চামড়া বিপর্যয়: চিনে নেওয়া যাক আসল সিন্ডিকেট

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:১২, আগস্ট ১৭, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৩, আগস্ট ১৭, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানআচ্ছা এই ‘কুশীলব’ লোকটা কে? সে কীভাবে সব নাটকে থাকে? ছোটবেলায় বিটিভিতে নাটকের শেষে টাইটেল ওঠার সময় অভিনয় শিল্পীদের নামের ওপরে ‘কুশীলব’ শব্দটি দেখে তাকেও একজন মানুষ মনে করতাম। সময়ের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই এই ভুল ভাঙে। কথাটা মনে পড়লো একটা বিষয় দেখে—ইদানীং দেশে কোনও পণ্য নিয়ে কোনও অঘটন ঘটলে আমরা একটা শব্দ শুনছি ‘সিন্ডিকেট’। এখনও শৈশবে থাকলে মনে প্রশ্ন আসতোই—আচ্ছা, এই ‘সিন্ডিকেট’ ‘ব্যাটাটা’ কে? সব ঝামেলায় দেখি সে থাকে।
রমজানে জিনিসপত্রের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ে, আমরা বলি সিন্ডিকেট এটা করেছে। ধানের মৌসুমে বোরো ধানের দাম কৃষক পায় না, আমরা সেখানেও সিন্ডিকেটের কথা বলি। কিংবা কয়েক দিন আগে যখন চামড়া পানির দামেও বিক্রি করা যায়নি, তখনও আমরা অনেকেই সিন্ডিকেট দেখেছি। অনেকেই এই সিন্ডিকেটের পিণ্ডি চটকাচ্ছি, এবং এর সদস্যদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি। সরকারও ‘সাড়া’ দিয়েছে এই আবেদনে। সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক বলেছেন, কারা এর সঙ্গে জড়িত খতিয়ে দেখে মাত্রা অনুযায়ী শাস্তি দেওয়া হবে। তার এই কথা এক অসাধারণ কৌতুক। কেন সেটা, সেই আলোচনায় পরে আসছি।
এবারের কোরবানির ঈদে কাঁচা চামড়ার দামে বিপর্যয় ঘটেছে। এই বছর ঈদের চামড়ার দাম নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টের শিরোনাম ‘৩১ বছরের মধ্যে চামড়ার সর্বনিম্ন দাম’। খুবই মজার ব্যাপার, গত বছরও বাংলা ট্রিবিউন ঠিক একই সময়ে একই রকম রিপোর্টে বলেছিল ‘৩০ বছরের মধ্যে চামড়ার দাম সর্বনিম্ন’। অর্থনীতির বিবেচনায় এই শিরোনামগুলোর মধ্যে আসলে ভ্রান্তি আছে। চামড়ার দাম আসলে কতটা কমে গেছে, সেটি বোঝার জন্য মুদ্রাস্ফীতিও বিবেচনায় নেওয়া উচিত।

গত বছরের কথাই ধরা যাক। ৩০ বছর আগে যে চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল আর গত বছর যে চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়, মুদ্রাস্ফীতি হিসাব করলে গত বছরের দাম ৩০ বছরের তুলনায় কিছুই নয়—প্রায় মূল্যহীন। আর এবার যা হয়েছে সেটা নিয়ে একটা বাক্য ব্যয় করাও বাতুলতা।

গত বছর আমরা প্রায় সবাই খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখাইনি, কিন্তু এই বছর আমরা স্তম্ভিত, বিক্ষুব্ধ। আসলে স্তম্ভিত হওয়ার কোনও কারণ ছিল না, যদি আমরা চোখ-কান খোলা রাখতাম। এতই আত্মকেন্দ্রিক জীবনযাপন আমরা এখন করি যে, এসব খেয়াল করার সময় আমাদের কোথায়? 

গত বছরের পতন মাথায় রাখলে, সঙ্গে বাংলা ট্রিবিউনে এই ঈদের আগে প্রকাশিত একটা রিপোর্ট কেউ পড়লে খুব স্পষ্টভাবেই বুঝে যাওয়ার কথা এই বছর চামড়ার দাম নিয়ে কী হতে যাচ্ছে। চামড়া ব্যবসায়ী এবং ট্যানারি মালিকদের বক্তব্য নিয়ে সেই রিপোর্টটির একটা অংশ এরকম—‘আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়ার চাহিদা কমে গেছে। কমপ্লায়েন্সের কারণে বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন অনেক ক্রেতা। গত বছর কেনা চামড়ার ৫০ শতাংশ এখনও অব্যবহৃত রয়ে গেছে। নতুন চামড়া কেনার জন্য ব্যাংক থেকে পাওয়া ঋণও পর্যাপ্ত নয় বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।’ মোটামুটি একই ধরনের একটা বয়ান গত বছরও দেওয়া হয়েছিল।

ইনিয়ে বিনিয়ে বলা কথাগুলোর মানে বোঝা যায় খুব সহজেই—চামড়ার চাহিদা তেমন একটা নেই, সুতরাং অতিরিক্ত জোগানের ফলে দাম কমে যাবে। একজন মোটামুটি সচেতন মানুষই এই ব্যাপারটা আগেই বুঝে যাওয়ার কথা। অথচ আমাদের রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বসে থাকা মানুষগুলো কি এটা বুঝতে পারেনি?

এই বছর চামড়ার মূল্য আক্ষরিক অর্থেই শূন্য হয়ে গিয়েছিল। লাখ লাখ পিস চামড়া মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে, রাস্তায় কিংবা নদীতে ফেলা হয়েছে। এই বিপর্যয়ের কারণে খুব কম করে হিসাব করলেও অন্তত ৬০০ কোটি টাকা দরিদ্র মানুষের কাছে পৌঁছেনি। পরিস্থিতি যখন এই জায়গায় গেলো তখন সরকার ঘোষণা দিলো চামড়া রফতানি করা হবে। তবে এই সিদ্ধান্ত তখন এলো যখন চামড়া আর সাধারণ মানুষের হাতে নেই, চলে গেছে আড়তদার আর বড় ব্যবসায়ীদের হাতে। এখন চামড়ার মূল্য বৃদ্ধি হলে তার ফল কার কাছে যাবে সেটা জানার জন্য রকেট বিজ্ঞানী হতে হয় না। 

একটু পেছনে যাওয়া যাক। কিছুদিন আগেও বোরো ধানের দাম না পেয়ে প্রান্তিক কৃষকরা পথে বসেছিল। রাস্তায় ধান ছিটিয়ে, ধানের ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে প্রতিবাদে নেমেছিল তারা। কৃষকের রক্তের, ঘামের ধান মূল্য হারিয়ে আরও বেশি বড়লোক বানিয়েছিল চালকল, আড়তদার আর চাতালের মালিকদের। এখানেও তখন শোনা গেলো সিন্ডিকেটের কথা। তখনও দাবি উঠেছিল সিন্ডিকেটকে খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। 

চামড়ার চাহিদা নিয়ে ব্যবসায়ীরা বোঝাতে চেয়েছেন দেশে চামড়ার চাহিদা তেমন একটা নেই। এর দুটো ব্যাখ্যা থাকতে পারে। এক আসলেই তাদের বক্তব্য সঠিক, তাদের উল্লেখ করা কারণে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে কাঁচা চামড়ার চাহিদা সত্যিই কমে গেছে। আরেকটা হতে পারে এগুলো সব মিথ্যে অজুহাত—চামড়ার দামকে কৃত্রিমভাবে কমিয়ে ফেলার জন্যই এমন কথা তারা বলছেন। দুটোর যেটাই সত্য হোক না কেন সরকারের তো কথা ছিল ঈদের আগেই চামড়া রফতানির সিদ্ধান্ত দিয়ে চামড়ার দামের এই বিপর্যয় ঠেকানো। আমাদের দেশে কোনও সম্পদ যদি উদ্বৃত্ত হয় সেটা আমরা রফতানি করবই। অথবা এই বড় ব্যবসায়ীরা কারসাজি করে চামড়ার দামে পতন ঘটিয়ে দরিদ্র মানুষকে বঞ্চিত করার চেষ্টা রোধ করার জন্যও ঈদের আগে রফতানির সিদ্ধান্ত জরুরি ছিল। এটা দামকে একেবারে পড়ে যেতে দিতো না। কিন্তু সেটা সরকার করেনি।

ঠিক একইভাবে গত বোরো মৌসুমের সময়ও ধান কাটার আগে সরকার ধান-চালের সংগ্রহমূল্য সময়মতো ঘোষণা করেনি। তার ফলেই আসলে ধানের দাম এতটা পড়ে গিয়েছিল। এবার চামড়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটতে দেখা গেলো। আসল সিন্ডিকেটকে কি তবে চেনা গেলো?

হ্যাঁ, এই রাষ্ট্রই আসল ‘সিন্ডিকেট’।

সত্যিই একটা গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাই সিন্ডিকেটে পরিণত হতে পারে। সিন্ডিকেটে পরিণত হওয়া রাষ্ট্রব্যবস্থাটির নাম ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’। এটিই হচ্ছে পুঁজিবাদের বিকৃত রূপগুলোর মধ্যে সবচেয়ে খারাপগুলোর একটি। এটি সেই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যেখানে একটা রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শ্রেণির সঙ্গে বড় ব্যবসায়ী শ্রেণির একটা সিন্ডিকেট তৈরি হয়।

সেই ব্যবসায়ী চক্র বাজারে প্রতিযোগিতামূলকভাবে ব্যবসা করে না, বরং সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ থাকার কারণে সরকারি অনৈতিক নীতি, কর কাঠামো, ঋণ এবং আর্থিক প্রণোদনা সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে নিজেদের অনুকূলে নিশ্চিত করার মাধ্যমে ব্যবসা করে। এভাবে ব্যবসা করা সেসব ব্যবসায়ীর জন্য অকল্পনীয় পরিমাণ মুনাফা নিশ্চিত করলেও ভীষণভাবে ভুক্তভোগী হয় জনগণ। বলাবাহুল্য এই অবিশ্বাস্য পরিমাণ মুনাফার অংশীদার হয় সরকারের নানা পদে থাকা কর্মকর্তা এবং ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলটির নেতারা। 

এ দেশে এই অর্থনৈতিক ব্যবস্থাটি টিকে আছে দীর্ঘদিন থেকেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ব্যাপ্তি এবং প্রকটতা বেড়েছে বহুগুণ। মানবিক পুঁজিবাদীব্যবস্থা কল্যাণ অর্থনীতি দূরেই থাকুক, এমনকি একটা মোটামুটি সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকেও আমরা বহু দূরে আছি। রাষ্ট্রের প্রতিটা ক্ষেত্রে এখন ক্রোনি ক্যাপিটালিজমের জয়জয়কার।

তাই ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের একজন খুব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী যখন সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি দেওয়ার কথা বলেন, তখন সেটাকে এক দারুণ কৌতুক বলে মনে করে আমার হাসি পায়। 

এবার চামড়া নিয়ে বিপর্যয়ের পর ট্যানারি মালিকরা কাঁচা চামড়া আড়তদারদের সিন্ডিকেট বলে আমাদের সামনে প্রমাণ করতে চেয়েছেন। আবার আড়তদারও পাল্টা অঙুলি নির্দেশ করেছেন ট্যানারি মালিকদের দিকে। কোনও সন্দেহ নেই এই দুটো গ্রুপই এই সিন্ডিকেটের অংশ। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে শুধু এদের দ্বারাই সিন্ডিকেটটি গঠিত হয়নি। এদের সঙ্গে পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা জড়িত না থাকলে এদের সিন্ডিকেট কখনো কার্যকর হতে পারতো না। দেশে প্রতিটি সিন্ডিকেট যেখানেই সাধারণ মানুষের অধিকার খর্ব করে সেখানেই ওই সেক্টরের ক্ষমতাশালী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকে এই পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থা।

আমরা, সাধারণ জনগণ যখন এ ধরনের একেকটা বীভৎস বর্বর ঘটনার পরে সিন্ডিকেটের কথা বলি, তখন যাতে আমরা সঠিক সিন্ডিকেটকেই নির্দেশ করি এবং সেটিকে ভেঙে দেওয়ার জন্যই কাজ করতে শপথ নেই। ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’ নামের এই সত্যিকারের সিন্ডিকেটটি যদি আমরা ভেঙে দিতে না পারি, তাহলে এরকম বা তার চেয়েও আরো ভয়ঙ্কর ঘটনা দেখার জন্য যেন আমরা প্রস্তুত থাকি।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ