হটলাইন কমান্ডো, ফেসবুক লাইভ আর যুদ্ধের ভুল ফ্রন্ট

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৩:২৯, আগস্ট ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩০, আগস্ট ০৪, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানব্যারিস্টার সুমন ফেসবুক‌ লাইভ করেন। নানা বিষয়ে, নানা কায়দায় তিনি লাইভ করেন। স্কুলের সামনের ডাস্টবিন সমস্যা করছে,  সেটা দেখানোর জন্য ডাস্টবিনের ভেতরে ঢুকে, কোনও এলাকায় ব্রিজ কমপ্লিট হয়নি সেটার জন্য বুক পানিতে নেমে গায়ে গামছা দিয়ে, এমনকি তার ভাষায়, ‘একজন ব্যারিস্টার হয়েও লুঙ্গি পরে’ লাইভ করেন তিনি। স্কুলের সামনে ডাস্টবিন, সেতু কাজ সম্পন্ন না হওয়া, এসবের সঙ্গে সঙ্গে তিনি লাইভে এসে দেখান ট্রেনের প্ল্যাটফরম ট্রেনের তুলনায় নিচু থাকার কারণে ট্রেনে ওঠা কতটা কষ্টকর, একটা সড়ক কোন দিকে গেছে সেই সাইনবোর্ডে জায়গার নামের ওপরে পোস্টার সাঁটিয়ে দেওয়া হয়েছে, একটা রাস্তার কিছুটা ভেতরে একটা ল্যাম্পপোস্ট রয়ে গেছে, কিংবা ঢাকার রাস্তায় নানারকম সেবার ক্যাবলের জঙ্গল।
তার লাইভের তালিকায় আছে অত্যন্ত আপত্তিকর বিষয়ও—কিছুদিন আগে গণপিটুনিতে নিহত তাসলিমার সন্তানদের সঙ্গে লাইভ। এরকম একটা ট্রমার পরে হতভাগা মায়ের শিশু সন্তানদের এভাবে লাইভে আনা কতটা ভয়ঙ্কর সেটা বোঝার জন্য মনোবিজ্ঞানী হতে হয় না, এমনকি ব্যারিস্টার হওয়ারও দরকার নেই, খুব সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান দিয়েই সেটা বোঝা যায়। যাক এই প্রসঙ্গে আলোচনা থাকুক, এটি এই লেখার মূল প্রসঙ্গের বাইরে।

কখনও কখনও তার দেখানো সমস্যাটার সমাধান হয় খুব দ্রুত–লাইভের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে স্কুলের সামনের ডাস্টবিন সরে যাওয়ার কিংবা রাস্তার কিছুটা ভেতরে ঢুকে পড়া ল্যাম্পপোস্টে সরে যাওয়ার খবরও আমরা পাই। দেখে আমরা অনেকে ভীষণ আনন্দ পাই। অনেককেই ফেসবুকে লিখতে দেখি–এভাবে আরও কিছু মানুষ যদি রাস্তায় নেমে ফেসবুক লাইভে নানা সমস্যা তুলে ধরতো, তাহলে আমাদের প্রায় সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেতো। আসলেই কি হতো?

‘পর্বতের মুষিক প্রসব’ প্রবচনটির কথা মনে পড়লো দিন কয়েক আগে সোহেল তাজের একটা সংবাদ সম্মেলনের খবর পড়ে। চলতি বছরের ৩ এপ্রিল সোহেল তাজ তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেইজে একটি টিজার প্রকাশ করেন। সেখান দেখানো হয়, সোহেল তাজ ফিল্মি স্টাইলে একটা মোটর বাইকে চড়ে কিছুদূর গিয়ে বাইক থেকে নেমে মানুষের দরজায় গিয়ে টোকা দিচ্ছেন। টিজারটির শুটিং ও এডিটিং দেখলে মনে হয় তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ে আমাদের সামনে আসতে যাচ্ছেন। 

এরপর আমরা ওই সংবাদ সম্মেলনে জনলাম তিনি কী করতে যাচ্ছেন–তিনি ‘হটলাইন কমান্ডো’ নামে একটা টিভি শো নিয়ে মানুষের সামনে আসছেন। সামাজিক বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরতে এবং সুস্বাস্থ্যের প্রতি নজর দিতে মানুষকে সচেতন করতে চান এর মাধ্যমে। টিভি শোতে জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও সুস্থতা  ছাড়া আর কী থাকবে সেটার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, ‘সুস্থ থাকা মানে শুধু স্বাস্থ্যই না; সমাজের সুস্থতাও দরকার। গণমাধ্যমে এখন ধর্ষণের খবর পাওয়া যাচ্ছে। ইভটিজিং রয়েছে, মাদক—এগুলো সমাজের ব্যাধি। সমাজের সব ব্যাধিকে আমাদের লাল কার্ড দেখাতে হবে। সমাজের সমস্যাগুলোকে সমাধান করা না গেলে সোনার বাংলা গড়া যাবে না।’

সোহেল তাজ যা করতে যাচ্ছেন আর ব্যারিস্টার সুমন যা করছেন, সেটার প্রভাব নিয়ে যে কেউই বিতর্ক করতে পারেন। এটাও আমার মেনে নিতে দ্বিধা নেই, এই সমস্যাগুলো মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপনকে প্রভাবিত করে। প্রশ্ন হচ্ছে তারা যা করছেন, বা করতে যাচ্ছেন, সেটা করে কি এই সমস্যাগুলোর সমাধান হবে?

আমি বিশ্বাস করি, সমাধান তো হবেই না, বরং আমি বিশ্বাস করি এই দু’জনের বা এমন আরও কারও কারও কাজ আমাদের সমাজের জন্য, মানুষের জন্য ক্ষতিকর।

ফরাসি দার্শনিক এবং সমাজতত্ত্বিক জ্যাক এলু (Jacques Ellul) এর লিখা বই ‘Propaganda: The Formation of Men's Attitudes’ই সম্ভবত প্রথম বই যেটি প্রপাগান্ডা নিয়ে বিশদভাবে পূর্ণাঙ্গ আলোচনা করেছিল। প্রপাগ্যান্ডার ধরন, বিস্তারের কৌশল, প্রভাব নানা কিছু নিয়ে সেখানে কথা বলা আছে। এই বইয়েরই একটা বিষয় আমি এখানে উল্লেখ করতে চাই।

সত্তরের দশকের শুরুর দিকে প্রকাশিত বইটিতে জ্যাক এলু আমাদের স্বাভাবিক কাণ্ডজ্ঞানের বিপরীত একটা কথা বলেছেন। আমাদের স্বাভাবিক ধারণা থাকতে পারে একটা সমাজে মানুষ যত নিরক্ষর থাকবে মানুষ যত কম শিক্ষিত থাকবে সেই সমাজে প্রপাগান্ডা ছড়ানো হয়তো তত বেশি সহজ। কিন্তু এলু আমাদের জানান সমাজের স্বাক্ষরতা ও তথাকথিত শিক্ষার হার যত বাড়ে সেই সমাজে প্রপাগান্ডা ছড়ানো তত বেশি সহজ হয়। এই আলোচনার পরবর্তী অংশে যাওয়ার আগে আমাদের আলোচিত দুই চরিত্র নিয়ে আরেকটু কথা বলে নেওয়া যাক।

কিছুদিন আগে জনাব সোহেল তাজের ভাগ্নে গুম হয়েছিলেন। তখন জনাব সোহেল তাজ একের পর এক ফেসবুক লাইভে আসতে থাকেন তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আশ্বস্ত করেন এবং সত্যি সত্যি তার ভাগ্নেকে খুঁজে পাওয়া যায়। এরপর জনাব সোহেল তাজ জানান তার কামনা, ‘দেশের আর কোনও মানুষ এই পরিস্থিতিতে পড়ুক আমরা চাই না’। ২০০৯  সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই সরকারের আমলে ৬০০ জনের মতো মানুষ গুম হয়েছে।  অবশ্য বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়ে তিনি এখনও কিছু বলেননি। কারণ হয়তো এখনও তার কোনও স্বজন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে মারা যাননি। যদিও এই মুহূর্তের বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন একজনের বেশি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছে। 

কী কী সামাজিক সমস্যা নিয়ে জনাব সোহেল তাজ কাজ করবেন। সেই প্রসঙ্গে আমাদের জানান তিনি ইভটিজিং, ধর্ষণ, মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করবেন। এই তালিকায় গুম বা বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নেই, এটাই প্রত্যাশিত।

মজার ব্যাপার ব্যারিস্টার সুমন গণপিটুনিতে নিহত তাসলিমার পরিবারের কাছে গিয়ে তাদের সন্তানদের সামনে নিয়ে লাইভ করেন। কিন্তু এই সুমনই একটা বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কিংবা গুমের শিকার কোনও মানুষের পরিবারের স্বজনদের নিয়ে লাইভ করেন না। আমি বাজি ধরে বলছি, তিনি সেটা কখনও করবেনও না। 

সুমন একজন ব্যারিস্টার, তাই তার না বোঝার কোনও কারণ নেই যে, একটি রাষ্ট্রের বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কিংবা গুমের তুলনায় তারা যেসব নিয়ে কথা বলেন বা বলতে চান, সেগুলো কোনও ব্যাপারই না। সোহেল তাজও উচ্চশিক্ষিত সচেতন একজন মানুষ, তাই এটা তিনিও জানেন। উভয়েরই না বোঝার কোনও কারণ নেই গুম এবং বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিষয় যে রোগের প্রধান লক্ষণ সেটারই খুব ছোট কিছুর উপসর্গ হচ্ছে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা বিষয়গুলো। 

আমি কোনোভাবেই বলছি না, তাদের গুম বা বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড নিয়েই কথা বলতে হবে। আমি এটা বলতে চাইছি এমন সব বিষয় তারা বেছে নিচ্ছেন, যেগুলো এই সমস্যাগুলোর মূল কারণের কাছে আমাদের নিয়ে যাবে না।

আবার একটু জ্যাক এলুর কথায় ফিরে আসা যাক। তথাকথিত শিক্ষিতদের সময়ে কেন প্রপাগান্ডা বরং বেশি ছড়াতে পারে তার ‌ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এলু আমাদের জানান একজন ‘শিক্ষিত’ মানুষ আসলে কোনোকিছু পড়তেই শেখে। প্রতিটি বিষয়কে প্রশ্ন করে তলিয়ে দেখার মতো মননশীলতা আমাদের বিদ্যমান সিস্টেম মানুষের মধ্যে তৈরি হতে দেয় না। তার মৃত্যু হয় ১৯৯৪ সালে, তাই তিনি বর্তমান ইন্টারনেটের যুগটা দেখে যেতে পারেননি। দেখে যেতে পারলে তিনি বলতেন প্রযুক্তির স্বাক্ষরতা ও যত বাড়ে প্রপাগান্ডা ছড়ানো আরও বেশি সহজ হয়ে ওঠে। আজ মানুষের স্বাভাবিক এবং প্রযুক্তিগত স্বাক্ষরতা যখন অনেক বেড়েছে তখন কিছু মানুষের কিছু চটকদার কর্মকাণ্ড যখন সামনে আসে, তখন বেশিরভাগ মানুষ খুব গভীরভাবে চিন্তা না করে সেগুলোকে সঠিক বলে ধরে নেয়। এটা মানুষকে সচেতন আসলে তেমন একটা করে না বরং এই স্বাক্ষরতার কারণে মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ করা যেহেতু অনেক সহজ হয়ে যায় যে কোনও প্রপাগান্ডা ছড়িয়ে দেওয়া অনেক সহজ হয়। 

এরা যে কাজ করছেন তার প্রধান ক্ষতিকর দিক হচ্ছে এরা কিছু ক্ষুদ্র উপসর্গ আমাদের সামনে এনে সেটার দিকেই মানুষের মনোযোগ টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। তারা যেসব বিষয় আমাদের সামনে আনছেন, সে সব আসলে সুশাসনের ঘাটতিজনিত উপসর্গ। একটা রাষ্ট্রে সুশাসন না থাকা প্রমাণ করে সেই রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সব ভেঙে পড়েছে। একটা রাষ্ট্রের সরকার কীভাবে এবং কখন একটা রাষ্ট্রের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে ফেলে সেগুলো নিয়ে কথা বলার আগ পর্যন্ত কোনও সমস্যার সমাধান আসলে দীর্ঘমেয়াদে হবে না। এমনকি যেসব সমস্যা নিয়ে তারা কথা বলছেন, সেসব সমস্যারও সমাধান হবে না। 

তারা এসব বিষয় নিয়ে ক্রমাগত কথা বলে মানুষকে লড়াইয়ের মূল ফ্রন্ট থেকে সরিয়ে একেবারে ভুল, ক্ষুদ্র একটা ফ্রন্টে মানুষকে নিয়ে যান।

সোহেল তাজ ভীষণভাবে আওয়ামী পরিবারের মানুষ। তার বাবা-মা আওয়ামী লীগের অতি গুরুত্বপূর্ণ পদে ছিলেন। এখন বোন আছেন, এমনকি তিনি নিজেও এই দলের হয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন। ব্যারিস্টার সুমন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর হিসেবে কাজ করেছেন। এই দুইজনের এই ব্যাকগ্রাউন্ড তাদের কর্মকাণ্ড বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। আওয়ামী লীগ ব্যাকগ্রাউন্ডের মানুষ হওয়ার কারণে এই সরকার এটাও দেখাতে পারবে এমনকি আওয়ামী লীগের লোকজন সরকারের সমালোচনা করছে; এই রাষ্ট্রে একটা অসাধারণ গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করছে।

মানুষকে রাষ্ট্র বিনির্মাণের মূল লড়াইয়ের মূল ফ্রন্ট থেকে সরিয়ে ভুল তুচ্ছ ফ্রন্ট এ নিয়ে যাওয়া আর তাদের এই কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশে একটা চমৎকার গণতান্ত্রিক পরিবেশ বিরাজ করে এটা দেখিয়ে তারা মূলত বর্তমান চরম কর্তৃত্ববাদী সরকারটিকে টিকে থাকতে সহায়তা করেন। তাদের দু’জনই আওয়ামী লীগ ব্যাকগ্রাউন্ড—এতে যৌক্তিকভাবেই অনুমান করা যায় তাদের এই কাজটা তাদের অজান্তে হয়নি, এটা তাদের পরিকল্পিত পদক্ষেপ। আমি অনুমান করি ভবিষ্যতেও এমন মানুষ আরও আসবেন।

ভবিষ্যতে এদের সবার সামষ্টিক প্রপাগান্ডার সামনে আমরা পড়বো। ডিজিটাল মিডিয়ার কারণে সেটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়বে। আমরা খুব সহজে কমিউনিকেটেড হবো এবং সবকিছু বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করবো। আমরা মনে করতে থাকবো আমাদের যাবতীয় সমস্যার সমাধান এভাবেই হবে। অন্তরালে থেকেই যাবে যুদ্ধের মূল ফ্রন্ট—ক্ষমতায় থাকা মানুষদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করার লড়াই। ওই লড়াই থেকে যতো বেশি সংখ্যক মানুষকে দূরে সরিয়ে নেওয়া যাবে, ক্ষমতাসীনদের অনৈতিক ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার অনুকূল পরিবেশ তত বেশি নিশ্চিত হবে।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ