ভারতে হিন্দু জাগরণ

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:৩২, আগস্ট ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৩২, আগস্ট ২২, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীগত ১৪ আগস্ট ২০১৯ আমেরিকার ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’ পত্রিকায় একটি কলাম লিখেছেন আধুনিক ভারতের ইতিহাসবিদ এবং মহাত্মা গান্ধীর জীবনীকার রামচন্দ্র গুহ। তিনি বলেছেন, ভারতবর্ষ ছিল গণতন্ত্রের জন্য একটি চমৎকার নমুনা। কিন্তু কাশ্মিরের আঞ্চলিক স্বাধীনতা হরণ, হিন্দুত্ববাদের উত্থান আর সংখ্যালঘু মুসলমানদের প্রতি তার আচরণের কারণে ভারতের সেই প্রশংসাপত্রগুলোকে ডাউনগ্রেড করার সময় এসেছে। তিনি ভারতে হিন্দুত্ববাদের উত্থান নিয়ে বলেছেন, গত শতাব্দীর ৮০’র দশক থেকে বিজেপি ভারতে যে হিন্দুত্ববাদের জাগরণ তুলছে, তাতে বলা যায়—১৯৪৭ সাল থেকে যেকোনও সময়ের চেয়ে এখন ভারত ‘হিন্দু পাকিস্তান’ হওয়ার কাছাকাছি।
প্রকৃতই হিন্দুত্ববাদের জাগরণে প্রাণান্ত প্রয়াস চালাচ্ছেন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পাঁচশ’ বছর আগে মুঘল সম্রাট আকবরের সঙ্গে মেবারের রানা প্রতাপ সিংয়ের (১৫৪০-১৫৯৭) লড়াই ভারতের হিন্দু জনমানসে প্রচুর প্রভাব ফেলেছিল। প্রভাবের পদাঙ্ক অনুসরণ করেছিলেন শিবাজী, দুর্গাদাস, রাজ সিংহ। কিন্তু ইংরেজদের আগমনে সে মৃদু জাগরণের উত্তেজনাটাও অঙ্কুরে বিনষ্ট হয়ে গিয়েছিল। সাতশ’ বছর মুসলমানরা ভারত শাসন করেছে। তারপর টানা ২০০ বছর ভারত শাসন করলো ইংরেজরা। শিবাজীর উত্থানের কথা বলতে গিয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ঈশ্বরী প্রসাদ বলেছিলেন, ‘শিবাজী দেখলেন হিন্দুত্ববাদের বৃক্ষটি এখনও মরেনি, কিন্তু এতদিন পর্যন্ত দেখা গেছে সাংস্কৃতিক হিন্দুত্ববাদ যেভাবেই হিন্দুরা জাগাতে পেরেছে সামরিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তারা রাষ্ট্রকাঠামো প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তেমন সফলকাম হয়নি।’ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এখন সে সুযোগ তাদের হাতে এসেছে। সুদীর্ঘ ৯শ’ বছর তারা বিজাতির শাসনাধীন ছিল। শক, হুন, ইংরেজ—সব শাসকই ভারত ত্যাগ করে চলে গেছে, কিন্তু মুসলমানরা ভারত ত্যাগ করেনি। মুসলমানের ফকিরেরা এদেশে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। তারা সফলকামও হয়েছিলেন। তারা তো গোঁড়ামির পথ পরিহার করে চলেছেন। ভক্তি আন্দোলনের বিকাশে জৈন ধর্মের দান ছিল। এরই ফলে মধ্যযুগে যে মরমিয়া আধ্যাত্মিক সাধনার ধারা তৈরি হয়, পরবর্তী সময়ে তা ইসলাম ধর্মের সুফি সাধনার এক ঐতিহাসিক সাড়া প্রদানের সমর্থ হয়েছিল।

দাদু, কবীর ধর্মসূত্রে মুসলমান ছিলেন, কিন্তু এক উদার মতবাদ প্রচার করে হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মাঝে তারা পরম ভক্তির সঙ্গে গৃহীত হন। তাদের আনাগোনা ছিল সম্রাট আকবরের দরবারে। তাই সম্রাট আকবরও উদার ছিলেন। তার সময়ে ইউরোপে ইনকুইজিশন চলেছে। ইনকুইজিশন বলতে মধ্যযুগের ক্যাথলিক চার্চের অধীনে কিছু প্রতিষ্ঠানকে বোঝায় যারা ক্যাথলিক মতবিরুদ্ধ ধর্ম বা চিন্তাধারাকে প্রতিহত করার কাজে লিপ্ত ছিল। ১৬শ’ খিস্টাব্দে রোমে যখন ইতালীয় দার্শনিক জিওর্দানো ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হচ্ছিল তখন ভারতে সম্রাট আকবরের আহ্বানে সর্বধর্ম সমন্বয়ের আয়োজন ঘটেছিল।

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে দু’টি ধারা লক্ষ করা যায়। মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু, সরদার বল্লভভাই প্যাটেল, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, রাজেন্দ্র প্রসাদ, কৃপালিনী প্রমুখ ছিলেন ব্রিটিশ রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গড়ে ওঠা মানুষ। তাদের চিন্তা চেতনায় আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি আশ্রিত। অবশ্য সরদার প্যাটেল ও রাজেন্দ্রপ্রসাদের ধর্মের প্রতি অনুরাগ ছিল বেশি। রাজেন্দ্র প্রসাদ রাষ্ট্রপতি হয়েও চিনিকল মালিকদের থেকে ডেকে ডেকে চাঁদা সংগ্রহ করেছিলেন গুজরাটের সোমনাথ মন্দির সংস্কারের জন্য। অবশ্য এতে অস্বাভাবিকতা কিছু ছিল না। তিনি যতদিন রাষ্ট্রপতি ছিলেন ততদিন রাষ্ট্রপতি ভবনে যাগ-যজ্ঞ লেগেছিল।

প্যাটেল মন-মানসিকতায় হিন্দু ছিলেন। ধর্ম পালনে তেমন কোনও নিষ্ঠা ছিল না। তবে তারা কেউই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মকে প্রশ্রয় দেওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন না। বাবরি মসজিদ নিয়ে বিতর্ক ব্রিটিশের সময়কাল থেকে চলে আসছে। স্বাধীনতার পর উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী গোবিন্দ বল্লভ পন্থ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার প্যাটেলের সঙ্গে বাবরি মসজিদ ভাঙার বিষয়ে আলোচনা করেছিলেন। তিনি তাকে কড়া ভাষায় চিঠি লিখে এসব বাজে চিন্তা পরিহার করে চলার পরামর্শ দিয়েছিলেন।

স্বাধীনতা স্থপতিদের সমান্তরাল আরেকটা গ্রুপ তখনও ছিল, এখনও আছে, যারা ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। ভারত যদি স্বাধীন হয় তবে হিন্দু রাষ্ট্র হবে, তারা এই চিন্তায় মশগুল ছিলেন। সাভারকার, গোলওয়ালকার এরাই হচ্ছে সে দলের নেতা। আরএসএস, হিন্দু মহাসভা, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ, বজরং দল এদের সৃষ্টি। এই সংগঠনগুলোর স্বাধীনতা সংগ্রামে এক পয়সার অবদান ছিল না।

শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী খুবই উচ্চ শিক্ষিত লোক ছিলেন। তার পিতা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখার্জি। তিনিও একবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সুতরাং শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি সাম্প্রদায়িক হলেও বাস্তবতা বিবর্জিত ছিলেন না। তিনি বুঝেছিলেন মুসলমানকে বাদ দিয়ে ভারতে রাষ্ট্রচিন্তা ত্রুটিপূর্ণ হবে, তাই তিনি হিন্দু মহাসভার সভাপতি হওয়ার পর মহাসভার সদস্যপদ মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করার প্রস্তাব করেছিলেন। মহাসভার কার্যকরী সংসদ সম্মত না হওয়ায় তিনি হিন্দু মহাসভা ছেড়ে ১৯৫১ সালে একুশে অক্টোবর দিল্লিতে সর্বভারতীয় এক সম্মেলনের আহ্বান করেছিলেন। পাঁচশ’ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে তিনি নিজে জনসংঘ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। অটল বিহারি বাজপেয়ি ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির ব্যক্তিগত সেক্রেটারি। অটল বিহারি বাজপেয়ি এবং এল কে আদভানি ১৯৪১ সাল থেকেই ছিলেন আরএসএস-এর ক্যাডার। এই জনসংঘ পার্টি পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি হয়েছে। তারাই বর্তমানে ক্ষমতায়। তারাই হিন্দু জাগরণবাদী শক্তি।

লাল কৃষ্ণ আদভানি রথযাত্রা করে হিন্দু জাগরণের সূচনা করেছিলেন উনিশশ’ ছিয়াশি সালে। একটা ট্রাককে রথ বানিয়ে গুজরাটের সোমনাথ মন্দির থেকে তার যাত্রা শুরু করেছিলেন। কথা ছিল সেই রথ অযোধ্যায় আসবে এবং করসেবকরা সেখানে উপস্থিত থাকবেন। আদভানি গিয়ে উপস্থিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাবরি মসজিদ ভাঙা শুরু করবেন। কিন্তু পথের মধ্যে বিহারের মুখ্যমন্ত্রী লালুপ্রসাদ যাদবের হুকুমে রথ থামিয়ে দেওয়া হয় এবং আদভানিকে গ্রেফতার করা হয়। ফলে সে যাত্রায় বাবরি মসজিদ বেঁচে যায়।

১৯৮৪ সাল থেকে বিজেপি হিন্দু জাগরণের পদক্ষেপ নেওয়া আরম্ভ করেছিল। এখন বিজেপিতে চরমপন্থীরা ক্ষমতার শীর্ষে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী এবং অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তখন গুজরাটে ২০০২ সালে দাঙ্গা বাধিয়ে মুসলিম হত্যার মহড়া হয়েছিল। হিন্দু-মুসলিম মিলিয়ে ২ হাজার লোক মারা গিয়েছিল। আর এখন তো নরেন্দ্র মোদি কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী আর অমিত শাহ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। রামের জন্মভূমি দাবি করে বাবরি মসজিদ ধ্বংস হয়েছে। সেখানে রাম মন্দির তৈরির কথা বলে আসছে বিজেপি। মথুরার কেশব রাই মন্দির সংলগ্ন মসজিদ ভাঙারও দাবি উঠেছে প্রচণ্ডভাবে। কারণ ওই স্থান নাকি কৃষ্ণের জন্মভূমি। গত বছর বিজেপি ১৬৫৬ সালে প্রতিষ্ঠিত পুরান দিল্লির জামা মসজিদ ধ্বংস করার জন্য এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বলা যায়, সর্বত্র এখন জাগরণের শোর উঠেছে।

হিন্দুদের জাগরণের কথা বলে মারাঠা নেতা শিবাজী হিন্দু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। পারেননি। ব্যর্থ হয়েছেন। সম্রাট আওরঙ্গজেব ধর্ম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন। ব্যর্থ হয়েছেন। এখন আধুনিক যুগে এসে ভারতের বর্তমান শাসকরা পুনরায় সেই প্রচেষ্টা শুরু করেছেন। ধর্মের নামে যে জাগরণকে উসকানি দিয়েছেন, তা হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান জৈন শিখ এত ধর্মের মাঝে কি বাস্তবায়ন করতে পারবেন?

ধর্মীয় জাগরণ এবং ধর্মীয় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে পরিকাঠামো থাকা দরকার, হিন্দুধর্মে তা অনুপস্থিত। ঋষীরা হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থগুলো রচনা করেছেন। তাই গ্রন্থে গ্রন্থে মতভিন্নতা রয়েছে। সুতরাং এত বিশ্বাসের হিন্দুধর্মকে ভিত্তি করে ধর্ম রাষ্ট্র গঠন কঠিন কাজ। মসজিদ ভেঙে, ভিন্ন ধর্মের মানুষ হত্যা করে যদি ধর্ম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা মুখ্য কাজ হয়ে থাকে, তবে তা সম্ভব। তবে সেটি হবে বিশৃঙ্খলার মাঝে একটি বিরাট জনপদ ধ্বংস হওয়ার আলামত।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ