‘এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনো দিন’

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৬:৫৯, আগস্ট ২২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০১, আগস্ট ২২, ২০১৯

আহসান কবিরপাকিস্তানিরা দ্বিধান্বিত ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে ফাঁসিতে ঝোলানোর জন্য পাকিস্তানি জান্তা তাঁর বিরুদ্ধে প্রথমে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য) দিয়েছিল। গণআন্দোলনের মুখে এই মামলা থেকে তিনি বেকসুর খালাস পেয়েছিলেন। ১৯৭১ সালের পঁচিশ মার্চ রাতে গ্রেফতারের পর পাকিস্তানে নিয়েও তাঁকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়েছিল। ফাঁসি দেওয়াটাই ছিল পাকিস্তানি জান্তার মুখ্য উদ্দেশ্য। স্বাধীনতার পর বিশ্ব জনমতের চাপে বঙ্গবন্ধু মক্তি পান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল বাংলাদেশের মানুষরাই। শহীদ কাদরী তাঁর ‘হন্তারকদের প্রতি’ কবিতায় লিখেছেন–
‘বাঘ কিংবা ভালুকের মতো নয়,
বঙ্গোপসাগর থেকে উঠে আসা হাঙরের দল নয়
না, কোনো উপমায় তাদের গ্রেপ্তার করা যাবে না
তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম
বুট, সৈনিকের টুপি,
বঙ্গবন্ধুর সাথে তাদের কথাও হয়েছিলো,
তারা ব্যবহার করেছিল
এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো
বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই
ওরা মানুষের মতো
দেখতে, এবং ওরা মানুষই
ওরা বাংলা মানুষ
এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনো দিন।’

যতদিন বেঁচে থাকবো ততদিন এই ভয়াবহ কথা শুনতে শুনতে আমাদের দিন যাবে। আড্ডা, গল্প, খাদ্য,মোমবাতি সব ফুরোবে,বঙ্গবন্ধু কখনও ফুরিয়ে যাবেন না। হয়তো কেউ আসবেন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন কোনও কবিতা লিখে,কেউ সঙ্গে করে আনবেন সূর্যোদয়ের মতো নতুন কোনও গান। কেউ দেখাবেন নতুন গবেষণায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ষড়যন্ত্রের নতুন কোনও দিক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন,আছেন এবং থাকবেন বাংলাদেশ এবং বাঙালির হৃদয়ে অমলিন।

দুই.

অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে বিভাজন শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালেই। মুক্তিবাহিনী এবং মুজিব বাহিনীর কথা যেমন শোনা যায় তেমনি খন্দকার মোশতাকের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তাজউদ্দীন আহমদের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন খন্দকার মোশতাকসহ আরও কেউ কেউ। খন্দকার মোশতাক,মাহবুবুল আলম চাষী,তাহের উদ্দীন ঠাকুর প্রমুখ পাকিস্তানের সঙ্গে কনফেডারেশন গঠন করতে চেয়েছিলেন,আমেরিকান অ্যাম্বেসি ও ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁদের বিশেষত মোশতাকের যোগাযোগ ছিল ৭১ থেকেই। মোশতাকের প্রচারণা ছিল এমন-‘স্বাধীনতা আগে না শেখ মুজিব আগে? আমাদের শেখ মুজিবকেই আগে দরকার। যারা শেখ মুজিবের অনুপস্থিতিতে স্বাধীনতা চায় তাদের চিনে রাখা দরকার!’ অনেকেই মোশতাকের এই প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য যার ‘প্রায় অপরিহার্য’ প্রয়োজন ছিল,তাঁকেই চলে যেতে হয়েছিল বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভা থেকে। চলনে বলনে,জীবনাচরণে তাজউদ্দীন আহমদকে ধরে নেওয়া হতো ‘শৃঙ্খলাপরায়ণ কমিউনিস্ট মনোভাবাপন্ন’ রাজনীতিবিদ হিসেবে। অনেকেই তাজউদ্দীন সম্পর্কে বলতেন, ‘বঙ্গবন্ধুর অনুগত কমিউনিস্ট’! পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিবকে ইমোশনাল অ্যাপ্রোচে কাবু করা যায়। কিন্তু তাঁর পেছনে ফাইল বগলে নিয়ে যে ‘নটোরিয়াস’ লোকটি দাঁড়িয়ে থাকে তাকে (তাজউদ্দীনকে) কাবু করা শক্ত।’ স্বাধীনতার পর ‘মোশতাক চক্র’কে বঙ্গবন্ধু ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। ষড়যন্ত্রকারীরা ক্ষমা পেলে দ্বিগুণ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। মোশতাকের সঙ্গে শারীরিক গড়নে বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের দারুণ মিল ছিল। যে মোশতাক বঙ্গবন্ধুর বাবা-মা’র মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি কেঁদেছিলেন, কবর দিতে কবরে নেমে বলেছিলেন- ‘আমাকেও কবর দিয়ে দাও’– সেই মোশতাকই বঙ্গবন্ধুর খুনের সঙ্গে আগাগোড়া জড়িত ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের আখ্যা দিয়েছিলেন ‘সূর্যসৈনিক’ হিসেবে। প্রামাণ্যচিত্র ‘দ্য ডটারস টেল’-এ শেখ হাসিনা মোশতাকের প্রতি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস প্রসঙ্গে বলেছেন-‘মা আমার (বঙ্গবন্ধু) কিছু হলে তোরা মোশতাক চাচার কাছে যাস!’

তিন.

স্বাধীনতার পর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল ‘ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশের’। ৭২ সালেই প্রথম এবং বড় বিভাজন দৃশ্যমান হয়। যারা বেসামরিক প্রশাসনে ছিলেন তাদের খুব কম অংশই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। মুক্তিযোদ্ধারা ফিরে এসে বেসামরিক প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি। বঙ্গবন্ধু প্রথমেই এক ‘নীরব ষড়যন্ত্রের’ সম্মুখীন হন। যা কিছুই করতে চান নেমে আসতে থাকে প্রশাসনিক স্থবিরতা। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জাসদের (জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল) মারমুখো সদস্যরা। উল্লেখ্য, ন্যাপ (মোজাফফর) ও সিপিবি (বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি) এই দুই দল ছিল আওয়ামী লীগের প্রতি বন্ধু মনোভাবাপন্ন। ‘মুক্তিযুদ্ধ বিরোধিতা’র জন্য কিছু ধর্মভিত্তিক দল নিষিদ্ধ ছিল, যাদের বেশিরভাগ সক্রিয় সদস্য কোনও না কোনোভাবে বিভিন্ন দলের সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছিল। জাসদ,পূর্ববাংলার সর্বহারা পার্টি,ভাসানীর ন্যাপ সহ সব দলের বিরুদ্ধাচরণ দেশে এক অরাজক পরিস্থিতির তৈরি করে। খেটে খাওয়া খুব সাধারণ মানুষেরাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। পেশাগতভাবে ছাত্র এবং সেনা,নৌ,বিমান ও ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস) সদস্যদের উল্লেখযোগ্য অংশ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। জাসদ গঠনের মধ্য দিয়ে ছাত্রদের বড় একটি অংশ চলে যায় বিরোধী শিবিরে।

মুক্তিবাহিনী ছাড়াও কাদেরিয়া বাহিনী,হেমায়েত বাহিনী ছিল মুক্তিযুদ্ধে, যাদের অবদান অসামান্য। সিরাজ শিকদারের দল ১৯৭১ এ মুক্তিবাহিনীর মতাদর্শের সঙ্গে একমত না হলেও যুদ্ধ করেছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) গড়ে উঠেছিল ইন্ডিয়ান জেনারেল উবানের নেতৃত্বে। বিএলএফ পরে মুজিববাহিনী নামে পরিচিত হয়। এই বাহিনীর চার আঞ্চলিক নেতা ছিলেন মনোজ (শেখ ফজলুল হক মনি), সরোজ (সিরাজুল আলম খান), রাজু (আবদুর রাজ্জাক) ও তপন (তোফায়েল আহমেদ)। এই চারজন মানুষ তখন ইন্ডিয়ান সরকারের প্রটোকল পেতেন বলে মহিউদ্দীন আহমেদ তার বইতে (জাসদের উত্থান পতন: অস্থির সময়ের রাজনীতি) লিখেছেন। ট্রানজিট ও মুক্তিযোদ্ধাদের বাছাই করার জন্য এই চারজনের নেতৃত্বে চারটি ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। ব্যারাকপুরের অধিনায়ক ছিলেন তোফায়েল আহমেদ এবং তার প্রধান সহকারী ছিলেন নুরে আলম জিকু। জলপাইগুড়ির পাঙ্গা ট্রেনিং ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান এবং সহকারী ছিলেন মনিরুল ইসলাম। মেঘালয়ের তুরা ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন সিরাজুল আলম খান এবং তার সহকারী ছিলেন সৈয়দ আহমেদ। আগরতলা ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি এবং তার সহকারী ছিলেন আ স ম আব্দুর রব। কাজী আরেফ ছিলেন বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর গোয়েন্দা প্রধান এবং শাজাহান সিরাজ ছিলেন বিএলএফের সঙ্গে প্রবাসী সরকারের যোগাযোগ রক্ষা করার দায়িত্বে। বিএলএফ বা মুজিব বাহিনীর মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকা নিয়ে বিভিন্নজন তাদের লেখা ও স্মৃতিচারণে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করেছেন। স্বাধীনতার পর মুজিব বাহিনীর চার ট্রেনিং ক্যাম্পের আট অধিনায়ক ও উপ-অধিনায়কই বঙ্গবন্ধুকে প্রথম বিভাজনের মুখোমুখি করেছিলেন বলে আমি মনে করি। কারণ,  ছাত্রলীগ দুই দলে বিভক্ত হয়ে সমাবেশ ডাকে। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগের যে অংশের সমাবেশে যান,আব্দুর রাজ্জাক,তোফায়েল আহমেদ ও শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন সেই অংশে। বাকিরা বিভাজিত হন এবং জাসদ গঠন করেন। তবে একথা অনস্বীকার্য, বিভাজনের পর আওয়ামী লীগ এবং জাসদ অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিই দুর্বল হয়েছে। ক্ষমতা চলে গেছে মূলত সেনানির্ভর ‘রাজনীতিবিদদের’ হাতে, যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানিকরণেই সচেষ্ট ছিলেন।

চার.

সাধারণ মানুষ,রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট ছাত্রদের বাইরে মুক্তিযোদ্ধাদের ভেতর পেশাগতভাবে সেনা,নৌ,বিমান ও ইপিআর (ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস)-এর সদস্যরা ছিল উল্লেখযোগ্য হারে। স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন প্রায় ১২০ জন অফিসার এবং ১৭ হাজারের মতো সৈনিক। কিন্তু পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসার (১১০০-এর মতো) ও সৈনিকের সংখ্যা ছিল ২৭ থেকে ২৮ হাজারের ভেতর। সেনা,বিমান ও নৌবাহিনীতে পাকিস্তান প্রত্যাগত সৈন্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়,মুক্তিযোদ্ধা অফিসার ও সৈনিকদের দুই বছরের সিনিয়রিটি পাকিস্তান প্রত্যাগতদের উষ্মার বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডে সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য জড়িত ছিল তাদের কেউ কেউ ১৯৭১-এর অক্টোবর-নভেম্বরে পাকিস্তান থেকে ভারতে গিয়েছিলেন যুদ্ধে অংশ নিতে, যা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ঘাতকরা যখন হামলে পড়েছিল বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে তখন তাঁর নিরাপত্তায় নিয়োজিত সেনাবাহিনীর সদস্যরা কোনও প্রতিরোধই গড়ে তুলতে পারেনি কিংবা চায়নি।

বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর প্রধান,উপ-প্রধান,নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধান ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করার পরিবর্তে মোশতাক সরকারের বশ্যতা স্বীকার করেছিল। সেনাবাহিনীর সিনিয়র অফিসাররা এই হত্যাকাণ্ডের কথা জেনেও নীরব ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল বঙ্গবন্ধু নিহত হলে তারাই লাভবান হবেন এবং হয়েছিলেনও। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার দায় জেনারেল শফিউল্লাহও এড়াতে পারেন না।  তিনি মাঝে মাঝে জিয়াউর রহমানের দোষ দেন। তবে জিয়া ও এরশাদের সময় তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কাজ করেছেন! জেনারেল শফিউল্লাহকে সেনাপ্রধান বানানোর পরামর্শ বঙ্গবন্ধুকে দিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানী। ওসমানী সাহেব বাকশাল করার সময় আওয়ামী লীগ থেকে সরে এসেছিলেন।আবার তিনিই মোশতাক সরকারের সামরিক উপদেষ্টা হয়েছিলেন! এখানেই শেষ নয়। তিনি জিয়াউর রহমানের বিপক্ষে আওয়ামী লীগের হয়ে রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন! শেষমেশ গঠন করেছিলেন জনতা দল!

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের দিন তাঁর জন্য কোনও মুক্তিযোদ্ধা সেনা অফিসার এগিয়ে আসেননি। এসেছিলেন এবং নিহত হয়েছিলেন পাকিস্তান প্রত্যাগত অফিসার কর্নেল জামিল। কর্নেল জামিলের দাফনের সময় একখণ্ড সাদা কাপড়ও জোটেনি তার। ধার করা বিছানার চাদরে মুড়িয়ে তাঁকে নামানো হয়েছিল কবরে।

পাঁচ.

মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল রক্ষীবাহিনী। রক্ষীবাহিনীর প্রশিক্ষণ ও কর্মস্থল তৈরি,পোশাক, রেশন এসব নিয়ে সেনা,নৌ,বিমান ও বিডিআর সদস্যদের ভেতর স্পষ্টত বৈরিতা ছিল। রক্ষীবাহিনীর সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তিতে অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা নিজেদের ‘সৎছেলে’ হিসেবে ভাবা শুরু করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের সময়ে রক্ষীবাহিনীর প্রধান দুই কর্মকর্তা দেশের বাইরে ছিলেন। ঢাকার শেরেবাংলা নগরে মূল অফিস এবং সাভারে রক্ষীবাহিনীর প্রশিক্ষণস্থল থাকলেও এরা গোলাবিহীন ট্যাংক দেখে ভয় পেয়ে যায় এবং বিন্দুমাত্র প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সমর্থ হয়নি। রক্ষীবাহিনীর উপ-প্রধানরা মোশতাকের বশ্যতা স্বীকার করে। অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা শেষমেশ রক্ষীদের দেখে অবাক হয়। তারা ভেবেছিল এদের মনে হয় প্রচুর গোলাবারুদ ও আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র আছে। শেষমেশ রক্ষীদের সেনাবাহিনীতেই আত্তীকরণ করা হয় এবং রক্ষীবাহিনীর স্থাপনাগুলো (সাভার,ভাটিয়ারি ও শেরেবাংলা নগর) চলে যায় সেনাবাহিনীর হাতে!

যার কারণে রক্ষীবাহিনী সৃষ্টি বদনাম সৃষ্টি  ছাড়া তাঁর জন্য কিছুই করতে পারেনি।

ছয়.

বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর মোশতাকের মতো আওয়ামী লীগের আরও কিছু নেতা পাওয়া গিয়েছিল। যে অধ্যাপক ইউসুফ আলী মুজিবনগর সরকারের হয়ে সবাইকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ শুনিয়ে শপথ করাতেন তিনি চলে যান মোশতাকের ছায়াতলে। তাহের উদ্দীন ঠাকুর,মাহবুবুল আলম চাষীরা আগে থেকেই ছিলেন মোশতাকের পদানত। সোহরাব হোসেনও গিয়েছিলেন মোশতাকের মন্ত্রী হতে,পারেননি। কিন্তু কেএম ওবায়দুর রহমান,শাহ মোয়াজ্জেম,রিয়াজউদ্দীন আহমেদ ভোলা মিঞার মতো আরও অনেকে মোশতাক মন্ত্রিসভার সদস্য হন। ঘাতকরা ১৫ আগস্ট তাজউদ্দীন সাহেবের কাছেও গিয়েছিল। তাজউদ্দীন সাহেব বেইমানি করেননি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে। বেইমানি করেননি সৈয়দ নজরুল,ক্যাপ্টেন মনসুর আলীরা। বেইমানি করেননি সামাদ আজাদ,তোফায়েল আহমেদ,জিল্লুর রহমান কিংবা রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের মতো নেতারা। পরিণামে চার জাতীয় নেতাকে হত্যা করা হয়েছিল জেলে,বাকিরাও বিভিন্ন মেয়াদে জেলে যেতে বাধ্য হন। আওয়ামী লীগ স্মরণকালের সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পড়েছিল তখন। যে মালেক উকিল বলেছিলেন, দেশ ফেরাউনের হাত থেকে মুক্ত হয়েছে তাকেই বানাতে হয়েছিল আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধান। আর মোশতাক সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ওসমানী সাহেবকে দেওয়া হয়েছিল আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনের মনোনয়ন।

নিয়তি এই যে শেষমেশ বঙ্গবন্ধুকে তাঁর স্বপ্নের দেশেই হত্যা করা হয়েছিল। তাঁর আহ্বানে সেনাবাহিনীর যেসব সদস্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন তাদের কয়েকজন কোনও না কোনোভাবে তাঁর হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন। জেনারেল ওসমানী,ব্রিগেডিয়ার রউফ,জেনারেল জিয়াউর রহমান,ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ,কর্নেল শাফায়াত জামিল,ফারুক,রশীদ,আকবর,মেজর হুদা,মহিউদ্দীন,নুরসহ অনেকে বঙ্গবন্ধু হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা জানতেন। সেনাবাহিনীর এসব কর্মকর্তা এটাও অনুধাবন করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা চলে গেলে বেনিফিসিয়ারি হবেন তারাই। মুনতাসীর মামুন তার ‘ষড়যন্ত্রের রাজনীতি-দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা’ বইয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘আসলে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশের সায় ছিল এই হত্যাকাণ্ডে। এটি আজ পরিষ্কার। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার দায় সেনাবাহিনীরই!’

স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছর পরেও বাংলাদেশ পায়নি কাঙ্ক্ষিত ‘ঐক্য’। আজও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। দেশ যদি পৌঁছে যায় বিভেদের শেষ সীমানায়,দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রের কারণে দেশটা যদি ক্রমশ  পাকিস্তান,আফগানিস্তান,নাইজেরিয়া বা সিরিয়ার দিকেই হাঁটা শুরু করে,আমরা বিশ্বাস করি তখনও বঙ্গবন্ধু- আপনি হয়ে উঠবেন আসল অনুপ্রেরণাদাতা। আমাদের কানে বাজবে সেই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা-আর আমি যদি আদেশ দিবার নাও পারি,তোমাদের যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে। ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তুলো। মনে রাখবা, আমাদের কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না!

সহায়ক গ্রন্থ:

১. মহিউদ্দীন আহমদের সাক্ষাৎকার

২. বিএনপি-সময় অসময়, মহিউদ্দীন আহমদ

৩. ষড়যন্ত্রের রাজনীতি-দুই রাষ্ট্রপতি হত্যা, মুনতাসীর মামুন

৪. রক্ষীবাহিনীর সত্য মিথ্যা, আনোয়ার উল আলম

৫. তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা, লে. কর্নেল (অব.) এম এ হামিদ পিএসসি।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ