ভূস্বর্গ কাশ্মির, খাপে-ঢাকা বাঁকা তলোয়ার

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ১৪:১৬, আগস্ট ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৯, আগস্ট ১৮, ২০১৯

দাউদ হায়দারঢাকায়, আমাদের ১৪/২ মালিবাগ ভাড়া-বাসায় পুরোনো দিনের মারফি রেডিও ছিল। তখনও ট্রানজিস্টর শব্দটি চালু হয়নি। পুরোনো হলেও বিগড়ে যায়নি, যথারীতি গমগমে আওয়াজ। পাড়ায় একজন বয়স্ক ছিলেন, নাম শেখ মোহাম্মদ মারুফ, মাঝে মাঝে শাসন করতেন পাড়ার পোলাপানদের। ভয়ঙ্কর গম্ভীর কণ্ঠস্বর। মারফি রেডিওর নাম দিয়েছিলুম ‘মারুফ’।
আমাদের আকর্ষণ ছিল আকাশবাণী কলকাতার ‘অনুরোধের আসর’ (গান) শোনা, সংবাদ পরিক্রমা (লিখতেন প্রণবেশ সেন। পড়তেন দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়) শোনা এবং সাহিত্যবিষয়ক কথিকা শোনা।
একদিন রাতে, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান সময় ন’টা, ভারতে সাড়ে আটটা, দিনটি ছিল শনিবার, কোনও এক বাচিকশিল্পী, নাম মনে পড়ছে না, রবীন্দ্রনাথের ‘বলাকা’ কবিতা পড়লেন। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক জানালেন, ‘কার্তিক ১৩২২ বঙ্গাব্দে কাশ্মিরের শ্রীনগরে বাসকালীন রবীন্দ্রনাথ এই কবিতা লিখেছিলেন। ‘বলাকা’ কাব্যগ্রন্থে ‘বলাকা’ শিরোনামে কবিতাটি অন্তর্ভুক্ত।’ অতঃপর কবিতার ব্যাখ্যা, আলোচনা। কথকের কথা এক কান দিয়ে ঢুকে আরেক কান দিয়ে বেরিয়ে যায়। কিন্তু কবিতা পাঠ ও কবিতার রেশ মরমে ঠাঁই নেয়। ‘সন্ধ্যারাগে-ঝিলিমিলি ঝিলমের স্রোতখানি বাঁকা/আঁধারে মলিন হল, যেন খাপে-ঢাকা/ বাঁকা তলোয়ার।’
— সেই তখন (সেপ্টেম্বর ১৯৬৪ সালের কথা বলছি।), অল্প বয়স, চিত্তে দোলা দেয়, ঝিলমের স্রোত কেন বাঁকা তলোয়ার? কেনই-বা আঁধারে মলিন খাপে-ঢাকা?
লোকমুখে শুনেছিলুম, কাশ্মির নাকি ভূস্বর্গ। স্বর্গ বিষয়ে কোনও জ্ঞান নেই, ধারণা নেই। কৌতূহল ভিন্ন, রবীন্দ্রনাথের কবিতা, ঝিলম নদের স্রোত কেন বাঁকা তলোয়ার?—তো, কাশ্মির গেলুম (পাঁচবার কাশ্মির গিয়েছি, ১৯৭৪ থেকে ১৯৮৭) ঝিলম দেখতে। এমন কিছু আহামরি নয়। পাহাড়ি খরস্রোতা ঝর্ণার নদনদী যেমন হয়। চঞ্চল। কিছুটা অশান্ত। ঢেউয়ের গতিবেগ দুরন্ত। সন্ধেবেলায় জলে সন্ধ্যার আভা যেন সন্ধ্যারাগই বটে। রাগরাগিণীর উচ্ছল ঝিলিমিলি।
যতবারই কাশ্মিরে গিয়েছি, পরিবেশ আগের চেয়ে অন্য, মানুষগুলো অতিথিপরায়ণ, কিন্তু ক্রমশ দূরত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট। ভারত সরকারের কঠোর আচরণ কঠোর থেকে কঠোরতর। শ্রীনগরের একজন অধ্যাপক, তিনি কবিতাও লেখেন, তাঁর বাড়িতে নিমন্ত্রণ জানান। কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘কাশ্মির একটি কারাগার। আমরা বন্দি। আমরা স্বাধীনতা চাই। সশস্ত্র লড়াই ছাড়া ভিন্ন পথ নেই। আমরা পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হবো না, পাকিস্তানেও নয়। ভারতে আমাদের ভবিষ্যৎ নেই। আপনারা ভাগ্যবান, বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারত ও রাশিয়া সাহায্যকারী। ভারতই পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতায় পৃথিবীর বহু দেশ এগিয়ে এসেছে। কাশ্মিরের স্বাধীনতায় পাকিস্তানের লম্ফঝম্ফ পাকিস্তানের স্বার্থে, আমাদের স্বার্থে নয়।’  
—‘কাশ্মির কি ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চায়?’ প্রশ্ন করি। বলেন, ‘না, কিন্তু বাধ্য করছে বিচ্ছিন্ন করতে। পরিণাম ভয়াবহ।’ কতটা ভয়াবহ এখন, প্রতিনিয়ত দেখছি। ভারতের কোনও মিডিয়ায় দেখবেন না। কঠোর সেন্সর, কঠোর নিষেধাজ্ঞা। বিদেশি মিডিয়ার খবরাখবরে ভারতের মিডিয়ার সংবাদ বা সংবাদভাষ্যে কোনও মিল নেই। সবটাই ওলটপালট। পাঠক জানেন, ভারতের ধনকুবের আম্বানি, এও জানেন বোধ করি, ভারতের ৭৫ ভাগ ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ার কব্জাকারী মুকেশ আম্বানি। তিনি মোদির শহরের, মোদির দোসর। মুকেশ আম্বানি এক অর্থে, অপ্রকাশ্যে, সরকারের বিধাতা, ভারতের ভাগ্যবিধাতা।
কাশ্মির নিয়ে আমেরিকা-রাশিয়া-চিন-ইউরোপীয় ইউনিয়নের কেন ঘিলু খামচানো নেই? কারণ জলের চেয়েও স্বচ্ছ। আমেরিকা সাম্রাজ্যবাদী। ভেনিজুয়েলা, গুয়েতেমালার দিকে চোখ বিস্তারিত। রাশিয়া দখল করেছে য়্যুক্রেনের ক্রিমিয়া। চীন মুসলিমদের একঘরে বন্দি করেছে। প্রত্যেক দেশই, ইউরোপীয় ইউনিয়নও, ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যে একগাট্টা, মুখে রা নেই। কেন থাকবে, আজকের বিশ্বে বাণিজ্য, অর্থনীতিই পয়লা। ভারতের মতো বিশাল বাজার কে হারাতে চায়?—অতএব, ‘কাশ্মির ভারতের ঘরোয়া ব্যাপার।’ গোল্লায় যাক কাশ্মির, মরুক কাশ্মিরি। কিসের বালাই মানবিকতার? দেখুন প্যালেস্টাইনকে। দেখুন বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের।
‘আজি হতে শতবর্ষ আগে’, ‘বলাকা’ কবিতায়, কয়েকটি লাইনে ঠিকই লিখেছেন: যদিও এই কবিতা প্রেমের নয়, রাজনীতির নয়, সামাজিক নয়, দৃশ্যকল্পের চিত্রণ, কিন্তু কিছু পঙ্‌ক্তি আজকের প্রেক্ষিতে অমোঘ বাণী। ‘অব্যক্ত ধ্বনির পুঞ্জ অন্ধকারে উঠিছে গুমরি।’ কাশ্মিরিদের নিয়ে এই লাইন প্রযোজ্য। যেমন প্রযোজ্য মোদির বিজেপি সরকার নিয়েও—‘ঝঞ্ঝামদরসে-মত্ত তোমাদের পাখা/রাশি রাশি আনন্দের অট্টহাসে/বিস্ময়ের জাগরণ তরঙ্গিয়া চলিল আকাশে।’
পৃথিবীর নানা দেশে পরিক্রমণ,কাশ্মিরের ‘ভূস্বর্গের’ চেয়ে আরো নানা দেশ আছে, কিন্তু ভুলিনা প্রথম দেখা ভূস্বর্গ, একদা রজনীতির চেয়ে আদর আপ্যায়নই ছিল মানবিক। আজ নেই।
    
লেখক: কবি ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ