কী ইঙ্গিত দেয় উত্তর-পূর্বের বাতাস

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৩:৫৪, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৫, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনআসামে নাগরিক তালিকা প্রকাশের পর আরেকটি উদ্বেগ তৈরি হলো। ১৯ লাখ মানুষের রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়ার উপক্রম হয়েছে সেখানে। যদিও ভারত সরকার নাগরিকত্ব থেকে বাদপড়াদের বিষয়ে আইনি সুবিধা খোলা রেখেছে। বাদপড়া নাগরিকরা আপিল করতে পারবেন আগামী ১২০ দিনের মধ্যে। বাস্তবতা হচ্ছে—আসামের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের বক্তব্য অনুযায়ী, সেখানে এক-তৃতীয়াংশ মানুষই অভিবাসী। তারা বাংলাদেশ থেকে গেছে। সুতরাং এর পরিণতি বিষয়ে বাংলাদেশকে ভাবতেই হবে। এর কারণও আছে।এর আগে তারাই বলেছে, আসামের অনুপ্রবেশকারীদের তারা বাংলাদেশে ফেরত পাঠাবেন। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশকারী’ আসামের এই জনগণ। ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বক্তব্য থেকে সরে এসেছেন, এমন তথ্য নেই। সুতরাং ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আসামের নাগরিত্বের বিষয়টি যতই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় আখ্যায়িত করেন না কেন, এরপরও একটা শঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়।
গত শতকের আশির দশকে আসামে বাঙালি খেদাও ছাত্র আন্দোলন থেকে ওদের এখানে অভিবাসীদের বাংলাদেশের মানুষ হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়েছিল। আবার ধর্মীয় দিক থেকে বিবেচনা করলে দেখা যাবে,  দেশটির এই মানুষগুলোর অধিকাংশই মুসলমান।

যদিও রাষ্ট্রহীন হিসেবে পরিণত হওয়া মানুষগুলোর থাকার জন্য সেখানে আলাদা ক্যাম্প স্থাপন করা হচ্ছে, এরপরও আশঙ্কা কিন্তু থেকে যায়। এই মানুষগুলো কি শুধু ক্যাম্পেই জীবনভর কাটাবে, নাকি তাদের ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করা হবে।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ভারত সুসম্পর্ককে সামনে এনে কেউ হয়তো বলতে পারেন, ভারত অন্তত এমন কোনও উদ্যোগ নেবে না, যেন বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের অবনতি হয়। কিন্তু এও অনুমান করা যায়, হয়তো ভারতীয় রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহার হবে এই অভিভাসীরা। বাংলাদেশকে চাপে রাখার জন্য পরোক্ষ অস্ত্র হিসেবে কাজ করতে পারে এই ইস্যুটি। অন্যদিকে, কট্টর হিন্দুদের ভোটের ভাগটাও যেন মোদির দলের দিকে যায়, সেই চেষ্টাও হতে পারে। কিন্তু সেখানে তাদের আদর্শিক বিষয়টি ভাবনার বিষয়। হিন্দুত্ববাদী বিজেপি যে কাজটি করছে, সেটা তো তাদের রাজনৈতিক আদর্শকে ধারণ করেই। তারা নিজেরাই তো সাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী। সেক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক কর্মসম্পাদনের মাধ্যমেই তো তাদের আদর্শকেই বাস্তবায়ন করা হবে।

ভারত সরকার বলেছে, যারা নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, তাদের আপিল করার সুযোগ থাকবে। ১০০টি আপিল কেন্দ্র গঠিত হয়েছে। আরও ২০০টি গঠিত হবে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে। কিন্তু নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য যেসব শর্ত আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো দেখানো তাদের কতজনের পক্ষে সম্ভব হবে, সেটা সন্দেহমুক্ত নয়। ১৯৫১ সালে এনআরসি একটি নাগরিক তালিকা করেছিল, সেই কাগজপত্র কি কারও সংগ্রহে থাকার কথা? এরপর সেই মানুষগুলোর কেউ হয়তো ৫০-৬০ বছর ধরে সেখানে বসবাস করছে, তারা সেখানকার নাগরিক সুবিধাদি ভোগও করে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে তাদের নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে হবে আবারও। ইতোমধ্যে টাইম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, এই ১৯ লাখের অনেকেই ভূমিহীন। কেউ হয়তো রিকশা চালায় কিংবা ক্ষেত মজুর হিসেবে জীবনযাপন করে। তাদের নিজের জীবনেরই যেখানে শৃঙ্খলার ঘাটতি আছে, সেখানে কবে তারা কী কাগজপত্র পেয়েছে, সেটা কি তারা দেখাতে পারবে?

সেক্ষেত্রে এই মানুষগুলোর প্রায় সবাই যে রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়বে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আসামের ছাত্র আন্দোলনের কথা বলা হলেও এই পদক্ষেপটিকে কেউ কেউ সাম্প্রদায়িকতা হিসেবেই দেখছেন। তাদের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্যকেই তারা উল্লেখ করছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, অবৈধ অভিভাসীদের মধ্যে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা নাগরিকত্ব পাবে। প্রশ্ন হচ্ছে, একটা দেশের আইনের ক্ষেত্রে হিন্দু কিংবা মুসলমান বিভাজন করা কি চরম সাম্প্রদায়িকতা নয়?

আসাম ছাত্র আন্দোলন নিরসনে চুক্তি হলেও তা একসময় চাপা পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু গত নির্বাচনের আগে বিজেপি বিষয়টিকে আবার চাঙ্গা করে। মূলত সেই সূত্র ধরেই তারা নাগরিক তালিকার পদক্ষেপ নেয়।

তারা এমনটা বলছে না, এই মুহূর্তেই রাষ্ট্রহীন মানুষগুলোকে বাংলাদেশে ঠেলে দেবে। বাংলাদেশ হয়তো আপাতত আশ্বস্তও হতে পারে,  দেশটির হতভাগাদের আবাসন ব্যবস্থার জন্য। তাদের নির্দিষ্ট ক্যাম্পে জীবনযাপনের ব্যবস্থা করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। কিন্তু বিজেপির বক্তব্য অনুযায়ী যদি কাজ করা হয়, তাহলে বাংলাদেশের উদ্বেগের কারণ অবশ্যই রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের বর্তমান সরকারও বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, এমনটাই প্রতীয়মান হয়। সেরকম অবস্থায় রাষ্ট্রহীন হয়ে পড়া মানুষগুলোকে তারা বাংলাদেশে ঠেলে দিতে পারে?

তারপরও বাংলাদেশের বিষয়টি নিয়ে ভাবনাহীন থাকার কি সুযোগ আছে? এমন পরিবারও সেখানে আছে, যাদের তিন-চার পুরুষ আগে থেকেই সেখানে বসবাস। তাদের বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার পক্ষে কোনও কাগজপত্র কিংবা প্রমাণও নেই। এমতাবস্থায় তাদের যদি বাংলাদেশে পাঠানোর চেষ্টা করা হয়, সেটা কোন যুক্তিতে বাংলাদেশ গ্রহণ করবে? সেক্ষেত্রে ভারতের এমন উদ্যোগ সরাসরি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হবে।

কাশ্মির শাসনের ভিত্তি শক্তিশালী করার জন্য ভারতে সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল হয়েছে। ভূস্বর্গ কাশ্মির এখন ঘুমন্ত জগতের উদাহরণ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে বিষয়টি নিয়ে। এর মধ্যে আসামে নাগরিকত্ব ইস্যুটি সেই আলোচনাকে আরেক ধাপ উসকে দেবে। বাংলাদেশকেও রোহিঙ্গা সমস্যার পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশের আচরণকে পর্যবেক্ষণ করতে হবে নিবিড়ভাবে। আর অঘটন ঘটার আগেই যদি আশঙ্কামুক্তির পথ থাকে, সেটিও ভাবতে হবে আন্তরিকভাবে। অন্তত বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বে ফাটল ধরতে পারে, এমন কিছু নিশ্চয়ই বাংলাদেশ আশা করে না। সেটাই দেখার বিষয়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ