মানুষ কী করে খুনি হয়?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৫১, আগস্ট ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫২, আগস্ট ০৪, ২০১৯

আমীন আল রশীদগুজব ও আতঙ্ক পাশাপাশি শব্দ। কারণ যখন কোনও বিষয়ে আতঙ্ক তৈরি হয়, তখন সেখানে গুজবের ডালপালা মেলে। আবার যখন কোনও বিষয়ে গুজব ছড়ায়, সেখানে আতঙ্কও ভর করে। ফলে পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে—এমন গুজব যখন আতঙ্কে পরিণত হলো, তখন কোথাও কাউকে ছেলেধরা সন্দেহ হলে তার ওপর উত্তেজিত জনতা হামলে পড়বে, তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। শুধু বাংলাদেশ নয়, সম্প্রতি অপহরণকারী সন্দেহে ভারতের মহারাষ্ট্রে গণপিটুনির শিকার হয়েছেন খোদ কংগ্রেসের তিন নেতা।
বলা হচ্ছে ‘ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনি’। এখানে ‘গণ’ শব্দটি যুৎসই নয়। কেননা এটি ইংরেজি ‘ম্যাস’ বা ‘পাবলিক’ শব্দের বাংলা নয়। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে ‘গণ’ শব্দটি প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। এখানে অপরাধটি সংঘটিত হয় সংঘবদ্ধভাবে, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘গ্যাং’। সুতরাং গণপিটুনি না বলে বলা উচিত সংঘবদ্ধ নৃশংসতা। একইভাবে ‘গণধর্ষণ’ না বলে বলা উচিত ‘সংঘবদ্ধ ধর্ষণ’। কেননা বিষয়টা ‘গ্যাং রেপ’।
এখন প্রশ্ন নানাবিধ—

১. হঠাৎ করে কেন পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে এমন গুজব ছড়ালো?

২. কারা কী উদ্দেশ্যে এই কথা প্রচার করলো?

৩. মানুষ কেন এ জাতীয় গুজব বিশ্বাস করে এবং কাউকে সন্দেহ হলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে?

৪. হঠাৎ করে এত কথিত ছেলেধরা কোথা থেকে এলো?

৫. রাজধানীর বাড্ডায় একটি স্কুলের ভেতর থেকে একজন নারীকে টেনেহিঁচড়ে বের করে এনে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যার দায়ে বেশ কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হলেও এর দায় ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে কি না?

৬. যারা ওই নারীকে পিটিয়ে হত্যা করলো, বিশেষ করে বহিরাগতরা, তাদের কেন এত উৎসাহ ছিল? তারা কি সামাজিক দায়বদ্ধতা অথবা ভয় থেকে এভাবে পিটিয়ে মারার যজ্ঞে শামিল হলো নাকি মানুষ মারার যে পাশবিক আনন্দ—সেই আনন্দের উদযাপন করলো?

৭. মানুষ কী করে খুনি হয়ে ওঠে? ওই ঘটনার ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যারা নৃশংসভাবে রেণুকে পিটিয়ে মেরেছে, তারা মারপিটে সিদ্ধহস্ত। নিতান্ত পেশাদার বা অভ্যস্ত না হলে এভাবে একজন মানুষকে, বিশেষত একজন নারীকে এভাবে প্রকাশ্যে পেটানো সম্ভব নয়। তাদের মারের যে স্টাইল, সেটি সিনেমাকেও হার মানায়। এই মারের প্রশিক্ষণ তারা কোথায় পেলো? সুতরাং এই মারের সঙ্গে যারা জড়িত, তাদের প্রত্যেকের অতীত পর্যালোচনা করা দরকার। আপনি নিজেকে প্রশ্ন করে দেখুন, আপনাকে যদি সুযোগ দেওয়া হয় এবং বড় কোনও অপরাধীকেও যদি মারতে বলা হয়, আপনি তাকে কতটুকু মারতে পারবেন? কিন্তু বাড্ডায় বা অন্য যেকোনও স্থানে সম্প্রতি যারা পিটিয়ে মানুষ খুন করেছে, সেই লোকগুলোর পরিচয় কী? তারা কি সমাজের আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই স্বাভাবিক? একজন সবজি বিক্রেতা কী করে মুহূর্তের মধ্যে খুনির ভূমিকা অবতীর্ণ হতে পারলো?

স্মরণ করা যেতে পারে, যমুনা নদীর ওপরে বঙ্গবন্ধু সেতু নির্মাণের সময়ও একইরকম গুজব ছড়িয়েছিল যে সেখানে মানুষের মাথা লাগবে। তখনও নানা জায়গায় ছেলেধরা সন্দেহে অনেককে ধরা হয়েছে, গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনও একজন লোকের সন্তান খুন হয়েছে বা হারিয়ে গেছে কিংবা কোনও একজনের মাথা যমুনা সেতুর পিলারের নিচে সমর্পণ করা হয়েছে, এরকম কোনও প্রমাণ নেই।

বাংলাদেশে এ জাতীয় গুজবের ভিত্তি আরও পেছনে। ছোটবেলায়ও আমরা এমন কথা শুনতাম এবং ওই সময়ে বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা আতঙ্ক তৈরি হতো। কিন্তু আসলেই কতজনের সন্তান হারিয়ে গেছে বা কতজনের মাথা কেটে নেওয়া হয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা যেতো না বা আদৌ এরকম ঘটনা কখনো ঘটেছে কি না, তাও পরিষ্কার নয়। কিন্তু মানুষের মনে একটা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়তো এবং তখন আমরা দেখতাম বিভিন্ন পণ্যের ফেরিওয়ালাদেরও মানুষ সন্দেহ করতো। ফলে তখন পাড়া-মহল্লা ও গ্রামে ফেরিওয়ালাদের আনাগোনা কমে যেতো এবং অপরিচিত ফেরিওয়ালা বা লোক দেখলে মানুষ তাকে জেরা করতো।

সম্প্রতি ছেলেধরা সন্দেহে যাদের পিটিয়ে খুন করা হয়েছে এবং যাদের গণপিটুনির পর পুলিশে দেওয়া হয়েছে, তাদের প্রত্যেকের ব্যাপারে পুলিশ তদন্ত করে দেখেছে এদের কেউই ছেলেধরা বা অপরাধী নন। বরং রাজধানীর বাড্ডায় রেণু নামে যে নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে, তিনি স্কুলে গিয়েছিলেন ছেলের ভর্তির বিষয়ে খোঁজ নিতে। কিন্তু তাকে জেরা করেন ওই স্কুলেরই কিছু অভিভাবক। যে কারণেই হোক, সেখানে অভিভাবকদের কাছে অপরিচিত ওই নারী হয়তো কথায় জড়িয়ে গিয়েছেন কিংবা তিনি হয়তো গুছিয়ে কথা বলতে পারেননি। ফলে তাকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করা হয় এবং প্রধান শিক্ষকের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেও চলে উপর্যুপরি জেরা। একপর্যায়ে এই কথা রাষ্ট্র হয় গেটের বাইরে। তখন ‘অতি উৎসাহী সচেতন জনতা’ এসে তাকে প্রধান শিক্ষকের রুম থেকে টেনেহিঁচড়ে বাইরে গিয়ে নৃশংসভাবে পিটিয়ে হত্যা করে।

নারায়ণগঞ্জে যে লোকটিকে পিটিয়ে মারা হয়েছে, তিনিও ছিলেন নিরপরাধ। সাভারে যে নারীকে খুন করা হয়েছে, তিনিও ছেলেধরা বা অপহরণকারী ছিলেন না। কিন্তু এই মানুষগুলোকে বেঘোরে প্রাণ দিতে হলো স্রেফ গুজব ও ছেলেধরা আতঙ্কের কারণে।

একসময় মাটির নিচের পিলারের ব্যবসা বেশ জমজমাট ছিল। একেকটি পিলার নাকি কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে। তখন সারা দেশেই পিলারের সন্ধানে ছুটে বেড়িয়েছে কিছু লোক। এটি ছিল একটি বিশাল চক্র। কিন্তু পিলার বিক্রি করে আসলে কতজন কোটিপতি হয়েছে, তা জানা যায় না। এরপর তক্ষক নামে গিরগিটি জাতীয় একটি প্রাণী নিয়েও একইরকম গুজব ছড়ায়, নির্দিষ্ট একটি সাইজের তক্ষক পাওয়া গেলে তার বাজারমূল্য লাখ টাকা। আসলেই তক্ষকের এই বাজারমূল্য আছে কিনা বা যে কারণে এটি ধরার জন্য একশ্রেণির মানুষ উদভ্রান্তের মতো নানা জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছে, সেটি আসলে মরীচিকা কিনা, তা গোয়েন্দারা ভালো বলতে পারবেন।

বাস্তবতা হলো, এর সবকিছুর পেছনেই থাকে বিশাল চক্র। অর্থাৎ একটি সস্তা জিনিসও এভাবে প্রচারের ফলে দামি হয়ে ওঠে এবং হাত বদল হতে হতে এটি হয়তো দুর্মূল্য হয়ে ওঠে। কিন্তু আখেরে এখানে টাকা খাটিয়ে কতজন শেষমেশ লাভবান হয়েছে আর কতজন নিঃস্ব—তারও অনুসন্ধান হতে পারে।

মানুষের মাথার ক্ষেত্রেও হয়তো এরকম কোনও চক্র আছে যারা গুজবটি বাজারে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং একটি মাথা এনে দিতে পারলে লাখ টাকা দেওয়া হবে, এরকম প্রলোভনে পড়ে হয়তো কেউ কেউ সত্যিই এই কাজে নেমে পড়েছিল। কিন্তু সেই চক্রের সন্ধান পাওয়া কি অসম্ভব? নাকি কেউ একজন অতীতের অভিজ্ঞতায় নিতান্ত কৌতূহলের বশে গুজবটি ছড়িয়ে দিয়েছিল যে পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে এবং এরপর একজন দুজন করে বিষয়টি দ্রুত রাষ্ট্র হয়ে গেছে? যে বা যারা এই কথাটি ছড়ালো তাদের কি কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে? নাকি কারো ফাজলামোর বিষয়টি একপর্যায়ে সিরিয়াস বিষয়ে পরিণত হওয়ার ফলে কয়েকজন মানুষকে জীবন দিয়ে তার মূল্য দিতে হলো? আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীর লোকজন নিশ্চয়ই এর তদন্ত করছে।

আমরা বরং রাজধানীর বাড্ডায় যে নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, সেদিকে দৃষ্টি দিই। ওই নারীকে প্রথমে স্কুলের গেটে জেরা করেন কয়েকজন অভিভাবক। তারপর সন্দেহ হলে তাকে নেওয়া হয় প্রধান শিক্ষকের রুমে। প্রশ্ন হলো অভিভাবকরা কেন ওই নারীকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করলেন? এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, যখন ছেলেধরা গুজব ছড়ালো তখন প্রত্যেক অভিভাবকই আতঙ্কিত হয়েছেন এবং যাদের ছোট সন্তান স্কুলে যায় তাদের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হয়েছেন। এরকম একটি ভীতিকর পরিস্থিতিতে কেউ একজন যদি কাউকে ছেলেধরা বলে সন্দেহ করে তখন সব অভিভাবক ওই সন্দিগ্ধ ব্যক্তির ওপর হামলে পড়বেন, সেটিই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে দেখার বিষয়, কারও অতি উৎসাহ ছিল না। এখন পর্যন্ত যতটুকু জানা গেছে, স্কুলের কয়েকজন অভিভাবকের পাশাপাশি বহিরাগত কিছু লোকই মূলত ওই নারীকে পিটিয়ে হত্যা করে।

আমাদের আশপাশে তাকালে দেখা যাবে, এরকম লোকের সংখ্যা নেহাত কম নয়। রিকশাচালকের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে বচসার পরিণতিতে বেধড়ক মারপিট অপরিচিত দৃশ্য নয়। আবার সামান্য জিনিস চুরির অভিযোগে কিংবা অপবাদে অথবা দায়ে যেকোনও বয়সী একজন মানুষকে যখন কেউ একজন একটি ঘুষি দেয়, তখন সেখানে মুহুর্মুহু আক্রমণে শামিল হয় আরও অনেকে। কিন্তু অনেক সময় এরকম জনরোষের শিকার হওয়ার ভয়ে কেউ এ জাতীয় মারধর থামাতেও যায় না। তার মানে সামান্য কারণে লোকজনকে মারপিট শুরু করা এবং তাতে আরও অনেক লোকের যুক্ত হয়ে যাওয়ার একটা অপসংস্কৃতি ও প্রবণতা আমাদের সমাজে শত বছর ধরেই রয়েছে। এটা সামগ্রিকভাবে আমাদের চরিত্র, সংস্কৃতি ও বোধের বহিঃপ্রকাশ। বাড্ডায় ওই নারীকে পিটিয়ে হত্যা করা কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, মানুষ কেন এ কথা বিশ্বাস করে, পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে? এটি কি সামগ্রিকভাবে আমাদের অজ্ঞানতা, অশিক্ষা ও অসচেতনতার ফল নয়? অশিক্ষিত লোকই শুধু নয়, অনেক শিক্ষিত সচেতন মানুষও এ ধরনের কথায় কান দেয় এবং বিশ্বাস করে। বিশ্বাস করে বলেই স্কুলের সামনে খোদ শিক্ষিত অভিভাবকরাই একজন নারীকে জেরা করলেন এবং তাকে কিছু উন্মত্ত হায়েনার সামনে ছেড়ে দিলেন। এখন হয়তো ওই অভিভাবকদের অনেককেই ধরা হবে, তাদের বিচারও হবে। কিন্তু তাদের মনে ছেলেধরার গুজবটি যারা ছড়িয়ে দিলো তাদের চিহ্নিত করা কি সম্ভব হবে এবং শিক্ষিত লোকেরা কেন এ জাতীয় গুজবে বিশ্বাস করে—সেই প্রশ্নের জবাব কি জানা যাবে?

বাড্ডার ওই নারীকে খোদ প্রধান শিক্ষকের রুম থেকে যখন টেনেহিঁচড়ে বের করে আনা হলো, তখন শিক্ষিত প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা কী ছিল? তিনিও কি ছেলেধরার গুজবে বিশ্বাস করেছিলেন? যখন ওই নারীকে তার রুম থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করা হলো, তিনি কেন পুলিশকে ফোন করলেন না? তিনি কেন একজন নিরীহ মানুষকে নিশ্চিত মৃত্যুর দিতে ঠেলে দিলেন? ওই নারীর মৃত্যুর দায় প্রধান শিক্ষকসহ ওই সময়ে স্কুলে যারা ছিলেন তারা কি এড়াতে পারেন? নাকি স্কুলসুদ্ধ সব শিক্ষকই বিশ্বাস করেন, আসলেই ছেলেধরা বলে একটা গোষ্ঠী আছে এবং সত্যিই পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে? যদি সত্যিই তাই হয়, তাহলে বলতে হবে—সমস্যাটা আমাদের পুরো জাতির মগজে; তো সেই মগজ পরিষ্কার করার দায়িত্বটা কে নেবেন?

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ