তবুও ঈদ আসে

Send
বিধান রিবেরু
প্রকাশিত : ১৩:১৯, আগস্ট ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২৬, আগস্ট ১৭, ২০১৯

বিধান রিবেরুমানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন লক্ষ্য ও উপলক্ষের প্রয়োজন হয়, তেমনি আনন্দ ও উৎসবেরও প্রয়োজন হয়—শত ব্যথা, বেদনা, বিপদ, বিপত্তি, বঞ্চনা, বৈষম্য সঙ্গী করেও। নয়তো মানুষ ঈদ উদযাপন করবে কেন? ঈদ পালনে ধর্মীয় কারণ নিশ্চয় আছে, এর পাশাপাশি সামাজিক কারণও আছে। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে আছে জীবনে আনন্দ যোগ করা। মানুষ শুধু ব্যথা-বেদনা নিয়ে বাঁচতে পারে না, বাঁচতে চায়ও না। এ কারণেই ছয় ঘণ্টার যাত্রাপথ ২৬ ঘণ্টার নারকীয় অভিজ্ঞতা হয়ে উঠলেও মানুষ বাড়ি পৌঁছে ঈদ উদযাপন করে স্বর্গীয় সুখ নিয়ে।
কারও বেতন ভাতা হয়নি, কারও হয়তো বেতনটাই অতি অল্প, তারপরও যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী উনুনে খাবার চাপানো হয়, পরিবারের ছোট সদস্যদের জন্য কেনা হয় নতুন জামা। আর  যারা বেকার, নিজের শ্রম বিক্রি করতে পারেনি, কাজের সন্ধানে যাদের এদিক-সেদিক ছুটে বেড়াতে হয়, যারা শারীরিকভাবে পঙ্গু, কার্লমার্কসের জবানিতে যারা সমাজের আপাত উদ্বৃত্ত, তারাও ঈদের আনন্দে শামিল হয়। তবে সেজন্য তাদের চেয়ে থাকতে হয় সমাজের উঁচু তলার মানুষের দিকে। সেখান থেকে আসা অবশিষ্ট দিয়েই তারা ঈদকে আনন্দময় করে তোলে।
যারা সমাজের একেবারে তলানিতে অবস্থান করে ভবঘুরে, ভিক্ষুক, বেশ্যা, ফ্রানৎস ফানোঁর দৃষ্টিতে যারা ইঁদুরের মতো বেঁচে থাকে সমাজে, তারা জীবনের সব ভাঁড়ার থেকে কিছুটা চুরি করে বাঁচতে চায়, ঈদকে উপলক্ষ করে তারাও ভালোমন্দের মাঝে নিজেদের টিকে থাকাকে অর্থবহ করতে চায়।

বাংলাদেশ এখন ডেঙ্গু আতঙ্কে জর্জরিত, যাদের পরিবার ডেঙ্গুর কারণে মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছে ঈদ এসেছে সেই পরিবারেও। তবে আর ১০টা ঈদের মতো ঝলমলে নয় সেই আসা, এই আসা অনেকটাই ম্লান। তারপরও তো এসেছে। প্রিয় মানুষের বিয়োগ সত্ত্বেও তারা ভাববে আজ ঈদ! কিছু দিন আগেই উত্তরাঞ্চলে বেনোজল ধুয়ে মুছে দিয়ে গেছে জীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্য। সেখানেও ঈদ এসেছে।

ঈদ এসেছে সেই পরিবারেও, যেখানে ধর্ষণের শিকার হয়েছে সবার স্নেহের মেয়েটি, অথবা শুধু শ্লীলতাহানি নয়, পুড়িয়ে মারা হয়েছে যাকে। অথচ তারা ক্ষমতা ও প্রভাবের কাছে অসহায়, ন্যায়বিচার তারা পাচ্ছে না। বিচারের বাণী নিভৃতে আর কাঁদে না, বরং উচ্চ স্বরে উপহাস করে তাদের। তারপরও ঈদ এসেছে। তারাও হয়তো বেদনাকে চেপে ধরে দিনটি কাটিয়ে দেবে।

কিংবা ধরুন, সেই মেয়েটি, যে তার বাবাকে হত্যা করতে শুনেছে নিজ কানে, তার জীবনেও আজ ঈদ এসেছে। তার ঈদ অন্য পরিবারের আদুরে মেয়েটির মতো করে আসেনি। সেই ছেলেটির জীবনেও ঈদ এসেছে, সেও আনন্দে শামিল হবে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে সে জানে তার সাংবাদিক বাবা-মাকে কে বা কারা নৃশংসভাবে খুন করে গেছে, সেটি আজ অবধি জানা যায়নি, কখনও যাবে কিনা, সেটাও সে জানে না।

ঈদ এসেছে কাশ্মীরেও। ঈদের প্রাক্কালে যাদের সাংবিধানিক বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নেওয়া হয়েছে। এমনকি খোদ একটি রাজ্যই বিলুপ্ত করে দেওয়া হয়েছে। এর পেছনের ইতিহাস আরও করুণ ও পরাধীনতার। একই কান্না অশ্রু হয়ে গড়িয়ে পড়ে ফিলিস্তিন অথবা সিরিয়ায়। তারপরও ঈদ আসে। মানুষ তাতে শামিল হয়। কারণ, মানুষ শুধু হত্যা, গুম, ধর্ষণ, পরাধীনতা, রাজনৈতিক অধিকার হরণ ও শঠতার শিকার হয়ে বাঁচতে পারে না। মানুষের চাই আনন্দ উদযাপনের উপলক্ষ।

পরিহাসের বিষয়, সমাজে যারা দুর্নীতি, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও অন্যের দুঃখ-দুর্দশার জন্য দায়ী, তারাও ঈদ উদযাপন করে। বেশ সাড়ম্বরেই করে। ঈদ তাদের কাছে, নিজেদের অপরাধ ঢেকে রেখে, ক্ষণিকের আনন্দে ভেসে যাওয়ার উপলক্ষ মাত্র। তারা ঈদুল আজহায় ঘটা করে পশু জবাই করে ঠিকই, কিন্তু মনের পশুকে তারা জিইয়ে রাখে, তাকে নিয়মিত খড়-বিচালি খেতে দেয়, হৃষ্টপুষ্ট করে তোলে। কিন্তু তারা বুঝতেই পারে না, এই মনের পশুই একদিন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন হয়ে উঠবে। তবে তার আগ পর্যন্ত সমাজের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ঈদ আসতে থাকবে দুঃখ ও বেদনাকে সঙ্গী করেই।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

/এপিএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ