ধর্ষণ প্রতিরোধে জরুরি অ্যাকশন

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৭:০৬, আগস্ট ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৯, আগস্ট ০২, ২০১৯





মো. জাকির হোসেনধর্ষণ ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। বাবা, শ্বশুর, দুলাভাই, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মসজিদ-মাদ্রাসা-মন্দিরের ইমাম-হুজুর-পুরোহিতরাও বাদ পড়ছেন না। মসজিদ-মন্দিরের মধ্যে ধর্ষণ। নয় মাসবয়সী শিশু থেকে শতবর্ষী রোজাদার বৃদ্ধাও ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। আইয়্যামে জাহিলিয়ার যুগেও বাবা সন্তানকে, শ্বশুর পুত্রবধূকে ধর্ষণ করেছেন এমন খবর সচরাচর শুনা যায় না। বাংলাদেশ এক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ, তলাবিহীন রাষ্ট্র হিসেবে দুর্নাম কুড়িয়েছিল। ধর্ষণ যে সর্বগ্রাসী রূপ নিয়েছে তা প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বাংলাদেশের গায়ে ধর্ষণের উপত্যকার তকমা জুড়ে দেওয়ার শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কেন ধর্ষণ মহামারি রূপ নিলো তা ব্যাখ্যা করতে নানা মুনির নানা মত পত্র-পত্রিকায়, প্রকাশিত হচ্ছে। কেউ বলছেন, জাতি হিসেবে আমরা একটি রূপান্তর কাল অতিক্রম করছি তাই সমাজে অস্থিরতা। কেউ আইনের শাসনের অভাব, পরিবারের বন্ধন আলগা হয়ে যাওয়া, ক্ষেত্র বিশেষে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ধর্ষকের পক্ষ অবলম্বন করা ইত্যাদিকে দায়ী করছেন।
ধর্ষণের অভিশাপমুক্ত হতে কেউ পারিবারিক বন্ধনকে আরও জোরালো করা, নৈতিক শিক্ষা জোরদার করা, সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীকে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ধর্ষণবিরোধী ভূমিকা পালন করাসহ নানা পরামর্শ দিচ্ছেন। কেউ কেউ আইন সংশোধন করে দ্রুত বিচারের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। কেউ কেউ আবার ক্রসফায়ারে হত্যাকেও সমর্থন করছেন। সব পরামর্শকে আমি সমাধান মনে না করলেও অধিকাংশের সঙ্গেই আমার দ্বিমত নেই। সমাজ থেকে ধর্ষণ নির্মূল করতে হলে এ বিষয়ে আমাদের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আবশ্যক বলে মনে করি। যেমন ধরুন, ধর্ষণকে আমরা অপরাপর অপরাধের মতোই গোত্রভুক্ত করে এ বিষয়ে আইন ও বিচারিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। কিন্তু স্রষ্টা তার সৃষ্টির চরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত বলে এ অপরাধকে অন্যান্যর অপরাধ থেকে আলাদা করে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। একইসঙ্গে এর বিচার ও শাস্তি কার্যকরের ক্ষেত্রেও অন্যান্য অপরাধ থেকে স্বতন্ত্র পদ্ধতির কথা বলেছেন।

ইসলামি আইন শাস্ত্রে ধর্ষকের শাস্তি ব্যভিচারকারীর শাস্তির অনুরূপ। তবে অনেক ইসলামি দার্শনিকরা ধর্ষণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কিছু শাস্তির কথা উল্লেখ করেছেন। ব্যাভিচার পারস্পারিক সম্মতিতে হয়। ব্যভিচার শিরকের পর বৃহত্তম অপরাধ। রাসুল (স.)বলেছেন, ‘আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার পর কোনও নারীর সঙ্গে অবৈধভাবে যৌন সম্পর্ক করার মতো বড় পাপ আর নাই।’ (আহমদ, তাবারানি)

রাসুল (স.) বলেছেন, ‘ঈমান একটি উত্তম পোশাক, যা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকেই পরিধান করান। আর কোনও বান্দা যখন ব্যভিচার করে তখন তার কাছ থেকে তিনি ঈমানের পোশাক খুলে নেন। এরপর তওবা করলে তাকে পুনরায় এ পোশাক ফিরিয়ে দেওয়া হয়।’ (বায়হাকী, তিরমিযি, আবু দাউদ ও হাকেম)

পবিত্র কোরআনে বর্ণিত হয়েছে, ‘আর ব্যভিচারের ধারে-কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।’ (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)

অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, ‘কোনোরকম অশ্লীলতার কাছেও যেও না তা প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক।’ (সূরা আনআম: ১৫১)

আলেমরা বলেছেন, ‘ব্যভিচার করো না’-এর চেয়ে ‘ব্যভিচারের ধারে-কাছেও যেয়ো না’ অনেক বেশি কঠোর বাক্য। এর অর্থ যেসব বিষয় ব্যভিচারে ভূমিকা রাখে সেগুলোও নিষিদ্ধ। অর্থাৎ, ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধকারী উপায়-উপকরণ থেকেও দূরে থাকতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কেন স্রষ্টা এমন নির্দেশ দিয়েছেন? কারণ স্রষ্টা মানব চরিত্রের ভেতর-বাইরের সম্পূর্ণ বিষয়ে পূর্ণ অবগত আছেন। আল্লাহ বলেন, ‘...আর মানুষ সৃষ্টিগতভাবেই দুর্বল’।(সূরা নিসা: ২৮)

এই দুর্বলতার কারণে তার পাপে লিপ্ত হয়ে পড়ার আশঙ্কা বেশি। মানুষের এ দুর্বলতার সাক্ষ্য মিলে পবিত্র কোরআনের সূরা আল ইমরানে। আল্লাহ বলেন, ‘নারী, সন্তান-সন্ততি, জমাকৃত সোনা-রূপার ভাণ্ডার, পছন্দসই (চিহ্নিত) ঘোড়া, চতুষ্পদ জন্তু ও ক্ষেত-খামার প্রভৃতি কমনীয় জিনিসকে মানুষের নিকট শোভনীয় করা হয়েছে। এ সবই ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামগ্রী মাত্র। আর আল্লাহর নিকটেই উত্তম আশ্রয়স্থল রয়েছে।(সূরা আল ইমরান: ১৪) তাফসিরকারকরা বলেছেন, ‘কমনীয় জিনিস’ বলতে এখানে এমন সব জিনিসকে বোঝানো হয়েছে, প্রাকৃতিকভাবে মানুষ যার প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং যা পছন্দ করে। সৃষ্টিকর্তা এ জন্যই ব্যভিচারে উদ্বুদ্ধকারী উপায়-উপকরণের ধারে-কাছে যেতেও নিষিদ্ধ করেছেন। আমাদের দেশে ব্যভিচার ও ধর্ষণে উদ্বুদ্ধকারী অন্যতম উপায়-উপকরণ হলো পর্নছবি ও অশ্লীল সামগ্রীর অতি সহজলভ্যতা।
মোবাইল ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ থাকায় পর্নছবি মুড়ি-মুড়কির মতো সহজলভ্য। আমাদের উচ্চ আদালত ও বাংলাদেশ সরকারকে ধন্যবাদ যে, আদালতের নির্দেশে সরকার পর্ন ওয়েবসাইট বন্ধ করেছেন। আমি তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি সব পর্ন বিষয়বস্তু প্রদর্শন বন্ধ করা হয়নি বা বন্ধ করা যায়নি। প্রযুক্তিবিদরা বলেছেন, শুধু সাইটের নামভিত্তিক হলে এটা সফল হবে না। পর্নো বিষয়বস্তু দেখা সফলভাবে বন্ধ করতে হলে সরকারকে কেন্দ্রীয়ভাবে কন্টেন্ট বেইজড পর্নসাইটগুলো ফায়ারওয়াল দিয়ে বন্ধ করতে হবে। এ জন্য একটা শক্তিশালী টিম দরকার যারা নিয়মমত তদারকি করবেন। চীনের একটা প্রজেক্ট আছে যার নাম Green Dam Youth Escort যার মাধ্যমে পর্ন বিষয়বস্তু দেখা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে।

ইসলামে ব্যভিচার এত বড় অপরাধ যে, কোনও বিবাহিত পুরুষ অথবা নারী এ অপরাধ করলে, তার জীবিত থাকার অধিকার থাকে না। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিও ভিন্ন। নির্দেশ হলো, পাথর মেরে তার জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাতে হবে যাতে সে সমাজে (অন্যদের জন্য) শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে যায়। কোরআনে বর্ণনা করা হয়েছে, ‘...আল্লাহর বিধান কার্যকর কারণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে’। (সূরা নূর: ২)

ব্যভিচার পারস্পারিক সম্মতিতে হয়। অন্যদিকে ধর্ষণের ক্ষেত্রে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক সংঘটিত হয়। ধর্ষণের ক্ষেত্রে দু’টো অপরাধ হয়। এক. অবৈধ শারীরিক সম্পর্ক, দুই. বলপ্রয়োগ বা ভীতিপ্রদর্শন। প্রথমটির জন্য ব্যভিচারের শাস্তি পাবে। পরেরটির জন্য ইসলামি আইনজ্ঞদের মতে, মুহারাবার শাস্তি হবে। মুহারাবা হলো, পথে কিংবা অন্যত্র অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়া ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা কিংবা লুণ্ঠন করা। এককথায়, ‘মুহারাবা’ হলো পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি, লুণ্ঠন, নিরাপত্তা বিঘ্নিতকরণ, ত্রাসের রাজ্য কায়েম করা ইত্যাদি। এক্ষেত্রে কেবল সম্পদ ছিনিয়ে নেওয়া, কিংবা কেবল হত্যা সংঘটিত করা কিংবা উভয়ই হতে পারে। মালেকি মাজহাবের আইনজ্ঞরা মুহারাবার সংজ্ঞায় ধর্ষণ তথা সম্ভ্রম লুট করার বিষয়টি যোগ করেছেন। মুহারাবার শাস্তি প্রসঙ্গে আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের সঙ্গে সংগ্রাম করে এবং দেশে হাঙ্গামা সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হয়, তাদের শাস্তি হচ্ছে, তাদের হত্যা করা হবে অথবা শুলে চড়ানো হবে অথবা তাদের হাতপা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে অথবা দেশ থেকে বহিষ্কার করা হবে। এটি হলো তাদের জন্য পার্থিব লাঞ্ছনা আর পরকালে তাদের জন্যে রয়েছে কঠোর শাস্তি’। (সূরা মায়িদা: ৩)

মানবচরিত্র সম্পর্কে সম্যক অবগত স্রষ্টা ধর্ষণকে বিশেষ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ শাস্তির কথা উল্লেখ করলেও বাংলাদেশের আইন ও বিচারে ধর্ষণ আর দশটা অপরাধের মতোই বিবেচিত হয়েছে। বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো পুরুষ বিবাহ বন্ধন ব্যতীত ষোল বৎসরের অধিক বয়সের কোনও নারীর সহিত তাহার সম্মতি ব্যতিরেকে বা ভীতি প্রদর্শন বা প্রতারণামূলকভাবে তাহার সম্মতি আদায় করিয়া, অথবা ষোল বৎসরের কম বয়সের কোনও নারীর সহিত তাহার সম্মতিসহ বা সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সঙ্গম করেন, তাহা হইলে তিনি উক্ত নারীকে ধর্ষণ করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।’ বাংলাদেশের আইনে ধর্ষণের সঙ্গে মৃত্যু না হলে মৃত্যুদণ্ড নেই। কেবল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের রয়েছে।

মহামারি রূপ নেওয়া ধর্ষণ প্রতিরোধে দু’টি দিক রয়েছে। এক. নিবারণমূলক ও দুই. প্রতিকারমূলক। ধর্ষণ ঠেকাতে নিবারণমূলক যে বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ, সেগুলো হলো ধর্ষণকে উদ্বুদ্ধ করে এমন উপায়-উপকরণ বিশেষ করে পর্ন, অশ্লীল বিষয়বস্তুর সহজলভ্যতা কাল বিলম্ব না করে বন্ধ করতে হবে। পরিবারকে আরও বেশি সচেতন হতে হবে। সন্তানদের সঙ্গে আরও বেশি সময় কাটাতে হবে, সন্তানের গতিবিধি লক্ষ রাখতে হবে। বিশেষ করে, তারা কেথায় যায়, কাদের সঙ্গে মিশে এ ব্যাপারে বাবা-মাকে লক্ষ রাখতে হবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলে ধর্ষণবিরোধী ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন। আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা একযোগে সারা দেশে কয়েক’শ কিলোমিটার দীর্ঘ মানববন্ধন করতে পারেন। কিশোর, তরুণ, যুব সমাজকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও এর বাইরে খেলা-ধূলা, বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, বিষয়ভিত্তিক অলিম্পিয়াডসহ নানা কো-কারিকুলার কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।

ধর্ষণ প্রতিরোধে মূল প্রতিকারমূলক বিষয় হলো দ্রুত বিচার করে ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। আর এটি করতে হলে ধর্ষণবিরোধী নতুন আইন প্রণয়ন আবশ্যক। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করতে হবে। বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ আইন প্রণয়ন সময়ের দাবি। জালিয়াতির মতো মামুলি অপরাধ ঠেকাতে ব্রিটেনকে জালিয়াতির শাস্তি মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে আইন তৈরি করতে হয়েছিলো। ধর্ষণবিরোধী নতুন আইন তৈরির সময় এ মামলার বিচারের ক্ষেত্রে প্রধান ত্রুটিগুলো নিরসনে মনোযোগ দিতে হবে। সারাদেশে বিচারের জন্য ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দেড় লক্ষাধিক মামলা ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচার চলছে ঢিমেতালে। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ মামলা। আর সাজা পাচ্ছে হাজারে মাত্র সাড়ে ৪ জন৷ সাজার হার ০.৪৫ শতাংশ। নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ ট্রাইব্যুনালে ৬ মাসের মধ্যে এসব মামলার বিচার শেষ করার বিধান আছে। কিন্তু নানা অজুহাতে তা শেষ হয় না। অনেকেই আইনের আশ্রয় না নিয়ে সালিশের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবিলা করতে চান। অপরাধীর শাস্তি না পাবার কারণে অপরাধপ্রবণতা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ধর্ষণের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ফরেনসিক পরীক্ষা হলে ধর্ষণের শারীরিক প্রমাণ পাওয়া সহজ হয়। দেরি হলে প্রমাণ বিলীন হয়ে যায়। কিন্তু আমাদের দেশে ভিকটিমদের পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয় ১০-১২ দিন পর৷ ফলে এখানেই ধর্ষকের ছাড়া পাওয়ার পথ তৈরি হয়ে যায়। ব্লাস্টের তথ্যমতে, ৭৫ শতাংশ ধর্ষণের সার্ভাইভার নারীকে স্থানীয় পুলিশ মেডিক্যাল পরীক্ষার নাম করে অপেক্ষা করতে বাধ্য করে। এফআইআর করতে অস্বীকৃতি জানায়, নানারকম নথিপত্রগত বা প্রশাসনিক ধমক প্রয়োগের মাধ্যমে মেডিক্যাল পরীক্ষাকে বিলম্বিত করে। এর পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালীরা নানাভাবে ধর্ষণের ঘটনাটি আদালতের বাইরে নিষ্পত্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। আর এর মধ্য দিয়ে সেই অতি গুরুত্বপূর্ণ ৭২ ঘণ্টা পার হয়ে যায়। ধর্ষণের চিহ্ন মুছে যাওয়ার আগেই ডাক্তারি পরীক্ষা করানো জরুরি। ধর্ষণকারী যেসব জিনিসের সংস্পর্শে এসেছে যেমন জামা-কাপড়, অন্তর্বাস, প্যাড ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংরক্ষণও আবশ্যক৷ আছে ডিএনএ পরীক্ষাসহ ধর্ষণের চিহ্ন নিশ্চিত করার বিশেষ কিছু ব্যবস্থা৷ এ সব আধুনিক পদ্ধতির মাধ্যমে ধর্ষককে চিহ্নিত করে তার বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা করা সহজ৷ শুধু তাই নয়, কোনও নারী যদি বলেন, ধর্ষণের সময় তিনি ধর্ষককে নখের আচড় বা খামচি দিয়েছেন, তাহলে পরে তার নখ কেটে পরীক্ষা করেও ধর্ষকের চিহ্ন পাওয়া সম্ভব। ধর্ষণের ঘটনা অবগত হওয়ার পরও পুলিশ অফিসার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষা করতে ব্যর্থ হলে তাকেও ওই মামলায় ধর্ষণের অপরাধের সহযোগী হিসেবে আসামি করার বিধান আইনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আমাদের দেশের বিচার ব্যবস্থা অনুযায়ী যে আদালত বিচার করছেন, সে আদালতের বিচারকের তদন্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু ইনকুইজেটরিয়াল বিচার পদ্ধতিতে বিচারিক জজের তদন্ত করার ক্ষমতা রয়েছে। এ পদ্ধতির অনুসরণে আমাদের দেশেও ধর্ষণ মামলার বিচারের ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতকে পরীক্ষামূলকভাবে তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া যেতে পারে। বিশেষ করে ধর্ষিতার ডাক্তারি পরীক্ষায় পুলিশের গাফিলতির প্রশ্ন উত্থাপিত হলে বিচারিক আদালত নিজেই এ বিষয়ে তদন্ত করতে পারবেন। এর ফলে পুলিশও প্রভাবশালীদের অবাঞ্ছিত চাপমুক্ত থেকে তদন্ত করতে পারবেন। ডিএনএ পরীক্ষা ও অপরাধ প্রমাণের বোঝা এখনও ধর্ষণের শিকার নারীর ওপরই রয়ে গেছে। নতুন আইনে এ দায়িত্ব ধর্ষকের ওপর দিতে হবে। অর্থাৎ ধর্ষককে প্রমাণ করতে হবে সে ধর্ষণ করেনি। আদালতে ধর্ষণ মামলার বিচার প্রক্রিয়াও ত্রুটিপূর্ণ। সাক্ষ্য আইন মেনে ধর্ষণকে যেভাবে আদালতে প্রমাণ করতে হয়, তা অনেক জটিল এবং অবমাননাকর। ফলে অনেক ভিকটিম মামলা করলেও আর শেষ পর্যন্ত আদালতে যান না। অপরাধী শনাক্ত করতে গিয়ে ধর্ষিতার চরিত্র নিয়ে বাজে প্রশ্ন করা, হেয়প্রতিপন্ন করা আইনে নিষিদ্ধ করতে হবে। অপরাধ শনাক্ত করতে ফোনকল, এসএমএস, গতিবিধি নজর রাখা ও পারিপার্শ্বিক তথ্য প্রমাণসহ অনেক পদ্ধতি রয়েছে যা দ্বারা অপরাধ প্রমাণ করা যায়। ভিকটিম ও সাক্ষী বার বার আদালতে আসতে অনাগ্রহী। তাই ডিজিটাল পদ্ধতির প্রয়োগে ভিকটিম ও সাক্ষীকে আদালত হাজির না করেই সাক্ষ্যগ্রহণ করার বিধান করতে হবে।

ধর্ষণ মামলার বিচারে নতুন আইন প্রণয়ন ও ধর্ষণে উদ্বুদ্ধকারী উপায়-উপকরণ বিশেষ করে পর্ন ছবি ও অশ্লীল সামগ্রীর সহজলভ্যতা বন্ধে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ ও ধর্ষণবিরোধী সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারলে ধর্ষণের অভিশাপ ও দুঃস্বপ্ন থেকে মুক্তি মিলবে বলে আশা করা যায়।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ