চাই আশীর্বাদের হাত!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৬:০২, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:০৩, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯

রেজানুর রহমানএকজন রানু মণ্ডলই তো দেখি দুনিয়া কাঁপিয়ে দিলেন। ছিলেন ভবঘুরে। লোকে তাকে পাগলি বলে ডাকতো। ভারতের পশ্চিম বঙ্গের বিভিন্ন রেলস্টেশনসহ নানা জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। দুমুঠো খাবার জোগাড় করার জন্য মানুষের কাছে হাত পাততেন। কেউ দিতো, কেউ দিতো না। অনেকেই দুর দুর করে তাড়িয়ে দিতো। রানু মণ্ডলের থাকার কোনও জায়গা ছিল না। কাজেই যেখানে রাত সেখানেই কাত। রানু মণ্ডল দেখতে কালো। তবু তিনিই জগতের আলো হয়ে উঠেছেন। এই পাগলির গানের গলা সুন্দর। পথেঘাটে অন্যের গান শুনতে শুনতে নিজেই একদিন গায়িকা হয়ে ওঠেন। কিন্তু রাস্তার পাগলি বলে কেউ তাকে পাত্তা দিতো না। ভিড় করে গান শুনতো ঠিকই। দু’চার পয়সা হয়তো ভিক্ষা দিতো। ওই পর্যন্তই...কিন্তু প্রতিভার আগুন তো কোনও কিছুতেই চাপা থাকে না। একদিন না একদিন ঠিকই বেরিয়ে পড়ে। তেমনি পাগলি রানু মণ্ডলের প্রতিভার দ্যুতিও ছড়িয়ে পড়েছে। রাস্তায় পড়ে থাকা কৃষ্ণ কালো রঙের এক পাগলির ঠিকানা এখন বৃহৎ প্রাসাদে। ভারতসহ বিভিন্ন দেশে চলছে রানু মণ্ডলের বন্দনা। ভারতের জীবন্ত কিংবদন্তি গায়িকা লতা মুঙ্গেশকারের একটি গান গেয়ে রানু মণ্ডল পৃথিবীব্যাপী এতো জনপ্রিয় হন। রেলস্টেশনে দাঁড়িয়ে গাওয়া পাগলি রানু মণ্ডলের এই গানটি মোবাইল ফোনে ভিডিও করেন একজন তরুণ এবং তিনিই গানটি ফেসবুকে ছেড়ে দেন। সঙ্গে সঙ্গে গানটি দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যস বদলে যায় পাগলি রানু মণ্ডলের জীবন। রেলস্টেশনে জীবন কাটানো এক ভবঘুরে মহিলা এখন রানির মর্যাদা পাচ্ছেন। ইতোমধ্যে বলিউডের সিনেমায় গানও গেয়ে ফেলেছেন। তার জীবনকাহিনি নিয়ে সিনেমা নির্মাণের ঘোষণাও এসেছে ইতোমধ্যে। বলিউডের জনপ্রিয় নায়ক সালমান খান ঘোষণা দিয়েছেন এখন থেকে ৫৫ লাখ রুপির একটি আধুনিক ফ্ল্যাট হবে রানু মণ্ডলের। সালমান খান এই ফ্ল্যাটটি রানু মণ্ডলকে উপহার দিয়েছেন।

রানু মণ্ডলকে নিয়ে এই কথাগুলো লেখার সময়ও বিশ্বাস হচ্ছিল না যে কথাগুলো সত্যি! এও কি সম্ভব? রাস্তার এক ভবঘুরে পাগলি মহিলা, যাকে দেখলে মানুষ একদিন ‘দুর ছাই’ ব্যবহার করতো, সেই কিনা এখন রানির মর্যাদায় আসীন। রানু মণ্ডল এখন যেখানেই যায়, সেখানেই ভিড় সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে। তাকে এক নজর দেখার জন্য সাধারণ মানুষের সে কী আকুলতা! শুধু কি সাধারণ মানুষ? সমাজের ওপর তলার মানষেরাও রানু পাগলির দারুণ ভক্ত হয়ে উঠেছে। রানুর সঙ্গে একটা সেলফি তুলতে পারলেই যেন জাতে ওঠার রাস্তা পরিষ্কার। প্রশ্ন উঠতেই পারে, হঠাৎ করে রাস্তার একজন পাগলি কী করে এত জনপ্রিয়তা পেলো? কী এমন জাদু দেখালেন রানু মণ্ডল যে সবাই এখন রানু বলতেই পাগল। এই প্রশ্নের একটাই উত্তর—গানের প্রতিভার জাদু দেখিয়েছেন রানু মণ্ডল। রানুর গানের গলাই তাকে আজ গানের রানির আসনে দাঁড় করিয়েছে।

রানু মণ্ডলের নতুন জীবনের গল্পের ডালপালা আপাতত এটুকুই বেড়েছে। তাই এখানেই বোধকরি লেখাটি শেষ করা যায়। কিন্তু আমার যেন বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। এটা কি স্বপ্ন না বাস্তব? পথের ভিখারি একজন  মহিলা হঠাৎ রানির মর্যাদা পেয়ে গেলো? রানু মণ্ডলের মতো এমন কত শত প্রতিভাই না পথেঘাটে ঘুরে বেড়ায়। সবাই কি শেষ পর্যন্ত যোগ্য মর্যাদা পায়? এই যে রানু মণ্ডল শেষ পর্যন্ত যোগ্য মর্যাদা পেলো, সেটা কি ভাগ্যের গুণে, নাকি তার গানের গলার গুণে? আমাদের দেশে কি এমন রানু মণ্ডল নেই? কিছুদিন আগে ফেসবুকেই একজন ছিন্নমূল কিশোরকে গান গাইতে দেখেছিলাম। অসাধারণ তার গানের গলা। ফেসবুকে অনেকেই তার গানের গলার প্রশংসা করেছেন। পরে তাকে ঘিরে আর কোথাও কিছু দেখিনি। আমাদের ব্যান্ড সংগীতের কিংবদন্তি তারকা আইয়ুব বাচ্চুর জীবদ্দশায় জুনিয়র এক আইয়ুব বাচ্চুর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। আইয়ুব বাচ্চুর সঙ্গে সে গানও গেয়েছিল। ‘তুমি একদিন অনেক বড় তারকা হবে’—ছেলেটির ব্যাপারে এমনই আশীর্বাদ করেছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। জানি না প্রতিভাধর এই ছেলেটির খবর কী? সে কি এখনও গানেই আছে? দেশ বরেণ্য টিভি ব্যক্তিত্ব হানিফ সংকেত এক রিকশাওয়ালাকে গায়ক হিসেবে আবিষ্কার করেছিলেন। তার নাম আকবর। ভারতের রানু মণ্ডলের মতো আকবরও সেই সময় ব্যাপক আলোচনায় উঠে এসেছিলেন। এখন তো দেখি তারও তেমন কোনও খবর নেই। একটি রিয়েলিটি শো’র মাধ্যমে নোলক নামে একজন প্রতিভাধর তরুণ গায়কের আবির্ভাব ঘটেছিল আমাদের দেশে। ধন্য ধন্য রব পড়ে গিয়েছিল তাকে ঘিরে। হঠাৎই নোলক যেন গানের জগৎ থেকে হারিয়ে যান। কয়েক বছর বিদেশে কাটিয়ে নোলক আবার দেশে ফিরে এসেছেন। নতুনভাবে নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছেন। অতি সম্প্রতি রানা নামে এক কিশোর গায়কের গান নিয়ে পর পর তিনটি মিউজিক ভিডিও বানিয়েছেন তবিব নামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী। কেরানীগঞ্জে একটি গ্যারেজে কাজ করে কিশোর গায়ক রানা। তার র‌্যাপ গানে মুগ্ধ হয়ে তবিব ‘গলি বয়’ নামে পর পর ৩টি মিউজিক বানিয়ে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে ছেড়েছেন। ইউটিউবে অনেক শ্রোতা রানার গান শুনেছেন। এর ফলে রানা কতটুকু লাভবান হয়েছেন তা স্পষ্ট নয়।

এমন আরও অনেক শিল্পী রয়েছেন আমাদের দেশে। কেউ কেউ রানু মণ্ডলের মতোই প্রতিভাধর। কিন্তু প্রতিভা বিকাশের পথ হয়তো খুঁজে পাচ্ছেন না। এখন প্রশ্ন হলো, এই খুঁজে পাওয়া ও খুঁজে বের করার প্রক্রিয়া কী? আমাদের দেশে একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল সঙ্গীত, নাটকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন প্রতিভা তুলে আনার জন্য নিয়মিত রিয়েলিটি শো’র আয়োজন করে আসছে। এক্ষেত্রে চ্যানেল আইয়ের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এ কথা স্বীকার করতেই হবে, বর্তমানে দেশের নাটক, সঙ্গীতসহ সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমে যারা শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে চলেছেন, তাদের অধিকাংশই চ্যানেল আইয়ের বিভিন্ন রিয়েলিটি শো থেকে উঠে আসা তারকা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের পত্র-পত্রিকাসহ টিভি মিডিয়ায় দেশের তারকাদের নিয়ে তেমন আলোচনা হতে দেখি না। কলকাতার জি বাংলা অথবা অন্যান্য টিভি চ্যানেল থেকে উঠে আসা তারকাদের ব্যাপারে আমরা যতটা লেখালেখি করি, প্রচার চালাই, তার ছিটেফোঁটাও বোধকরি দেশের তরুণ প্রতিভাবান তারকাদের বেলায় হয় না। আমার এক বন্ধু রীতিমতো তর্ক করার ভঙ্গিতে বললো, শোনো তোমাকে একটা অপ্রীতিকর কথা বলি। জি বাংলায় নাম লিখিয়ে আমাদের নোবেল অনেক জনপ্রিয় হয়েছে। সে জি বাংলার প্রতিযোগী বলে আমরা উদারভাবে তার জন্য লিখেছি। কিন্তু সে যদি বাংলাদেশের কোনও টিভি চ্যানেলের গানের প্রতিযোগিতায় নামতো, তাহলে দারুণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও প্রচার পেতো কিনা সন্দেহ। কারণ আমরা অনেকেই নিজ দেশের প্রতিভাকে প্রতিভা মনে করি না। অবস্থাটা এমন—‘ঘরকা মুরগি ডাল বরাবর’। আমরা অনেকেই নিজের স্ত্রীর চেয়ে অন্যের স্ত্রীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ থাকি। নিজেরা নিজেদের প্রশংসা করতে হয়তো দ্বিধা করি। অথবা ঈর্ষাকাতর থাকি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন তরুণ গায়ক বললেন, নিজের প্রতিভা সম্পর্কে আমি অনেক সচেতন। খুব যে ভালো গান গাই, তা বলবো না। তবে আমি চেষ্টা করি। মাঝে মাঝে মন চায় আমার এই চেষ্টাকেই বয়োজ্যেষ্ঠদের কেউ একজন প্রশংসা করুক। বলুক চেষ্টা করো, তুমি পারবে...কিন্তু তেমন করে কেউ বলে না। একজন তরুণ সাহিত্যিক বললেন, আমি ছোট গল্প লিখি। মাঝে মাঝেই বিভিন্ন দৈনিকে আমার ‘ছোট গল্প’ ছাপা হয়। তখন বন্ধুদের মুখে শুনি তোর গল্প দেখলাম। আরে ভাই গল্প তো দেখার বিষয় না, পড়ার বিষয়। পড়েই না বলবি গল্পটা কেমন হয়েছে।

এ কথা সত্য, আমাদের দেশে সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে উৎসাহ দেওয়ার মানুষ যেন কমে যাচ্ছে। প্রসঙ্গক্রমে ফেসবুকে দেওয়া অনুজ প্রতিম সাংবাদিক তানভীর তারেকের একটি লেখার কিছু অংশ তুলে ধরছি। তানভীর তারেক লিখেছেন, “আচ্ছা, আমাগো ‘গলি বয়’ রানার মাথায় কেউ কি একবার হাত দিলো? কোনও শিল্পী? গায়ক-গায়িকা কী উইশ করলো? শুনলাম না তো। সালমান খান নাকি রানু মণ্ডলকে ৫৫ লাখ টাকার ফ্ল্যাট দিলো। আমাদের শাকিব কি তার ফিল্মে আমগো রানারে একখান প্লেব্যাকের আশ্বাস দিছে...? কোনো তুলনা করছি না। বাট ওই রানু আর রানার প্লট একই। কিন্তু ওরা রানুকে ক্যাশ করে ভ্যালু অ্যাড করে ফেলেছে ওদের শোবিজে। বাট রানাকে আমরা পারি নাই। তানভীর আরও লিখেছেন, হে লিজেন্ড সম্প্রদায় ইতিবাচক প্রজন্মের হাতে বা কপালে আপনি চুমু না খেলে মৃত্যুর পর জানাজার সাথে সাথেই হয়তো হারিয়ে যাবেন। আপনাকে বয়ে নিতে হলে অনেকের মাথায় হাত রাখতে হবে। ওরাই আপনাকে মিছিল বানাবে, আপনার না থাকা জীবনে...”

আজকের লেখাটা এখানেই শেষ করি। ভালো থাকবেন সবাই।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ