রবীন্দ্রসরণি ও মূর্তি, ইউরোপে

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৭:০৪, আগস্ট ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৬, আগস্ট ০৬, ২০১৯

দাউদ হায়দার‘ভাগ্যিস, পূর্ব জার্মানি কমিউনিস্ট শাসনাধীন ছিল একদা, এবং ছিল বলেই ১৯৬১ সালে, রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে পূর্ব বার্লিনের পাঙ্কো জেলায় একটি প্রশস্ত সড়কের নামকরণ করা হয় ‘রবীন্দ্রনাথ টাগোরে স্ট্রাসে’ (রবীন্দ্রনাথ টাগোর স্ট্রিট)। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানি থেকেই (পূর্ব বার্লিন ও লাইপজিগ) রবীন্দ্রনাথের অধিকাংশ বই প্রকাশিত। রবীন্দ্রসাহিত্যও পাঠ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে। অথচ পশ্চিম (তৎকালীন) জার্মানিতে রবীন্দ্রনাথের নামে একটি পাঠাগারও তৈরি হয়নি। জন লেলনের (গায়ক) নামে স্কুল আছে (পশ্চিম বার্লিনে)।’ বললেন জনাব মাঈন চৌধুরী। প্রায় চার দশক বার্লিনের বাসিন্দা। দুই বার্লিন একত্রীকরণের আগে পূর্ব বার্লিনে ছিলেন। মাঈন চৌধুরীর আদি নিবাস নোয়াখালীর ফেনী। বহু বছরই তিনি জার্মান নাগরিক। গোটা জার্মানিতে মাঈন চৌধুরীই সবেধন নীলমণি, রবীন্দ্রসংগীত গায়ক। উদাত্ত, সুরেলা কণ্ঠ। লোকে বলেন ‘সোয়াইটে (সেকেন্ড) দেবব্রত বিশ্বাস।’ অনেকটাই হুবহু।
রবীন্দ্রজন্ম বা মৃত্যুদিবসে জার্মানির বিভিন্ন শহরে তাঁর চাহিদা প্রচণ্ড, যেখানে বেশি ইউরো পান, গন্তব্য সেখানেই। স্বাভাবিক।
আমরা জানি, কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানিতে (পূর্ব বার্লিনে), ইন্দিরা গান্ধির নামে সড়ক আছে, ইন্দিরাকে হত্যার পরে নামকরণ। মহাত্মা গান্ধি কিংবা জওহরলাল নেহরুর নামে কোনও গলিও নেই। পশ্চিম জার্মানির (তৎকালীন পশ্চিম জার্মানি বা আজকের, একত্রীকরণের জার্মানি) কোথায়ও নেই। নেতাজির নামে কোনও কিছু থাকার প্রশ্নই ওঠে না। নেতাজি মধ্য বার্লিনের ৬/৭ নম্বর সোফিয়েনজিলের (সড়ক) যে বাড়িতে থাকতেন, কোনও ফলক নেই, চিহ্ন নেই। নেতাজিকে জার্মানরা মনে করেন ‘নাৎসি।’ কারণও আছে। হিটলারের সঙ্গে মহব্বত, দোস্তি ছিল। কিন্তু ইতিহাস ঘেঁটে দ্যাখে না। যেমন দ্যাখে না এম এন রায়ের (মানবেন্দ্রনাথ রায়) বেলায়। এম এন রায় ছিলেন পশ্চিম বার্লিনের ক্রয়েৎস্‌ব্যার্গ জেলায়, অ্যালবার্ট স্ট্রাসে (সড়ক)-তে। পশ্চিম বার্লিন ছিল (বার্লিন ভাগাভাগির পরে) অ্যালায়েড ফোর্সের (আমেরিকা-ব্রিটেন-ফ্রান্স) অধীনে। কমিউনিস্ট পূর্ব বার্লিনের ভাগে যদি অ্যালবার্ট স্ট্রাসে থাকতো এম এন রায়ের নামে ‘স্ট্রাসে’ হতো। অনুমান করি।

রবীন্দ্রনাথের নামে পূর্ব-পশ্চিম ইউরোপে সরণি আঙুলে গোনা। রবীন্দ্র জন্মসার্ধবর্ষে উত্তর প্যারিসে ‘রবীন্দ্রনাথ টাগোর রিয়ুৎ’ (সড়ক), আধা কিলোমিটারও নয়, শিল্পী ‘মিরো পার্ক’ ঘেঁষে।  রবীন্দ্রনাথের আবক্ষ মূর্তি আছে। মূর্তি দেখে রবীন্দ্রনাথকে চেনা দায়। অনাড়ি ভাস্করের কাজ। রবীন্দ্রনাথের নামে সরণি এবং সরণির শেষে মূর্তি, উদ্বোধনী দিনে (সকালে) ভারতীয় (বিশেষত পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি) দর্শকের চেয়ে বাংলাদেশির সংখ্যা বেশি। এও বাহুল্য। অনুষ্ঠানে ভারতীয় রাষ্ট্রদূত (প্যারিসস্থ) নয়, ডেপুটি ছিলেন। বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত যথারীতি উপস্থিত। মাল্যও দেন। শিল্পী শাহাবুদ্দীনের মুখে শুনেছি, প্যারিসের মেয়র নাকি, অনুষ্ঠানের এক ফাঁকে একটু আড়ালে, জিজ্ঞেস করেন, ‘রবীন্দ্রনাথ মূলত কোন দেশের কবি, ভারতের না বাংলাদেশের?’ শাহাবুদ্দীনের উত্তর, ‘দুই দেশেরই এবং বিশ্বের।’

মনে পড়ছে একটি মজার দৃশ্য। বছর তিনেক আগে বুলগেরিয়ার রাজধানী সোফিয়ায় গিয়েছিলুম সাহিত্যানুষ্ঠানে। একজন বললেন, ‘এখানেও রবীন্দ্রনাথের মূর্তি আছে, দেখবেন?’ গেলুম দেখতে। দেখে তাজ্জব। রবীন্দ্রনাথের দাড়ি কি ঝাঁটার মতো সরু, লম্বা ছিল? এও নয় সহনীয়। কে বা কারা মুখে কালি লেপে দিয়েছে (হয়তো আগের রাতে। অন্ধকারে)। প্রশস্ত কপালে লেখা: ‘মুসোলিনের বন্ধু।’ দোভাষী লজ্জিত। বললেন, ‘নগর কর্তৃপক্ষ নিশ্চয় মুছে দেবে আজই।’

পূর্ব-পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা বিভাগ তুলে দেওয়া হয়েছে, অজুহাত এই ‘ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা কম।’ জার্মানির যে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা চর্চা, শিক্ষা (মূলত এশিয়ান বিভাগে), রবীন্দ্রসাহিত্য নামে মাত্র।

দুই জার্মানির পুনর্মিলনের আগে পশ্চিম জার্মানির রাজধানী ছিল বন। বন-এ একসময় বিশ্বভারতীর ছাত্রী, শান্তিনিকেতনবাসী লেখক-গবেষক-অনুবাদক-গায়ক তৃণা পুরোহিত-রায় (জন্ম: ১/১০/১৯২৭। মৃত্যু: ২২/৬/২০১৪) ছিলেন বহু বছর বাস করেছেন। গড়ে তুলেছেন ‘টাগোর সেন্টার।’ রবীন্দ্রসাহিত্যপাঠ ও গবেষণা ছিল মূল। যুক্তও হন অনেক জার্মান। পরে সেন্টারের বিলুপ্ত। তৃণা পুরোহিত শান্তিনিকেতনে ফিরে যান।

বার্লিনে ‘টাগোর-আইনস্টাইন সোসাইটি’ আছে বটে, নামেমাত্র, তাও আবার একজনের ফ্ল্যাট বাড়ির ঠিকানায়। ঘরবন্দি সোসাইটি। সদস্য ছয়-সাতজন। দুই বাংলার বাঙালি।

বার্লিনে ভারতীয় দূতাবাসের অধীনে যে ‘টাগোর কালচারাল সেন্টার’ দেখভালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর কালচারাল রিলেশনস (আইসিসিআর)’, কী হয় টাগোর কালচারাল সেন্টারে? অনুষ্ঠানমালায় হিন্দি ছবির প্রদর্শনী, হিন্দি ছবির নাচ, ইয়োগা (যোগ) কালচার। যেহেতু রবীন্দ্রনাথের নামে সেন্টার, রবীন্দ্র জন্মদিনে একটি অনুষ্ঠান, গান বা নাচের।

রবীন্দ্র জন্মদিন-মৃত্যুদিনে বাংলাদেশিদের কালচারাল ফোরামের অনুষ্ঠান জাঁকজমক, মনমাতানিয়া। ভারতীয়দের কাছে নয়, পশ্চিমবঙ্গীয়দের কাছেও নয়, বাংলাদেশিদের কাছে, বিদেশে, রবীন্দ্রনাথ পরমপ্রিয়। 

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ