্রা। সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে দীর্ঘ চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পানে এগিয়ে যেতে শুরু করেছে বাংলাদেশ। তাবৎ বিশ্ব ম্যাজিক বা মিরাকল অর্থনীতির বাংলাদেশকে বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে যখন স্বীকৃতি দিয়েছে, ঠিক সে সময় বাংলাদেশকে নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশে নব্য মীরজাফর আর ঘষেটি বেগমরূপে প্রিয়া সাহারা সক্রিয় হয়েছে। ষড়যন্ত্রী প্রিয়াদের এ দেশের খেয়েপরে এ দেশের বুকে ছুরি চালাতে মোটেও বুক কাঁপে না।

লাখ লাখ শহীদের জীবন আর কন্যা-জায়া-জননী-ভগ্নির সম্ভ্রমের বিনিময়ে যে বাংলাদেশ, সে দেশকে নিয়ে পরিকিল্পিত মিথ্যাচার করতে, দেশকে খাটো করতে, কলঙ্কিত করতে এদের কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। দুঃখের বিষয়, প্রিয়ার অসত্য কথনকে দেশের ভেতর থেকে কেউ কেউ সমর্থন জোগাচ্ছেন। এরা বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নে আটঘাট বেঁধে নেমেছে। আবারও হোয়াইট হাউস-পেন্টাগন সক্রিয় হয়েছে। দেশি ষড়যন্ত্রীরা অচেনা নয়। দেশের বাইরে কোন কোন দেশ রয়েছে, তা সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে।

ট্রাম্পের দফতরে প্রিয়া সাহার হাজির হওয়া এবং সংখ্যালঘু নির্যাতনের পরিসংখ্যানসহ অত্যন্ত গোছানো ও আবেগঘন বক্তব্য এবং মিথ্যাচার রহস্যাবৃত ও ষড়যন্ত্রমূলক।

যেসব কারণে এ রহস্য ও ষড়যন্ত্র উন্মোচন আবশ্যক, তা হলো—

এক. মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। রথী-মহারথীদেরও মার্কিন রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ পেতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়, গলদঘর্ম হতে হয়। বাংলাদেশের একজন অখ্যাত প্রিয়া সাহাকে ট্রাম্পের দরবারে তশরিফ আনতে, স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে আমন্ত্রণ বাগাতে জোর তদবির করতে হয়েছে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যারা এ কাজটি করেছে, তাদের সঙ্গে মার্কিন প্রশাসনের সুসম্পর্ক রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, প্রিয়া সাহার সাক্ষাতের জন্য শক্তিশালী একটি দেশ লবিং করেছে। তবে সেই দেশটিকে একাজে লবিংয়ের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছিল বাংলাদেশের ভেতরে ও বাইরে অবস্থানরত কিছু নব্য মীরজাফর, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ, রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, কৃষ্ণবল্লভ, মানিক চন্দ্র আর ঘষেটি বেগমরা। ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ পরবর্তী প্রিয়ার বক্তব্যে এটা স্পষ্ট, তিনি লবিংকারীদের আড়াল করতে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাতের আগে তিনি জানতেন না প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা হবে। অনেকটা ‘ঘুম থেকে ডেকে তুলে উঠ ছুড়ি তোর বিয়ে’র মতো ট্রাম্পের সঙ্গে প্রিয়ার সাক্ষাৎ হয়েছে বলে প্রিয়ার দাবি।

ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রসঙ্গে প্রিয়া বলেছেন, ‘আমাকে ডেকে নিয়ে এসে বললো, চলেন আমরা হোয়াইট হাউসে যাবো। তো আমি আর বুঝিনি। আমি জানতাম না প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দেখা হবে।’ যিনি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়ে, বক্তব্য দেওয়ার বিষয়ে আগে থেকে কিছুই জানতেন না, সেই তিনি কী সুন্দর গুছিয়ে পরিসংখ্যানসহ ভয়ঙ্কর দেশবিরোধী আবেগঘন বক্তৃতা দিলেন। তার বক্তৃতার স্টাইল বলে দিচ্ছে স্বল্প সময়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে, নাটকীয় আবেগ তৈরি করতে তাকে একাধিকবার রিহার্সেল করতে হয়েছে। নিদেনপক্ষে মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয়েছে।

দুই. প্রিয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে একাধিক মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। কেন এমন সাজানো মিথ্যা, সে রহস্য জানা দরকার। প্রিয়া বলেছেন, প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নিখোঁজ রয়েছেন। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। সমবেদনা জানিয়ে প্রিয়া সাহার দিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হাত বাড়িয়ে দিলে প্রিয়া ট্রাম্পের হাতে হাত রেখে বলেন, এখনও সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা দেশ ছাড়তে চাই না। সেখানে আমার ঘরবাড়ি হারিয়েছি। তারা আমার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। জমিজমা দখল করে নিয়েছে। প্রিয়ার বক্তব্য শুনে ট্রাম্প জানতে চান, কারা এটা করেছে? প্রিয়া সাহা জবাব দেন, মুসলিম মৌলবাদীরা। তারা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সব সময়। আদমশুমারির তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন বলছে, ’৪৭-এ ভারত ভাগের পর থেকে এ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আর এখনকার বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কখনোই দেড় কোটি ছাড়ায়নি। ১৯৫১ সালের আদমশুমারিতে দেখা যায়, সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ছিল ৯৭ লাখ ৬ হাজার। ১৯৬১ সালের আদমশুমারিতে এ সংখ্যা ৯৯ লাখ ৫০ হাজার। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে এ সংখ্যা হয় ১ কোটি ৪ লাখ ৩৯ হাজার। আর সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এই সংখ্যা ১ কোটি ৩৮ লাখ। অর্থাৎ এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কখনোই ৩ কোটি ৭০ লাখ বা এর অর্ধেকও ছিল না। তবে এ কথা অনস্বীকার্য, মোট জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আনুপাতিক হার কমেছে। এই কমে যাওয়ার পরিসংখ্যান শুধু পাকিস্তান আমলে কিংবা বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরই যে দেখা যাচ্ছে তেমন নয়। বরং ব্রিটিশ আমলেও এই অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের আনুপাতিক হার কমে যাওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ১৯১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সে সময় পূর্ব বাংলায় হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার ছিল ৩১ শতাংশ। ১৯৪১ সালে ২৮ শতাংশ। অর্থাৎ ৩০ বছরে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার কমেছে ৩ শতাংশ।

তবে এরপরই হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার দ্রুতগতিতে আরও কমতে থাকে। ১৯৪১ থেকে ১৯৭৪, এই ৩৩ বছরে হিন্দু জনগোষ্ঠীর আনুপাতিক হার কমে যায় প্রায় ১৫ শতাংশ। এ কমে যাওয়াকে কেউ কেউ ১৯৪৭-এর ভারত-ভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ বিভিন্ন কারণে সে সময় পূর্ব বাংলা থেকে হিন্দু জনগোষ্ঠীর অনেকেই ভারতে চলে যাওয়াকে উল্লেখ করে থাকেন। একইভাবে ভারত থেকেও অনেক মুসলমান পূর্ব পাকিস্তানে এসেছিলেন। আবার বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়ও অনেক হিন্দু দেশান্তরী হয়েছিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও মোট জনসংখ্যায় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ক্রমাগত কমে যাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। ১৯৭৪ সালের প্রথম আদমশুমারিতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার ছিল ১৪.৬ শতাংশ। ২০১১ সালে সেটি কমে আসে ৯.৬ শতাংশে। অর্থাৎ বাংলাদেশ আমলে ৩৭ বছরে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার কমেছে ৫ শতাংশ। ৫ শতাংশ কেন কমেছে, সে বিষয়ে সরকারের ভাষ্য প্রকাশ ও গবেষণা দরকার। প্রিয়া সাহা তার পরিসংখ্যানের সমর্থনে বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাতের গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়েছেন ও তার সঙ্গে গবেষণা সহযোগী হিসেবে কাজ করার দাবি করেছেন। অধ্যাপক বারকাত পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, প্রিয়া সাহা কখনও তার সঙ্গে গবেষণাকাজে যুক্ত ছিলেন না এবং তার নাম উল্লেখ করে দেওয়া তথ্যও মিথ্যা। এদিকে প্রিয়া সাহার গ্রামের বাড়ি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার মাটিভাঙা ইউনিয়নে তার নিজের বাড়িঘর নেই। ভাই ও আত্মীয়স্বজনের বাড়িঘর রয়েছে। পার্শ্ববর্তী চিতলমারী উপজেলার চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান শামীমের সঙ্গে প্রিয়া সাহার বিরোধ রয়েছে। প্রায়ই ঝামেলা হয় দু’পক্ষে। এ বছর মার্চ মাসে প্রিয়া সাহাদের সমর্থকরা শামীম পক্ষের সংখ্যালঘুদের তিন-চারটি ঘরে আগুন দিলে তার একদিন পর প্রিয়া সাহার ভাইয়ের অব্যবহৃত ঘরে আগুন দিয়ে প্রতিপক্ষদের ওপর মামলা দেওয়া হয়। প্রিয়া সাহা তার দায়ের করা মামলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকদেরও আসামি করেছেন, জেলও খাটিয়েছেন। তার বাড়িঘর জায়গাজমি দখলের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তিন. শেখ হাসিনা সরকার ধর্মীয় উগ্রবাদকে শক্ত হাতে দমন করেছেন এবং এটি দেশে-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসাও কুড়িয়েছে। এরপরও ট্রাম্পের কাছে প্রিয়া সাহার নালিশ ‘মুসলিম মৌলবাদীরা সব সময় রাজনৈতিক আশ্রয় পায়। সব সময়’। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও গভীর ষড়যন্ত্রমূলক।

চার. প্রিয়া ট্রাম্পের হাতে হাত রেখে নাটকীয় আবেগ সৃষ্টি করে বলেছেন, ‘এখনো সেখানে ১ কোটি ৮০ লাখ সংখ্যালঘু রয়েছে। দয়া করে আমাদের সাহায্য করুন। আমরা দেশ ছাড়তে চাই না।’ লাখ লাখ শহীদের জীবন ও কন্যা-জায়া-জননী-ভগ্নির সম্ভ্রমের চড়া মূল্যে অর্জিত স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশে বিদেশি রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের আহ্বান কখনই কাম্য হতে পারে না। এটি মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের প্রতি চরম অবমাননা।

পাঁচ. প্রিয়া সাহা বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনের যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা শুধু মিথ্যাচারই নয়; একই সঙ্গে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু, বিশেষ করে সাধারণ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর এবং বিপজ্জনক। প্রিয়া সাহা আপামর সাধারণ হিন্দুদের আবেগ-অনুভূতির বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নিজ দায়িত্বে যে মিথ্যাচারটি করেছেন, তা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশে ধর্মীয় উগ্রবাদকে উসকে দেওয়া ও সাম্প্রদায়িকতার আগুনে ঘি ঢালারই নামান্তর। অথচ সাধারণ হিন্দু বা অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের এ ব্যাপারে কোনও সম্পৃক্ততা নেই।

ছয়. বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব অ্যাডভোকেট গোবিন্দ চন্দ্র প্রামাণিক ভারতীয় দৈনিক যুগশঙ্খ-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, প্রিয়া সাহা মার্কিন প্রেসিডেন্টের কাছে বাংলাদেশের ৩ কোটি ৭০ লাখ ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিখোঁজের যে অভিযোগ করেছেন তা সঠিক। তার মতে অসম, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরাসহ গোটা ভারতে বাংলাদেশ থেকে নিখোঁজ ৩ কোটি ৭০ লাখ নাগরিকের অধিকাংশই রয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, অসমে এনআরসি থেকে বাদ পড়া ৪০ লাখ নাগরিক বাংলাদেশি ছিলেন। প্রিয়া ও প্রামাণিকের বক্তব্যে পরিকল্পিত যোগসাজশ রয়েছে কিনা সে রহস্য উদঘাটনও আবশ্যক।

আমার মূল্যায়নে প্রিয়া সাহা তার ব্যক্তিগত যোগ্যতা বা সক্ষমতায় স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণ পাননি। যে বক্তব্য প্রিয়া উপস্থাপন করেছেন, তা নির্বাচনও তার নিজস্ব বিবেচনাবোধ থেকে নয়। এমনকি বাংলাদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানদের কল্যাণার্থেও প্রিয়া এরূপ রাষ্ট্রবিরোধী বিকৃত, মিথ্যাচার করেননি।

প্রিয়াকে ট্রাম্পের দরবারে হাজির করানো ও তার বক্তব্য নির্ধারণ করে দেওয়ার সঙ্গে অন্যরা জড়িত বলে আমি মনে করি। এর পেছনে বড় শক্তি ও গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানব সভ্যতার একটি বড় ব্যর্থতা ও লজ্জা হলো সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে তাদের অধিকার ভোগে কার্যকর সুরক্ষা দিতে ব্যর্থতা। আজকের আমেরিকাবাসীদের অনেকের পূর্বপুরুষরা ধর্মীয়, রাজনৈতিক ও জাতি-গোষ্ঠীগত সংখ্যালঘু হিসেবে নির্যাতিত হয়ে নিজ রাষ্ট্র ছেড়ে নতুন পৃথিবীর সন্ধানে বের হয়ে মার্কিন মুলুকে বসতি গড়েন। একবিংশ শতাব্দীর ইউরোপ, আমেরিকায় সংখ্যালঘু মুসলমান, এশিয়ান ও কৃষ্ণাঙ্গরা প্রতিনিয়ত নিপীড়িত হচ্ছে। মিয়ানমারে সংখ্যালঘু মুসলমানদের অবস্থা বর্ণনাতীত। গান্ধীর অহিংস ভারত এখন সংখ্যালঘুদের জন্য সহিংস ভারত। বাংলাদেশেও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সময়ে সময়ে নিপীড়িত হয়েছেন, ভয়ঙ্কর অধিকার লংঘনের শিকার হয়েছেন, অস্বীকার করার উপায় নেই। সবকিছুর পরও বাংলাদেশে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতির মেলবন্ধন অনেক রাষ্ট্রের তুলনায় নজিরবিহীন। প্রিয়াকে দিয়ে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাহিনি ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরা ও ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ চাওয়ার পেছনে যেসব কারণ থাকতে পারে তা হলো –

এক. কেউ বাংলাদেশকে পরিকল্পিতভাবে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করতে চান কিংবা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করতে চান।

দুই. বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না, সেজন্য বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে প্রিয়াকে ব্যবহার।

তিন. বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসম্পদ ও সম্ভাবনাময় খনিজসম্পদ লুট করতে বাংলাদেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অজুহাত খুঁজতে কেউ সক্রিয় হয়ে উঠেছে, যেখানে প্রিয়া ষড়যন্ত্রের ট্রাম্পকার্ড।

চার. অর্থনৈতিক পরাশক্তি চীনকে ঠেকাতে ভূ-রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত বাংলাদেশকে কেউ কব্জায় নিতে প্রিয়া অজুহাত ব্যবহার করতে চায়।

পাঁচ. এ অঞ্চলে আধিপত্য বিস্তার ও সেনা অভিযানের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে প্রিয়া কাহিনি বানানো।

ছয়. বাংলাদেশের ওপর কারও অতীতের কোনও রাগ-গোশশা রয়েছে, এখন তার প্রতিশোধ নিতে চায়।

সাত. শেখ হাসিনা সরকারের পূর্বমুখী পররাষ্ট্রনীতি বিশেষ করে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন গভীর প্রেম মেনে নিতে না পেরে কেউ প্রিয়াকে দিয়ে সতর্কবার্তা দিতে চায়।

আট. বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে কানোভাবেই ক্ষমতাচ্যুত করা যাচ্ছে না, তাই সরকারকে ফেলে দিতে এটি একটি অপকৌশল হতে পারে।

বাংলাদেশ কোনও একক জনগোষ্ঠীর নয়। বাংলাদেশ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার। দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ববিরোধী যে কোনও ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত প্রতিহতের জন্য সব সম্প্রদায়ের মানুষকে এক ও ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু বলেছেন, এই দেশ হিন্দুর না, এই দেশ মুসলমানের না। এই দেশকে যে নিজের বলে ভাববে, এই দেশ তার। এই দেশের কল্যাণ দেখে যার মন আনন্দে ভরে উঠবে, এই দেশ তার। এই দেশের দুঃখে যে কাঁদবে, এই দেশ তার। এবং এই দেশ তাদের, যারা এই দেশের মানুষের স্বাধীনতার জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দেবে।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ