আর নয় ফটোসেশন

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৩:৫৮, আগস্ট ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৯, আগস্ট ০৭, ২০১৯

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাডেঙ্গুর সরব বিস্তারের মাঝেই একদিন উত্তর ঢাকার মেয়র বসেছিলেন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে। সেখানে একটা কথা আমি বলেছিলাম—ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ায় ডেঙ্গুর প্রকোপ আমাদের চেয়ে বেশি, তাই সেসব দেশকে দৃষ্টান্ত হিসেবে না টেনে নজর দিতে হবে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার দিকে। জানতে হবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এবার কলকাতা তুলনামূলকভাবে সফল কেন। তবে একজন সম্পাদক তখন বললেন আমি ঠিক বলিনি এবং তিনি দাবি করলেন কলকাতায় ডেঙ্গু মোটেও নিয়ন্ত্রণে নেই। উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামকে ধন্যবাদ, তিনি বুঝেছেন এবং ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কলকাতা পৌরসভার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষের পরামর্শ নিয়েছেন।
ডেঙ্গু নাগরিক রোগ, অভিজাত মশা এডিসের মাধ্যমে ছড়ায়। কিন্তু এবার ডেঙ্গু আর নগরে বা অভিজাত এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়েছে দেশব্যাপী। গতকাল আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, যে যত কথাই বলুক, বাস্তবতা হলো, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের বাইরে আছে, তাই আরো সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু একই দিনে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক বললেন আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। যেদিন তারা এসব বললেন সেদিনও এক দিনে ৯ জন ডেঙ্গুতে মারা গেছেন। কতজন মারা গেলে জনগণ আর আতঙ্কিত হবে না, সেই পরিসংখ্যানটা জানা এখন খুব প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রয়োজন সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জনগণের মাঝে ভালো তথ্য বিতরণ। 

মশা মারা ওষুধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। কিন্তু আগের ওষুধ কেন কাজ করলো না, কারা কীভাবে এই ওষুধ আমদানি করল, প্রয়োগ করলো তার কোনও জবাবাদিহিতা আছে কিনা সেটা জানাও জরুরি। 

একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন কলকাতার ডেপুটি মেয়র অতীন ঘোষ। বললেন ডেঙ্গু প্রতিরোধে মশাকে নিধন করতেই হবে। এও বললেন, কীটনাশক প্রয়োগের চেয়ে এডিস মশার উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা বেশি দরকার। একথাটাই বলছে ঢাকা নগরবাসী। আমাদের নাগরিকদের সচেতন হতে হবে, আমাদের চারপাশে যেন এডিস মশার উৎপত্তিস্থল জমা পানি না থাকে, সেটা তো অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু মশাও তো মারতে হবে, যেটি সিটি করপোরেশন বা পৌরসভার প্রধানতম দায়িত্ব। 

সারা শহরে হাজার হাজার বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। সেসবের কোথায় স্বচ্ছ পানি জমে আছে, সেগুলোর ব্যাপারে এখন দুই সিটি করপোরেশন নড়েচড়ে উঠেছে। কিন্তু একাজটি করা দরকার ছিল আরো আগে থেকেই। এর বাইরে সড়কে যে উন্নয়ন কাজ চলছে সেদিকটাও নজরে রাখা প্রয়োজন ছিল। অতীন ঘোষ বলেছেন, ‘মশারে করো উৎসে বিনাশ’ এই স্লোগান নিয়ে বাসাবাড়ি কিংবা উন্মুক্ত জলাশয় যেখানেই এডিস মশার প্রজননস্থল পাওয়া যায় তা ধ্বংস করেছেন তারা। এবং তারা কাজটি করেন সারা বছর, শুধুমাত্র সমস্যা যখন বাড়ে তখন নয়। কলকাতা পৌরসভা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণকে প্রতিরোধ ও প্রতিকার—এই দুটি ভাগে বিভক্ত করেছে। সেখানে সারা বছর ধরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে মনিটরিং এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। 

যেকোনও কাজে মানুষকে সঙ্গে না রাখলে সফল হওয়া যায় না। মানুষের উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার কথা উঠে আসে গণমাধ্যমে। কিন্তু আমরা দেখলাম ঢাকা দক্ষিণের মেয়র একটা পর্যায়ে ডেঙ্গু বাড়ছে গণমাধ্যমের এমন তথ্যকে ছেলেধরা গুজবের সঙ্গে তুলনা করে বিষয়টিকে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তিনিও স্বীকার করেছেন পরিস্থিতি আতঙ্কজনক। 

এখন যেহেতু একটা আতঙ্কজনক পরিস্থিতি আছে, সারা দেশে ছড়িয়েছে, ঈদের জন্য মানুষ জেলায় জেলায় বা গ্রামে যাচ্ছে, সেজন্য কী কী করণীয় তার একটা সমন্বিত বার্তা দেওয়া প্রয়োজন। মানুষ কোরবানি দেবে এবং সেটিও এই পরিস্থিতিতে কোনও ঝুঁকি তৈরি করে কিনা, তার কথা বলতে হবে সরকারের দিক থেকেই। 

এখন যে অবস্থা বিরাজ করছে তাতে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থাপনাতেই নজর দিতে হচ্ছে। চিকিৎসকরা তাদের সাধ্যমতো করছেন। কিন্তু কিছু বিষয় বোধ হয় এখনও ভাবা যেতে পারে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন কলকাতার ডেপুটি মেয়র। তিনি জানান, কিউলেক্স মশা নিয়ন্ত্রণে ফগার মেশিনের সাহায্যে ওষুধ প্রয়োগ কার্যকরী হলেও এডিস মশা দমনে এর কার্যকারিতা কম। উত্তরে যে ওষুধ নিষিদ্ধ হলো সেটা কেন দক্ষিণে ব্যবহৃত হতেই থাকল অনেক দিন? 

রাজধানীর দুই মেয়র বলছেন বহুতল ভবনে বা কোনও স্থাপনায় ডেঙ্গুর কারণ এডিস মশার উৎপত্তিস্থল পাওয়া গেলে ভবনের মালিককে জরিমানা করা হবে। এটি একটি ভালো পদক্ষেপ আগামী দিনের জন্য। কিন্তু খেয়াল রাখা দরকার, আমরা সততার সঙ্গে, নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজটি পারবো কিনা। যদি ক্ষমতাবান কোনও ভবন মালিককে ছাড় দেওয়া হয়, আর সাধারণ কাউকে সাজা দেওয়া হয়, তাহলে এটি ব্যর্থ হতে বাধ্য। সুশাসনের প্রধান দর্শনটি হলো ন্যায্যতা। 

এখন থেকেই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোকে চিন্তা করতে হবে কীভাবে তারা সারা বছর ধরে নিবিড় নজরদারি চালাবে যাতে কোথাও পানি না জমে থাকে। হাসপাতাল, ক্লিনিক হোম বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগীদের কী কী রক্ত পরীক্ষা হচ্ছে, কী ভাইরাস পাওয়া যাচ্ছে সেসবের গভীর মনিটরিং প্রয়োজন। বর্ষা শুরু হলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এই ভাবনা থেকে সরে আসতেই হবে। জনস্বাস্থ্য নিশ্চিতে সিটি করপোরেশন ওয়ার্ডভিত্তিক ক্লিনিক সেবা বা ফিল্ড হাসপাতাল চালু করতে পারে। প্রতিটি ওয়ার্ডে কমপক্ষে একজন প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মী রাখতে পারে, যারা ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের খোঁজ পেলেই তা করপোরেশনের নজরে আনবেন। 

কাজগুলো করতে হবে আন্তরিকতার সঙ্গে, অঙ্গীকার নিয়ে। প্রধানমন্ত্রী যে কথাটি বলেছেন সেটিই প্রণিধানযোগ্য, ‘পরিচ্ছন্নতার নামে ফটোসেশন নয়’—কোন ওয়ার্ড কতটা সত্যিকারের পরিচ্ছন্ন, সেটা নিশ্চিত করাই আসল কাজ।

লেখক: প্রধান সম্পাদক, জিটিভি ও সারাবাংলা

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ