‘ছেলেধরা’রা কখনও বড়লোক হয় না!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:৪৯, জুলাই ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪১, জুলাই ৩১, ২০১৯

আহসান কবির–আমাকে সমর্থন করো? কী ভালো লাগে শুনি?
–যদি বলি কিছু না, তাহলে?
–উমম…তাহলে গণপিটুনি।
–শুরু করো। মৃত্যুর প্রহর গুনি!
জানি না, গণপিটুনিতে এরপর কে মৃত্যুর প্রহর গুনছে! তবে ‘ছেলেধরা’দের কথা যত শোনা যায় ‘মেয়েধরা’দের কথা তেমন শোনা যায় না বললেই চলে! আর কথিত ছেলেধরাদের দোষ একটাই। তারা ‘গরিব শ্রেণির খেটে খাওয়া’ মানুষ! সমাজের যত চোর তারা সব গরিব মানুষ। তাদের সৌভাগ্য তারা ক্রসফায়ারে কম যায়, বেশি যায় গণপিটুনিতে। পুলিশের কাছে যাওয়ার জন্য আকুতি-মিনতি জানালেও সিনেমার শেষ দৃশ্যের মতো গণপিটুনিতে যাওয়ার পর পুলিশ আসে। গণপিটুনি খাবার পর যে আজরাইল আসে, সে কি মৃতের প্রতি সামান্য সদয় হয়? যারা ব্যাংকের টাকা চুরি করে কিংবা ঋণখেলাপি হয়, ক্রসফায়ার বা গণপিটুনি তাদের জন্য নয়। এমনকি যে পেটের দায়ে মাদকবহন ও বিক্রি করতে বাধ্য হয়, ক্রসফায়ার বা গণপিটুনি তার জন্য। মাদক সাম্রাজের অধিপতি বা গডফাদারদের জন্য নয়। বেশিরভাগ সাধারণ মানুষ খুব ‘সামান্য সর্বস্ব’ দিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে, এই অসংখ্য ‘সামান্য সর্বস্ব’ ক্রমশ সোজা করে দাঁড় করায় শেয়ারবাজারকে, এরপর যে দেশবিরোধীরা নিজেদের স্বার্থে শেয়ারবাজারে ধস নামায়, তারা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর ‘সামান্য সর্বস্ব’ দিয়ে যারা দেশের জন্য দাঁড়ায় শেয়ার বাজার ধসে সব হারিয়ে তারা যায় আত্মহত্যায়। ‘সামান্য সর্বস্বরা’ও ভাগ্যবান, তাদের যেতে হয় না গণপিটুনিতে! আত্মহত্যাই তাদের জন্য মুক্তির সনদ!

যারা গণপিটুনিতে প্রাণ দেয় কখনও-সখনও তাদের জন্য করুণার ফল্গুধারা বয়ে যেতে দেখা যায়। কেউ বলে ‘আহারে’, কেউ বলে ‘ইস’! কেউ কেউ বলে–‘বড় ভালো লোক ছিল!’ গণপিটুনিতে যে প্রাণ দেয় তাকে মারার বা হত্যা করার লোকের অভাব হয় না। কেউ কেউ সেই ঘটনা ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে। ভিডিও ভাইরাল হয়। শুধু নিহতের পরিবারের দায়িত্ব নিতে রাষ্ট্রের দেখা মেলে না। গণপিটুনিতে নিহত পরিবারের শিশুদের নিয়ে কেউ কেউ আক্ষেপ করে পোস্ট দেন–কী হবে এখন তুবার? (গণপিটুনিতে নিহত তাসলিমার মেয়ে তুবা)। কেউ কেউ নিজের ছবি দিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন–তুবার দায়িত্ব নিতে চাই। প্রয়োজনে লন্ডনের স্কুলে ভর্তি করাবো তুবাকে! তারপর থেমে যায় সব আলোচনা। হতভাগ্যদের কথা আর কারও মনে পড়ে না। সীমাহীন দুর্ভাগ্য নিয়ে তারা বেড়ে ওঠে রাস্তাঘাটে, কখনও কারও কাজের মানুষ হিসেবে।

মানুষের মনস্তত্ত্ব বড় বিচিত্র। কোথায় কখন কী যে তারা বিশ্বাস করে। নেত্রকোনার প্রত্যন্ত সাওতাল পল্লিতে এক যুবকের ব্যাগে শিশুর কাটা মাথা পাওয়ার পর থেকে গুজব ছড়াতে থাকে। খুব দ্রুত এই গুজব মানুষ বিশ্বাস করা শুরু করে। গত সাত দিনে বাংলাদেশের প্রাইমারি স্কুলগুলোর (১৮ থেকে ২৪ জুলাই, ২০১৯) সামনে অভিভাবকদের ভিড় বেড়েছে। গুজবের পর আশঙ্কা থেকে শিশু শিক্ষার্থীদের নিয়ে মা-বাবার শঙ্কা বেড়েছে। দেশের কয়েকটি জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কয়েকটি বাজারে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছে একটি বিদেশি সংবাদ সংস্থা। এই মানুষেরা বলেছেন তাদের শঙ্কার কথা। এলাকায় নাকি অচেনা লোকের সংখ্যা বেড়েছে। অচেনা মানুষ দেখলেই নাকি অনেকের মনে হচ্ছে–আরে মানুষটা ছেলেধরা না তো? হতাশার জায়গা থেকে দীর্ঘশ্বাস নেমে আসে আর দীর্ঘশ্বাস ছায়া ফেলে বিশ্বাসের দোলাচলে। কিন্তু মানুষ কী প্রকৃতিগতভাবে হিংস্র?

সৃষ্টির আদিলগ্ন থেকে মানুষ সমাজবদ্ধ জীব। একে অন্যের প্রয়োজনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কিন্তু একজন মানুষ যখন হতাশার শেষ পর্যায়ে পৌঁছে, তখন? যখন কোনও সুখবর আসে না জীবনের, যখন পিঠ ঠেকে যায় দেয়ালে, তখন? যখন আইনের প্রয়োগ থাকে না, রাস্তাঘাট ভাঙা, খানাখন্দে ভরা, তুমুল যানজট, বাজারে অগ্নিমূল্য, সামান্য জিনিস কিনতে নাভিশ্বাস ওঠে, তখন জীবনের প্রতি মোহ কমে যেতে থাকে, হতাশা মানুষকে নিয়ে যেতে থাকে চূড়ান্ত কোনও বহিঃপ্রকাশের দিকে। তখন নিজের হতাশাজনক অবস্থার বিপরীতে অন্যজনকেও টেনে নামাতে চায় নিজের অবস্থানে। সামষ্টিক বা ব্যক্তিগত হিংস্রতা ভর করে অজান্তেই। উন্মত্ত জনতা যখন আইন নিজ হাতে তুলে নেয়, তখন আশপাশের অনেকেই নিজেকে বিচারক কিংবা শক্তিশালী ভাবে। সবাই এক আদিম উল্লাসে ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের মতোই কোনও খেটে খাওয়া গরিব মানুষের প্রতি। তাদের স্নায়ু উত্তেজিত হয়, সাময়িক অথচ চূড়ান্ত উত্তেজনায় উন্মত্ত জনতা ভাবে, তারা পিটিয়ে মারছে শয়তান, ডাইনি কিংবা সিনেমার ভিলেনকে! হয়তো সাময়িকভাবে তারা পৈশাচিক আনন্দ পায়। পরক্ষণেই হয়তো গণপিটুনিতে যিনি নিহত হলেন, তার পরিচয় জানার পর মৃতের প্রতি সহনশীল হয়ে ওঠে এরাই।

সৃষ্টির আদিকাল থেকেই গুজবের পাখার গতি অনেক বেশি। গুজব কলেরা বা ডেঙ্গু মহামারির চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। ইংল্যান্ড ও ইউরোপের দেশগুলোতে গুজবকে নিয়ে অনেক গবেষণা চলে। একবার ইংল্যান্ডের এক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞানী রবার্ট ন্যাপের নেতৃত্বে ‘রিউমার ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিপার্টমেন্ট খোলা হয়েছিল। চার স্তম্ভ বা ভিত্তি না থাকলে নাকি গুজব প্রাণ পায় না। যেমন—

ক. গুজবটা মনে রাখার মতো হতে হবে।

খ. গুজবকে চলমান কোনও ষড়যন্ত্র বা আন্দোলনের অংশ হিসেবে জুড়ে দিলে ভালো হয়।

গ. কোনও ধর্ম, দল বা গোষ্ঠীর সেন্টিমেন্ট ধারণ করতে হবে গুজবকে।

ঘ. আপামর জনসাধারণের প্রচলিত বিশ্বাস বা সেন্টিমেন্টকে আঘাত করে উসকে দিতে পারে এমন জিনিস রটালে সেই গুজব ফল দেয়!

আর তাই ছেলেধরার গুজব ফল দেয়। ফল দেয় পদ্মা সেতুতে কাটা মাথা লাগবে সেই গুজব। গত ছয় সাত বছর ধরে গুজবের প্রাণভোমরা  সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। গুজব ছড়ানো শুরু হলেই তাই সরকার কিছু ওয়েবসাইট আর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয়। যেকোনও দেশের মিডিয়া নিয়ন্ত্রণ করা পুরোপুরি সম্ভব কিনা,  সেই বিতর্কে না গিয়েও এটা নিশ্চিত করে বলা যায়, টুইটার বা ফেসবুকের মতো যোগাযোগমাধ্যমে কারও কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি আর ২০১৭ সালের এপ্রিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশে ফেসবুকের আইডি সংখ্যা ২২ কোটি!

মানুষের দৃষ্টি বা মনোযোগ বদলে দিতে প্রয়োজন নিত্যনতুন কোনও ইস্যু। গণপিটুনি, গুজব কিংবা ছেলেধরা কি সেই টাইপের কিছু? তাহলে কি আড়াল করার চেষ্টা করা হচ্ছে সবার কাছ থেকে? এই আড়াল সম্পর্কে কার কী ধারণা? প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের এই যুগে কোনও কিছু কি আড়াল করা যায়? চেপে রাখা সম্ভব? হোক সেটা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে কারো নালিশ কিংবা শেয়ারবাজারে ধস অথবা অন্যকিছু?

লেখার শুরুতে বলা হয়েছে ‘মেয়েধরা’ দেখা যায় না! আগেরকালের রাজা বাদশা জমিদাররা ছিলেন মেয়েধরা। মেয়েদের ধরে এনে হেরেম বানাতেন। একসময় ছিল বাবু কালচার। টাকাওয়ালারাই ছিল বাবুকালচারের বাবু, মেয়েরা রক্ষিতা হতে বাধ্য হতো।  

আর গুজব গরিব মানুষের ভেতরেই বেশি ছড়ায়। তাদের যাচাই করে দেখার সময় কম। দিনের বেশিরভাগ সময় যায় পেটের চিন্তায়, কঠোর পরিশ্রমে। সংখ্যালঘু আর খেটে খাওয়া গরিব মানুষরা উপেক্ষিত থাকে দেশে, সমাজের বিভিন্ন অংশে। তারা নিজেদের ক্ষমতাহীন ভাবে। কখনও-সখনও গুজবের পাখাকে তাদের রঙিন মনে হয়। গুজবের গল্পকে তারা হয়তো সাময়িক ‘রঙ’ দিতে চায়। আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ক্ষমতাবান ভাবতে তাদের ভালো লাগে। রূপকথা আর আধুনিক গল্পের ‘ছেলেধরা’দের মিল শ্রেণিতে। তারা খেটেখাওয়া শ্রেণির, খুবই নিম্ন আয়ের মানুষ।

লেখক: রম্যলেখক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ