মশা আতঙ্কের শেষ কোথায়?

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৫:১০, জুলাই ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১২, জুলাই ৩০, ২০১৯

রেজানুর রহমানআসলে যার যায় সেই বুঝে ক্ষতিটা কেমন? এতদিন অনেকেই এমন ধারণা করেছিলেন, মশা বুঝি শুধুমাত্র ছোটলোকদেরই কামড়ায়। এখানে ছোট বলতে গরিব, অসহায় বস্তিবাসীদের বুঝানো হচ্ছে। কারণ তারা তো মশার সঙ্গেই বসবাস করে। মশার সঙ্গেই খায়, মশার সঙ্গেই ঘুমায়, মশার সঙ্গেই তাদের প্রেম, মশার সঙ্গেই তাদের আড়ি, মশার জগতেই তাদের বাড়ি। আর তাই এডিস মশার আক্রমণ নিয়ে এবার যখন পত্র-পত্রিকাসহ বিভিন্ন প্রচারমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবর বের হতে শুরু করলো, তখন ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রসহ অনেকেই ব্যাপারটাকে মোটেই গুরুত্ব দিতে চাননি। ব্যাপারটা এমন, বর্ষাকালে নদী নালা ও ডোবায় পানি বাড়বে। বাড়বে মশাদেরও প্রজনন। দুই-একটা মশা মানুষকে কামড়াতেও পারে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিবছরই হয়। কাজেই এটা নিয়ে হইচই করার কোনও মানে আছে?
আসলেই কথা তো সত্যি! আমাদের এই রাজধানী শহর কি এমন সুন্দর, ঝকঝকে তকতকে যে মশাবিহীন পরিবেশের কথা চিন্তা করা যাবে? একদিক দিয়ে বলতে গেলে মশা তো এই শহরের সৌন্দর্য! ঝাঁকে ঝাঁকে মশা, লাখে লাখে মশা না থাকলে অনেকের ব্যবসা তো থাকবে না। মশা আছে বলেই না মশার কয়েল দাপট দেখায়। বাহারি বিজ্ঞাপনে অনেক কারিশমা করে কয়েল দেখিয়ে আমরা মশা মারতে কামান দাগাই। মশা আছে বলেই না সিটি করপোরেশনে অনেক মানুষের চাকরি আছে। মশার মৌসুমে তারা কী সব ভোমা সাইজের যন্ত্রপাতি নিয়ে বীরদর্পে মশা মারার জন্য ধোঁয়া ওড়ায়। ধোঁয়া দেখে মনে হবে কোথাও বোধকরি আগুন লেগেছে। এক সময় দেখতাম সিটি করপোরেশনের লোকরা যখন মশা মারার জন্য এই ধরনের ধোঁয়া দিতো তখন ধোঁয়ার ঝাঁজ নাকে লাগতো। আশেপাশে থাকাই মুশকিল হয়ে দাঁড়াতো। এই তো সেদিন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির নির্বাচনের দিন জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনের পাশেই বিরাট ছামিয়ানার নিচে খোলা জায়গায় বসে আছি। একটু আগে বৃষ্টি হয়েছে। বড়ই স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। মনে হলো মশার প্রজনের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্ট জায়গা। হঠাৎ বিকট শব্দ পেলাম। ধোঁয়া উড়িয়ে সামনে এগিয়ে আসছে ঢাকা সিটি করপোরেশনের দুই কর্মী। মশা মারার জন্য ধোঁয়া ছুড়ছে তারা। ধোঁয়ার ঝাঁজ থেকে বাঁচতে যে যে দিকে পারে দৌড়াচ্ছে। আবার অনেকেই ধোঁয়ার ভেতরেই দাঁড়িয়ে আছে। তারা নির্বিকার। ধোঁয়ার মধ্যে কোনও ঝাঁজ নেই। তার মানে ধোঁয়ার কোনও পাওয়ার নেই, যা দিয়ে মশাকে কাহিল করতে পারে।

মনে প্রশ্ন জাগল তাহলে এই ধোঁয়া ছুড়ে লাভ কী? পরক্ষণেই মনে হলো কেউ একজন কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে, ভাই আপনি জানেন না? সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় তো বলেই দিয়েছেন মশা মারার ধোঁয়ায় এবার কোনও কাজ হবে না। কারণ মশার ওষুধে কোনও পাওয়ার পাওয়া যাচ্ছে না। যে ওষুধ মজুত আছে, তা মশা মারার জন্য কার্যকর কোনও ওষুধ নয়। তাহলে অহেতুক ধোঁয়া ছুড়ছেন কেন ভাই? প্রশ্ন করতেই কে যেন উত্তর দিলো, ভাই বুঝলেন না? এটা হলো রুটিন ওয়ার্ক। ধোঁয়া ছুড়লাম। মশা মরলো কি মরলো না, তাতে কিছু যায় আসে না। মশার কাজ মশা করুক। আমাদের কাজ আমাদের করতে দিন।

পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে সেরকমই মনে হচ্ছে। মশার উৎপাত নিয়ে রাষ্ট্রপ্রধানসহ সবাই অস্থির। সবাই যেন মশার বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করেছেন। কার্যত কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। বরং মশা নিধনকে কেন্দ্র করে চমৎকার সব কেচ্ছাকাহিনি তৈরি হচ্ছে। মশাকে কেন্দ্র করে একজন মন্ত্রীর একটি মন্তব্য তো এখন সবার মুখে মুখে ছড়াচ্ছে। মশার বংশবিস্তারের সঙ্গে তিনি আমাদের দেশে আশ্রয় পাওয়া এক জনগোষ্ঠীর বংশবিস্তারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। কী অমানবিক বক্তব্য! যদিও অনেকেই তার এই বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তবুও প্রশ্ন হলো, মশা সমস্যার সমাধান না করে এই ধরনের বিব্রতকর মন্তব্য করারই বা মানে কী? আমরা কি আসল সমস্যা থেকে দূরে থাকার চেষ্টা করছি। কিন্তু সেটা কি সম্ভব?

ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালের দিকে ছুটছে। ডেঙ্গুর আক্রমণে জ্বরে ভুগে মারাও যাচ্ছে অনেকে। এমন পরিস্থিতিতে সমাধানের কথা না বলে অহেতুক তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার কোনও মানেই হয় না। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন একটি পত্রিকার প্রধান খবরে দেখলাম হেডলাইন দিয়েছে—‘ডেঙ্গুর ভয়াল বিস্তার, একদিনে ৮২৪ রোগী ভর্তি’। আরেকটি পত্রিকা শিরোনাম করেছে ‘প্রায় সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী, হিসাব অজানা’। আরেকটি পত্রিকার শিরোনাম দিয়েছে ‘৫ মাসে এডিস মশা বেড়েছে ১০ গুণ’। কী ভয়াবহ তথ্য। ৫ মাসে যদি এডিস মশা দশ গুণ বেড়ে থাকে, তাহলে তো ভবিষ্যৎ আরও ভয়াবহ।

এডিস মশা নিধনে কার্যকর ওষুধ ও ভূমিকার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু তবুও কি পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে? সবচেয়ে মারাত্মক যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা হলো প্রতিটি পরিবারে এডিস মশা বিষয়ক আতঙ্ক। বিশেষ করে পরিবারের ছোট ছোট বাচ্চারা ভয় পেয়েছে বেশি। অনেকে স্কুলে যেতে চায় না। বাবা-মাকে কাছে না পেলেই ভয়ে ভয়ে থাকে। মশা দেখলেই চিৎকার দিয়ে ওঠে। এতদিন অনেকের ধারণা ছিল মশা বুঝি ছোটলোকদেরই কামড়ায়। কিন্তু মশার আক্রমণে বড় বড় লোকদের জীবননাশ হওয়ায় বুঝি আতঙ্কটা বেশি ছড়িয়েছে। এই সুযোগে অসাধু কিছু চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান রোগীদের কাছে অবৈধ পন্থায় টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘৃণ্য তৎপরতাও শুরু করেছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত আমার এক আত্মীয় নগরীর একটি নামকরা হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। ওই হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের এতই ভিড় দেখা দিয়েছে যে প্রথম দিন তার জন্য কেবিন পাওয়া যায়নি। জেনারেল ওয়ার্ডে তাকে রাখা হয়েছে। তিনি সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মূল পদে দায়িত্বরত আছেন। বোধকরি সে কারণে পরের দিন তার জন্য একটি কেবিন ‘ম্যানেজ’ করা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের মন্তব্য, ওই হাসপাতলের আইসিইউ ইউনিটেও ডেঙ্গু রোগীকে রাখা হচ্ছে, দিনপ্রতি যার শুধু ভাড়াই ১৫ হাজার টাকা।

ডেঙ্গু পরীক্ষার ক্ষেত্রে সরকার প্রতিটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ৫০০ টাকা ফি নির্ধারণ করে দিয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগীর এতই ভিড় দেখা দিয়েছে যে, ভিড় এড়াতে বাধ্য হয়ে অনেকেই বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রের দিকে ঝুঁকছেন। এই সুযোগে নানান খাতে অতিরিক্ত ফি আদায়ের ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে কিছু বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। ফলে একটা অসহায় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

এডিস মশা কামড়ালেই মানুষ ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত হয়। ময়লা আবর্জনা যুক্ত পানিতে এডিস মশা বংশবিস্তার করে, এ কথা আমরা সবাই জানি। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে এডিস মশার দৌরাত্ম্য দেখা দেয় এটাও কারও অজানা নয়। তাহলে আমরা সময় থাকতেই এ ব্যাপারে সচেতন হলাম না কেন? এডিস মশাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে ব্যাপক আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। সংশ্লিষ্টদের উচিত এই আতঙ্ক দূর করা। প্রসঙ্গক্রমে একটি কথা বলতে চাই। ময়লা আবর্জনাযুক্ত পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়। তার মানে ময়লা আবর্জনামুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করেও আমরা এডিস মশার আক্রমণ থেকে রেহাই পেতে পারি। বর্তমান পরিস্থিতিকে কি প্রকৃতির পক্ষ থেকে এক ধরনের হুশিয়ারি বলা যায় না? প্রকৃতি জানান দিচ্ছে, হে মানুষ তুমি ময়লা পরিহার কর। পরিষ্কার থাকো। তাহলে তোমাকে কেউ আক্রমণ করবে না। আর যদি পারো মনের ময়লা পরিষ্কার করো। কাজটি কি খুবই কঠিন?

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ