ঢাকার কিশোর অপরাধ ও কিছু কথা

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৮:০০, জুলাই ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:০০, জুলাই ২৮, ২০১৯





সালেক উদ্দিনঢাকার কিশোর অপরাধ সম্পর্কে একটি তথ্যবহুল প্রতিবেদন চোখে পড়লো। দেশের প্রথম সারির বহুল প্রচারিত একটি দৈনিকে প্রতিবেদনটি ছাপা হয়েছে। এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে ঢাকার নয়টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত, মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত এবং শিশু আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য অনুযায়ী। আসাদুজ্জামানের এই প্রতিবেদনের নাম ছিল ‘ঢাকায় ৯৯ খুনে জড়িত ৩ শতাধিক কিশোর’। এতে বলা হয়েছে, গত ১৬ বছরে ঢাকায় ৯৯ খুনের মামলায় ৩ শ’র বেশি কিশোর জড়িত থাকার অভিযোগ এসেছে। এর মধ্যে গত দেড় বছরে ঘটেছে ১৩টি খুন। এতে জড়িত অন্তত ১২০ কিশোর। এদের নাম উল্লেখ করে খুনের মামলাও হয়েছে।

প্রতিবেদনে ঢাকার উত্তরা হাজারীবাগ চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের খবরও উঠে এসেছে। এই কিশোর গ্যাংয়ের কিশোররা খুন-ধর্ষণ মাদকসহ নানা অপরাধে জড়িত।
এই বিষয়টি নিয়ে আজ থেকে দুই বছরের বেশি আগে বাংলা ট্রিবিউনে আমার একটি লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। ২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত সেই প্রতিবেদনের নাম ছিল ‘কিশোর গ্যাং তৈরির কারণ কী’।
সে সময়ে উত্তরার ডিস্কো গ্রুপের কিশোরদের হাতে নাইন স্টার গ্রুপের কিশোর আদনান জনসম্মুখে দিবালোকে খুন হয়। এই ঘটনার রহস্য উদঘাটনে বের হয়ে আসে উত্তরায় কিশোর গ্যাংয়ের অস্তিত্বের কথা। আড্ডার মধ্য দিয়ে একসময় এসব কিশোরের সহিংস হয়ে ওঠার কথা। ছোটখাট সন্ত্রাস ছিনতাইয়ের মতো অপরাধ পেছনে ফেলে একসময় ড্রাগ খুন-ধর্ষণের মতো ভয়ঙ্কর অপরাধে কীভাবে তারা জড়িয়ে পড়ে, সেই কথা।
তাদের সম্পর্কে আমার একটি ধারণা সেই লেখনীতে উল্লেখ করেছিলাম। তা হলো সমাজে সন্ত্রাস ও খুন হরহামেশাই হচ্ছে এবং অর্থের বলে, রাজনৈতিক সুবিধা আদায় করে ও ক্ষমতার দাপটে সন্ত্রাসী ও খুনিরা বিচার ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমাজে বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে। এক-একটি বড় অপরাধ করে টিকে যাওয়ায় তাদের সামাজিক মর্যাদা আরো বাড়ছে। এসব অপরাধীকে মহা ক্ষমতাবান ভেবে মানুষ তাদের পূজনীয় ভাবতে বাধ্য হয়। কিশোরারা এসব দেখে ধরে নেয় সন্ত্রাস করে পার পাওয়া তাদের পক্ষেও সম্ভব। তারা এই লাইনের অগ্রজদের আশ্রয় নিয়ে হয়ে ওঠে আরো বেপরোয়া।
কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা প্রভাবিত হয় খুব সহজেই। তথাকথিত বড় ভাইরা তাদের মাথায় ক্ষমতার বিষয়টি ঢুকিয়ে দেয়, আর এতেই তারা সহিংসতাকে হাতিয়ার মনে করে। তৈরি হয় একেকটি কিশোর গ্যাং।
লেখাটিতে আমি আমার ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের চিন্তাকে এভাবে উল্লেখ করেছিলাম,আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার্থে এখনই কিশোর অপরাধের লাগাম টেনে ধরতে হবে। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। কেন কিশোর গ্রুপ/কিশোর গ্যাং সৃষ্টি হচ্ছে এবং কেন আমাদের কিশোরদের মধ্যে ছিনতাই ড্রাগ আসক্তি খুন ধর্ষণের মতো হিংস্র ও বিকৃত অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাচ্ছে, তার কারণ উদঘাটন করতে হবে। এর জন্য দরকার অনেক বড় পরিসরে গবেষণা। আর সেই গবেষণালব্ধ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া। সরকারিভাবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ ধরনের পদক্ষেপ এখনই নিতে হবে।
‘ঢাকায় ৯৯ খুনের মামলায় তিন শতাধিক কিশোর জড়িত’ প্রতিবেদনটিতে বর্ণিত তথ্য এসেছে আদালতের বিচারিক নিবন্ধন খাতার তথ্য ও পুলিশের তদন্ত রিপোর্ট থেকে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, ঢাকার উত্তরা হাজারীবাগ চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে কিশোর গ্যাং। এই কিশোর গ্যাংয়ের কিশোররা ছিনতাই খুন ধর্ষণ মাদকসহ নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত। এসব তথ্যের আলোকে প্রতিবেদক বিভিন্ন সমাজ সংস্কারকের মতামত নিয়েছেন। তাদের অনেকেই সেই পুরনো কথাই নতুন করে বলেছেন। বলেছেন, আগে যে সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসন ছিল, তা এখন ভেঙে পড়েছে। কিশোরদের বড় একটা অংশই এখন ইন্টারনেটে অতিরিক্ত আসক্ত হচ্ছে, পর্নোগ্রাফি দেখছি। সব মিলিয়ে কিশোরদের মনস্তত্ত্বে বড় একটা পরিবর্তন এসেছে। এর ফলে তারা মারাত্মক সব অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কেউ বলেছেন, দেশে আইনের শাসনের ঘাটতি থাকায় ছিনতাই ধর্ষণ মাদকসহ খুন-খারাবির মতো নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে কিশোররা। বড়রা কিশোরদের নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করছেন। তাদের কথা হলো, কিশোর অপরাধ ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী রাজনীতিবিদ সর্বোপরি সরকারকে আরও সচেতন হতে হবে। কিশোরদের জীবনের লক্ষ্য কী, তা ভালোভাবে শেখাতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবারকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
গুণিজনেরা এসব কথা এর আগেও বহুবার বলেছেন, তবে কোনও কাজ হয়েছে বলে মনে হয় না। সাদা চোখে দেখা আর সরল মস্তিষ্কের থেকে যা বলতে পারি তা হলো, শিশু-কিশোর যুবকদের মধ্যে এক হিরোইজম বাস করে, যার নিয়ন্ত্রণ করে পরিবেশ। সুষ্ঠু পারিবারিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ পেলে এই হিরোইজম থেকে শিশু কিশোর ও যুবকরা দেশের সম্পদ হয়ে গড়ে ওঠে। আর তা নাহলে অর্থাৎ ধ্বংসাত্মক পারিবারিক সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ হাতছানি দিলে এরা ধ্বংসাত্মক হয়ে ওঠে। তারা তখন আইন নিয়ম বিধান ভাঙার মধ্যে হিরোইজমের তৃপ্তি খোঁজো। তারা নেশায় মাতে, দলবেঁধে অপরাধ করে, খুনকে অপরাধের চেয়ে বাহাদুরি হিসেবে গণ্য করতে শেখে। সৃষ্টি হয় এলাকাভিত্তিক কিশোর গ্যাংয়ের মতো ধ্বংসাত্মক কিশোর গ্রুপ নামের অন্ধকারময় এক সংস্কৃতি।
যেহেতু এই লেখাটি ঢাকার কিশোর অপরাধ নিয়ে, তাই এখানে ঢাকার রাজনৈতিক পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে লালিত শিশু-কিশোর যুবকদের চলন বলনকেই তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
পরিবারের সিনিয়র সদস্যরা যখন সামাজিক অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকে, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত থাকে, মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকে, ভূমি দস্যুতার সঙ্গে জড়িত থাকে, চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত থাকে, টেন্ডারবাজির সঙ্গে জড়িত থাকে এবং এদের পেছনে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের শেল্টার থাকে, আর সেই সুবাদে তারা তখন সমাজে মহাক্ষমতাশালী রূপে প্রতিষ্ঠা পায়। তা দেখে সেই পরিবারের সেই সমাজের শিশু কিশোর যুবকরা অগ্রজদের অপরাধমূলক কাজ অনুকরণ করে হিরো হতে চায়।
আবার মাঠের রাজনীতি ও ক্ষমতা ধরে রাখতে রাজনীতিক ও সমাজের প্রভাবশালীরা মাস্তান মহামাস্তান ব্যবহার করে। গডফাদারদের বদৌলতে এই মাস্তানরা আইনের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকে বলে তারাও হয় মহা প্রতাপশালী ক্ষমতাশালী। এই প্রতাপশালী মাস্তানদের কর্মকাণ্ড চালাবার জন্য তাদের আবার প্রয়োজন হয় বাইক বাহিনী। হিরোইজমে বিশ্বাসী এলাকার কিশোর যুবকরা যোগ দেয় সেই বাইক বাহিনীতে। নিজেদের শোডাউনের বিজয় অপকর্মের বিজয় দেখে তারা আইনের অনুশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বড়ভাই হওয়ার স্বপ্ন দেখে এবং বড়ভাই হয়েও ওঠে একদিন।
একদিন এরাই হয়ে উঠবে সমাজ তথা দেশের রাজনীতির ধারক-বাহক। সৃষ্টি হবে নতুন নতুন কিশোর গ্যাং। সংঘটিত হবে হাজারো অপরাধের সঙ্গে আরো কিশোর অপরাধ। সবমিলিয়ে ভবিষ্যতের এক অন্ধকারময় জাতিতে পরিণত হবো আমরা।
আজকের কিশোর গ্যাং বা কিশোর অপরাধ আমাদের সামাজিক রাজনীতিক অবক্ষয়ের একটি স্যাম্পল ছাড়া আর কিছুই নয়। শুধু গুণিজনদের কথায় বা লেখনীতে এটা রোধ করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের। বিপ্লব বললে ভুল হবে, মহাবিপ্লবের। সমাজ ও রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। অপরাধ করে পার পাওয়া যায়, এই সংস্কৃতি মুছে ফেলতে হবে।
কবে কে সেই মহাবিপ্লবের হাল ধরবে জানে না। তবে বিশ্বাস করি একজন ভিশনারি লিডারের পক্ষেই সম্ভব সমাজের এবং রাজনীতির এমন পরিবর্তন আনা। আমরা সেই অপেক্ষায় রইলাম। প্রত্যাশা রইল আবার সামাজিক ও পারিবারিক অনুশাসন ফিরে আসবে। বাইক শোডাউন বন্ধ হবে। বন্ধ হবে ছিনতাই ধর্ষণ মাদকসহ খুন-খারাবির মতো ধ্বংসাত্মক কাজে শিশুদের জড়িয়ে পড়া। সৎ রাজনীতি ফিরে আসবে। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে।
একজন আশাবাদী মানুষ হিসেবে ধরে নিতেই পারি, সেই দিন খুব বেশি দূরে নয়।
লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ