মাননীয় মেয়র সমীপে

Send
নাজনীন মুন্নী
প্রকাশিত : ১৬:১১, আগস্ট ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১২, আগস্ট ০৬, ২০১৯

নাজনীন মুন্নীমালিহা আর ইমতিয়াজের প্রথম সন্তান ছেলে হবে। প্রথম সন্তান মানেই দারুণ কিছু। পরিবারজুড়ে আনন্দ। সেই আনন্দ উপচে পড়েছে তাদের ফেসবুকে। ‘ইটস আ বয়’ ব্যানারে তাদের হাসিমুখের ছবি প্রকাশ পেয়েছে জুলাই ১৩ তারিখে। তার মাত্র সাত দিন পরই ছোট্ট মানুষটাকে নিজের শরীরের ভেতর নিয়েই মালিহাকে যেতে হয়েছে আইসিইউতে, সেটা ছিল ওয়ানওয়ে। মালিহা আর ফেরেনি। ইমতিয়াজের জানা হয়নি কেমন ছিল তার সন্তান দেখতে। সে কোনোদিন তা জানবেও না। মা আর ছেলেকে একসঙ্গে কেমন লাগে সেই ফ্রেম কোনোদিন দেখবে না ইমতিয়াজ।
কিন্তু আমার ভাই তার ছেলেকে দেখছে মা ছাড়াই। দুই বছর আগে আমার একমাত্র ভাইয়ের স্ত্রী, যার নাম আনা, সে মারা গেছে মাত্র ৩০ বছর বয়সে। তখন আমার ভাইয়ের সন্তানের বয়স মাত্র দুই। কেউ কি জানে দুই বছরের এক শিশু মা ছাড়া কেমন করে বাঁচে? ছোট্ট মানুষটা যে ততদিনে মা কী তা জানে, তার সেই কষ্ট আমরা দেখেছি। আনার চলে যাওয়ার শূন্যস্থান এখনও পূরণ করতে পারিনি আমরা। পুরো পরিবার ছিন্নভিন্ন হয়ে ছড়িয়ে গেছি দেশ-বিদেশ।
মৃত্যু তো সবার প্রাপ্য, কিন্তু এমন মৃত্যু? এক মশা হবে খুনি আর আমরা দেখবো বুঝে ওঠার আগে সবচেয়ে প্রিয় মানুষের চলে যাওয়া? এমন? এক মশা চাইলেই আমরা পারি, আমরা পারতাম তুচ্ছ করতে। ২০০০ সালে এই দেশে ডেঙ্গু এসেছে। এরমধ্যে পার হয়েছে ১৯ বছর। এই ১৯ বছর আমরা জানি কখন হয় এই মশা, কোথায় হয়, কেমন করে জন্মায়, কেমন করেই বা আমাদের মৃত্যু। কিন্তু পুরো বছর আমরা তা গায়ে মাখি না। কত দাম মশার ওষুধের? ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ হয়েছে। গেলো পাঁচ বছর বরাদ্দ বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ। কিন্তু মশা নাশ তো দূর, তা বেড়ে হয়েছে কয়েকশ গুণ। মাননীয় মেয়র ৫০ কোটি টাকা কই? আপনাকে এই টাকা আমাদের কাছ থেকে আদায় করে দিয়েছেন যে রাজস্ব কর্মকর্তা, তার ছেলেটিও বাঁচতে পারেনি। কাজ হয় না বলে উত্তরের মেয়র যে ওষুধ ফেলে দিয়েছেন দক্ষিণে সেই ওষুধ ছিটিয়ে কি প্রমাণ করতে চেয়েছেন আপনি?

মাননীয় মেয়র, আপনি কেবল একবার ভাবেন, জ্বর বলে প্রিয়জনের যত্নটা পেতে যে মানুষ বাসে রওনা হয়, সেই মানুষটা শেষ মুহূর্তে দেখতে পায়নি স্বজনের কোনও মুখ, কেমন লেগেছিল তার, যখন মৃত্যুর আগে একটু পানি পড়েনি মুখে? তার মৃত্যুটা কার দায়? হাসপাতালের ৬তলায় ভর্তি হওয়া মেয়েটা যখন জানে না ৪তলায় থাকা তার ভাই এরই মধ্যে মারা গেছে। ১০ বছরে সেই ভাইটার মৃত্যুর দায় কার? যে মা বাবা ছেলেকে দাফন করে, সেই মৃত্যু সংবাদ অসুস্থ মেয়ের কাছে লুকাতে অভিনয় করছে। আপনি কি জানেন সেই অভিনয়ের কষ্ট? তিন মাসের যে শিশুর নরম তুলতুলে শরীর নিস্তেজ হয়ে গেলো মশার কামড়ে। তার জামা-কাপড় পুতুলভর্তি ঘর। মা কাঁদতেও পারে না জোরে, কারণ তার সিজারের কাটাটা যে এখনো শুকায়নি।

আমার দায়? আমাদের দায়? যখন স্বাস্থ্য অধিদফতর বলেছে এই বছর ডেঙ্গু হবে মহামারি। সেটি ৭ মাস আগের কথা। তখন আপনি কি বলেছিলেন আমাকে মশা মেরে আপনি আপনার রাজকীয় হাত নষ্ট করবেন না? মশা মারার কাজ আমার। বলেছিলেন? ড্রেনে মাছ ছেড়ে আপনি তামাশা করেন। আপনি জানেন না মাননীয় মেয়র এডিস মশা ড্রেনে জন্মায় না? আপনিই যদি না জানেন তাহলে যে শহরে ২০ লাখ রিকশাচালক আর ১০ লাখ কেবল গার্মেন্টকর্মী থাকে, সেই শহর মশামুক্ত করার জ্ঞান কার থাকার কথা? যখন সবাই বলছে মহামারি, আপনি বলছেন গুজব। আপনার এই গুজব উপাধিতে আর কিছু হয়নি, ডেঙ্গু ছড়িয়েছে ৬৪ জেলায়। অথচ সেদিনও যদি আপনি স্বীকার করতেন এই দুর্যোগ, তাহলে ঘটনা গড়ায় না মহামারিতে। এই দায় কার মাননীয় মেয়র? করেন কী আপনারা। কোন মশা কেমন করে কখন নিয়ে আসবে দুর্যোগ, সেই হিসাব যদি আপনি না রাখেন, কোন হিসাবে ব্যস্ত থাকে আপনার মাথা আর হাত?

এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৫৩ জন। সরকার মহোদয় আপনার পক্ষে আর তাই সেই মৃত্যু বেঁধে রেখেছে ১৮-এর সংখ্যায়। ৫৩ জন মানুষের মরে যাওয়া ২৭ হাজার মানুষের কষ্ট আর ১৬ কোটি মানুষের মৃত্যু আতঙ্কের দায় কার মাননীয় মেয়র?

আমি দেখিনি কোনও মশার ওষুধ গেলো পাঁচ বছরে আমার বাসার আশেপাশে ছিটানো হয়েছে। আমি যদি বলি হাত তোলেন আপনারা কার বাসার আশেপাশে মশার ওষুধ পড়েছে, আমি জানি সেই হাত আঙুলে গোনা যাবে। মা বলতেন তুই পড়াশোনা কর। তারপর ফেল করলেও সান্ত্বনা যে চেষ্টা করে পারিসনি। আপনার কি কোনও চেষ্টা ছিল মাননীয় মেয়র? আপনার কী দায়, মায়া বা আন্তরিকতা ছিল এই নগরের মানুষের প্রতি? আপনি কেবল চেষ্টা করে গেছেন আপনার অপারগতা, দায়িত্বহীনতা আর অযোগ্যতা গোপন করতে। সেই গোপনীয়তা বিস্ফোরিত হয়ে মারা গেছে এতগুলো প্রাণ। আপনার কোনও জবাবদিহি নেই। আপনার কাজে জবাব চাওয়ারও কেউ নেই। আপনার দোষ স্বীকার নেই, আপনার অনুতাপ নেই। আপনার যা আছে কেবল এক চেয়ারের লোভ।

লেখক: সাংবাদিক ও উপস্থাপক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ