উপেক্ষিত স্বাচ্ছন্দ্য বনাম আত্মপরিচয় সংকট

Send
ইব্‌তেসাম আফরিন
প্রকাশিত : ১৪:২৯, আগস্ট ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩২, আগস্ট ০৯, ২০১৯

ইব্‌তেসাম আফরিনআত্মপরিচয় কিংবা আইডেন্টিটি অনির্দিষ্টকাল থেকেই বিভিন্ন তর্ক এবং বিতর্কের মূল কেন্দ্রতে স্থান পাচ্ছে। সেটি যদি হয় জাতিগত কিংবা নৃগোষ্ঠীভিত্তিক, আত্মপরিচয় তখন বিশেষভাবে আলোচনার কেন্দ্রতেই চলে আসে। বাংলাদেশে ১৯৭০ পরবর্তী সময়ে আত্মপরিচয় কেন্দ্রিক যে রাজনীতি চর্চা শুরু হয়, তা এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে আরও বিশদ আকার লাভ করেছে। বর্তমান সময়ে বিশ্বায়িত সংস্কৃতি কিংবা মুক্ত পরিচয়ের পাশাপাশি বিভেদ ও স্থান করে নিচ্ছে। স্পষ্টতই, আত্মপরিচয়ের ধারণা বিকাশ ও বিশ্লেষণ অকপটেই বলে ফেলার মতো বিষয় নয়। তবে, এই সমীকরণের জটিলতা বৃদ্ধি পায় এমন প্রেক্ষিতে, যখন নিজের সমরূপ হওয়ার ধারণা থেকে আমরা কোনও সমষ্টি বা গোষ্ঠীর সঙ্গে নিজের একটি পরিচয় ভাগ করে নেওয়ার ধারণা থেকে চোখ ফিরাই (সেন, ২০০৬)।

আমি বরাবরই বিশ্বাস করি যাবতীয় ঘটনা এবং এর বিস্তার ‘অরাজনৈতিক’ নয়। তাই আত্মপরিচয় গঠন ও আত্মপরিচয় সংকট বিষয়ক আলোচনাও কার্যত অ-রাজনৈতিক হচ্ছে না। সেক্ষেত্রে আলোচনার সুবিধার্থে আত্মপরিচয় কী, সে বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা যাক। আত্মপরিচয় এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে ব্যক্তি কিংবা সমষ্টির কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য যেমন—নৃতাত্ত্বিক পরিচয়, জাতিগত পরিচয়, ধর্মীয় পরিচয়, লিঙ্গীয় চর্চা ইত্যাদি দ্বারা নির্দিষ্ট পরিচয় নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ আত্মপরিচয় হলো এমন একটি পরিচিতি যা একক সত্তাকে একটি সামগ্রিক পরিচয় দিয়ে ঘিরে রাখে এবং তার একটি সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা তৈরি করে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা কী? সাংস্কৃতিক স্বতন্ত্রতা পরিমাপের কোনও মাপকাঠিতে বিশ্বাসী না হলেও, কোনও গোষ্ঠীর ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় কিংবা রীতিনীতি অথবা সমাজ পরিচালনার নিয়মগুলো স্বকীয় সংস্কৃতি সৃষ্টি করে। এবং একাধারে সামাজিক এই কাঠামোতে অভ্যস্ত থেকে যখন একজন ব্যক্তি সমাজের অন্যান্য মানুষের চেয়ে চলনে-বলনে এবং বিশ্বাসে পৃথক হয়ে ওঠে, তখনই তা হয়ে ওঠে তার আত্মপরিচয়। এটি কোনও ক্ষণজন্মা বিষয় নয়। কালের স্রোতে এবং সময়ে বহমানতায় তৈরি হয় আত্মপরিচয়। যেমন—আমার আত্মপরিচয়ে আমি একজন বাঙালি। আমি একজন ইথওপিয়ান অথবা ভারতীয় অথবা ম্রো অথবা অস্ট্রেলিয়ান হতে স্বতন্ত্র এবং আমার নিজস্ব জীবনব্যবস্থা আছে, যেগুলোতে অন্যান্য সমাজ ও দেশের মানুষ অভ্যস্ত নয়। আবার আমি যখন বাঙালি মুসলিম হিসেবে নিজেকে প্রকাশ করতে যাই, তখন তৈরি হয় আরেক ধরনের আত্মপরিচয়।

তবে অমর্ত্য সেনের ভাষায়, আমাদের পরিচয়ের বহুমাত্রিকতা এবং চয়ন ও যুক্তির ব্যবহারের অবহেলা করার ফলে আমরা যে জগতে বাস করি সেটা ক্রমেই ধোঁয়াটে হয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রেক্ষাপটের বিচারেও আত্মপরিচয় তৈরি হয় এবং তা একইসঙ্গে সংকটাপন্নও হয়। আর এই গঠন-সঙ্কটের দামামায় মানুষের মানবিক জীবনযাপন কি তার সুষ্ঠু জীবনব্যবস্থা থেকে সরে আসছে না? কেতাবি ভাষায় আত্মপরিচয় কী, এর উত্তরে গলুবভিক (২০১০) বলেছেন, আত্মপরিচয় হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কোনও ব্যক্তি কিংবা দলের মাঝে তার স্ব-চিত্র অথবা একটি সামগ্রিক চিত্র নির্মিত হয়, যা তাকে ‘অন্যদের’ থেকে পৃথক করে। অর্থাৎ আত্মপরিচয় হলো ‘অপরের’ কাছে ‘নিজেকে’ ‘নিজ’ হিসেবে উপস্থাপনের একটি প্রক্রিয়া মাত্র। 

২.

যেখানে ‘নিজ’ উপস্থিত সেখানে ‘অপর’ উপস্থিত থাকাটাই তত্ত্বগতভাবে কাম্য। তেমনিভাবে আত্মপরিচয় যেখানে উপস্থিত সেখানে আত্মপরিচয় সংকট প্রসঙ্গে আলোচনা কোনও অনভিপ্রেত ঘটনা নয়। যে মুহূর্ত থেকে আমি বাঙালি বলে পরিচয় দিচ্ছি কিংবা পরিচিত হচ্ছি, তখনই বৈশ্বিক সংস্কৃতি আমার মাঝে একটি নতুন বলয় তৈরি করতে থাকে। যেখানে অপর সংস্কৃতির নানান দিক আমাকে প্রলুব্ধ করে আমাকে তার বা তাদের মতো হতে উৎসাহী করে। বিশ্বব্যবস্থার ‘বৈশ্বিক’ তকমা যখন জীবনের নিত্যতায় যুক্ত হয় তখন খুব সহজে আমাদের মাঝে ‘মিলে মিশে’ সংস্কৃতি চর্চার একটি ধারা চোখে পড়ে। যা তৈরি করে একটি অদৃশ্য প্রতিযোগিতা, যার অন্যতম উদাহরণ যেতে পারে ভাষায়, যা নানান শব্দের সংমিশ্রণে নতুন রূপ লাভ করছে ক্ষণে-ক্ষণে। শুধু বাঙালি জাতিগোষ্ঠী নয়, সমগ্র বিশ্বের জাতিগোষ্ঠীর মাঝেই পরিলক্ষিত হয় এই প্রতিযোগিতা। মাইক্রো (ক্ষুদ্র) এবং ম্যাক্রো (বৃহৎ) উভয় স্তরেই রচিত হওয়া এই প্রতিযোগিতা ক্রমেই একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে এটি উপলব্ধি করতে উদ্বুদ্ধ করে—‘তোমার’ স্বতন্ত্রতার চেয়ে ‘আমার’ সংস্কৃতি ঢের সমৃদ্ধ। আমার সংস্কৃতির চর্চাই কেবল পারে তোমার সাংস্কৃতিক দীনতাকে দূর করতে এবং এটি তোমাকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে শেখাবে। এই প্রতিযোগিতার সাংস্কৃতিক বিস্তৃতি শুধু সংখ্যালঘিষ্ঠ জনগণের মধ্যেই নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর মাঝেও বিস্তরভাবে বিদ্যমান। এরই ধারাবাহিকতায়, বিভিন্ন সময় সুবিধাজনকভাবে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের মাঝে এই ধারণা বিকশিত করছে এবং তাকে নিজ সংস্কৃতি থেকে বিমুখ করছে। ফলস্বরূপ, আত্মপরিচয়ের প্রকাশে একটি দ্যোতনার সৃষ্টি হয়। আর এভাবে আত্মপরিচয় সংকটের বীজ রোপিত হচ্ছে। নিজ স্বতন্ত্রতা অর্থাৎ পরিচয়ের স্বাচ্ছন্দ্যকে পাশ কাটিয়ে অপর অর্থাৎ যে পরিচয়ে আমি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি না, সেই সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে তাকেই নিজের করে ফেলার যে তাড়না—তাকে আমি আত্মপরিচয় সংকট বলে বিবেচনা করছি। আত্মপরিচয়ের এই সংকট একটি রাজনীতিক রূপ মাত্র, যা নিজেকে অন্যের চাইতে পৃথকভাবে দাবি করে এবং এই ভিন্নতাকে বৈধতা দেওয়ার দাবি করে (মেইসি, ২০০০)।

আত্মপরিচয়ের সংকটের নানান কারণ থাকতে পারে। বৈশ্বিক সংস্কৃতির উপর্যুপরি চর্চা, স্বার্থ ও সুবিধা লাভ এবং নিজ সংস্কৃতির অপ্রচলিত ধারা নিয়ে হীনমন্যতার কারণে এই আত্মপরিচয় সংকট সৃষ্টি হতে পারে। প্রেক্ষাপটের ভিন্নতা অনুসারে এর রকমে ভিন্নতা দেখা দিতে পারে। যা আমি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কয়েকটি উদাহরণ দিয়ে বর্ননা করার চেষ্টা করব।

৩. 

একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে আমার জীবন সুপ্রসন্ন হয়েছিল বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি জেলা এবং উপজেলায় বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করবার কারণে। সেই সুযোগ আমাকে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন মানুষের সঙ্গে মিশবার সুযোগ করে দিয়েছে, যা সমাজ, সামাজিক আচার ব্যবস্থা এবং মানুষ সম্পর্কে একটি বিশদ ধারণা প্রদান করেছে। বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করবার সময় আমি তাদের সাংস্কৃতিক ব্যবস্থা, ভিন্নতা, প্রচলিত চর্চা এবং বিদ্যমান সমস্যা সম্পর্কে জ্ঞাত হয়েছি। তাই, আত্মপরিচয় সংকটের মতো খুবই স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে লেখা আরম্ভ করেছি। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আত্মপরিচয় এবং আত্মপরিচয় সংকট এমনি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রপঞ্চ যা আত্মপরিচয়ের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এটি যেমন একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক ভিন্নতার উদযাপন আবার একই সঙ্গে সংখ্যালঘিষ্ঠের প্রতিরোধ হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। তাই, ব্যক্তিক অভিব্যক্তির সমষ্টিগত অভিজ্ঞতার এই সম্পর্ককে তুলে ধরা সময়ের দাবি বলে বিবেচনা করছি। 

অমর্ত্য সেনের (২০০৬) মতে, আমাদের পরিচয় নির্বাচন করার স্বাধীনতা নেই। সেই হিসেবে পরিচয় ধারণ করার প্রক্রিয়াতে সাধারণ মানুষকে ব্যস্ত রাখা হয়। বাংলাদেশের ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী শুধু পাহাড়েই থাকে এমন ধারণা যারা করে থাকেন তাদের জন্য চমকে দেওয়ার মতো বিষয় হচ্ছে বাংলাদেশের সমতলেও সমানভাবে বসবাস করছে অনেক ‘আদিবাসী’ জনগোষ্ঠী। যাদের ভাষা, পোশাক কিংবা পেশা ‘মেইনস্ট্রিম’ বাঙালির চেয়ে কিছুটা আলাদা, যারা সংখ্যাগরিষ্ঠ জ্ঞাতিগোষ্ঠীর মাঝে থেকেই নিজেরদের ঐতিহ্যগত রীতিনীতি এবং অভ্যাসের চর্চা করছে। তবুও কোথায় যেন একটা ছন্দ-পতন! কোথায় যেন মূল স্রোতের সঙ্গে মিশে যাওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা, কোথায় যেন ‘স্বকীয়তা’ অদৃশ্য হওয়ার সুর পাওয়া যাচ্ছে। বলছিলাম ত্রিপুরা, বুনো, বাগদী, রাখাইন, মাঝি নৃগোষ্ঠীর কথা।

এই অদৃশ্য দৃশ্যপটে যে সংঘাত সৃষ্টি হয়, তা যেমন স্বতন্ত্র সংস্কৃতির জন্য হুমকি, তেমনটা জাতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও। কেননা, বৈচিত্র্যতা আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। তাই আমার মতে, যদি সংখ্যাধিক্যের চাওয়া-পাওয়ার চাপে সংখ্যায় কম জনগোষ্ঠীর স্বাচ্ছন্দ্যে পতন ঘটে, তবে তা সামগ্রিক অর্থে আত্মপরিচয়ের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য হুমকি তৈরি করে। তাহলে প্রশ্ন আসছে, পরিচয় তৈরি হওয়া, ধারণ করা এবং চর্চা করার যে রাজনীতি, তা ঠিক কোন প্রেক্ষাপটে তৈরি হচ্ছে?

৪. 

বাংলাদেশের গ্রামের নামগুলো আমার কাছে অদ্ভুত সুন্দর মনে হয়। কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবেই গ্রামের নামটি উহ্য রাখলাম। এবং সুন্দর একটি গ্রামের নাম উল্লেখ করতে না পারার দুঃখ রয়েই যাচ্ছে। পায়ে চালিত ভ্যানে যেতে হলে মাঝে একটি কালভার্ট পার হতে হয়। তার একটু পরেই ছিমছাম ছোট প্রায় ৭৫ ঘর বিশিষ্ট একটি ‘আদিবাসী’ গ্রাম। গ্রামের ভেতরকার কথা বলার আগে কিছু ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণবলে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। ক্ষেত্র গবেষণায় সার্বিক সুবিধার জন্য সরকারি কর্মকর্তার সহযোগিতায় আমরা গ্রামের কিছু ‘আদিবাসী’ নেতার সাহায্য পেয়েছিলাম। উল্লেখ্য, কোনও এক কারণে গবেষণা চলাকালীন যখনই তাদের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে, তারা প্রতিনিয়ত তাদের কথা এবং কর্মকাণ্ড দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করছেন তারা ‘আদিবাসী’। তাদের সার্বক্ষণিক ফোনালাপ আর চোখের ইশারার মাধ্যমে বাক্য-বিনিময় ছিল চোখে পড়বার মতো। এসব কিছু লক্ষ করেও তাদের সঙ্গে যাত্রা করলাম গ্রামের দিকে। গ্রামে গিয়ে দেখি মাঝে একটি বেশ বড় ফাঁকা জায়গা। যেখানে গ্রামের সকলে বিশেষ উপলক্ষে জড়ো হন। ‘আদিবাসী’ নেতা শশব্যস্ত হয়ে গেলেন তাদের এলাকা ঘুরিয়ে দেখাবার জন্য এবং তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন গ্রামের একদম শেষ সীমানায়, সেখানে একটি শূকর কাদা পানিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল আর তার সঙ্গীটি বেড়ার ফাঁকে দাঁড়িয়ে গোঁ গোঁ শব্দ করছিল। এই গৃহপালিত প্রাণী দুটো দেখিয়ে সেই লোক আমাকে বললেন—“আপা, এদের আমরা পালি। এরা আমাদের ঐতিহ্য। আমরা ‘আদিবাসী’ এটাই এর প্রমাণ। আমরা এদের আমাদের সঙ্গেই রাখি। অন্য কোথাও গিয়া এইগুলা দেখতে পারবেন না।” এরপর পুরো গ্রামে আবার চক্রাকারে ঘুরলাম। অন্য কোথাও গৃহপালিত শূকরের সন্ধান পেলাম না। ‘প্রমাণ’ এবং ‘অন্য কোথাও এইগুলা দেখতে পারবেন না’ এই শব্দ এবং বাক্যগুলো আমাকে সারাদিন তাড়া করেছে। প্রশ্ন ঘুরছিল মাথায়, তবে কি শুধু ‘আদিবাসি’ পরিচয়টুকু পাওয়ার জন্য নামমাত্র সংরক্ষণ চলছে শূকর লালন-পালন করবার? স্বাভাবিক জীবনযাত্রার রূপটিকে একটি বিশেষ অংশে সীমাবদ্ধ করে ফেলা এবং এটিকেই তাদের স্বকীয়তার একমাত্র ধারক বাহক মনে করাটা প্রশ্ন তৈরি করেছিল ‘আত্মপরিচয় সংকট’ বিষয়টির বিস্তৃততা জানতে। শুধু ‘আদিবাসী’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার জন্য এই প্রাণী দুটোকে প্রমাণস্বরূপ দেখাবার প্রচেষ্টা কি তাদের নিজেদের জোর করে ‘আদিবাসী’ হিসেবে ধরে রাখার চেষ্টা নয়? নাকি, পরিচয় ধারণ করার প্রক্রিয়াটি এতটাই রাজনৈতিক হয়ে গেছে, যেখানে এক স্থানে বাঙালি আবার একই সময় ‘আদিবাসী’ পরিচয়ে পরিচিত হয়ে সে নিজেকে এমন সংকটাপন্ন অবস্থায় নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সে না হয়ে উঠছে বাঙালি না ধারণ করছে ‘আদিবাসী’ পরিচয়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, তাহলে কোন উপাদান বা উপাদানগুলো (সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক) তাদের মাঝে একটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ের পরিবর্তে আরেকটি সাংস্কৃতিক পরিচয়ে পরিচিত করতে উদ্বুদ্ধ করছে? বিচ্ছিন্ন করছে মানুষ ও মানবিকতার চর্চা থেকে? 

পরবর্তী সময়ে নেতাকর্মীদের অনুপস্থিতিতে যখন গ্রামে গিয়েছি তখনকার চিত্র ভিন্ন ছিল। সেখানে সাজ সাজ রব অনুপস্থিত ছিল, বাসিন্দারা স্পষ্টতই বিরক্ত কাজের মাঝে বিপত্তি সৃষ্টির জন্য। তাদের কাজ করার সুযোগ দিয়ে যখন বিভিন্ন জনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলাম। এরই মাঝে লক্ষ করলাম একজন ব্যক্তি খুব বিরক্তি নিয়ে বসে পায়ের নখ খুঁটছেন। আগ্রহী হলাম তার সঙ্গে কথা বলতে এবং কথা বলবার অনুমতি মিললে খুব ক্ষিপ্ত হয়ে বললেন—“আমি আদিবাসী, কিন্তু আমার সন্তানের পরিচয় আদিবাসী দেব না। ওরে আমি স্কুলে পড়াবো। ওর এতো যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে না। চাকরি করবে। ‘আদিবাসী’ হয়া লাভ নাই কোনও। বড় হয়া চাকরি করবে, সুখে থাকবে। শুধু শুধু ‘আদিবাসী’ নাম নিয়া বইসা থাকলে কোনও উপকার নাই, কোনও চাকরি নাই—সুযোগ সুবিধা যারা দরকার তারাই পায়, আমি আমার ছেলেরে বাঙালি পরিচয় দিয়া বড় করব, আমি কি বাঙালি না?” এখানে লক্ষণীয়, দ্বৈত সাংস্কৃতিক পরিচয়ের মাঝে একটি পরিচয়কে তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। কিন্তু কেন এই একটি সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দেওয়া? তার বক্তব্যের মধ্য থেকে খুব সহজেই খুঁজে পাওয়া যায় এর উত্তর। তবে শুধু কি সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির অপ্রতুলতা কিংবা অধিক সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির আশায় তার স্বাচ্ছন্দ্যের পরিচিতকে তুচ্ছ বলে জ্ঞান করছেন? নিজ সাংস্কৃতিক পরিচয়ে এত বছর জীবন ধারণের পরও হঠাৎ আরেকটি পরিচয়ে পরিচিত করবার পেছনে কোন উপাদানগুলো দায়ী কিংবা কোন বিষয়গুলো আত্মপরিচয় পরিবর্তনের জন্য দায়? সামাজিক অবস্থানের দোদুল্যমান অবস্থান কি আত্মপরিচয়ের সংকটের জন্য দায়ী নাকি জাগতিক অনুষঙ্গের বস্তুগত চিন্তায় এর মূল কারণ, তা এখনো সুস্পষ্ট নয়। 

আলোচনার এ পর্যায়ে নতুন একটি দৃশ্যপটের অবতারণা করা যাক, স্থান রাজবাড়ী। ত্রিপুরা নৃগোষ্ঠীর মানুষগুলোর সঙ্গে মাস কতক থাকার ফলে একটা মধুর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে এরই মাঝে। কথা হচ্ছিল একজন ত্রিপুরা যুবকের সঙ্গে, যিনি বর্তমানে রাজবাড়ী শহরে সেলুন দিয়েছেন। কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি তো নিজে ত্রিপুরা পরিচয় দিলেন। আপনার ভোটার আইডিতে ত্রিপুরা লেখা, কিন্তু মুখে চৌধুরী বললেন, সেটা কেন? উত্তরে যা বললেন এর চর্চা দেখে আসলেও এরকম চোখে আঙ্গুল দিয়ে বলে দেয়নি কেউ কখনো। তার উত্তর ছিল, “চৌধুরি বললে সঙ্গে সঙ্গেই ‘আদিবাসী’ বলে কেউ হেলাফেলা করে না। সহজেই কাজ পাওয়া যায়। নিজেদেরকে আর অন্যদের চেয়ে আলাদা মনে হয় না। সবকিছু বিবেচনা করেই চৌধুরীটাই সুবিধাজনক। আপনারা তো আজকে আছেন, কালকে নাই, সমস্যা লিখে নেবেন কিন্তু সমাধান হবে না। কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকতে হবে। সেই জন্যই সব সময় ত্রিপুরা পরিচয় দিতে হয় না।” প্রশ্ন এসেই যায়, সমাজব্যবস্থার কোন চর্চা আজ পরিচয়ের স্বাচ্ছন্দ্যতাকে বিলীন করে দিচ্ছে? জীবনযুদ্ধের এই বাস্তবতা কি তাদের স্ব-পরিচয়কে সংকটাপন্ন করছে না? 

আলোচনার শুরুতে বলেছিলাম, সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক লেনদেন মানুষের মাঝে পারস্পরিক যোগাযোগের পরিমাণ ম্লান করছে ‘নিজস্ব’ চর্চাগুলোকে। বাঙালি নাকি ‘আদিবাসী’ অথবা বাঙালি এই দ্বিধায় তৈরি হয় জটিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিন্যাস। কোন গোষ্ঠীতে দৃঢ়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হবার চেতনা এবং তৎসংক্রান্ত অনন্যতার বোধ অনেকক্ষেত্রে অন্যান্য গোষ্ঠীর সঙ্গে দূরত্ব ও পার্থক্যের অনুভূতি বহন করে আনে (সেন, ২০০৬)। আর এই অনুভূতি যে অসম মানব-ব্যবস্থা সৃষ্টি করছে তার পরিণাম পরিলক্ষিত হয় বর্তমান সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষ এবং দাঙ্গায়। মানুষের মাঝে সৃষ্টি করে সংকোচনের এক অনুভূতি চর্চা যা ‘নিজ’ ‘অপরের’ বাইনারি অবস্থানে ইন্ধন জোগায় অসমতার। অমর্ত্য সেন তার এক বক্তব্যে বলেন, ‘নির্দিষ্ট আত্মপরিচয় একই সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের দৃঢ়তা ও উষ্ণতা সৃষ্টির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। সুনির্দিষ্ট পরিচয়বোধ অনেককে সৌহার্দ্যের কাছে টানার সময়ে আবার অন্য অনেককে সবলে দূরে সরিয়ে দেয়।’ অর্থাৎ, আত্মপরিচয় গঠনের প্রক্রিয়ার মাঝে যে বিষয়গুলো নিহিত থাকে তা সামাজিক মানুষ হিসেবে বিন্যস্ত করে ঠিকই কিন্তু, স্বকীয়তার চর্চায় যখন অধীনস্থ কিংবা অধস্তনতার বিষয় উঠে আসে তখন তা তৈরি করে আত্মপরিচয়ের সংকটের। তৈরি হয় সংখ্যালঘিষ্ঠ এবং গরিষ্ঠের লড়াই। এবং সৃষ্টি হয় সাম্প্রদায়িক অস্থিতিশীলতা। আত্মপরিচয়ের সংকট এর গঠনেই নিহিত থাকে। সামাজিক চর্চা এটিকে এমন এক স্থানে নিয়ে যায়, যেখানে পরিচয়ের ক্ষেত্রে যুক্ত হয় সংখ্যা, আধিপত্য এবং বুদ্ধিবৃত্তিক শক্তি, যা পরিচয়ের স্বাচ্ছন্দ্যতাকে হারিয়ে ফেলে প্রয়োজনের গোলক ধাঁধায়। যে অদৃশ্য কাঠামো ভিত্তিক নিপীড়ন হচ্ছে এবং তা নানান আঙ্গিকে বৈষম্যকে আরো গাঢ় করছে, সেই প্রেক্ষাপটে, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কি উচিত না সমাজ ব্যবস্থার কাঠামোকে বিনির্মাণের জন্য নিজেকে তৈরি করা? এবং সেই সকল আত্মপরিচয়ের সংকটে থাকা মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো? ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুলের একজন তাত্ত্বিক এবং দার্শনিক এরিক ফর্ম আত্মপরিচয় প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘Many individuals die before they have been born.’ সামাজিক পরিচয়ের ক্ষেত্রেও কি কথাটা একইভাবে প্রযোজ্য নয়? বিস্তৃত সামাজিক পরিচয়ের ব্যাপ্তিতে যদি স্বাচ্ছ্যন্দের পরিচয় লোপ পেয়ে একটি সমাজ বা গোষ্ঠীর আত্মপরিচয় সংকট ক্রমেই তা প্রতিষ্ঠা করে অস্থিতিশীলতার। পরিচয়ের সংকট যদি স্বাচ্ছন্দ্য দ্বারা বেষ্টিত থাকে তবে প্রাথমিকভাবে করণীয় হিসেবে মানবিক চর্চার বিকাশের পথ চিহ্নিত করে তা উন্মুক্ত করতে পারলে হয়তো অস্থিতীশীল সামাজিক অবস্থায় পরিবর্তন আসবে। দুই বা ততোধিক পরিচয় বহিঃপ্রকাশের ভাষায় ‘অথবা’ এর স্থানে ‘এবং’ এর অবস্থান কি তবে আত্মপরিচয়ের সংকটের ভয়াবহতাকে ম্লান করতে পারে না? 

প্রভাষক, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ (আইইউবি) 

তথ্যসূত্র: 

১। Fearon, J. D. (1999). What is identity (as we now use the word). Unpublished manuscript, Stanford University, Stanford, Calif.

২। Golubović, Z. (2011). An anthropological conceptualisation of identity. Synthesis philosophica, 26(1), 25-43.

৩। Myers, M. D., & Klein, H. K. (2011). A set of principles for conducting critical research in information systems. MIS quarterly, 35(1).

৪। Sen, A. (2007). Identity and violence: The illusion of destiny. Penguin Books India.

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ