‘চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি’

Send
প্রভাষ আমিন
প্রকাশিত : ১৬:২৮, আগস্ট ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩০, আগস্ট ০৪, ২০১৯

প্রভাষ আমিনস্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক যেটা করেছেন, সেটাই বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ হিসেবে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা নিজেদের একেকজন ফেরেশতা ভাবেন, মনে করেন তারা কোনও ভুল করতে পারেন না। ভুল করলেও সেটাকে ভুল মনে করেন না। বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের স্বাভাবিক প্রবণতা হলো, অস্বীকার করা, দায়টা অন্য কারও ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া বা ধমক দিয়ে মুখ বন্ধ করে রাখার চেষ্টা করা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীও তাই করেছেন। আসলে ৮ দিনের পারিবারিক ভ্রমণ চারদিনে গুটিয়ে দেশে ফিরে আসতে হলে যে কারোরই মেজাজ বিগড়ে যাওয়ার কথা। আর যাদের কারণে তার এই পূর্ব পরিকল্পিত ভ্রমণ লণ্ডভণ্ড হয়ে গেলো, সেই সাংবাদিকদের ওপর তিনি একটু বেশি ‘ক্ষ্যাপা’ হতেই পারেন। তাই তো সামনে পেয়ে প্রথম সুযোগেই ধমক দিয়ে সাংবাদিকদের মুখ বন্ধ করতে চাইলেন।
দেশবাসীকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে ফেলে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আটদিনের জন্য মালয়েশিয়া চলে যাওয়াটা যে কোনও বিবেচনায় অবিশ্বাস্য। তাছাড়া পুরো বিষয়টার মধ্যে একটা লুকোচুরি, পালিয়ে বেড়ানোর ব্যাপার আছে। স্বাস্থ্যমন্ত্রী গেলেন মালয়েশিয়া। কিন্তু তার জনসংযোগ কর্মকর্তা সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মন্ত্রী এলাকায় গেছেন বন্যাদুর্গতদের পাশে দাঁড়াতে। খুব গোছানো ও পরিকল্পিত মিথ্যা। এটা কি তিনি নিজেই সাজিয়েছেন? নাকি মন্ত্রীর নির্দেশে? লুকোচুরি মনে হচ্ছিল, কারণ শুধু জনসংযোগ কর্মকর্তা নন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কেউই মন্ত্রীর এই লম্বা সফর সম্পর্কে কিছু জানতেন না বা জানলেও মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে একটা ব্যাপার তারা নিশ্চিত করতে পেরেছিলেন আগেই, এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা ডেঙ্গু সংক্রান্ত কোনও সফর নয়। নিতান্তই ব্যক্তিগত।

বাংলাদেশের মন্ত্রীদের সংবেদনশীলতার যে মান, তাতে দেশবাসীকে এডিস মশার হুলের মুখে রেখে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ‘পালিয়ে’ যাওয়াটা আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও অস্বাভাবিক মনে হয়নি। ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ানরা তবু লোক দেখানো হলেও জনগণের পাশে থাকেন। কিন্তু যারা ব্যবসায়ী থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠেন, যাদের নির্বাচিত হতে ভোট লাগে না, লাগলেও সেই ভোট কেনার মতো অঢেল টাকা যাদের আছে; তারা সবাই চেতনায় ‘নিরো’। রোম যখন পোড়ে, নিরোরা তখন বাঁশি বাজায়। দেশের হাসপাতালে যখন ডেঙ্গু রোগীর উপচানো ভিড়, জাহিদ মালেকরা তখন মালয়েশিয়ায় বেড়াতে যান।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই সময়ে কেন মালয়েশিয়ায় সপরিবারে বেড়াতে গিয়েছিলেন? এটা সারা বাংলাদেশের মানুষের মনের প্রশ্ন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা জাহিদ মালেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের লোকজন ছাড়া বাংলাদেশের প্রতিটি বিবেকবান মানুষ এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইবেন। গণমাধ্যমকর্মীরাও সাধারণ জনগণের প্রশ্নের উত্তরই খোঁজার চেষ্টা করবেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জনসংযোগ কর্মকর্তা বুধবার বিকালেই জানিয়ে দেন, রাতেই দেশে ফিরছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং বৃহস্পতিবার দুপুরে তিনি সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখবেন। বুধবার মধ্যরাতে দেশে ফিরে সকালেই স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছুটে যান মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু ওয়ার্ড উদ্বোধন করতে। সেখানে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেননি। সাংবাদিকরাও চাপাচাপি করেননি, কারণ তখনও তারা জানতেন দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রীকে পাওয়া যাবে। কিন্তু শেষ মুহূর্তে সংবাদ সম্মেলন বাতিল হওয়ায় সাংবাদিকরা মরিয়া হয়ে সচিবালয়ে অপর একটি অনুষ্ঠানে তাকে ধরার চেষ্টা করেন। তাতে লাভ হয়নি কোনও—ধমক খাওয়া ছাড়া।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর যদি সৎ সাহস থাকতো, তিনি সংবাদ সম্মেলন করে জাতির কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতেন, পদত্যাগের ঘোষণা দিতেন। তাতো করেনইনি, উল্টো সাংবাদিকদের ধমক দিয়েছেন। কিন্তু ধমক দিয়ে কয়জনের মুখ বন্ধ করবেন মন্ত্রী? তার ধমক শুনে আমার ছেলেবেলায় শোনা দুটি কথা মনে হয়েছে—চোরের মায়ের বড় গলা এবং চুরি তো চুরি, আবার সিনাজুরি। মানে হলো, অপরাধ করেও সিনা মানে বুক ফুলিয়ে চলা।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে সবার প্রশ্ন, এই সময়ে তিনি কেন পারিবারিক সফরে মালয়েশিয়া গেলেন? এবং কেন তার সফর নিয়ে লুকোচুরি হয়েছে? তবে আমার প্রশ্ন হলো, তিনি চারদিন আগেই ফিরে এলেন কেন? আটদিনের সফর চারদিনেই ফিরে আসার মতো জরুরি কী ঘটেছে? তিনি যাওয়ার আগে পরিস্থিতি যেমন ছিল, ফেরার সময়ও তো তেমনই ছিল। তাহলে গেলেনই কেন? আবার তাড়াহুড়ো করে ফিরলেনই কেন?

একটা হতে পারে, মালয়েশিয়ায় যাওয়ার পর হঠাৎ কোনও মধ্যরাতে তার বিবেক জেগে উঠল। ভাবলেন, দেশবাসীকে ডেঙ্গুর ঝুঁকিতে রেখে তার এভাবে বেড়ানোটা অন্যায়। তাই তিনি পাগলের মতো ছুটে এলেন। তবে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এত জাগ্রত বিবেক থাকার কথা না। থাকলে তিনি যেতেনই না। পত্রিকায় পড়েছি—গণমাধ্যম ও সামাজিকমাধ্যমে তীব্র সমালোচনার মুখে তিনি দেশে ফিরেছেন। তবে আমার ধারণা, এটিও সত্য নয়। জনগণের সমালোচনা আমলে নেওয়ার মতো সংবেদনশীলতা এই মন্ত্রীর আছে বলে মনে হয় না। আমার ধারণা, প্রধানমন্ত্রীর ধমকেই চাকরি বাঁচাতে তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে দেশে ফিরেছেন। তবে এখন যাই করুন, ডেঙ্গুর এমন প্রায় জরুরি অবস্থায় দেশের বাইরে যাওয়ার অপরাধে তার চাকরি থাকা উচিত না। পদত্যাগ করার সুযোগ পেলে, সেটা হবে গুরু পাপে লঘুদণ্ড। তাকে আসলে অপসারণ করা উচিত বলে আমি মনে করি। তবে এখনই নয়, ডেঙ্গুর বিপদ কেটে গেলে যেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অপসারণ করা হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন স্থগিত করেছেন, প্রশ্নেরও জবাব দেননি। আমার ধারণা, তার কাছে আসলে কোনও জবাব নেই। তিনি যাই বলুন, কেউ তা মানবে না। প্রথম কথা হলো, এটা তার পারিবারিক সফর। এখানে দেশ, মন্ত্রণালয়, ডেঙ্গু পরিস্থিতির কোনও সম্পর্ক নেই। যদি কুয়ালালমপুরে ডেঙ্গু বিষয়ক কোনও আন্তর্জাতিক সেমিনারও হতো, তাও আমি করি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সেখানে যাওয়াটা সমান অপরাধ হতো। যত যাই হোক, এই সময়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বাইরে যাওয়াটাই অপরাধ।

পত্রিকায় পড়লাম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের অথবা তার স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়ায় গেছেন। এটা আরও অবিশ্বাস্য। কারণ বাংলাদেশের মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত, থাইল্যান্ড বা সিঙ্গাপুর যায়। মালয়েশিয়ায় যাওয়ার কথা আগে শুনিনি। হতে পারে স্বাস্থ্যমন্ত্রী চিকিৎসার বিষয়টি গোপন রাখতে চেয়েছিলেন। তাই সিঙ্গাপুর না গিয়ে মালয়েশিয়ায় গেছেন। তবে চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার আগে তার মাহাথির মোহাম্মদের গল্পটি জেনে যাওয়া উচিত ছিল। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর একবার মাহাথির হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সবাই তাকে দ্রুত সিঙ্গাপুর নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু বেঁকে বসেন মাহাথিরই। তার সাফ কথা, প্রধানমন্ত্রী চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে গেলে দেশের চিকিৎসাব্যবস্থা থাকবে কী করে। তিনি দ্রুত দেশেই একটি উন্নতমানের হাসপাতাল তৈরির নির্দেশ দিলেন। নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অপেক্ষা করলেন। দেশের হাসপাতালের মান উন্নত করার পরই মাহাথির চিকিৎসা নিয়েছিলেন। ঠিক জানি না, স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজের বা পরিবারের কারও চিকিৎসার জন্য মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন কিনা। ব্যাপারটা যদি এমন হয়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা তার পরিবারের কেউ মাহাথিরের বানানো হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন বা নিয়েছেন—তাহলে ব্যাপারটা খুব লজ্জার হবে। জাহিদ মালেকও তো বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থাকে তাকে চিকিৎসা দেওয়ার মানে উন্নীত করার চেষ্টা করতে পারতেন। যে ব্যক্তি বা তার পরিবারের দেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর আস্থা নেই; আর যাই হোক, স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদে তার থাকার কোনও নৈতিক অধিকার নেই।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ