‘ফেনায়িত’ আনুগত্য

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:০৯, আগস্ট ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১০, আগস্ট ১৭, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহঈদের ছুটিতে অফিস পাড়ার কফি’র দোকানে নির্জনতা খুঁজে পাওয়া যায়। ভর দুপুরের নির্জনতা কফির রঙের মতোই গাঢ় হয়ে হয়ে ওঠে। তেমনি এক নির্জন দুপুরে একলা বসেছিলাম কফি মগ হাতে। পুরনো কফির দোকান। তিন দশকের বয়সের বলিরেখা দোকানের শরীরজুড়ে। তারই টানে হয়তো পুরনো মানুষেরা এসে বসে। যতটা কফি মগে চুমুক রাখে, তার চেয়ে বেশি নিমজ্জিত হয় স্মৃতির গভীরতায়। এমন নিমজ্জন কালেই টেবিলের মুখোমুখি এসে বসলেন পুরনো একমুখ। কতদিন পর। যোগাযোগহীন, কিন্তু মুখচিত্রের বদল হয়নি তেমন। চুলে শারদীয় ফুলের আভাস। চোখের তীক্ষ্ণতা আগের মতোই। অর্ডার না করতেই কালো ফেনায়িত কফির মগ উপস্থিত তার সামনে। তিনি কফি মগ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখলেন। তারপর বললেন—ওরাই বদলায় নাই বুঝলেন। কফি মগ তো দেখি আগের মতোই আছে। খুঁজলে ঠোঁটের পুরনো স্পর্শও পেয়ে যেতে পারি। তারপর চামচ দিয়ে কফির ওপরের ফেনা তুলে ফেলতে ফেলতে বলে—বুঝলেন আমাদের রাজনীতি এমন ফেনায় ভরে গেছে। এখনকার রাজনীতিতে দেখেন মগের মধ্যে কালো কফি খুঁজে পাবেন না। সব বাষ্প হয়ে উড়ে গেছে। মগভর্তি শুধু ফেনা। এরাই সরকারি দলের দুধ-চিনি খেয়ে নিচ্ছে। তাদের চেয়ে বড় আওয়ামী লীগ প্রেমিক দুনিয়ায় নাই। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করবে এমন চওড়া বুক তাদেরই। এই ফেনাগুলো কিন্তু মগের দখল নেবার জন্যই রূপ, মুখোশ পাল্টে ফেলেছে। এদের দরকার পদ, এদের দরকার ব্যবসা, চাকরি ও রুজির সুরক্ষা। অদক্ষ ও অযোগ্য বলেই এদের মাতম বেশি।

এখন যারা বঙ্গবন্ধু এবং তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার জন্য গগন কাঁপাচ্ছে তাদের কয়জন ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই মাতম দেখিয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী নেতাদের অবস্থান এবং চরিত্রও তো এতদিনে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। ৫৬ হাজার বর্গমাইলে সবাই এখন আওয়ামী লীগ। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারক প্রকৃত নেতাকর্মীরা অনুপস্থিত। তারা কোণঠাসা, বঞ্চিত। দলের জয়ের বাদ্য বাজানোর ঢোল যাদের হাতে, তারা কয়জনের আওয়ামী লীগের প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্য আছে? রাজনীতিতে জোয়ার-ভাটা আছে। এরা জোয়ারের ঝাঁকের কই। ভাটায় এদের পাবেন না।

এক মগ কফিতে ওনার হলো না। তিনি আরেক মগ চাইলেন। ফেনায়িত মগই এলো আবার। আগের ভঙ্গিতেই ফেনা পিরিচে রাখতে রাখতে বললেন, ‘জানেন, বিএনপি যখন ২০০১-এ ক্ষমতায় আসে, তখনও একই দৃশ্য দেখেছি। বিএনপির ত্যাগী নেতা, বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের দেখেছি কীভাবে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুধু ক্ষমতার বনরুটি খাওয়ার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছিল কত জিয়া বা খালেদার আদর্শের দাবিদার। পরবর্তী সময়ে বিএনপির সংকটকালে আর তাদের মাঠে পাওয়া যায়নি। রাজনৈতিক দল এবং তার নেতাকর্মীরা ক্ষমতা উপভোগ করবে যেমন, তেমনি ক্ষমতার বাইরে থাকার সময় দমন, পীড়ন মোকাবিলা করতে রাজনীতির মাঠের লড়াইতে সক্রিয় থাকবে। এটাই রাজনীতির স্বাভাবিক সূত্র। কিন্তু ১৯৯০ পরবর্তী, বিশেষ করে ২০০১ পরবর্তী সময়ে রাজনীতির এই সূত্র কাজ করছে না। কারণ রাজনীতিতে বহিরাগতদের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জাতীয় সংসদ, এই কাঠামোকে তারা করপোরেট বা ব্যবসায়িক বিনিয়োগের একটি খাত হিসেবে নিয়েছে। ফলে বেনিয়াদের পুঁজির কাছে হেরে যাচ্ছেন ত্যাগী, আদর্শপুষ্ট রাজনৈতিক কর্মী-নেতারা। প্রবীণদের এই পরাজয়ে নবীনরাও আর আদর্শের তিতা জলে ডুবতে রাজি নয়। তারাও ছুটছে ক্ষমতার বনরুটির দিকে। রাজনীতির কফির মগে উজ্জীবিত কালো কফি ক্রমশ নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। মগের দখল এখন ফেনায়িত আনুগত্যজীবীদের হাতে। সেই পরিচিত মুখ উঠে গেলেন সামনে থেকে।

কফির দোকানের ভেতর থেকে দেখলাম ফুটপাত ধরে ভ্রূক্ষেপহীন হেঁটে চলছেন তিনি। আমার কফির মগ শূন্য। তবে তৃষ্ণা মেটেনি। দ্বিধায় পড়ে গেলাম, মগের পুরোটা কি ফেনায় পূর্ণ ছিল?

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ