উন্নয়নের ‘বেদুইন’

Send
আনিস পারভেজ
প্রকাশিত : ১৫:৪২, আগস্ট ৩১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫১, আগস্ট ৩১, ২০১৯

আনিস পারভেজদারিদ্র্য দূরীকরণের রোমান্টিক চিন্তা নিয়ে কিছু ব্যক্তিক উদ্যোগের সংগঠিত রূপ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। উন্নয়ন কর্মের এটি অর্ধেক চিত্রমাত্র। অন্য অর্ধেকে রয়েছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সমাজতান্ত্রিক ফ্রন্টের ক্রমবর্ধমান অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত পুঁজিবাদী পাশ্চাত্য, যারা সবেমাত্র সাম্রাজ্য খুইয়েছে, তাদের সুচিন্তিত কৌশল যাতে উন্নয়নের ঢালে সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখা যায়। শুরু হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৫৩-র V-Aid অর্থাৎ গ্রামীণ সাহায্য প্রকল্প দিয়ে। এশিয়া ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোতে সম্ভাব্য সমাজতন্ত্রকে ঠেকাতে স্বৈরশাসকদের প্রভূত অর্থ দেওয়া হয়। গ্রামীণ সমাজে রিলিফ দিয়ে প্রথমত দারিদ্র্যকে একটা পর্যায়ে স্থান দেওয়া এবং সেই সঙ্গে তৈরি করা একটি তাঁবেদারি গোষ্ঠী, যাদের হাতে গ্রামের কর্তৃত্ব কুক্ষিগত হবে। পাকিস্তানে, যার অংশ ছিল বর্তমানের বাংলাদেশ, স্বৈরশাসক আইয়ুব খান বুনিয়াদি গণতন্ত্রের মুখোশে V-Aid-এর সহায়তায় এ কাজটিই করেছিল।
স্বাধীনতার পরপরই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে জরুরি প্রয়োজন ছিল ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘর ও ভেঙে যাওয়া সড়ক নির্মাণ এবং স্বাস্থ্যসেবা। সরকারের পাশাপাশি দু-একজন ব্যক্তি সীমিত পরিসরে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এগিয়ে আসেন, যেমন- ফজলে হাসান আবেদ ও ডা. মো. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। 

সময়ের যাত্রায় এসব ব্যক্তিক উদ্যোগের ফল এ দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, যেমন- ব্র্যাক, গণস্বাস্থ্য সংস্থা, গ্রামীণ ব্যাংক ইত্যাদি। প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের জন্য এসব সংস্থার প্রয়োজন ছিল অর্থ ও কারিগরি সহায়তা, যা জোগাতে পাশ্চাত্যের দাতাদের অনুপ্রবেশ ঘটে।  

পাশ্চাত্যের দেশগুলো জনগণের করের টাকার একটি অংশ অনুন্নত দেশে প্রথমত দারিদ্র্য বিমোচন এবং ক্রমান্বয়ে অন্যান্য উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করে আসছে উন্নয়নশীল দেশের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা এবং সরকারের মাধ্যমে। অর্থের সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়ন সাহায্য হিসেবে আসে দাতা দেশ থেকে কারিগরি সাহায্য, যা মূলত সে দেশের মানবসম্পদ, যাদের বলা হয় উন্নয়ন পরামর্শক। ১৯৮০’র দশক থেকেই জ্যামিতিক হারে বাড়তে লাগলো বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, যা দেশে কর্মসংস্থান তৈরি করেছে বিশাল আকারে। সমান্তরালে সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে খোলা হয়েছে উন্নয়ন বিদ্যা বিভাগ বা ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ।

অর্থের শক্তি অনতিক্রান্ত। তাই স্বল্প সময়েই দাতানির্ভর হয়ে উঠলো উন্নয়ন কর্ম। দারিদ্র্য দূরীকরণের ব্যক্তিক রোমান্টিক স্পিরিট রূপান্তরিত হলো পেশাদারিত্বে, যা নিয়ন্ত্রিত হতো দাতাদের অনুগ্রহ ও পরামর্শে। দাতারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ফর্মুলায় উন্নয়ন নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষার নামে মূলত একটি প্রাতিষ্ঠানিক ফাঁদ তৈরি করলো। যার প্রধান উদ্দেশ্য দুটি—আন্তর্জাতিক বলয়ে নিজেদের একটি উজ্জ্বল ইমেজ তৈরি করা এবং উন্নয়নশীল দেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে জটিলতর করা। 

উচ্চ বেতনে পাশ্চাত্যের, আসলে দাতা দেশের, পরামর্শকদের রাখা হয়, অনেক ক্ষেত্রেই তাদের বেতন ভাতা বাবদ উন্নয়ন সাহায্যের ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ব্যয় হয়। প্রায়শই এসব পরামর্শক স্বদেশের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশে উন্নয়নের কৌশল চাপিয়ে দেয়, যার কোনও উপযোগিতাই থাকে না এ দেশের প্রেক্ষাপটে। অতি দামি পরামর্শকরা আসেন বছরে কয়েকবার নতুন নতুন পরামর্শ নিয়ে। একবার এসে তারা আয়তক্ষেত্রের কথা বলেন তো পরেরবার এসে তা পাল্টে বলবেন বর্গক্ষেত্রের কথা। তাদের কথামত অবিরত বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল ও কর্মকাণ্ড।   

প্রথম দু’দশক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর স্থায়ী জনবল ছিল, যারা আর দশটি চাকরির মতোই প্রায় আড়াই দশক কাজের নিশ্চয়তা নিয়ে দক্ষতা ও কমিটমেন্ট সুদৃঢ় করে উন্নয়নকর্মে অবদান রাখবে। এ চিত্রটি ৯০-এর দশক থেকে পাল্টে যাচ্ছে। এখন দাতারা প্রকল্পভিত্তিক সাহায্য দেয়—সাধারণত দুই বা তিন বছরের প্রকল্প। প্রকল্পের জন্য জনবল নেওয়া হয়। স্বল্প সময়ের চাকরিতে কমিটমেন্ট আশা করা যায় না। প্রথম ছয় মাস চলে যায় প্রকল্প বুঝতে, এবং শেষ এক বছর ব্যয় হয় পরবর্তী চাকরি খুঁজতে। চাকরি না পেলে দারিদ্র্য তো তাকেও ঘায়েল করবে। এরকম একটি পরিস্থিতিতে উন্নয়ন দূরাহত।

উপরন্তু, দুই বা তিন বছরে প্রকল্প এলাকার লোকজনের মধ্যে একটি সারহীন আশা উসকে দিয়ে সরে পড়ার ফলে উন্নয়ন নিয়ে যেমন জনগণের বিভ্রান্তি হয়, তেমনি উন্নয়নের সঙ্গে অর্থ ও অন্যান্য প্রাপ্তির গন্ধে কিছু ধুরন্ধর লোক নতুন ক্ষমতা বলয় সৃষ্টি করে। খুলনার পাইকগাছায় দেলুতি ইউনিয়ন এ নিরিখে একটি জলজ্যান্ত উদাহরণ। তিরিশ বছর সেখানে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ চলছে। এক দল যায় তো বিরতি দিয়ে অন্য দল আসে। এলাকায় একটি স্বার্থান্বেষী দল তৈরি হয়েছে, কিন্তু তিন দশকে এলাকায় চোখে পড়ার মতো কোনও উন্নয়ন হয়নি।

উন্নয়নকর্মীরা ‘বেদুইনের’ মতো এক প্রকল্প থেকে আরেক প্রকল্পে ঘুরে বেড়ায়, অহর্নিশ তাদের মগজে থাকে চলমান প্রকল্পের পরে অন্য প্রকল্পে চাকরি পাবো তো! আরেকটি 'বেদুইন' দল আছে, উন্নয়ন পরামর্শক, যারা দাতা দেশের নাগরিক—মোটা বেতনে স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যালে গ্রামে যায়, দরিদ্র লোকগুলো তাদের ডাবের পানি দিয়ে আপ্যায়িত করে। বিকেলে এসব 'বেদুইন' হোটেলের সুইমিংপুলে শরীর জুড়ায়।

লেখক: যোগাযোগ ও সিনেমা গবেষক।  

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ