বন্যা ও ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রয়োজন ঐক্য

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৭:২৫, আগস্ট ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৬, আগস্ট ০১, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনউত্তরবঙ্গে বন্যার তাণ্ডব, ঢাকায় ডেঙ্গু, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়ানো গুজব আর তার ডালপালা মেলে নিরীহ মানুষ খুন–এই তো বাংলাদেশের হালচিত্র। মাঝখানে দাঁড়িয়ে রাজনীতিবিদরা। দাঁড়িয়ে বলবো এ কারণে, তাদের পারস্পরিক দোষারোপ আর গলাবাজিতে এডিস মশারা কর্ণপাত করছে না, কিংবা বন্যার্ত মানুষেরও আহাজারি থামছে না। কিন্তু তারা টেলিভিশনের সামনে আসছেনই। মনে হতে পারে—বন্যার্তদের কাছে যাওয়ার চেয়ে তারা যেন টিভি ক্যামেরার জন্য দাঁড়িয়ে থাকাটাকেই উত্তম মনে করেন। তাই এমন বলার সুযোগ নেই, সরকারের বিরুদ্ধে থাকা রাজনীতিবিদরা প্রকৃতই জনগণের বিপদে তাদের কাছে গিয়ে সহমর্মিতা প্রকাশ কিংবা সহযোগিতা করে সফল হয়েছেন। কিংবা সরকারও তার শক্তিশালী হাত লাগিয়ে এই শান্তির শত্রুদের বাগে আনতে পেরেছে। আর সামগ্রিক পরিস্থিতি যে কোনও পর্যায়ে সেটা তৃতীয় কোনও পক্ষকে বর্ণনা করতে হবে না। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নিজেই স্বীকার করেছেন—পরিস্থিতি উদ্বেগজনক।
এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত কোনও পরিকল্পনা কি আছে? এত বড় বিপর্যয় ঠেকানোর দায়িত্ব কি শুধু সরকার কিংবা সিটি করপোরেশন কিংবা স্থানীয় সরকারের? বারো মাসে তের প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ বাংলাদেশ। হালে সেটা কমে এলেও নিশ্চিহ্ন তো হয়ে যায়নি! এমন পরিস্থিতিতে আমরা কী দেখেছি? খুব মনে পড়ে অতীতে এ ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা মানবসৃষ্ট দুর্যোগের সময় সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন কিংবা রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর দায়িত্ব পালনের কথা। মাত্র সেদিনও ১৯৮৮ সালের বন্যার কথা নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। ঢাকা শহরের মোড়ে মোড়ে ত্রাণ ভাণ্ডার দেখা যেতো। প্রবীণদের নিশ্চয়ই মনে আছে, পাকিস্তান আমলে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো কাঁধে হারমোনিয়াম নিয়ে রাজপথে সাহায্য প্রার্থনা করতো। ত্রাণসামগ্রী নিয়ে গ্রামে চলে যেতো তারা। রাজনৈতিক দলগুলোও পাল্লা দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতো। আজকে এই যে এত বড় ডেঙ্গু বিপর্যয়, তাকে ঠেকানোর জন্য কি আমাদের মধ্যে তেমন কোনও উদ্যোগ লক্ষ করা যায়?

আমরা শুধু বলছি সরকারের ব্যর্থতার কথা। সরকার করছে না, সরকার পারছে না বলে নিজের দায়িত্বকে এড়িয়ে যাচ্ছি আমরা। হ্যাঁ, এটা স্বীকার করতে হবে, নাগরিকের নিরাপত্তার দায় সরকারের। আমাদের কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, নাগরিকের কল্যাণে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতা অনুযায়ী এগিয়ে আসবে এটাও তাদের পরীক্ষার একটি মাধ্যম। 

এর মাঝখানে যে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি হয় না কিংবা হবে না এটা নয়। কিন্তু আমরা যখন দেখি নেতিবাচক মনোভাবই যেন একমাত্র লক্ষ্য এবং রাজনৈতিক পক্ষগুলো একে অন্যকে ঘায়েল করার জন্যই মানুষের দুর্ভোগকে ভেলা হিসেবে ব্যবহারের চেষ্টা করে তখনই বিপত্তিটা ঘটে।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম সরকারকে বললেন, সরকার ব্যর্থ। দেশ আজ ডেঙ্গু ও বন্যায় কাঁপছে। তখন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাকে বললেন, বিএনপির নয়া পল্টনের কার্যালয় হচ্ছে গুজব তৈরির কারখানা। তার আগে একটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণ সংবাদ শিরোনাম করলো—ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সাড়ে ৩ লাখ ছাড়িয়ে গেছে। এমন শিরোনাম পড়ে যে কারও আতঙ্কিত হওয়ার কথা। সংবাদের ভেতরে দেখা গেলো এটি অনুমিত একটি পরিসংখ্যান। শুধু তাই নয়, অনুমিত সংখ্যাকেও যে গুরুত্ব দিতে হয়, সেই তদবিরও তারা করলো সংবাদের অভ্যন্তরে।

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র এই অনুমিত সংখ্যাকেই গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করে বিপাকে পড়লেন বেশ। গণমাধ্যমে স্পষ্ট প্রচার পেতে থাকে তিনি ডেঙ্গুকে গুজব হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।তাকে তুলোধূনো করতে থাকলো বিভিন্ন মহল থেকে। অন্যদিকে তিনি সমালোচনা হজম করেই গেলেন। ব্যাখ্যা করলেন না কোন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি ডেঙ্গু নিয়ে গুজবের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। তিনি বা তার পক্ষ থেকে বলা হলো না, তিনি নিজেই যেখানে ডেঙ্গুবাহী মশানিধনে সারাক্ষণ কাজ করছেন, সেখানে তিনি ডেঙ্গুকে গুজব বলবেন কোন কারণে। বাস্তবতা হচ্ছে—উদ্দেশ্যমূলক সংবাদ পরিবেশন করে যে হুলুস্থূল ফেলা দেওয়া হলো, তার কিন্তু কিছুই হওয়ার নয়। দক্ষিণের মেয়র মাঝখান থেকে তার নিজ দলের নেতার সমালোচনার মুখেও পড়লেন।

এই মুহূর্তে আমরা দেখতে পেলাম, ঢাকায় মেয়রদের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে। এটা গণতান্ত্রিক সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছা করে, যারা কুশপুত্তলিকা দাহ করলেন, তারা তো সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ঢাকায় মশকনিধন কার্যক্রমে অংশ নিতে পারতেন। সিটি করপোরেশনকে বলতে পারতেন, আমাদের ছাত্র সংগঠনের ১০ হাজার কর্মী দুইদিন সিটি করপোরেশনের মশকনিধন কার্যক্রমে অংশ নেবে। আপনারা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করুন। যদি সিটি করপোরেশন তাদের প্রস্তাবে ইতিবাচক সাড়া না দিতো, তখন তারা আন্দোলন করতে পারতো, মেয়রের কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে জনমত তৈরি করতে পারতো তাদের পক্ষে।

এদিকে, সরকারের কর্মযজ্ঞেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আসতে পারে। কেন সরকার কি ঘোষণা করতে পারে না ঢাকা শহরের প্রতিটি কলেজ থেকে কমপক্ষে ১০০জন শিক্ষার্থী যার যার এলাকায় বাড়িঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করার কাজে নিয়োজিত হবে। কিংবা কলেজ শিক্ষার্থীরা জনসচেতনতামূলক কাজে অংশ নেবে। এটা সরকারিভাবে সংগঠিত হলে অবশ্যই ইতিবাচক ফল আসতে পারে। এক্ষেত্রে রাজনীতিটাও হয়ে যেতে পারে। ধরা যাক ছাত্রলীগ কিংবা ছাত্রদলের টিম যাচ্ছে একটি পাড়ায়। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথা বলবে। অসচেতন নাগরিকের সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা এমনকি তাদের নিরাপত্তার কথা বলতে পারে তারা। দরকার হয় তাদের ব্যানার ফ্যাস্টুন ব্যবহার করতে পারে কাজের সময়। তখন কি তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ লাভ হবে না? আর এটা কি অন্যায় কিছু হবে?

এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের একটা উদাহরণ দিতে পারি। ওখানে তখন বামদল ক্ষমতায়। মাধ্যমিক পরীক্ষা চলছিল। প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রের কাছাকাছি রাস্তায় দেখা গেলো শত শত ছাত্র স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছে। ট্রাফিকের পাশে দাঁড়িয়ে তারা পরীক্ষার্থীদের রাস্তা পারাপারে সহযোগিতা করছে। অনেক অভিভাবক এসেছে পরীক্ষার্থীদের নিয়ে তাদের বসার ব্যবস্থা করছে। আরেক দল জিজ্ঞেস করছে প্রবেশপত্র, পেন্সিল-কলম সবকিছু ঠিক মতো এনেছে কিনা। কিংবা কারও কোনও প্রয়োজনে তারা সহযোগিতায় প্রস্তুত এটাও জানিয়ে দিচ্ছে। কাউকে দেখা গেলো অভিভাবকদের জন্য তৈরি ছাওনিতে পত্রিকা এবং তাদের দলীয় লিফলেট ইত্যাদিও বিতরণ করছে। পানি সরবরাহ করছে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশের ছাত্র-রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যদি তাদের সীমিত সাধ্য নিয়ে বাড়ি বাড়ি যায়, তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায়, আমাদের দেশে ছাত্ররাজনীতির প্রতি মানুষের যে নেতিবাচক মনোভাব আছে তা অনেকাংশে দূর হবে। সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক কলহ যাতে না হয় সেদিকটিও খেয়াল রাখতে হবে।

বিরোধী দল যদি উদ্যোগ নিয়ে বাধাগ্রস্তও হয় তাতেও তাদের রাজনৈতিক ফল তারা পেয়ে যাবে। তারা তখন বলতে পারবে, তাদের জনগণের দুঃখ-কষ্টে জনগণের পাশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। আর সরকার সমর্থক ছাত্রসংগঠন তাদের প্রতিপক্ষকে সহযোগিতা করে এটা প্রমাণ করতে পারে—বিরোধীরা শুধুই দোষারোপ করতে অভ্যস্ত। তারাও জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারছে। তাদের সহযোগিতা করছে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন। এতে করে রাজনীতির প্রতি মানুষের যে অবিশ্বাস তা কিছুটা হলেও ফিরে আসবে। অন্যদিকে ভয়াবহ পরিস্থিতি রোধে কিছুটা হলেও সহায়ক হবে।

তাই এই মুহূর্তে আমি মনে করি তরুণ ও ছাত্র রাজনীতিবিদদের বিলম্ব না করে রাস্তায় বেরিয়ে আসা উচিত—শুধুই মানুষের কল্যাণ চিন্তায়। এই মানুষগুলো যে তাদেরই বাবা-মা, ভাই-বোন। রাজনীতিবিদদের মনে রাখা উচিত ডেঙ্গু, বন্যা ও গুজবকে রাজনীতির ভেলা বানাতে সক্ষম হলেও মানসিকতার পরিবর্তন না আনতে পারলে এই ভেলাও ডুবে যাবে।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ