কুঁড়েঘরের মোজাফফর: ত্যাগী শেষ নেতার শেষ বিদায়

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৫১, আগস্ট ২৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৬, আগস্ট ২৯, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীসম্ভবত তিনি ছিলেন এই উপমহাদেশের বাম ঘরানার প্রবীণতম শেষ ব্যক্তি। সম্ভবত তার প্রজন্মের শেষ ত্যাগী নেতাও। মহান নেতা কমরেড অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ শেষ বিদায় নিলেন ২৩ আগস্ট ২০১৯। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, অনুরূপ কোনও নেতা আর জীবিত থাকলো না। কুমিল্লা জেলার দেবীদ্বার উপজেলার এলাহাবাদ গ্রামে ১৯২২ সালে তার জন্ম। পিতা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। নিজেও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করে প্রথমে কলেজে, পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। শিক্ষকের সন্তান আর নিজেও শিক্ষক ছিলেন সম্ভবত সেই কারণেই তার আচার-আচরণে শিক্ষক-শিক্ষক ভাব প্রকাশ পেতো। সহজ-সরল জীবন-যাপন করেছেন।
১৯৬৭ সালে ন্যাপ বিভক্ত হওয়ার পর মস্কোপন্থী ন্যাপের পূর্ব পাকিস্তানের সভাপতি হয়েছিলেন কমরেড অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদ। আর অল পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি ছিলেন খান আবদুল ওয়ালী খান। ওয়ালী খান ছিলেন ‘সীমান্ত গান্ধী’ নামে পরিচিত খান আবদুল গাফফার খানের সন্তান। সীমান্ত প্রদেশের তারা নামকরা পরিবারগুলোর মাঝে অন্যতম। আবদুল গাফফার খানের ছোট ভাই ডক্টর খান সীমান্ত প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীও ছিলেন।

কমরেড মোজাফ্ফর ন্যাপ সভাপতি হিসেবে চট্টগ্রামের সভা-সমিতিতে যখন যোগ দিতে যেতেন, তখন থেকেই দেখছি স্টেশন রোডের ওয়াদুদ বোর্ডিংয়ে উঠতেন। সেখানে বাথরুমসহ কামরা ছিল না। বোর্ডিংয়ের গেস্টরা ওই কমন বাথ ব্যবহার করতেন। ভাড়া ছিল পাঁচ টাকা। কোনও রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কখনও চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে এমন হোটেলে উঠেছেন বলে কোনও ইতিহাস নেই। কিন্তু মোজাফফর সাহেব বরাবরই ওয়াদুদ বোর্ডিংয়ে উঠতেন। অথচ তার দলের স্থানীয় অবস্থান মজবুত ছিল। স্থানীয় নেতাদেরও আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল না।

কোন সাল তা মনে নেই এখন। স্টেশন রোডের আরেক হোটেল ওয়্যারলেসে একবার হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, খান আবদুল গাফফার খান, মানকি শরীফের পীর, মিয়া ইফতেখার উদ্দিন চট্টগ্রাম সফরে গিয়ে উঠেছিলেন। এখন যেখানে বিআরটিসি বাস ডিপো আছে চট্টগ্রাম শহরে, সেখানে ছিল ওয়্যারলেস হোটেল। তারা লালদীঘি ময়দানে জনসভা করে পরেরদিন আমার থানা হাটহাজারীর হেডকোয়ার্টারের হাটহাজারী হাই স্কুল মাঠে জনসভা করেছিলেন। তখন আওয়ামী লীগের এত বিভক্তি আসেনি। আওয়ামী লীগ সংযুক্ত ছিল।

অধ্যাপক মোজাফ্ফর কখনও কারও কাছে বোঝা হতে চাইতেন না। খুবই স্বাবলম্বী ছিলেন। পরিকল্পিতভাবেই নিজের জীবন-যাপন করতেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় তিনি তিন কাঠা জায়গা নিয়ে পুরানা পল্টন পানির ট্যাংকের সামনে একটা ছোট বাড়ি করেছিলেন। সারাজীবন কেটেছে সেই বাড়িতে। কোনও পুত্র সন্তান ছিল না বলে শেষ বয়সে গিয়ে একমাত্র কন্যা সন্তানের বারিধারার বাড়িতে উঠেছিলেন। সেখানেই তার শেষ জীবন কেটেছে।

মোজাফফর আহমদ মূলত ছিলেন কমিউনিস্ট আন্দোলনের লোক। কিন্তু অন্যান্য কমিউনিস্ট নেতার মতো তার জীবনেও ব্যাপক কোনও রাজনৈতিক সফলতা নেই। এটা তার একক ব্যর্থতা নয়। এই উপমহাদেশের বড় বড় কমিউনিস্ট নেতাদের সবাই এই ব্যর্থতার অংশীদার। এই উপমহাদেশে যারা মার্কসীয় দর্শনের বিশ্বাস করতেন, তারা সবাই ছিলেন মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোক। আবার উচ্চবিত্তের জমিদার শ্রেণির লোকের অনেকের সন্তানও কমিউনিস্ট আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। মধ্যবিত্ত এবং উচ্চবিত্তের সুবিধাবাদী চরিত্রের কারণে এই উপমহাদেশে বাম আন্দোলন সফল হয়নি।

তেলেঙ্গানা কৃষক বিদ্রোহের পরিসমাপ্তির পর আবার কমিউনিস্টরা সংসদীয় রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে নির্বাচন করেছেন। সুতরাং মার্কসীয় দর্শন মেনে চলতে পারেননি। আর এই উপমহাদেশে ধর্ম বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে রেখেছিল এবং শেষ পর্যন্ত ধর্মের প্রতিবন্ধকতার কারণে মোজাফফর আহমদের মতো লোকও ‘ধর্ম-কর্ম-সমাজতন্ত্র’র কথা বলতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি তিনবার সংসদীয় নির্বাচন করেছেন। দুইবার সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। বিখ্যাত কুঁড়েঘর মার্কা নিয়ে প্রথমবার তিনি পরাজিত করেছিলেন মুসলিম লীগের নূরুল আমিন মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী মফিজউদ্দিনকে।

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ এদেশের একজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তি। তার মতো একজন আদর্শবান, নিরহঙ্কার, নিরভিমান, সৎ চরিত্রের শেষ ব্যক্তিটাও চলে গেলেন। রাষ্ট্র ও তার সহকর্মীরা তার বিদায়ের সময় যতটুকু সম্মান প্রদান করেছেন, তাতে কোনও কৃপণতা ছিল না। গত শনিবার বেলা পৌনে ১১টার দিকে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের প্রতি ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী, মন্ত্রী-এমপি ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। প্রেসিডেন্টের পক্ষে তার সহকারী সামরিক সচিব শ্রদ্ধা জানান। আওয়ামী লীগের পক্ষে দলীয় নেতাদের সঙ্গে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এলাহাবাদ গ্রামও তার বীর সন্তানকে বিদায় দিয়েছে স্মরণীয় ব্যক্তির সম্পূর্ণ মর্যাদায়।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে মোজাফফর ও তার দল সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের তাজউদ্দীন আহমদ, খন্দকার মোস্তাক আহমদ, কংগ্রেসের মনোরঞ্জন ধর, ন্যাপের মোজাফফর আহমদ, কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড মণি সিংহ, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীদের নিয়ে। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ছিলেন উপদেষ্টা পরিষদের আহ্বায়ক। তিনি জাতিসংঘ গিয়েছিলেন বিশ্ব জনমত গঠনে। তার অবদানও কম ছিল না।

স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর দাবি ছিল সর্বদলীয় সরকার গঠন করার। কিন্তু আওয়ামী লীগ তাদের সেই দাবি মানেনি। স্বাধীনতার পর মোজাফফর ন্যাপ, ভাসানীর ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি আর জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ ছিল মূলত বিরোধী দল। পিকিংপন্থী আবদুল হক, মতিন, আলাউদ্দিন, সিরাজ সিকদার প্রমুখের বিপ্লবী সংগঠন ছিল পশ্চিমবঙ্গের নকশাল আন্দোলনের চারু মজুমদারের মতো। এরাই মূলত ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর সংসদীয় গণতন্ত্রের যে সূচনা হয়েছিল, সে ধারাটাকে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি।

শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় বাকশাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ইরাকে, সিরিয়ায়, মিসরে অনুরূপ একদলীয় ব্যবস্থা ছিল তখন। বাকশাল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধু এবং আওয়ামী লীগের ওপর কমরেড মণি সিংহ এবং মোজাফফর আহমদের নাকি প্রভাব ছিল। আবার সোভিয়েত ইউনিয়নেরও পরামর্শ ছিল।

মুজিবনগর সরকারের উপদেষ্টা কমরেড মোজাফ্ফরকে ২০১৫ সালে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ দেওয়া হয়। কিন্তু তিনি সে পুরস্কার বিনয়ের সঙ্গে প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, ‘পুরস্কারের জন্য মুক্তিযুদ্ধ করিনি। দেশের জন্য যুদ্ধ করে পুরস্কার নেওয়া কোনও দেশপ্রেমিকের কাজ নয়।’

মোজাফফর সাহেব পরিণত বয়সে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। সুতরাং পরিতাপের কিছু নেই। একটা হাদিস শরিফে আছে, আল্লাহকে ভালোবাসার ইচ্ছা থাকলে প্রথমে মানুষকে ভালোবাসতে শেখো। অধ্যাপক মোজাফফর মানুষকে ভালোবেসে সারাজীবন রাজনীতি করেছেন। সে উছিলায় আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেবেন, এই প্রার্থনা করি। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ