ডেঙ্গুর মহামারি, নরবলির গুজব এবং বন্যা

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:০৫, জুলাই ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৪২, জুলাই ৩১, ২০১৯

আনিস আলমগীরডেঙ্গুর প্রকোপ, ছেলেধরা-নরবলির গুজব আর প্রায় সারাদেশে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি—সব মিলিয়ে দেশের অবস্থা ভালো নয়। বন্যাদুর্গতরা এসে আশ্রয় নিতে পারে, উত্তরবঙ্গের কোনও কোনও এলাকায় এমন উঁচু স্থানেরও অভাব দেখা দিয়েছে। একই পরিস্থিতি তাদের গবাদিপশু নিয়েও। কোরবানিও দ্রুত এসে উপস্থিত। খামারিরা আশ্বস্ত করছেন যে বাজারে কোরবানির গরুর অভাব হবে না। চাঁপাইনবাবগঞ্জ দিয়ে প্রচুর ভারতীয় গরু নাকি প্রবেশ করছে। আগে টেকনাফ দিয়ে মিয়ানমার থেকে গরু আসতো। এখন রোহিঙ্গাদের কারণে সীমান্তের অবস্থা ভালো নয়। সুতরাং এবার মিয়ানমার থেকে গরু আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
অবশ্য খামারিরা যেভাবে আত্মপ্রত্যয় নিয়ে বলছেন তাতে মনে হয়েছে, বাজারে কোরবানির গরুর অভাব হবে না। এবার কিন্তু রাস্তাঘাটের দুরবস্থার কারণে গরু নিয়ে গাড়ি সর্বত্র চলাচল করা হয়তো মুশকিল হবে। মুভমেন্টের কারণে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হতে পারে, সে বিষয়ে গরুর কারবারিদের সতর্ক হতে হবে। অমর্ত্য সেন বলেছেন, খাদ্য মজুত থাকলেও দুর্ভিক্ষ হতে পারে, যদি মুভমেন্ট নির্বিঘ্ন না হয়। সেটা আমাদের মনে থাকলেই ভালো।

সঙ্কট মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে নেই। সম্পূর্ণ মন্ত্রিসভাটিই প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী। জরুরি এমন কোনও কাজ নেই তার নির্দেশের প্রয়োজন হয় না। তার অনুপস্থিতিতে সরকারি কাজকর্মের গতি আর সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বহীন আচরণ, লাগামহীন কথাবার্তায় বারবার মানুষকে স্মরণ করিয়ে দেয়—সরকার পরিচালনায় শেখ হাসিনার নেতৃত্ব কতটা অপরিহার্য। অবশ্য তিনি লন্ডন থেকে নির্দেশনা দিচ্ছেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। সেই নির্দেশনায় সমস্যার সমাধান চোখে পড়ছে না। দিন দিন ডেঙ্গু মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। বন্যার পরিস্থিতির উন্নতি নেই। কল্লাকাটার গুজব আর গণপিটুনি কমেছে কিন্তু থামেনি। প্রধানমন্ত্রীর চোখের অপারেশনটা জরুরি না হলে এমন সংকটময় মুহূর্তে হয়তো তিনি বিদেশ সফরে যেতেন না। আশা করছি শিগগিরই আরোগ্য শেষে তিনি দেশে ফিরবেন।

সবচেয়ে বেশি আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে ডেঙ্গু নিয়ে। ডেঙ্গুর মৌসুম হলো জুন-জুলাই-আগস্ট। কথাবার্তায় মনে হলো ডেঙ্গু নিয়ে ঢাকা সিটি করপোরেশনের কোনও সতর্কতা ছিল না। দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন তো ডেঙ্গুকে গুজব বলে উড়িয়ে দিতে চেয়েছেন। অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের নেতাসুলভ জবাব দিয়েছেন। জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ওষুধ না আনলে সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু নিয়ে ভয়াবহ অবস্থায় পড়বে। জনস্বাস্থ্যেরও দুরবস্থার সৃষ্টি হবে।

এ পর্যন্ত ৫৯ জেলায় ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেছে। মাত্র পাঁচটি জেলা আছে ডেঙ্গু রোগী এখনও পাওয়া যায়নি। ২৮ জুলাই পর্যন্ত পত্রিকার হিসাব অনুযায়ী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন দশ হাজার ডেঙ্গু রোগী। সাত হাজার ৭৮৯ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা মেডিক্যালের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে আর মহাখালীর গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউটও ডেঙ্গু রোগীদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। রবিবার সরকার ডেঙ্গু সংক্রান্ত এক একটি রক্ত পরীক্ষার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে ৫০০ টাকা করে। সরকারি হাসপাতালে এই পরীক্ষা ফ্রি করা হবে বলে নির্দেশ জারি করেছে। রোগীর স্থান সংকুলান সংকট কিছুটা কেটেছে।

আমরা উভয় মেয়রকে পরামর্শ দেবো যেন মশা মারার কার্যকর ওষুধ প্রয়োজনে এয়ারলিফটের ব্যবস্থা করে দেশে নিয়ে আসেন। ঢাকায় যেন মশার বিরুদ্ধে একটা সম্মিলিত যুদ্ধ ঘোষণা করেন তারা। দক্ষিণের মশা উত্তরে যায় আর উত্তরের মশা দক্ষিণে যায়—এসব হাস্যকর যুক্তির দিন শেষ। পাবলিক এতো বোকা নয় যে এসব কথা বিশ্বাস করবে এবং তাদের নগরপিতা হিসেবে গণ্য করবে। মৌসুম শেষ হতে পূর্ণ একমাস বাকি রয়েছে, যেন গড়িমসি করে মৌসুম শেষ করার চেষ্টা না করেন তারা।

দেশে বন্যা হয়েছে গত এক মাস ধরে। ঢাকা ট্রিবিউনের খবরে দেখলাম ২৭ জুলাই পর্যন্ত ২৮ জেলায় তীব্র বন্যার কারণে ১১৪ জন লোক মারা গেছে, লাখ লাখ লোক বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অবশ্য কয়েক বছর ধরে দেশে বন্যা হয়নি। ইনসেক্টিসাইড, ফার্টিলাইজার ইত্যাদির ব্যবহারে কৃষি জমির ওপরে একটা আবরণ সৃষ্টি হয়, যা মাটির উর্বরতাকে বিনষ্ট করে। কৃষিবিদরা বলেন, মাঝে মাঝে বন্যা হলে তা ধুয়ে মুছে চলে যায়। এজন্যই দেখা যায় বন্যার পরে অধিক ফসল ফলে। দেশে অনেক নদী দখল হয়ে গেছে। ভরাট হয়ে গেছে খাল বিল। সুতরাং বন্যা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এক সময়ের সমৃদ্ধ বাণিজ্যপথ এখন ভরাট হয়ে হারিয়ে যাচ্ছে। ড্রেজিং করা খুবই ব্যয়বহুল ব্যাপার, তবে প্রয়োজনীয় নৌবাণিজ্য অব্যাহত রাখতে ড্রেজিং করতে হবে। পর্যাপ্ত রিলিফ এখনও দুর্গত এলাকায় পৌঁছেনি। পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী, ওষুধ, খাওয়ার পানি দুর্গত এলাকায় না গেলে মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছাবে।

আওয়ামী লীগ সরকার বন্যা সামলাতে আগেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। আশা করি এবারও দেবে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ফেরার পর কর্মতৎপরতা আরো নিশ্চয়ই বাড়বে। হয়তোবা রিলিফের কাজে প্রয়োজনে সেনাবাহিনী নামাতে পারে সরকার।

ছেলেধরার গুজব সারা দেশে একটা অস্থিতিশীল পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। এখানে সেখানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি এখনও চলছে। কেউ কেউ এই গুজবের সুযোগও নিতে চাচ্ছে। লোকজনের মধ্যে সচেতনতার অভাবে এটি বিস্তার লাভ করছে। এ পর্যন্ত গণপিটুনিতে মারা গেছে প্রায় ১০ জন। আহত হয়েছে ৫০ জনের মতো।

সাধারণ মানুষের মধ্যে নরবলি দেওয়ার গুজবটা এমনভাবে ছড়ানো হয়েছে, বড় বড় স্থাপনা সৃষ্টিতে এই ধরনের নরবলি লাগে এমন কুসংস্কার আগে থেকে প্রচলিত থাকায় অনেকে সেটা সহজে বিশ্বাসও করছে। যদিও এ পর্যন্ত ছেলেধরার খবর একটিও সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি, নরবলির কোনও ঘটনা ঘটেনি। তাই সরকার এবং রাজনৈতিক নেতাদের প্রচার প্রচারণায় অংশ নিয়ে মাথা নেওয়ার গুজব থেকে দেশের মানুষকে মুক্তি দিতে হবে।

পদ্মা সেতুতে নরবলির গুজবে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে কিনা জানি না। পদ্মা সেতুর তিন চারটা পাইল ছিল খুবই ক্রিটিক্যাল। আগের নকশা পরিবর্তন করে এ পাইল কয়টি করা হয়েছে। সে পাইলগুলো শেষ হওয়ার পরই কিন্তু গুজব রটেছে, সেতুতে নরবলির দরকার। একটি দু’টি নয়, এক লাখ নরবলি।

শেখ হাসিনা সাহস করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু করার উদ্যোগ নিয়েছেন। পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের পর প্রধানমন্ত্রীর ইমেজ দেশে-বিদেশে আরও বৃদ্ধি পাবে। দেশের ইমেজও বৃদ্ধি পাবে। দেশের মানুষ গত দুই তিন বছর কষ্ট পাচ্ছে। সম্ভবত অর্থের টানাটানির কারণে রাস্তাঘাটের ব্যাপক সংস্কারের কাজও ব্যাহত হচ্ছে। পাইল বসানোর কাজ শেষ হওয়ায় মনে হচ্ছে সহসা পদ্মা সেতু দৃশ্যমান হবে। যেহেতু শেখ হাসিনা ঝুঁকি নিয়ে সেতুর কাজটা আরম্ভ করেছিলেন, যার ৯০ শতাংশ কাজ এখন শেষ হয়েছে—তা অনেকে হয়তো সহ্য করতে পারছেন না।

খালেদা জিয়া তো এক সময় বলেছিলেনও, এই সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানানো হচ্ছে, সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হবে, তাই এই সেতু দিয়ে না চলাই উত্তম হবে। এটুকু পর্যন্ত তিনি যখন বলেছেন, আর নরবলির অপপ্রচার তো বিচিত্র নয়। বেশ ক’জন বিএনপি সমর্থক লোক ভুয়া আইডি বানিয়ে ফেসবুকে অপ্রচারের জন্য ইতোমধ্যে র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারও হয়েছে বলে খবরও বেরিয়েছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।
anisalamgir@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ