ঈদ হোক ভালো আশার এবং ভালোবাসার...

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:৪২, আগস্ট ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৫, আগস্ট ১৭, ২০১৯

রেজানুর রহমানএকজন যুবক। মাথায় বিপ্লবীদের স্টাইলে জাতীয় পতাকা বেঁধেছে। তার কপাল বরাবর জাতীয় পতাকার লাল অংশটি জ্বলজ্বল করছে। দুই হাতে ছোট বড় চারটি ফেস্টুন। একটিতে লেখা ‘ট্রেনে অপরিচিত কারও খাওয়া খাবেন না’। অন্যটিতে লেখা ‘যাত্রাপথে সতর্ক হোন, ঈদের আনন্দ যেন বেদনার না হয়। আরেকটিতে লেখা ‘সাবধানের মার নাই। একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। শেষটিতে লেখা ‘সাবধানে রাখুন মোবাইল ও মানিব্যাগ। যুবকটি কমলাপুর রেলস্টেশনে একটি প্ল্যাটফর্মে ফেস্টুনগুলো হাতে ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো যাত্রীর ভিড়ে স্টেশনে একদণ্ড দাঁড়িয়ে থাকাই মুশকিল। এ অবস্থায় অনেকেই তার ফেস্টুনের দিকে তাকানোর ফুরসতই পাচ্ছে না। যারা ফেস্টুনের দিকে চোখ ফেলার সুযোগ পাচ্ছেন তারা যেন গুরুত্বহীন ভঙ্গিতে ফেস্টুনের লেখাগুলো পড়ে ফেলছেন। ভাবটা এমন, এসব কথা তো আমাদের জানা। কী দরকার বাপু ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে এসব কথা মনে করিয়ে দেওয়ার? সাহায্য-টাহায্য চায় নাকি? অথবা হিরো হওয়ার শখ। আজকাল তো আবার ফেসবুকের যুগ। ভালোমন্দ একটা কিছু ছেড়ে দিলেই লাইক কমেন্টেসের হিড়িক পড়ে যায়। নিমিষেই হিরো হওয়া যায়। যুবকটির সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম। নাম ঠিকানা জিজ্ঞেস করতেই বিনীত হয়ে বললো, প্লিজ আমার নাম, ঠিকানা জিজ্ঞেস করবেন না। নিজের নাম ফুটানোর জন্য আমি এই উদ্যোগ নেইনি। ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষ যেন একটু সচেতন হয় সেজন্যই আমার এই উদ্যোগ। অনেকেই পাশ দিয়ে যাওয়ার আসার সময় আমাকে দেখে হাসাহাসি করছেন। নানান মন্তব্য করছেন। এতে আমার কিছুই যায় আসে না। আমার এই উদ্যোগের ফলে ঈদযাত্রায় একজন মানুষও যদি সচেতন হয় সেটাই বা কম কী?

মনে মনে ভাবলাম ছেলের সাহস আছে বটে। এ কথা তো সত্য, আমরা অনেক কিছুই জানি কিন্তু জানা বিষয়টাও মানি না। স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছি। বৃষ্টি হচ্ছিল। একটা ট্রেন চলে গেলো। ট্রেনের ছাদের ওপর অনেক মানুষ। বৃষ্টিতে কাজভেজা হয়েই মানুষগুলো ট্রেনের ছাদে চড়ে বাড়ি ফিরছে। আহারে ওরা কী নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাবে? যুবকটির হাতে ধরা ফেস্টুনের একটি বক্তব্য চোখের সামনে ভেসে উঠলো– ‘যাত্রাপথে সতর্ক হোন। ঈদের আনন্দ যেন বেদনার না হয়।’ উপদেশটা তো ফেলে দেওয়ার মতো নয়। যাত্রাপথে একটু সতর্ক হলেই তো অনেক দুর্ঘটনার হাত থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব। কিন্তু কে শোনে কার কথা। সুসময়ে কোনও উপদেশই কারও ভালো লাগে না। কিন্তু দুঃসময়ে মনে হয়, আহারে যদি কথাগুলো মানতাম, যদি ট্রেনের ছাদে না উঠতাম, বাসে ঝুলে না যেতাম, ড্রাইভারকে জোরে বাস চালানোর জন্য হুমকি ধমকি না দিতাম তাহলে তো কোনও দুর্ঘটনাই হতো না। চোর পালালেই আমাদের বুদ্ধি বাড়ে। তখন মনে মনে কত কথাই না ভাবি।

ট্রেনে অপরিচিত কারও খাওয়া খাবেন না। যুবকের হাতে ধরা ফেস্টুনের এই কথাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ। বাসে অথবা ট্রেনে যাত্রা করার সময় অপরিচিতদের দেওয়া খাবার খেলে কী হয় তার একটি বাস্তব ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরি। এক ভদ্রলোক ট্রেনে চড়ে ঢাকার বাইরে যাচ্ছেন। তার পাশের সিটে বসেছেন একজন বয়স্ক লোক। মুখে হাসি, অমায়িক চেহারা। ভদ্রলোকের সঙ্গে বন্ধুর মতোই কথাবার্তা শুরু করে দিলেন। একথা সেকথা... কত যে কথা বলছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনের বন্ধুত্ব হয়ে গেলো। কথায় কথায় একসময় বয়স্ক লোকটি তার ব্যাগ থেকে একটি টিফিন বাটি বের করলেন। বাটির ভেতর নারকেলের নাড়ু রাখা আছে। বয়স্ক লোকটি বললেন, তার মায়ের হাতে বানানো এই নারকেলের নাড়ু খেতে বেশ মজা। নারকেলের নাড়ু বলে কথা। দু’জনই বেশ মজা করে নারকেলের নাড়ু খেতে লাগলেন। ট্রেন চলছে। হঠাৎ ট্রেনের ঝাঁকুনিতে ভদ্রলোকের তন্দ্রা কেটে গেলো। নারকেলের নাড়ু খেয়ে তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়েছিলেন। এই সুযোগে বয়স্ক লোকটি যা করার তা-ই করেছে। ভদ্রলোকের মানিব্যাগ আর মোবাইল ফোন নিয়ে চম্পট দিয়েছে। পাঠক, এবার বুঝলেন তো অপরিচিত লোকের দেওয়া খাবার খেলে কী ধরনের ঝামেলা হতে পারে?

অনেকেই যাত্রাপথে মোবাইল ও মানিব্যাগ যত্নে রাখতে ভুলে যান। হয়তো দেখা গেলো বাস অথবা ট্রেনের মধ্যেই কেউ একজন মোবাইল চাইলো, ভাই বিপদে পড়েছি। একটা জরুরি কল করা দরকার। আমার মোবাইলে ব্যালেন্স নেই। শুধুমাত্র একটা জরুরি কল করবো... কারও এমন আকুতিতেও আপনি গলে গেলেন তো ফেঁসে গেলেন। তার মানে সবাই যে এমন দুষ্টু প্রকৃতিরই হবে এমন কোনও কথা নেই। তবুও সচেতন থাকা ভালো। কথায় আছে না, সাবধানের মার নেই। ঈদযাত্রায় কথাটি মনে রাখলেই সম্ভাব্য অনেক ঝামেলা এড়ানো সম্ভব।

এ কথা তো সত্য, এবার একটু অস্থিরতার মাঝেই পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হচ্ছে। ঢাকাসহ সারাদেশে ডেঙ্গু আতঙ্ক রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। তাই বলে তো আর উৎসব আনন্দ থেমে থাকবে না। বানভাসি মানুষরাও ঈদে আনন্দ করবে। হয়তো দেখা যাবে বন্যাকবলিত অনেক এলাকায় এক চিলতে শুকনো জায়গায় পবিত্র ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হবে। এটা হলো সময়ের দাবি। সময় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঠেকানো মুশকিল। সময়ের কাজ সময় করবেই। বন্যা হবে। ঝড় হবে। রোগ-ব্যাধি ছড়াবে। এটা হলো সময়ের কাজ। একইভাবে মানুষের কাজ মানুষের পক্ষেও করা সম্ভব। সেটা কীভাবে? কাজটাই বা কী? কাজটা হলো ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই মানবিক সত্যটিকে প্রতিষ্ঠিত করা।

আবারও কমলাপুর রেলস্টেশনে ফেস্টুন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ওই যুবকের কথা উল্লেখ করতে চাই। সে এককভাবে কিছু উপলব্ধির কথা জানিয়ে দিয়েছে। আমরা যারা নাড়ির টানে গ্রামে যাচ্ছি তারা ওই যুবকের কাছ থেকে কিছুটা হলেও প্রেরণা পেতে পারি।

ঈদের আনন্দ করতেই তো গ্রামে যাচ্ছি। অনেকেই পশু কোরবানি দেবো। কিন্তু কোরবানির প্রকৃত নিয়ম জানি কি আমরা? আবার জানলেও মানি কি? জবাইকৃত পশুর মাংসের একটি অংশ দুস্থদের মাঝে বিলিয়ে দিতে হয়। এটাই নিয়ম। অথচ অনেকেই এই নিয়ম মানেন না। কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রির অর্থ গরিব, এতিমদের প্রাপ্য। এই নিয়মটাও আমরা অনেক হাদিস মেনে অনুসরণ করি না। ঈদ মানেই আনন্দ। তার মানে আপনার পরিবারের একার আনন্দ নয়। প্রতিবেশীদের দিকেও খেয়াল রাখা কর্তব্য। অনেকেই তা করি না। ঈদে কষ্ট করে গ্রামের বাড়ি যাই। ত্যাগ নয়, প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে অনেকে পশু কোরবানি দেই। পাশের বাড়ির অসহায় দুস্থ পরিবারটির খোঁজও রাখি না। ধর্মীয় বিধানে এভাবে পবিত্র ঈদ উদযাপনের কথা বলা হয়নি। কাজেই ধর্মীয় বিধান মেনে ঈদ উদযাপনের ব্যাপারে আমাদের সচেতন থাকা জরুরি।

ঈদে যারা গ্রামের বাড়িতে যান তাদের অনেককেই দেখা যায় মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকতে। সারাক্ষণ ফেসবুকে হাতাহাতি চলে। অথচ ফেসবুকে ব্যস্ত না থেকে এলাকার মানুষজনের সঙ্গে মতবিনিময় করা উচিত। তরুণেরা এ ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ঈদের ছুটিতে গ্রামে এসে শুধুই ঘোরাঘুরি না করে, দলবদ্ধ প্রক্রিয়ায় স্বাস্থ্য ও সামাজিক সমস্যা থেকে উত্তরণের ব্যাপারে মোটিভেশনাল উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। বর্তমান সময়ের ভয়াবহ আতঙ্ক ডেঙ্গু থেকে উত্তরণের উপায় নিয়েও মোটিভেশনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সেই সঙ্গে আরও একটি উদ্যোগ নিতে পারি আমরা। আজকাল গ্রামাঞ্চলেও সাধারণ মানুষের মধ্যেও বিদেশি টিভি চ্যানেলের অনুষ্ঠানের প্রতি ব্যাপক ঝোঁক দেখা দিয়েছে। আমাদের দেশের ৩০টি টিভি চ্যানেল প্রতিবারের মতো এবারও ব্যাপক অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করেছে। কাজেই আমরা সবাইকে দেশের টেলিভিশনের অনুষ্ঠান দেখার ব্যাপারেও পরামর্শ দিতে পারি। সবই নির্ভর করছে দেশাত্মবোধের ওপর।

প্রিয় মাতৃভূমিকে আমরা সবাই ভালোবাসি। কিন্তু ভালোবাসার কথা শুধু মুখে বললে হবে না। করেও দেখাতে হবে। আসুন, এই ঈদে ভালোবাসার কথা বলি। দেশের প্রতি ভালোবাসা। প্রিয় পাঠক, ঈদ মোবারক। ভালো থাকবেন সকলে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক-নাট্যকার, সম্পাদক: আনন্দ আলো

এমওএফ

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ