গুজব আর বাস্তবতার পার্থক্য বুঝতে হবে

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৩:৫৩, জুলাই ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৪, জুলাই ৩১, ২০১৯

জোবাইদা নাসরীনডেঙ্গু জ্বরে কাঁপছে বাংলাদেশ। আক্রান্তের সংখ্যা এরই মধ্যে সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়ে গেছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগনিয়ন্ত্রণ শাখার বরাতে গণমাধ্যম এই তথ্য প্রকাশ করছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ৬০ জেলায় ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার তথ্য জানিয়েছে। আর এ জ্বরে আক্রান্তের সংখ্যা ১৫ হাজার ৩৫৯ জন। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় রয়েছেন ১৩ হাজার ৫২৪, আর ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে রয়েছেন এক হাজার ৮৪৫ জন। বর্তমানে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, ঢাকায় প্রায় সবক’টি হাসপাতালে আর কোনও ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করাতে পারছে না। গতকাল ফেসবুকে এক বন্ধুর পোস্টে জানতে পারলাম, তার এক আত্মীয় ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত সাত মাসের বাচ্চাকে নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে ঘুরেছেন, কিন্তু ভর্তি করাতে পারছেন না। কারণ কোথাও কোনও সিট ফাঁকা নেই। সেই ঘটনার সত্যতা আরও মিললো যখন জানলাম একই আবাসিক ভবনের এক সহকর্মী ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছয় বছরের ছেলেকে নিয়ে গতকাল বিকাল পর্যন্ত বাসায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন। কারণ কোনও হাসপাতালে একটি সিট ম্যানেজ করতে পারছিলেন না। অনেক কষ্টে তিনি একটি সিট ম্যানেজ করে শেষ বিকালে ছেলেকে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করেছেন।
বছরের প্রথম পাঁচ মাস ডেঙ্গুর প্রকোপ কিছুটা কম হলেও জুন ও জুলাই মাসে এটি মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়। কিন্তু আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে ৮৫ শতাংশই চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যান না এবং যারা হাসপাতালে যান, তাদের মাত্র ২ শতাংশের তথ্য সরকারি নজরদারির মধ্যে আসে বলে বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে জানা যায়। 

এই ডেঙ্গু যখন এতটাই আসন পেতে বসেছে, তখন এটিকে ঘিরে বেসরকারি হাসপাতালগুলো ‘বাণিজ্য মেলা’য় বসে যায়। একটি খ্যাতনামা বেসরকারি হাসপাতালে একজন রোগীর ২৪ ঘণ্টায় বিল আসে ১ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। ডেঙ্গুর কাছে মানুষ অনেকটাই নিরুপায় হয়ে পড়েছে। এখন সরকারি হস্তেক্ষেপে সেটি কমিয়ে আনা হয়েছে। তবে এখন দেখার বিষয় হাসপাতালগুলো কতটা তা মানছে এবং এই বিষয়ে সরকারিভাবে কতোটা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

এই ডেঙ্গু জ্বরে যে আটজন মারা গেছেন তাদের মধ্যে দু’জন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং আরেকজন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের। গত শুক্রবার রাত ১০টার দিকে স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগের ১৩-১৪ সেশনের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী ফিরোজ। তার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের টনক নড়ে। বিশেষ করে তার লাশ ক্যাম্পাসে আনা এবং জানাজাকে কেন্দ্র করে বিভক্ত হয়ে পড়ে খোদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অনেকে এর সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘ভাবমূর্তি’র প্রশ্ন দেখেন। অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। প্রশ্ন হলো যখন পুরো বাংলাদেশেই ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ‘ভাবমূতি’ কাঁখে ঢেকে আসলে আমরা কী ঢাকবো?

তবে ফিরোজের মৃত্যু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা ঝাঁকুনি তৈরি করেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ১৩টি, ছাত্রীদের পাঁচটি এবং বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য একটি হল রয়েছে। এছাড়া রয়েছে আরও চারটি হোস্টেল। সবমিলিয়ে প্রায় বিশ হাজারের মতো শিক্ষার্থী হলে থাকেন। এ পর্যন্ত বিভিন্ন হলে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু হল প্রশাসন নিজেরা খোঁজ নিয়ে জেনেছে, আসলে এর সংখ্যা আরও বেশি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত অনেক শিক্ষার্থীই ইতোমধ্যে বাড়ি চলে গেছেন।

কেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ডেঙ্গু এতো ভয়াবহ? কারণ এর আবাসিক হলগুলোর প্রত্যেকটিতেই হাজারের বেশি শিক্ষার্থী থাকেন। তাই এসব হলে ডেঙ্গু খুব দ্রুত ছড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ডেঙ্গু রোগের প্রকোপ হঠাৎ করেই বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার দাবি উঠছে শিক্ষার্থীদের মধ্যে। ফেসবুকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিজেদের করা একটি জরিপেও এর প্রতিফলন দেখা গেছে। ১৭০০ শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণার পক্ষে মত দিয়েছেন। ডেঙ্গু মোকাবিলায় বিভিন্ন হল মশা নিধনের মেশিন কেনাসহ নানা ধরনের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতামূলক কর্মকাণ্ড চালু করেছে এবং ডেঙ্গু আক্রান্তদের পাশে থাকছে। তবে সীমাবদ্ধতার কথা জানাতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর বাস্তবতার কারণেই ডেঙ্গু জ্বরের ঝুঁকি কতটা কমানো যাবে, তা বলা মোটেই সহজ নয়। হলগুলোর গণরুমগুলোতে মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো সত্যিই কঠিন এবং এর ব্যবস্থাও নেই খুব একটা। এছাড়া হলের যে সিটগুলো আছে, তা আসলে একজন শিক্ষার্থীর জন্য তৈরি করা, খুবই ছোট। কিন্তু আবাসিক শিক্ষার্থীর তুলনায় সিট কম থাকায় সব সিটেই প্রায় সব হলেই ডাবলিং দেওয়া হয়। সেখানে মশারি টানানোর পর সত্যিকারভাবেই দু’জন শিক্ষার্থীর ঘুমানো কঠিন। এক রুমে দেওয়া হয় কমপক্ষে চারটি খাট। কোনও কোনও হলে আরও বেশি। ছেলেদের হলে অনেকে সিট না পেয়ে মেঝেতেও ঘুমান। 

ডেঙ্গু কিন্তু হঠাৎ করে নতুন আসা কোনও রোগ নয়। প্রায় বিশ বছর ধরেই চলে আসছে। সঠিক সময়ে মশা নিধনে দুটো সিটি করপোরেশনের কাজের ব্যর্থতার কারণেই ডেঙ্গু এতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বরং একজন মেয়র এটিকে গুজব বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, এক্ষেত্রে তো তাদের আগে থেকেই একটা পদক্ষেপ নেওয়ার দরকার ছিল। কিন্তু দুই মেয়রই ব্যর্থ ছিলেন। বিশেষ করে যখন ঢাকার অনেক রাস্তাতেই এখন মেট্রোরেলের কাজ চলছে এবং বর্ষাকালে সেখানে পানি জমে মশার বসতি হবে, সেখান থেকে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত জ্বর হবে, এই চিন্তা তো সবার মাথাতেই আসার কথা। কিন্তু মেয়রদের মাথায় আসেনি। কারণ তাদের মাথা ব্যস্ত ‘গুজব’ অস্ত্র ব্যবহারে। গুজব আর বাস্তব চিত্রের পার্থক্য তাদেরই তো সবার আগে বুঝতে হবে।

লেখক: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ইমেইল: zobaidanasreen@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ