ভিআইপি-কর্মকর্তা-কর্মচারী

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:১৬, আগস্ট ১০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৮, আগস্ট ১০, ২০১৯

আমীন আল রশীদভিআইপি নিয়ে বিতর্ক এবং আলোচনার ফাঁকে বোধ করি ‘কর্মকর্তা’ ও ‘কর্মচারী’ শব্দ দুটি আড়ালে পড়ে যাচ্ছে কিংবা সবাই হয়তো বিষয়টায় নজর দিচ্ছেন না।
মাদারীপুরের কাঁঠালবাড়ি ফেরিঘাটে সরকারের একজন যুগ্মসচিবের জন্য ফেরি ছাড়তে বিলম্ব হওয়ায় অ্যাম্বুলেন্সে থাকা একজন মুমূর্ষুর মৃত্যুর পর সারা দেশেই ভিআইপি বিড়ম্বনার কড়া সমালোচনা শুরু হয়। সরকারের তরফে একাধিক কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন হয়। তদন্ত কমিটির লোকেরা ভুক্তভোগী পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে খোদ হাইকোর্ট নির্দেশনা দিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ ভিআইপি নন। এর দিন কয়েক বাদে ৫ আগস্ট রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে সেতুমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলেছেন, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়া কেউ নিজেকে ভিআইপি দাবি করলেও তিনি বা তারা যেন রাস্তায় উল্টো পথে চলতে না পারেন। পরিহাস হলো, যেদিন তিনি এই পরামর্শ বা নির্দেশ দিলেন, সেদিন রাত পৌনে নয়টার দিকে রাজধানীর কাঁটাবন মোড়ে দীর্ঘ সময় জ্যামে বসে থেকেছি। একটার পর একটা সিগন্যালের সময় পার হয়েছে। কিন্তু ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি ছাড়েনি। অনেকক্ষণ পরে দেখা গেলো, পুলিশের একজন ঊর্ধতন কর্মকর্তা প্রটোকল নিয়ে ওই রাস্তা দিয়ে চলে গেলেন এবং এরপরে সিগন্যাল ছাড়া হলো। সুতরাং ভিআইপিদের হাত থেকে যে আমাদের দ্রুত মুক্তি নেই, সেটা পরিষ্কার।

আসল প্রসঙ্গে আসা যাক। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী সরকারে চাকরিজীবীদের সবাই ‘কর্মচারী’। কোথাও ‘কর্মকর্তা’ শব্দটি নেই। কিন্তু একজন জেলা প্রশাসককে ‘কর্মচারী’ বললে তিনি নিশ্চয়ই চটে যাবেন। এমনকি দ্বিতীয় শ্রেণির কোনও কর্মচারীও নিজেকে কর্মকর্তা বলেন। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মীদের ক্ষেত্রেই কেবল কর্মচারী শব্দটি ব্যবহৃত হয়। ২০১৮ সালে যে সরকারি চাকরি আইন করা হয়, সেখানেও লেখা হয়েছে ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কর্মচারী’। অর্থাৎ ‘কর্মকর্তা’ বলে কোনও শব্দ নেই। প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের এই কর্মচারীরা কখন থেকে কর্মকর্তা হলেন?

সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সব সময়ে জনগণের সেবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য। এই বিধানের আলোকে ২০১৮ সালে সরকারি কর্মচারী আইনটি করা হয়, যার প্রথম অধ্যায়ের ১৬ ধারায়ও ‘সরকারি কর্মচারী’ অর্থ লেখা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তি।

সংবিধানের ৪৬ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনও ব্যক্তি’ বা অন্য কোনও ব্যক্তি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যেকোনও অঞ্চলে শৃঙ্খলা-রক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোনও কার্য করিয়া থাকিলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করিতে পারিবেন।

১২০ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশনের ওপর ন্যস্ত দায়িত্ব পালনের জন্য যেরূপ ‘কর্মচারী’র প্রয়োজন হইবে, নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করিলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেইরূপ কর্মচারী প্রদানের ব্যবস্থা করিবেন। 

১৩৪ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তি’ রাষ্ট্রপতির সন্তোষানুযায়ী সময়সীমা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল থাকিবেন।     

সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদ—যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা রয়েছে, সেখানেও ‘সরকারি কর্মচারী’ অর্থ লেখা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে বেতনাদিযুক্ত পদে অধিষ্ঠিত বা কর্মরত কোনো ব্যক্তি’। এখানেও ‘কর্মকর্তা’ শব্দটি নেই। কিন্তু সংবিধানের ইংরেজি ভার্সনে ১৫২ অনুচ্ছেদে সরকারি কর্মচারীর ইংরেজি লেখা হয়েছে Public officer, যদিও সংবিধানের অন্যান্য অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে Staff, Servant ইত্যাদি। সংবিধানের বাংলা ও ইংরেজির মধ্যে এরকম কিছু বিভ্রান্তি মাঝেমধ্যে হয়। যেমন ৫৯ অনুচ্ছেদে Local government-এর বাংলা লেখা হয়েছে ‘স্থানীয় শাসন’। সংবিধান অবশ্য এই সমস্যার সমাধানও দিয়েছে ১৫৩ অনুচ্ছেদে এই বলে, বাংলা ও ইংরেজি পাঠের মধ্যে বিরোধের ক্ষেত্রে বাংলা পাঠ প্রাধান্য পাবে। সুতরাং বাংলায় যেহেতু ‘সরকারি কর্মকর্তা’ বলে সংবিধানে কিছু নেই, অতএব সরকারি কাজে নিয়োজিত ব্যক্তিরা সরকারের বা রাষ্ট্রের তথা জনগণের কর্মচারী—এটিই সিদ্ধ।

সংবিধান ও আইনের কোথাও যেখানে কর্মকর্তা বলে কোনো শব্দে নেই, সেখানে সরকারের কর্মচারীরা কীভাবে এবং কোন এখতিয়ারে নিজেদের ‘কর্মকর্তা’ বলে দাবি করেন এবং উল্লেখ করেন—সেই প্রশ্নটিই এখন তোলা দরকার।

২.

ভিআইপি-কর্মকর্তা ও কর্মচারী বিষয়ক এই তর্কের ভেতরেই গণমাধ্যমের একটি সংবাদে চোখ আটকে গেলো। ওই সচিত্র প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের শিমুলিয়ায় চারটি ঘাটের মধ্যে একটি ঘাটের নাম ‘ভিআইপি’। কোনও ঝামেলা ছাড়া ‘ভিআইপি’ বা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা যাতে সহজে পারাপার হতে পারেন, সেজন্য এই ঘাটটি সংরক্ষিত।

সাংবাদিকদের কাছে এর একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) শিমুলিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) আবদুল আলীম এভাবে। তিনি বলেন, ‘চার নম্বর ঘাটের নাম ভিআইপি হওয়ার কারণ, এ ঘাটে ফরিদপুর, কর্ণফুলী ও কুমিল্লা ছাড়া অন্য ফেরি ভেড়ানো যায় না। আবার এখানে বড় পণ্যবাহী যান উঠতে গেলে পন্টুনের ক্ষতি হয়, সেজন্য ছোট গাড়ি এ ঘাটে পারাপার হয়।’

তিনি স্বীকার করেন, ফেরি পারাপারে ভিআইপিদের সন্তুষ্ট করতে না পারলে তাদের বিভিন্ন সমস্যায় পড়তে হয়। ভিআইপি পারাপারে ব্যর্থ হওয়ায় বিআইডব্লিউটিসির শিমুলিয়া ঘাটের সদ্য সাবেক উপমহাব্যবস্থাপক শাহ মো. বরকতউল্লাহকে বদলি করা হয়েছে বলেও তিনি জানান।

কথা হচ্ছে, রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা কিছু জায়গায় বিশেষ সুবিধা বা ছাড় পান। অনেক সময় রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ কাজ এবং তাদের নিরাপত্তার জন্যও এটা প্রয়োজন হয়। কিন্তু এ ধরনের পরিস্থিতি কখন তৈরি হয় এবং প্রশাসনের কোন স্তরের লোকেরা এই বিশেষ সুবিধা কখন ও কতটুকু পাবেন, তার সুনির্দিষ্ট কোনও নীতিমালা নেই। ১৯৮৬ সালে সরকারের জারি করা ‘ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স’ বলে একটা জিনিস আছে যেখানে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পদের পদক্রম উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু সেটি সাধারণত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কে কোন সারিতে কার আগে-পরে বসবেন, সেক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। এই তালিকার প্রথম তিনজন হচ্ছেন যথাক্রমে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার। আর সর্বশেষ অর্থাৎ ২৫ নম্বরে আছেন সরকারের উপসচিব, প্রথম শ্রেণির পৌরসভার নির্বাচিত চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, সিভিল সার্জন, সেনাবাহিনী-নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর মেজর পদমর্যাদার লোক এবং পুলিশ সুপার।

সমস্যা হলো, যখন সবাই গণহারে নিজেদের ভিআইপি বা অতিগুরুত্বপূর্ণ বলে ভাবা শুরু করেন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই ক্ষমতার চর্চা করেন, তখন এটা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, বিতর্কিত হয়। কখনো-সখনো সরকারের দ্বিতীয় তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারীদের দাপটেও সাধারণ মানুষ অস্থির হয়ে যায়। বিভিন্ন সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে গেলে একজন পিয়ন বা এরকম চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীও নাগরিকদের সঙ্গে যে আচরণ করেন, তাতে অনেক সময় এটি বোঝা যায় না কে কার কর্মচারী।

বস্তুত আমাদের দেশের সরকারি কর্মচারীদের অধিকাংশই চান আলাদা গুরুত্ব, আলাদা মর্যাদা, বাড়তি সুযোগ-সুবিধা। কিন্তু এই বাড়তি মর্যাদা ও সুযোগ-সুবিধা ভোগ করতে গিয়ে রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ, তারাই বরং বিপদে পড়ে। কর্মচারীরা নিজেদের কর্মকর্তা এবং ভিআইপি মনে করে তাদের বেতন হয় যে জনগণের করের পয়সায়, সেই জনগণকেই কর্মচারী ভাবতে শুরু করেন। সুতরাং সরকারি কর্মচারীদের মনে যতক্ষণ না এই বোধ তৈরি হচ্ছে, তারা জনগণের সেবক এবং সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সব সময়ে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা তাদের কর্তব্য—ততক্ষণ ফেরিঘাটে কথিত ভিআইপির অপেক্ষায় থেকে অ্যাম্বুলেন্সে মুমূর্ষু রোগীর মৃত্যু বন্ধ করা যাবে না। বরং এরকম ঘটনা ঘটবে এবং কিছুদিন এ নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় বইবে এবং নতুন ইস্যু এলে মানুষ এটা ভুলে যাবে।

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর।

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ