আমাদের দুধ-ভাতে উৎপাতের কথা

Send
ফয়েজ রেজা
প্রকাশিত : ১৬:৫৫, আগস্ট ০৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, আগস্ট ০৭, ২০১৯

ফয়েজ রেজা‘যে গরু দুধ দেয়, তার লাথি খাওয়াও ভালো’– সারা বাংলায় প্রচলিত এই প্রবাদ যদি মেনে চলে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, তারা যদি একটু কথা বলে বড়  দুধ উৎপাদন  ও সরবরাহকারীদের পক্ষে, তাতেই যদি কোর্ট-কাচারি সরব হয়ে যায়, তাহলে কি উৎপাদন বাড়বে দুধের? যে গরু আগে ২-৩ কেজি দুধ দিতো, এখন দিনে ৪-৫ কেজি দুধ দেয়, সে গরু কি দিনে ১০-১২ কেজি দুধ দেবে? এই দেশতো উৎপাদনের দেশ। যত পারো উৎপাদন বাড়াও। সেটা জনসংখ্যা হোক, ছাগল, গরু, ভেড়া, মহিষ হোক আর গরু মহিষের দুধ হোক।
এই দেশে দুধের মাছিরা সবসময় রাজনৈতিকভাবে থাকে শক্তিশালী। প্রশাসনিকভাবে পায় বাড়তি পরিচর্যা। সকালে যে রায় দুধের মাছিদের বিপক্ষে যায়, বিকেলে সে রায় চলে আসে তাদের পক্ষে।
বাংলাদেশ তো বটেই, গোটা ভারতবর্ষের মানুষের মনের কথা—‘আমার সন্তান যেনো থাকে দুধে ভাতে’। দুধে ভাতে থাকা মানে তো ভালোভাবে খেয়ে পরে বেঁচে থাকা। কোনোভাবে খাদ্যাভাবের শিকার না হওয়া। অবস্থা সচ্ছল হলে, প্রাচুর্যের মধ্যে থাকলে তবেই দুধে ভাতে থাকা সম্ভব। সরল সহজ ভাষায় যে কথাটি ভারতচন্দ্র বলেছিলেন সেই মধ্যযুগে। সন্তানের ভবিষ্যৎ সুখের কথা ভেবে যে বাসনা প্রকাশ করা হয়েছিল সেকালে, চিরায়ত সেই বাসনা এখনও অপূর্ণ রয়ে গেলো, হায়! যদিও যুদ্ধ, আকাল, মহামারি, বন্যা, দুর্যোগ, মঙ্গার মতো বড় কষ্টের বহু ঘটনা অতিক্রম করে এসেছে বাংলাদেশ। মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত থেকে ফিরে এসেছিলেন ৬৬ লাখ ৪৫ হাজার শরণার্থী। (তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা, ২ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২)

ফিরে আসা শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য তখন দরকার ছিল কমপক্ষে ২০ লাখ গবাদি পশু। এ হিসাব বের করেছিলেন বাংলাদেশের উদ্বাস্তু ও পুনর্বাসন দফতরের প্রতিনিধি ও ভারতের পুনর্বাসন বিভাগের কর্মকর্তারা। (তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা, ১৯৭২) অথচ পূর্ব হিসাব মতে, বাংলাদেশে ২ কোটি ৮০ লাখ গো-মহিষ ছিল, ২ কোটি ১০ লাখ হাঁস-মুরগী ও ৪৪ লাখ ৬৪ হাজার ছাগল ভেড়া ছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় মানুষের সঙ্গে তারা পশুদেরও ধ্বংস করেছিল, প্রায় ২৫ ভাগ প্রাণী পাকিস্তানি ও তাদের দোসররা জবাই করে খেয়েছিল। (তথ্যসূত্র: দৈনিক বাংলা, ২৬ জানুয়ারি, ১৯৭২)

তারপর দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে বেশ সুফল পেয়েছে বাংলাদেশ। ১৯৭১ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত মাথাপিছু দুধের প্রাপ্যতা ছিল ২৬ থেকে ২৮ মিলি। সে সময় প্রতিটি গরু দিনে ২ লিটার দুধ দিতো। ১৯৯৭ সাল থেকে প্রাণিসম্পদ অধিদফতর উন্নত জাতের বীজ বিতরণ কার্যক্রম জোরদার করে। ১৯৯৮ সাল থেকে এ খাত বিকশিত হতে থাকে। বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে গবাদি পশুর সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৫ কোটি। এর মধ্যে গরুর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ৩১ লাখ ৯৫ হাজার, ছাগল প্রায় ২ কোটি ৫১ লাখ ১৬ হাজার এবং ভেড়া প্রায় ৩০ লাখ ৮২ হাজার।

যদি ‘নিরাপদ খাদ্য বলতে বোঝায় এমন একটি অবস্থাকে, যেখানে মানুষকে তার খাদ্যে সংস্থান নিয়ে চিন্তা করতে হয় না’ তাহলে বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থান খুব ভালো। ২০১৭ সালে বাংলাদেশে খাদ্যশস্য উৎপাদন হয়েছে ৩শ ৯২ কোটি মেট্রিক টন। ১৯৭৩ সালে পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবমতে, দেশে  খাদ্যের মোট চাহিদা ছিল-১ কোটি ২০ লাখ টন (জনপ্রতি দৈনিক ১৫৫ আউন্স হিসাবে ৭ কোটি ৩২ লাখ লোকের জন্য)। (তথ্যসূত্র: দৈনিক ইত্তেফাক, ৯ জুন, ১৯৭৩) 

আগে নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি ছিল মানুষের ক্রয় ক্ষমতা, আয়-রোজগার ও প্রাকৃতিক বিষয়ের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বাড়ছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, বাড়ছে। এমনকী জিডিপি’র প্রবৃদ্ধিও বাড়ছে। বাঙালির এখন আর ‘নুন আনতে পানতা ফুরায়’ না। ফলে নিরাপদ খাদ্যের অধিকার শুধু আয়-রোজগারের ওপর নির্ভর করছে না। বেশি আয়ের মানুষই এখন বেশি বঞ্চিত হচ্ছে নিরাপদ খাদ্যের অধিকার থেকে।

একালে মানুষের পাতে দুধ-ভাত তুলে দেওয়াই নিরাপদ খাদ্য বা খাদ্য নিরাপত্তা নয়। মানুষ যেসব প্রাণ-এর ওপর খাদ্যের জন্য নির্ভর করে, সেসব প্রাণের খাবার নিরাপদ করাও খাদ্য নিরাপত্তার অংশ। আমরা খাঁটি দুধ আশা করছি। খাঁটি দুধের প্রধান উৎস গরু মোটাতাজাকরণে যে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হচ্ছে, তা বন্ধ করছি না। দেশে দুধের চাহিদা বেশি। তাই বাড়তি দুধ-মাংস উৎপাদন করতে গিয়ে নির্ভরতা বাড়াচ্ছি রাসায়নিক উপাদানের ওপর। ফলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ছে, নষ্ট হচ্ছে খাদ্যের গুণগত মান।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের স্যানিটারি ইনস্পেক্টররা ২০১৫ সালে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ছয় হাজার ৩৬০টি খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করেন। তারা সেগুলো  মহাখালি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইপিএস) ফুড টেস্টিং ল্যাবরেটরিতে পাঠান। সংগৃহীত ওই নমুনার মধ্যে ১ হাজার ৯৭৮টিতে অর্থাৎ ৩১ দশমিক ১০ শতাংশ খাদ্যপণ্যে ভেজাল পাওয়া যায়।

আমাদের নিরাপদ আমিষের মূল উৎস ডিম, মুরগিও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে রাসায়নিকের ব্যবহারে। বিশ্বে যে পরিমাণ অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি হয়, তার অর্ধেকই ব্যবহৃত হয় পশু উৎপাদনে। আর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার জন্য হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) থাকা রোগীদের একটি বড় অংশের মৃত্যু হয়। ২০১৮ সালে শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আইসিইউ-তে মোট ৯০০ রোগী ভর্তি হয়েছিল, যাদের মধ্যে ৪০০ জন মারা যায়। তাদের প্রায় আশি শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে তাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া বা ‘সুপারবাগের’ উপস্থিতি ছিল। (তথ্যসূত্র: বিবিসি, ১৫ এপ্রিল ২০১৯)। এর বড় কারণ অধিকাংশ পশুখাদ্যে, গো খাদ্যে পোল্ট্রি ফিডে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো হয়। পশুর শরীরে যে জীবাণু তা ধীরে ধীরে অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ করার ক্ষমতা তৈরি করে ফেলে। ফলে মানুষ যখন উৎপাদিত গরু, মুরগী বা মাছ খায়, তখন খাবারের মাধ্যমে মানবদেহে এসব অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবানু প্রবেশ করে। এরপর মানুষ যখন তার নিজের অসুখ হলে এসব অ্যান্টিবায়োটিক খায়, তখন সে ওষুধে আর কাজ হয় না।  দেশের সামগ্রিক খাদ্য ব্যবস্থাপনার নমুনা যখন এমন, তখন আমরা বলছি, দুধ-ভাতের কথা। 

দুধ নিয়ে যে উৎপাত নতুন শুরু হয়েছে এমন নয়। এর আগেও ২০০৩ সালে বাজারে মেয়াদোত্তীর্ণ গুঁড়ো দুধ ও বিষাক্ত পাম স্টেরিন মেশানোর দায়ে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) চারটি কনডেন্সড মিল্ক কোম্পানির লাইসেন্স বাতিল করেছিল। নিয়মে ছিল কনডেন্সড মিল্কে কমপক্ষে ৮ ভাগ মিল্ক ফ্যাট থাকতে হয়। যা গরু বা মহিষের দুধ থেকে তৈরি করতে হয়। দুধ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী  এই শর্ত অমান্য করে ভেজাল কনডেন্সড মিল্ক তৈরি করার কথা স্বীকারও করেছিল। এরপর সাবান তৈরির ভেজিটেবল ফ্যাট দিয়ে কনডেন্সড মিল্ক বানানোর অনুমতি চেয়ে একটি মানদণ্ড তৈরির দাবি তুলেছিল। যাতে তারা কনডেন্সড মিল্ক উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারে।

প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দুধ ভাতে উৎপাত করে আসছে একদল দুধের মাছি। দরিদ্র কৃষকদের ভূমিহীন আর ছোট খামারিদের এক ধরনের চাকরে রূপান্তর করেছে দুধের মাছিরা এখন শিক্ষিত ও বড় ব্যবসায়ী। দুধ উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারীদের এখন বেশ কয়েকটি সংগঠনও আছে। যার একটি বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন। তাদের এই অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য সংখ্যা নাকি ৮১ হাজার। এর মধ্যে ৫০ হাজারের বেশির শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক। (তথ্যসূত্র: ৫ মে ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত ‘দেশীয় দুগ্ধশিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন এর বক্তব্য)।

দুধ উৎপাদনকারী ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের দাবি—শিক্ষিত দুধ উৎপাদনকারীরা দুগ্ধশিল্পে বিনিয়োগ করে বাংলাদেশের দুধের চাহিদা মেটাচ্ছেন। তাদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ দুগ্ধ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের খুব কাছাকাছি অবস্থানে আছে। এ কারণে তাদের যদি দুধে একটু পানি মেশায়, মানুষের শরীরের জন্য ক্ষকিতারক ডিটারজেন্ট পাউডার মেশায়, দুধে যদি হঠাৎ হঠাৎ পাওয়া যায় একটু ক্ষতিকারক অ্যান্টিবায়োটিক, সিসা, দুধ উৎপাদনকারীদের পক্ষে যদি কথা বলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ,  তাতেই যদি হৈ হৈ করে ওঠে, তাহলে কি মান থাকে উৎপাদনকারী বা বিকাশমান  দুগ্ধ শিল্পের!

কতিপয় দুধ উৎপাদনকারী নয়, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ দেখার নৈতিক দায়িত্ব পালনের শপথ নিয়ে মাসিক বেতন ভোগ করেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা। তারা যখন খাদ্যের মান সুরক্ষার কথা না ভেবে কথার তুবড়ি ছোড়েন  উৎপাদনকারীদের পক্ষে, সাধারণ মানুষের তখন আর কী করার থাকে? কোর্ট কাচারি সরব হলেই দুধ-ভাতে উৎপাত বন্ধ হয়ে যাবে। একথা যদি ভাবেন, বড় বোকা আপনি। অতীত বলে,  বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ‘নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইন- ২০১৩’সহ ২০টির ও বেশি আইন রয়েছে দেশে। সহায়ক হিসেবে আছে,  ‘বাংলাদেশ খাদ্য ও পুষ্টি নীতি-১৯৯৭’,  ‘বাংলাদেশ খাদ্য নীতি- ১৯৯৮’ ও ‘ব্যাপক খাদ্য নিরাপত্তা নীতি-২০০১’।

এত আইন থাকলেও আইনের তো চোখ ‘বাঁধা’। তাই প্রকাশ্যে এদেশে খাদ্যে মেশানো হয় ভেজাল। বাজারে বিক্রি করা হয় ভেজাল খাদ্য। অথচ নীতিমালায় আছে,  আইনের বিধান অনুসরণ করে অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।

সব মানুষের জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই শুধু নয়, নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এ প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ভেজাল এবং কেমিক্যালমুক্ত খাদ্য পেতে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩’। এ আইনের অন্যতম উদ্দেশ্য বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতির যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট সব কার্যক্রম সমন্বয়ের মাধ্যমে সবার জন্য নিরাপদ খাদ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা। এ আইনে খাদ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দ্রব্য মেশানোর দায়ে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর জেল ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

আর দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে সাজার মেয়াদ বেড়ে হয় দ্বিগুণ, অর্থাৎ ১০ বছরের কারাদণ্ড। খাদ্য নিয়ে মিথ্যা বিজ্ঞাপন দিলে ১ বছরের কারাদণ্ড, নিবন্ধন ছাড়া বিক্রি করলে ৩ বছর, ছোঁয়াচে ব্যাধি আক্রান্ত কাউকে দিয়ে খাদ্য বিক্রি করলে দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন ‘এফবিসিসিআই খাদ্য দূষণের শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দাবি করে বলেছিল, কোনও খুনি যদি একজনকে খুন করে মৃত্যুদণ্ড পায়, তাহলে একজন খাদ্য দূষণকারী নীরবে হাজার হাজার মানুষ হত্যার জন্য কেন মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন জেল-জরিমানার শাস্তি পাবে না? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এ ধরনের অপরাধে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে’। (তথ্যসূত্র: Feed The Future: Bangladesh In Foc, পৃষ্ঠা-২৫৬)

তেলে জল মিশ খায় না। দুধে জল মিশ খায় বলেই দুধে পানি বা পাউডার কিংবা পাউডার জাতীয় পদার্থ মেশানোর সুযোগটা বেশি। ফলে দুধ খাঁটি হলেও সংশয় থাকে, দুধে পানি মেশানো নেইতো। এখন তো সংশয় ডিটারজেন্ট মেশানো নেই তো! হয়তো। আধুনিক প্রযুক্তির যুগেও এই সংশয় থেকে মুক্ত হতে পারেনি দুধভাতের কাঙালি, বাঙালি।

বর্তমানে ও ভবিষ্যতে দুধে ভাতে থাকতে হলে ভাত ও দুধের উৎপাদন বাড়াতে হবে। প্রতিবছর ১৮-১৯ লাখ নতুন মুখের জন্ম হচ্ছে দেশে। ২০৩০ সালে জনসংখ্যা ছাড়াবে ১৯ কোটি। এই ১৯ কোটি মানুষকে যদি দুধে-ভাতে রাখতে চান, বাড়াতে হবে চালের উৎপাদন, বাড়াতে হবে দুধের উৎপাদন। অথবা দুধ ভাতের পুষ্টি উপাদান খুঁজতে হবে অন্য কোনও খাদ্যে। বর্তমানে ১ কোটি ৫০ লাখ মেট্রিক টন দুধের চাহিদা রয়েছে দেশে। এর বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ৯৪ লাখ মেট্রিক টন দুধ। প্রাণী সম্পদ মন্ত্রণালয় ও এলডিডিপি ‘লাইভ স্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে ৬০ লাখ মেট্রিক টন দুধের চাহিদা পূরণ করার চেষ্টা করছে। (তথ্যসূত্র: ৫ মে ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো আয়োজিত ‘দেশীয় দুগ্ধশিল্পের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন এর বক্তব্য)

একালে শুধু উৎপাদন বাড়ালে হবে না, জোর দিতে হবে খাদ্য মান রক্ষার বিষয়ে। বন্ধ করতে হবে দুধে ক্ষতিকারক রাসায়নিক উপাদান মেশানো। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ যদি সুর তোলে দুধের মাছিদের কণ্ঠে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অবস্থা হবে মহাসাগরের ভাসা মানুষের মতো। চারপাশে অনেক পানি কিন্তু সামান্য এক ফোঁটা পানি নেই পান করার মতো।

লেখক: ছড়াকার ও তথ্যচিত্র নির্মাতা

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ