স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কি পারবেন অমিত শাহের দুরভিসন্ধি ঠেকাতে?

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৪:৩৭, আগস্ট ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৯, আগস্ট ০৬, ২০১৯

আনিস আলমগীরভারতের আসাম রাজ্যের জাতীয় নাগরিকপঞ্জি বা এনআরসি নিয়ে তুমুল বিতর্কের মধ্যে ঢাকা-দিল্লি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক হচ্ছে ৭ আগস্ট ২০১৯। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের মধ্যে দিল্লিতে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৬ সদস্যের বাংলাদেশ দলের নেতৃত্ব দেবেন। আনুষ্ঠানিক বৈঠক ছাড়াও দু’মন্ত্রীর একান্ত বৈঠক হওয়ার কথা আছে। এটি দু’দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে চালু হওয়া বৈঠকের সপ্তম বৈঠক। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের ষষ্ঠ বৈঠকটি গত বছরের অক্টোবর ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই বৈঠকে ভারতীয় প্রতিনিধিদলের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং।
আমাদের সঙ্গে ভারতের এখন সীমান্ত বিরোধ নেই বললেই চলে। ছিটমহল বিনিময়সহ যেসব জটিল সীমান্ত বিরোধ ছিল তা নরেন্দ্র মোদি প্রথমবার ক্ষমতাসীন অবস্থায় বাংলাদেশ সফরের সময় চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মিটমাট হয়ে গেছে। সে চুক্তিটি সম্পূর্ণভাবে কার্যকরও হয়েছে। সম্ভবত এবার সীমান্তে প্রায়শ বিএসএফের হাতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে হত্যা, সীমান্ত দিয়ে চোরাচালান বন্ধ, ভারতের মুদ্রা নকল ইত্যাদি বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে।
আসামে এনআরসিতে অনিবন্ধিত লোকদের বাংলাদেশি বলে যে প্রচারণা বিজেপি সরকার দীর্ঘদিন চালিয়ে আসছে তাদের নিয়ে আলোচনার কোনও কথা এই বৈঠকের এজেন্ডায় নেই। তবে ভারতীয় মিডিয়া এনআরসিকে হাইলাইট করছে। ৩০ জুলাই ২০১৯ টাইমস অব ইন্ডিয়া গ্রুপের পত্রিকা ইকোনমিক টাইমস লিখেছে, ভারতের স্বরাষ্ট্র দফতরের মন্ত্রী অমিত শাহ অবৈধ মাইগ্রেশন ইস্যু নিয়ে কথা বলবেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে। সম্ভবত বিষয়টা বৈঠকের এজেন্ডায় না থাকলেও ‘বিবিধ’ হিসেবে কৌশলে ভারত নিয়ে আসবে।

অমিত শাহ সেই লোক যিনি দীর্ঘদিন ধরে ভারতে বাংলাদেশবিরোধী প্রচারণায় হাওয়া দিচ্ছেন। বাংলাদেশিদের ভারতে অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আবিষ্কার করেন দু’চারদিন পরপর। বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ গত বছর রাজস্থানের গঙ্গাপুরে একটি সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে অবৈধ বাংলাদেশিদের ‘উইপোকা’র সঙ্গে তুলনা করে বলেছেন, এক এক করে তাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হবে। তিনি দাবি করেন, ‘আসামে কমপক্ষে ৪০ লাখ অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে চিহ্নিত করা হয়েছে।’ এমন একটি সাম্প্রদায়িক এবং বর্ণবিদ্বেষী লোকের সঙ্গে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকটি ঘিরে তাই দুশ্চিন্তা করার অবকাশ আছে।

এদিকে, ভারতীয় সংবিধানের যে ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে কাশ্মিরকে স্বায়ত্তশাসিত রাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে, ৫ আগস্ট ২০১৯ সেটি বাতিলের ঘোষণা দিয়েছেন অমিত শাহ। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে সাক্ষাতের পর সোমবার রাজ্যসভায় এ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন তিনি। তার আগে ভারতের রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোভিন্দ সই করে দিয়েছেন ৩৭০ ধারার অবলুপ্তিতে। সম্প্রতি নরেন্দ্র মোদির সরকার আমলে গণপিটুনিতে মানুষ হত্যার সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং তার মধ্যে বেশিরভাগই মুসলিম। সব মিলিয়ে ভারতীয় মুসলমানরা এখন চরম আতঙ্কে। আর বলার অপেক্ষা রাখে না, আসামের এনআরসি’র মূল টার্গেট সেখানকার মুসলমানরা। অমিত শাহ ভবিষ্যতে পশ্চিমবাংলাতেও অবৈধ বাংলাদেশির সন্ধানে এনআরসি চালু করবেন বলেছেন।

আসামে অসমীয়া এবং বাঙালি বিরোধ চলছে বহুদিন ধরে। বাঙালিদের সঙ্গে অসমীয়াদের সঙ্গে বহুবার জাতিগত দাঙ্গা হয়েছে। এই বিরোধ এখনও চলমান। বিরোধ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলাও রয়েছে। ২০১৩ সালে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট এই বলে আদেশ জারি করেছিলেন, তিন বছরের মধ্যে আসামে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করতে হবে। চারবার তারিখ বাড়ানোর পর ৩১ জুলাই ২০১৮ খসড়া নাগরিক তালিকা প্রকাশ করা হয়।

আদমশুমারি অনুসারে আসামের লোকসংখ্যা তিন কোটি ২৯ লাখ। এর মধ্য থেকে ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমান নাকি নিজেদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। তার মধ্যে ২৭ লাখ হিন্দু এবং ১৩ লাখ মুসলিম। আশ্চর্যের কথা, আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বেগম আনোয়ারা তৈমুর এবং ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলী আহমদের পরিবারের অনেক সদস্যও নাগরিক পঞ্জির অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি। এনআরসিতে নাম উঠেনি বলে মুসলিম এক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে যেতে হয়েছে কারাগারে। এমন উদাহরণ অসংখ্য।

এনআরসিতে তালিকাভুক্তি নিয়ে অসংখ্য বাদ-প্রতিবাদের পর আদালত পুনরায় ২০১৯ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত সময় বাড়িয়েছিলেন। মানে আরও এক বছর সময় বাড়ানো হয়েছিল নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য। পরবর্তীতে আদালত আরও একমাস সময় বর্ধিত করে চলতি মাসের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সময়সীমা বর্ধিত করেছেন। সম্ভবত আদালত আর সময় বাড়াবেন না। ইতোমধ্যে সরকার আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধক কর্তৃপক্ষের ঘোষিত অ-ভারতীয়দের আপিল নিষ্পত্তির জন্য ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। এই ট্রাইব্যুনাল ৩১ আগস্ট যে নাগরিক তালিকা প্রকাশিত হবে, তার থেকে বাদ পড়া কয়েক লাখ বাসিন্দার আবেদন যাচাই করবে।

যে নাগরিকপঞ্জি তৈরি করা হয়েছে তা নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, রাজ্য বিজেপি সরকার, বিজেপি নেতারা, এনআরসি কোঅর্ডিনেটর প্রতীক হাজেলা আর অসমীয়রা, কেউ সন্তুষ্ট নয়। তাদের দাবি হচ্ছে লম্বা সময় প্রদান করে খসড়া তালিকা সংশোধনের ব্যবস্থা করা হোক।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতরের অভিমত হলো, তৈরি খসড়া তালিকা থেকে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ২০ শতাংশ এবং দেশের অভ্যন্তরে ১০ শতাংশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রয়োজন রয়েছে। সীমান্তে মুসলমান সমৃদ্ধ জেলাগুলো যেমন ধুবড়ী, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি ইত্যাদিতে প্রায় ৯২ শতাংশ পর্যন্ত মানুষ এনআরসির খসড়া তালিকায় বৈধ নাগরিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

বিজেপি এবং অসমীয়রা এতদিন ধরে প্রচার করে আসছিল, সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর মুসলমানরা বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু খসড়া তালিকায় তারা প্রায় শতাংশে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় প্রমাণিত হয়েছে, বিজেপির অভিযোগ ভুয়া।

কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র দফতর ও রাজ্য সরকার নাম যাচাই বাচাইয়ের জন্য সুপ্রিম কোর্টে যে যৌথ পিটিশন দিয়েছিল তা অগ্রাহ্য করে মাত্র এক মাস সময় প্রদান করায় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎপরতা খুব বেড়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট তার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে খুব ভালো হয়। না হয় আরো ২০ শতাংশ মুসলমান নাগরিকত্বহীন হবে। এটাই অমিত শাহ এবং রাজ্য বিজেপি পরিকল্পনা বলে মনে হচ্ছে।

আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিল্লি নিমন্ত্রণ করে নিচ্ছে সম্ভবত এনআরসি নিয়ে নরম গরম কথা শোনানোর জন্য। যে ৪০ লাখ লোককে তালিকাচ্যুত করেছে তাদের বিষয়ে আলোচনা করার জন্য। ভারতীয় মিডিয়া তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যদি এমন কোনও পরিস্থিতির সম্মুখীন হন তবে খুবই সাহসিকতার পরিচয় দিতে হবে। এজেন্ডায় এনআরসি বিষয় নিয়ে একটি শব্দ রাখতে চাইলেও বিরোধিতা করতে হবে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৪৮ বছর হলো। এর মধ্যে কোনও সরকার আমলে ভারত আসামে বাংলাদেশিদের অনুপ্রবেশ নিয়ে এমন কোনও অভিযোগ উত্থাপন করেনি। আর পাকিস্তানের সময়ে ২৩ বছরও কোনও ভারতীয় সরকার পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করেনি। ৭১ বছর পর অভিবাসী সম্পর্কে কোনও আলোচনা হওয়ার প্রশ্নই আসে না। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত যারা ভারতে উদ্বাস্তু হিসেবে আশ্রয় নিয়েছিল তারা শতাংশে ফেরত এসেছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারসহ সীমান্ত রাজ্যগুলোর সরকারগুলো উদ্বাস্তুরা শতাংশে ফেরত আসায় তখন সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছিল। কিন্তু বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর তারা এই প্রচারণা শুরু করে। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশে নিয়োজিত তাদের কিছু এজেন্ট দিয়েও ইদানীং এটা প্রচার করছে, ৪০ লাখ অনিবন্ধিত লোক বাংলাদেশি। তাদের মধ্যে যারা মুসলমান আছে তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হোক।

সুতরাং, উদ্বাস্তু বিষয়কে এজেন্ডাভুক্ত করার কোনও তৎপরতা যদি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল দেখেন, সে বিষয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করবেন আশা করি। আমি আরও আশা করি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও স্পষ্ট করে এই ধরনের অভিসন্ধির বিরোধিতা করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বলতে হয়, তথাকথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ে ২০১৮ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর ভয়েস অব আমেরিকার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতি ভালো, ভালো অবস্থা পরিত্যাগ করে খারাপ অবস্থায় আমাদের লোক কেন ভারতে যাবে! তিনি আরও বলেছিলেন, বিষয়টা নিয়ে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলাপ করেছেন। নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, কাউকে ফেরত পাঠানোর কোনও চিন্তা তাদের নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহসা ভারত সফরে যাওয়ার কথা আছে। দেশের স্বার্থ রক্ষায় আমাদের প্রধানমন্ত্রীর প্রতি মানুষের আস্থা রয়েছে। আশা করি পূর্বের অবস্থানের চেয়ে প্রধানমন্ত্রী আরও দৃঢ়ভাবে ভারতীয় এই প্রচারণার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবেন।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

anisalamgir@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ