ডেঙ্গু নিয়ে সংকট বাড়ছে: আন্তরিকভাবে কাজে নামছে না সবাই

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ২০:২৯, আগস্ট ০১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:২৫, আগস্ট ০১, ২০১৯

স্বদেশ রায়বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, ডেঙ্গু রোগীর রক্ত পরীক্ষার কিটস ফুরিয়ে যাচ্ছে অধিকাংশ ডায়াগোনিস্টিক সেন্টারে। যা এখনই উদ্যোগ না নিলে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে দেখা দেবে। তখন রোগীর চিকিৎসা করাই সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে ডাক্তারদের পক্ষে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আরও আগেই সচেতন হতে হতো। ডেঙ্গু রোগী বাড়ার হার দেখেই তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হতো অবিলম্বে রক্ত পরীক্ষার কিটস আনার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ ক্ষেত্রে অন্তত ব্যর্থ হয়েছে। তবে এখন ব্যর্থতা নিয়ে বসে থাকার সময় নেই।  কারণ যে রোগে মানুষের মৃত্যু হয়, ওই রোগ যে সময়ে মহামারি আকারে দেখা দিয়েছে, তখন প্রতিটি কাজ কীভাবে সমাধান করা যায়, সেই পথেই হাঁটতে হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইতোমধ্যে নিজে যে কাজ করেছেন, তাতে প্রমাণিত হয়ে গেছে, তিনি গোটা বিষয়টির গুরুত্ব বোঝেননি। তাই এখন যে তিনি ডেঙ্গু নিয়ে সার্বিক কী করা উচিত সেটা বুঝবেন– এ নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ আসে। তবে, এখন এমন এক সময় যে, কাউকে দুটি কড়া কথা বলে বা লিখেই হাত ধুয়ে ফেলার উপায় নেই। কারণ, ডেঙ্গুর মতো রোগ মহামারি আকার নিয়েছে। তাই এখন সব থেকে আগে দরকার সমাধান। এ কারণে ডেঙ্গু রোগ শনাক্তের এই রক্ত পরীক্ষার কিটস অবিলম্বে জোগাড় করতে হবে। আমরা যতদূর জানতে পেরেছি প্রধানমন্ত্রী সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। তারপরেও তার কেবিনেটের সিনিয়র মন্ত্রীদের তার দলের  সাধারণ সম্পাদককে এ মুহূর্তে আরও দায়িত্ব নিতে হবে। তাদের অবিলম্বে ডেঙ্গু মোকাবিলায় করণীয় ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজ নির্ধারণ করার জন্যে একটি বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে। সেটা হতে পারে যেমন একজন সিনিয়র মন্ত্রীর নেতৃত্বে, যেমন আইন শৃঙ্খলা রক্ষা কমিটি হয়, তেমনি একজন সিনিয়র এবং পলিটিক্যাল মন্ত্রীর নেতৃত্বে ডেঙ্গু মোকাবিলা কমিটি করা যেতে পারে। এই কমিটিতে বিশেষজ্ঞদের রাখতে হবে। ওই কমিটিকে আগামী তিন মাস ডেঙ্গুর জন্যে কী কী সংকটের মুখে পড়তে হবে, সেগুলো চিহ্নিত করবে এবং তার সমাধানের পথ খুঁজবে। আর সেই পথে কাজ করবে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত ইতোমধ্যে নানাভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় বাংলাদেশকে সহায়তা করার কথা বলছে। তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কথা বলে অবিলম্বে কীভাবে তাদের কাছ থেকে রক্ত পরীক্ষার কিটস কতটা আনা সম্ভব, সে উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি রাজনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে, মানুষের জীবন রক্ষার জন্যে দ্রুত কোন কোন দেশ থেকে এই কিটস আনা যায়, তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ, রক্তপরীক্ষার হিড়িক পড়বে কয়েক দিনের মধ্যে। প্রধানমন্ত্রী দেশের মানুষকে পরামর্শ দিয়েছেন ঈদে গ্রামের বাড়ি যাওয়ার আগে রক্ত পরীক্ষা করে যেতে। প্রধানমন্ত্রীর এ পরামর্শ শতভাগ ঠিক। তা না হলে একদিকে ডেঙ্গু যেমন সারাদেশে ছড়িয়ে পড়বে, তেমনি প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে প্রকৃত চিকিৎসা সম্ভব হবে না। তখন অনেক মৃত্যুর  আশঙ্কা থেকে যায়। তাই প্রধানমন্ত্রীর এ নির্দেশ সবার অক্ষরে অক্ষরে পালন করা উচিত। কিন্তু ঢাকা শহরের লাখ লাখ মানুষ যখন রক্ত পরীক্ষা করতে যাবে, তখন রক্ত পরীক্ষার কিট সংকট আরও প্রকট হবে। তাই দুই-একদিনে ভেতর এ সমস্যার সমাধান করতে হবে।

অন্যদিকে আমরা অসহায়ভাবে একটি বিষয় লক্ষ করছি, ১৯৮৮ বা ১৯৯৮-এর বন্যায় যেমন আমরা বিভিন্ন সামাজিক শক্তি যেমন স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রী, বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীদের নেমে পড়তে দেখেছি। তারা রুটি তৈরি করে বিতরণ করতো, পানি বিতরণ করতো, বাড়িতে বাড়িতে কেরোসিন, দিয়াশলাই পৌঁছে দিতো; আবার এগুলো জোগাড়ের জন্যে নানাভাবে তারা কাজ করতো—ওইভাবে ডেঙ্গু মোকাবিলায় সামাজিক শক্তি এগিয়ে আসছে না। স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে সেই সামাজিক দায় থেকে এগিয়ে যাওয়ার তাগিদ দেখা যাচ্ছে না। এ মুহূর্তে তারা যদি পরিচ্ছন্নতার কাজে, মানুষকে তার  বাসা বাড়ি পরিষ্কার করার জন্যে সচেতন রাখার কাজে নেমে পড়তো, তাহলেও কিন্তু দৃশ্যপট অনেকটা পরিবর্তন হতো। তার বদলে এখন শুধু ক্যামেরার সামনে মহড়া দেওয়ার দৃশ্যই দেখা যাচ্ছে। এমনকি বড় পদের একজনকে দেখা গেছে, আগে রাস্তায় ময়লা ফেলে রেখে পরে টিভি ক্যামেরা এনে ওই ময়লা পরিষ্কারের মহড়া দিতে। যে সময়ে মানুষ মারা যাচ্ছে ওই সময়ে একটি রাজনৈতিক সরকারের বড় পদের বিশেষ করে জন প্রতিনিধি এ কাজ করলে তখন ধরে নেওয়া যায় সমাজের সব কিছু ভেঙে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, এটাও প্রমাণিত হয় আমাদের সমাজে রাজনৈতিক কালচার গড়ে ওঠেনি, আমরা এখনও সামরিক কালচারে আছি। রাজনৈতিক কালচারের ভেতর সততা, ত্যাগ, আত্মনিবেদন এগুলো থাকতেই হবে। আর এ ধরনের প্রতারণা এ তো সামরিক কালচার। সেই এরশাদের মতো বন্যার পানিতে নেমে গান গেয়ে বেড়ানো। ১৯৮৮’র বন্যায় মূলত ত্রাণ কাজ ও মানুষের সেবার কাজটি করেছিল তৎকালীন প্রগতিশীল বিরোধী দলীয় জোট ৮ দল ও ৫ দলীয় জোটের কর্মীরা। আর তাদেরও সামনের সারিতে ছিল বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, সামজিক সংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ছেলে মেয়েরা। তাদের কয়েকজন সেদিন পানিতে ডুবে মারাও গিয়েছিল। আজ ডেঙ্গুর এই অবস্থাতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিদেশে বেড়াতে যাওয়া, সামাজিক শক্তিগুলো ও তরুণদের চুপ চাপ বসে থাকতে দেখে স্বাভাবিকই প্রশ্ন জাগছে, সমাজের প্রাণ কি মারা গেছে? ডেঙ্গু  যেভাবে এগিয়ে আসছে তাতে একে মোকাবিলা করতে হলে সমাজের প্রাণ অবশ্যই বাঁচিয়ে তুলতে হবে।

অন্যদিকে, মশার ওষুধের কার্যকারিতা নেই, এটা জানার পরও পনেরো দিনের বেশি হয়ে হয়ে গেলো, এখনও কেন দেশে কার্যকরী ওষুধ আনা হলো না? মেয়র সাহেব বলছেন, প্রয়োজনে প্লেনে করে হলেও ওষুধ আনা হবে। মেয়র সাহেবকে এখন যে কেউ জিজ্ঞেস করতে পারে আর কত প্রাণ গেলে, শেখ হাসিনার সাফল্য আর কতটা ম্লান করতে পারলে তিনি প্রয়োজন মনে করবেন? বাস্তবে কি তাকে দিয়ে কার্যকর ওষুধ আনা সম্ভব হবে? মনে হয় হবে না। 

তাই প্রধানমন্ত্রী বিদেশে থাকলেও তাকেই এখন নির্দেশ দিতে হবে কীভাবে ও কোন পথে অবিলম্বে মশা মারার কার্যকর ওষুধ আনা যাবে। তিনি উদ্যোগ নিলেই দেশে অবিলম্বে মশা মারার কার্যকর ওষুধ আসবে। কারণ, মনে রাখা দরকার ডেঙ্গু’র প্রকোপ মে, জুন, জুলাইয়ের থেকে আগস্ট ও  সেপ্টেম্বরে বেশি দেখা দেয়। তাই অবিলম্বে মশা মারা ছাড়া অন্য কোনও বিকল্প নেই। আর সেজন্য দরকার কার্যকর ওষুধ। পাশাপাশি শহরকে, শহরের প্রতিটি বাড়িকে, বা যেখানে যেখানে মশা বংশ বিস্তার করতে পারে এ জায়গাগুলো অবশ্যই পরিষ্কার করতে হবে। এই পরিচ্ছন্নতার জন্যে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের পাশাপাশি সামাজিক শক্তিকে অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে। এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করার মত সময় কারও হাতে নেই। সামাজিক শক্তির জন্যে তাই সৈয়দ শামসুল হকের নুরুলদীনের মতোই উচ্চ স্বরে বলা যেতে পারে, জাগো বাহে কুনঠে সবাই... 

লেখক: সাংবাদিকতায় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ