জটিল হয়ে উঠছে রোহিঙ্গা সমস্যা

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৬:৪৯, আগস্ট ২৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:২৫, আগস্ট ২৮, ২০১৯

স্বদেশ রায়রোহিঙ্গা ঢল যখন নামে, তখন নানান লেখায় নানাভাবেই লিখি—রোহিঙ্গা সমস্যা সহজে ও শিগগিরই সমাধান হবে না। তবে বাংলাদেশের রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কোনও বিকল্প ছিল না। কারণ, বাংলাদেশ যদি তাদের ঢুকতে না দিতো, তাহলে বাংলাদেশও মানবাধিকারবিরোধী কাজ করতো এবং গণহত্যাকারীর অংশ হিসেবে চিহ্নিত হতো। আর রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে মারা গিয়েছিল ২৫ হাজার রোহিঙ্গা; এই মৃতের সংখ্যা তখন কয়েক লাখে গিয়ে পৌঁছাতো। এত বড় একটি গণহত্যা ও মানবিক বিপর্যয় থেকে পৃথিবীর মানব সম্প্রদায়কে বাংলাদেশ, বিশেষ করে বাংলাদেশের নেত্রী শেখ হাসিনা রক্ষা করেছেন। কিন্তু এর বিপরীতে সারা পৃথিবীর মানব সম্প্রদায়ের সচেতন অংশকে যেভাবে বাংলাদেশের পাশে এসে দাঁড়ানো উচিত ছিল, সেভাবে কেউ দাঁড়ায়নি। এর সব থেকে বড় কারণ গোটা পৃথিবীর সমাজ ও রাষ্ট্রের চরিত্র এখন বদলে গেছে। ষাট ও সত্তরের দশকে এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত জনগোষ্ঠীর পাশে এসে অনেক রাষ্ট্র ও বিশেষ করে পৃথিবীর সচেতন মানবগোষ্ঠী এসে দাঁড়াতো। এখন এই রাষ্ট্র ও মানুষের সংখ্যা কমে গেছে। কারণ, পৃথিবীতে এখন উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সংখ্যা এখন হাতেগোনা দুই-একটি। সবখানেই অনেকটা অটোক্রেটিক-ডেমোক্রেসি চালু হয়েছে, তাই সেটা ধর্মের নামে হোক, বর্ণের নামে হোক, আর অর্থনীতির নামে হোক। আর তারা সবাই জন-সমর্থিত। এর থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট, মানুষের চরিত্র বদলে গেছে, মানুষ মানবিকতাকে পাশে ঠেলে রেখে ধর্ম, বর্ণ ও অর্থনীতিকে বড় করে দেখছে—এ কারণেই সমাজের চরিত্র বদলে গেছে। আর সমাজের যে চরিত্র হবে, রাষ্ট্রেরও সেই চরিত্র হবে।

পৃথিবীতে যে সময়ে রাষ্ট্র ও সমাজের চরিত্র এমন, এ সময়ে রোহিঙ্গাদের পাশে এসে দাঁড়ানো মানুষ ও রাষ্ট্রের সংখ্যা কমে যাবে এটাই স্বাভাবিক। ঊনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে ইউরোপ, আমেরিকায় যে উদারনৈতিক সমাজ সৃষ্টি হয়েছিল, সে সমাজ আজ ক্ষয়িষ্ণু। অন্যদিকে ওই উদারনৈতিক সমাজের পাশাপাশি ছিল সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। যারা নীতিগতভাবে সারা পৃথিবীর নিপীড়িত মানুষের পাশে থাকতো, সেই সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র আজ অতীতের ইতিহাস। সমাজতন্ত্রের নামে চায়না টিকে আছে ঠিকই, কিন্তু বাস্তবে তারা ক্রোনি ক্যাপিটালিস্ট রাষ্ট্র। তাই এমন একটা পৃথিবীতে কাউকে শুধু মানুষ হিসেবে, নিপীড়িত মানুষ হিসেবে দেখা হবে, এমনটি আশা করা দুরাশাই মাত্র। বরং এ পৃথিবীতে বর্ণে মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে, ধর্মে মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে, এমনকি মহাসাগরের এপার-ওপার করেও মানুষকে ভাগ করা হচ্ছে। যে সময়ে ধর্মের নামে কোনও মানবগোষ্ঠী বিপর্যস্ত হয়েছে, তখন সেখানে সমর্থন কতভাগ আশা করা যায়। তারপরও একটি অপ্রিয় সত্য হলো, রোহিঙ্গারা বর্ণে কালো ও ধর্মে মুসলিম। তারা মুসলিম শরণার্থী হিসেবেই চিহ্নিত; অন্য কোনও পরিচয়ে নয়। বাংলাদেশে আটকে পড়া পাকিস্তানিদেরও কেউ কিন্তু আটকে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠী বলে না। তাদের আটকে পড়া পাকিস্তানি বলে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের কেউ মিয়ানমারের শরণার্থী বলে না, তাদের বলা হয় মুসলিম শরণার্থী। রোহিঙ্গারা যে সময়ে মুসলিম শরণার্থী হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে, এই সময়ে সারা বিশ্বে মুসলিমদের ইমেজ কী? বিশেষ করে মানবতার ডাকে যে ইউরোপ ও আমেরিকা বেশি সাড়া দিয়ে থাকে, তাদের কাছে মুসলিমরা ইমেজ সংকটে। এমন একটি অবস্থায় মুসলিম নামে চিহ্নিত একটি জনগোষ্ঠী যখন শরণার্থী হয়, সে সময়ে তাদের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকা থেকে নৈতিক সমর্থন, বিশেষ করে জনগণের সমর্থন আদায় করা খুবই কঠিন। শুধু বর্তমানে অবস্থিত ক্ষয়িষ্ণু উদারনৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক সমাজের সমর্থন পাওয়াই সম্ভব।

আমাদের সরকার হয়তো তেমনটি বুঝে প্রথমেই মুসলিম বিশ্বের দিকে বেশি নজর দিয়েছিল। মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর মধ্যে তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া ও সৌদি আরব বেশ সাড়া দিয়েছিল। কিন্তু এখানে সমস্যা হচ্ছে আজ যে সারা পৃথিবীতে মুসলিম সমাজকে জঙ্গি হিসেবে চিহ্নিত করার একটি অপতৎপরতা, এবং লাদেনসহ নানান কারণে যেটা সৃষ্টি হয়েছে এর পেছনে সৌদির এক ধরনের সহায়তা আছে। কারণ, পৃথিবী যে সময়ে আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে মোটামুটি দুই ভাগে ভাগ ছিল (যদিও জোটনিরপেক্ষ বলে আরেকটি অবস্থান অনেক দেশের ছিল) ওই সময়ে সমাজতান্ত্রিক বিশ্বকে হটানোর জন্য আমেরিকার মদতেই একটি মুসলিম জঙ্গিগোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়। কারণ, সত্যি অর্থে কমিউনিজমের আদর্শের পরে ইসলামই আন্তর্জাতিক। তাই সমাজতন্ত্রের বিপরীতে ইসলামকে বেছে নেয় আমেরিকা। আর এ কথা সত্য, আমেরিকার সব বিষয়ে সব সময়ই সৌদি আরব সমর্থন করে ও অর্থ জোগান দেয়। তাই পরোক্ষভাবে হলেও লাদেনের মতো অনেক জঙ্গিগোষ্ঠী গড়ে তোলার পেছনে সারা পৃথিবীতে সৌদি অর্থ কাজ করেছে। আমেরিকার প্ররোচনায় সৌদি অর্থ যতটা না পৃথিবীতে জঙ্গি তৈরিতে ব্যবহার হয়েছে, তার থেকে অনেক কম ব্যয় হয়েছে সারা বিশ্বের নিপীড়িত মুসলিমের পেছনে। যদি সৌদি অর্থ নিপীড়িত মুসলিমের কল্যাণে ব্যবহার হতো, তাহলে গাজায় প্যালেস্টাইন নারী শিশুরা ওইভাবে অভাবে থাকে না। তারা জলপাই কুড়াতে গিয়ে গুলি খেয়ে মরে না। আর নিপীড়িত মুসলিমদের কল্যাণে বা তাদের পক্ষে আমেরিকাকে কাজে লাগানোর বিষয়েও কখনও কোনও সৌদি উদ্যোগ দেখা যায় না। বরং যদিও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ছিল, তারপরেও মুসলিম অধ্যুষিত রাষ্ট্র হিসেবে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন সরকারকে অনেক বেশি সহায়তা করতে দেখা গেছে নিপীড়িত যেকোনও জনগোষ্ঠীকে। সে ইরাক এখন আর নেই। তাই বাস্তবে বিশ্ব জনমত গড়ার ক্ষেত্রে মুসলিম বিশ্বের সহায়তা খুব বেশি মিলবে বলে মনে হয় না।

অন্যদিকে আশিয়ান প্রস্তাব নিয়েছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনের পক্ষে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবসনের জন্য ও রোহিঙ্গাদের নিপীড়নের বিরুদ্ধে ছোট ছোট প্রতিবাদ হচ্ছে। সেখানকার পত্রপত্রিকায় কিছু লেখালেখিও হচ্ছে। তবে ইন্দোনেশিয়াসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই দেশগুলোর পক্ষে চীনের ওপর কোনও চাপ প্রয়োগ করা সম্ভব নয়। কারণ এই দেশগুলো অর্থনৈতিকভাবে যতই উন্নতি করুক না কেন, বাস্তবে তারা সবাই চীনের অর্থনৈতিক কলোনি। যেমন, মিয়ানমারও চীনের অথনৈতিক কলোনি। এ অবস্থায় চীনকে এ বিষয়ে চাপ দেওয়ার মতো সত্যি অর্থে কোনও দেশ এই মুহূর্তে পৃথিবীতে নেই। সে কারণে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্যে চীনের সঙ্গে আরও আলোচনার পাশাপাশি পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি কাড়তে হবে। পশ্চিমা বিশ্বের একটি কার্যকর উদ্যোগ অনেকটা কাজে লাগবে। আর এক্ষেত্রে কেবল পাশে পাওয়া যেতে পারে ভারতকে। মিয়ানমারের সঙ্গে ভারতের অনেক ব্যবসায়িক সম্পর্ক। মিয়ানমার যেমন চীনের বাজার, তেমনি ভারতেরও বাজার। ভারত সেখানে বিপুল পরিমাণ সমরাস্ত্র বিক্রি করে। আবার ভারত মিয়ানমার থেকে তেল, কাঠসহ অনেক কাঁচামাল কেনে। তারপরেও ভারতকে পাশে পাওয়া যাবে। এর একমাত্র কারণ রোহিঙ্গারা যেমন এ মুহূর্তে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি হয়ে দেখা দিচ্ছে, তেমনি তারা ভবিষ্যতে ভারতেরও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার হুমকি হবে। গত পঁচিশ আগস্টের রোহিঙ্গাদের সমাবেশের পরে তাদের আর শুধু শরণার্থী হিসেবে বিবেচনা করার কোনও সুযোগ নেই। তারা যে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও উদারনৈতিক পরিবেশের সুযোগ নিয়ে একটি সুসংগঠিত শক্তি হওয়ার চেষ্টা করছে, সেটা এখন স্পষ্ট। রোহিঙ্গারা এমন সুসংগঠিত শক্তি হলে সেখানে অনেক সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। প্রথমত, তাদের প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আলোচনার সুযোগ অনেক কমে যাবে। কারণ, মিয়ানমার প্রত্যাবাসন নিয়ে আলাপ করবে বাংলাদেশের সঙ্গে এবং বাংলাদেশে তারা রোহিঙ্গাদের শরণার্থী ছাড়া অন্য কোনোভাবে দেখলে তখন তাদের আলোচনায় আনা অনেক জটিল হয়ে যাবে। তাছাড়া বাংলাদেশেরও তাদের এভাবে সুসংগঠিত কোনও শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে দেওয়ার কোনও সুযোগ নেই। বাংলাদেশ তাদের মানবিক কারণে গণহত্যা থেকে বাঁচানোর জন্য আশ্রয় দিয়েছে। তাদের কোনোরূপ কোনও আন্দোলনে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশ মোটেই দায়বদ্ধ নয়। আর এমন কোনও ঘটনা বাংলাদেশ সৃষ্টি করবে না, যা নিয়ে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সঙ্গে বা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটে বা বাংলাদেশকে কোনও সমস্যায় জড়িয়ে পড়তে হয়। দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গারা যদি কোনও সুসংগঠিত শক্তি হিসেবে একটি সমুদ্র রুটের কাছে অবস্থান নেয়, তাহলে তারা স্বাভাবিকভাবে নানান অপকর্মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে। যার কিছু কিছু লক্ষণ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। রোহিঙ্গা শিবিরের অনেকেই মাদকসহ নানান চোরাচালানে জড়িত হয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে তারা তাদের কাজের বাধা হতো এমন একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যাও করেছে। তাছাড়া আরাকানের স্বাধীনতার জন্য গঠিত সংগঠন আরসা’র অনেক সদস্য রোহিঙ্গা শিবিরে শরণার্থী হিসেবে আছে। তারা এই সুযোগে নিজেদের শক্তি সঞ্চয় করবে। আর আরসা শক্তি সঞ্চয় করলে সেখানে কোনও না কোনোভাবে পাকিস্তান ঢুকে পড়বে। যেটা হবে বাংলাদেশের জন্যে আরও বড় বিপদ। আর রোহিঙ্গারা যদি এ ধরনের শক্তি হয়, তখন চীনও কোনও মতেই এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসবে না। অন্যদিকে আমাদের বাংলাদেশে জামায়াতসহ বেশ কিছু অশুভ জঙ্গি শক্তি আছে, যারা শুরু থেকে রোহিঙ্গাদের এদিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে– বাংলাদেশের একটি অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করার জন্যে। তারা যে রোহিঙ্গাদের এই সমাবেশের পেছনে আছে সে বিষয়টি স্পষ্ট এ কারণে যে, এতবড় একটি সমাবেশের অর্থ জোগান হলো কোথা থেকে?

তাই রোহিঙ্গাদের এভাবে আশ্রয় পাওয়া শরণার্থী থেকে এ ধরনের একটি শক্তিতে রূপান্তরিত হওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারকে বিষয়টিতে গভীর মনোযোগ দিতে হবে। পাশাপাশি প্রতিবেশী চীন ও ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্য শক্তিকে এই সমস্যা সমাধান করার জন্যে এগিয়ে আসতে হবে দ্রুত। তা না হলে যদি কোনোমতে রোহিঙ্গা শিবির এই এলাকার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নষ্টের জন্যে একটি বিশেষ গোষ্ঠী তৈরির বীজক্ষেত্র হয়, তাহলে সেটা থেকে শেষ অবধি কেউই রক্ষা পাবে না। মনে রাখা দরকার, ইতোমধ্যে কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধান বেশ জটিল হয়ে উঠেছে। 

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ