ডিসির ভিডিও এবং কয়েকটি প্রশ্ন

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৫৫, আগস্ট ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৯, আগস্ট ২৯, ২০১৯

আমীন আল রশীদসোশ্যাল মিডিয়া মানুষের কিছুই আর গোপন রাখছে না। কে কী দিয়ে দুপুরে ভাত খেয়েছেন, সেই ছবি যেমন অন্যরা জেনে যাচ্ছেন, তেমনি আড়ালে আবডালে বসে ‘আপাতনিষিদ্ধ’ বা ‘আপত্তিকর’ অনেক কাজও কারও না কারও ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাচ্ছে। তা সেটি বরগুনা শহরে স্ত্রীর সামনে প্রকাশ্যে স্বামীকে কুপিয়ে হত্যাই হোক, আর খাস কামরায় সহকর্মীর সঙ্গে জামালপুরের ডিসির রোমান্সই হোক। ফলে কোথায় কোথায় যে সিসি ক্যামেরা কিংবা ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনের ক্যামেরা তাক করা আর কখন যে কোথায় কী রেকর্ড হয়ে যাচ্ছে, তা বলা মুশকিল। এর একটি ভালো দিক হলো, অনেক অপরাধী সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা দেখিয়েও আর পার পাচ্ছে না অপরাধ সংশ্লিষ্ট ভিডিও বা প্রমাণ থাকার কারণে। কিন্তু জামালপুরের ডিসির গোপন ভিডিওটি কিছু প্রশ্নেরও জন্ম দিয়েছে।
১. ডিসি সাহেবের খাস কামরায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হলো অথচ তিনি তা জানলেন না, এটা কী করে সম্ভব হলো? সম্ভবত ওটি ছিল ‘স্পাই ক্যামেরা’। যার উদ্দেশ্যই ছিল এই ঘটনার দৃশ্যধারণ করা। অর্থাৎ যারা ক্যামেরা বসিয়েছেন, তারা মূলত একটা ফাঁদ পেতেছেন। তারা জানতেন যে, খাস কামরায় এরকম ঘটনা ঘটে। শোনা যায়, যে নারীর সঙ্গে জেলা প্রশাসকের ওই ভিডিওটি ফাঁস হয়েছে, সেই নারী ডিসির সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদে অন্যদের সঙ্গে এমন আচরণ করতেন, যে কারণে অনেকেই তার ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। হতে পারে সেই সংক্ষুব্ধ ব্যক্তিদের উদ্যোগেই ডিসির খাস কামরায় সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়। ওই নারী ছিলেন ডিসির অফিস সহায়ক। মানে ‘পিয়ন’। এমনও অভিযোগ আছে, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক প্রটোকল ভেঙে ওই নারীকে তার সঙ্গে নিয়ে যেতেন। জামালপুরের একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, ওই নারীকে অনেকে ‘ছায়া ডিসি’ বলে সম্বোধন করতেন।

২. খাস কামরায় এই ক্যামেরা বসানোর দুঃসাহস জেলা প্রশাসকের কোনও একজন কর্মচারীর হওয়ার কথা নয়। এর সঙ্গে একাধিক লোক জড়িত। তাদের মধ্যে ডিসির অত্যন্ত কাছের কর্মচারী, যাদের খাস কামরায় যাতায়াত আছে, তারা এবং সংক্ষুব্ধ আরও একাধিক লোকের যোগসাজশ থাকা স্বাভাবিক। এখন প্রশ্ন হলো যারা ক্যামেরাটি বসালেন, তদন্তে যদি তাদের পরিচয় বেরিয়ে আসে, তাহলে জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্তার ব্যক্তিগত জানালায় উঁকি দেওয়ার ‘অপরাধে’ কি কাদের শাস্তি হবে?

৩. একজন জেলা প্রশাসক জেলার প্রশাসনের সর্বোচ্চ গণকর্মচারী। সারাক্ষণ তাকে কাজের ভারে ন্যুব্জ থাকতে হয়। তাদের আরাম-আয়েসের জন্য রাষ্ট্র অফিস সংলগ্ন আধুনিক বাসভবনের সুবিধা রাখে। কিন্তু তারপরও অফিসের পেছনে খাস কামরা কেন রাখতে হবে? এই খাস কামরার বিধানটি কবে থেকে চালু হলো? কাজ করতে করতে ক্লান্ত হলে তিনি যদি আধা ঘণ্টা বিশ্রামের প্রয়োজন বোধ করেন, তাহলে তার আরামকেদারায় শুয়েই তিনি সেটি করতে পারেন। ওই সময়টুকুতে কেউ যেন কক্ষে প্রবেশ না করেন, সেই নির্দেশনা তার ব্যক্তিগত সহকারীকে দিলেই হয়। এর জন্য ‘খাস কামরা’ নামে একটি আলাদা নির্জন জায়গার মতো ঔপনিবেশিক সুবিধা রাখার তো প্রয়োজন নেই। প্রশ্ন হলো, দেশের সব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের পেছনেই এই খাস কামরা রয়েছে কিনা? যদি থাকে তাহলে এই ঘটনার পরে কি সরকার একটি নির্বাহী আদেশ দিয়ে খাস কামরা অবৈধ বলে ঘোষণা করবে?

৪. ভিডিওতে এটি স্পষ্ট, জেলা প্রশাসক ও ওই নারী যা করেছেন, তা উভয়ের সম্মতিতেই ঘটেছে। দু’জন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ সম্মতিতে যদি শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হন, সেখানে তৃতীয় কারও আপত্তি থাকার কথা নয়। কিন্তু এটি বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় গ্রহণযোগ্য নয়। বিশেষ করে জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কর্মচারী, যার কাছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে আসতে হয় সেবার জন্য, তাদের যে ধরনের নৈতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হয়, তাতে অন্তত কার্যালয়ের ভেতরে এ জাতীয় অতিব্যক্তিগত অধিকার চর্চা বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু এ প্রসঙ্গে এই প্রশ্ন তোলাও অযৌক্তিক নয়, দুজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, তাদের পরিচয় যাই হোক, আইনের দৃষ্টিতে সম্পর্কটি বৈধ হোক আর অবৈধ হোক, তাদের অন্তরঙ্গ হওয়ার দৃশ্যটি ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়াটাই বা কতটা যুক্তিসঙ্গত বা নৈতিক?

৫. যে দু’জনকে নিয়ে এই বিতর্ক, সেই জেলা প্রশাসক ও ওই নারী—উভয়েরই আলাদা পরিবার আছে এবং সমাজে তাদের একটা অবস্থান আছে। এখন এই ঘটনার পরে জেলা প্রশাসকের স্ত্রী ও তার পরিবারের অন্য সদস্যদের মানসিক অবস্থা কী? তারা যে ধরনের মানসিক পীড়ন ও ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, তার জন্য দায়ী কে এবং তারা কীভাবে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাবেন? একই অবস্থা ওই নারীর পরিবারের জন্যও। দু’জন মানুষের ব্যক্তিগত পছন্দ ও সিদ্ধান্তের নিরীহ ভিকটিম হচ্ছে দুটি পরিবার।

৬. ঘটনার পরে অভিযুক্ত জেলা প্রশাসককে ওএসডি করা হয়েছে। অর্থাৎ বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা করা হয়েছে। কার্যত এটি কোনও শাস্তি নয়। কারণ সরকারি কর্মচারীরা ওএসডি হলে তারা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে যুক্ত হন। তাদের বিশেষ কোনও কাজ থাকে না। বরং বসে বসে, লাইব্রেরিতে পত্রিকা পড়ে সময় কাটান। অফিস টাইম শেষ হলে বাসায় চলে যান। বেতনও পান নিয়মিত। শুধু ঘুষখোর কর্মচারীদের জন্য অসুবিধা হয়, তারা এই সময়ে ঘুষ খেতে পারেন না। এটা পুলিশের ক্লোজড-এর মতো। অভিযোগ উঠলে অনেক সময় পুলিশ সদস্যদের পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে বলা হয় তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। তাতে মনে হয় তাদের বিরাট শাস্তি হলো। আদতে তারা নিয়মিতই বেতন পান। সেখানেও ঘুষখোরদের জন্য অসুবিধা, অর্থাৎ ওই প্রত্যাহারকালীন তারা ঘুষটা খেতে পারেন না। বরং কাজ না করে বেতন নেন। এটা একধরনের অবকাশযাপন। অর্থাৎ ওএসডিরা প্রতিদিন নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ে হাজিরা দেন, লাইব্রেরিতে যান, আড্ডা দেন, কিন্তু কাজ না করে বেতন নেন। কাজ না করে বেতন নিলে সেটা হালাল হয় কি? যদি হালাল না হয়, তাহলে এই প্রশ্নও এখন নাগরিকদের পক্ষ থেকে তোলা উচিত, কোনও কর্মচারী ওএসডি বা কোনও পুলিশ ক্লোজড হলে ওই সময়ে তিনি কেন বেতন পাবেন? অর্থাৎ দাবিটা হওয়া উচিত এমন, তিনি অফিসে আসবেন-যাবেন, জরুরি প্রয়োজনে অফিসের কাজ করবেন, কিন্তু জনগণের পয়সায় বেতন ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পাবেন না। যদি তাই না হয়, তাহলে ওএসডি বা ক্লোজড বলতে যে শাস্তির কথা বোঝায়, সেটির কোনও মানে থাকে না। কেউ কেউ অবশ্য রসিকতা করে বলেন, সরকারি কর্মচারীরা ঘুষ খেতে পারবেন না, এর চেয়ে বড় শাস্তি আর কী হতে পারে?

৭. জামালপুরের জেলা প্রশাসকের ওই ভিডিও নিয়ে তোলপাড় ইস্যুতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কিন্তু তারা কেবল ভিডিও সংশ্লিষ্ট বিষয়টিকে প্রাধান্য দেবে। ডিসির বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি সম্পত্তির অপব্যবহারসহ আরও যেসব অভিযোগ আছে, সে ব্যাপারে কী হবে? জেলা প্রশাসক একটি প্রতিষ্ঠান। সেই প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট করার দায়ে তার কী বিচার হবে? মন্ত্রিপরিষদ সচিব সাংবাদিকদের বলেছেন, কমিটি যদি মনে করে অন্য কোনও প্রাসঙ্গিক বিষয়কে টেনে আনা প্রয়োজন অথবা এই বিষয়টি তদন্ত করতে গিয়ে অন্য কোনও বিষয় এসে যায়, তাহলে সেগুলোও তারা তদন্ত করতে পারবে। তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করা হবে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে সচিব বলেন, ‘এটা সময়সাপেক্ষ বিষয়’।

এখানে উল্লেখ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না, সরকারি কর্মচারীরা, বিশেষ করে প্রশাসন ক্যাডারের লোকেরা নিজেদের সুরক্ষিত রাখার সব দরজা ও সব বিকল্প খুলে রাখেন। তাদের ‘নেক্সাস’ এতই শক্তিশালী, তাদের ঘায়েল করা রীতিমতো অসম্ভব। ফলে ভিডিও আছে বলে এ যাত্রায় হয়তো জামালপুরের ডিসি ফেঁসে যাবেন, কিন্তু ভিডিও না থাকলে বা শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হলে হয়তো কোনোদিনই এই ঘটনা মানুষের জানাই হতো না।

সবশেষ কথা হচ্ছে, ভিডিও ফাঁস হলো বলে জামালপুরের ডিসি সাহেব হয়তো ফেঁসে গেলেন। কিন্তু ক্ষমতা দেখিয়ে জুনিয়র সহকর্মীর সঙ্গে এ রকম শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এরকম ভূরি ভূরি ঘটনা আছে। সেটা ডিসি অফিসে যেমন, তেমনি সরকারি-বেসরকারি অন্যান্য প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমসহ সর্বত্রই আছে। কিন্তু সবগুলোর ভিডিও থাকে না। যে কারণে বলা হয়, ‘চুরিবিদ্যা বড় বিদ্যা, যতক্ষণ ধরা না পড়ে।’

লেখক: বার্তা সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টিফোর

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ