এই সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্ক হলেই বা লাভ কী?

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৮:১৯, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২৩, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমানআমরা কি আদৌ একটি কার্যকর সংসদ চেয়েছি? কিংবা এই সংসদ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠুক, তা চেয়েছি? আমার মতে, এসব প্রশ্নের এককথায় উত্তর হবে ‘না’।
এই কয়েক দিন আগেই ব্রিটেনে গণতন্ত্রের একটা ভয়ঙ্কর স্খলন এবং অসাধারণ সৌন্দর্য দেখা গেলো। দীর্ঘদিন থেকেই তারা ব্রেক্সিটের জন্য একের পর এক চুক্তিতে পৌঁছার চেষ্টা করেছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে, কিন্তু সেটা সফল হয়নি। এর জের ধরে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে-কে পদত্যাগই করতে হয়েছিল। এরপর প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন বরিস জনসন। তিনি ব্রেক্সিটের ব্যাপারে প্রচণ্ড কট্টরপন্থী। এমনকী কোনও চুক্তিতে পৌঁছতে ব্যর্থ হলেও চুক্তি ছাড়াই ৩১ অক্টোবরের মধ্যে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার জন্য পণ করেছেন তিনি।
চুক্তি ছাড়া ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে বেরোনোর উদ্যোগ পার্লামেন্টে প্রচণ্ড বিরোধিতার মুখে পড়বে, এটা জেনে ব্রেক্সিট নিশ্চিত করার জন্য জনসন এক ক্ষমতা ব্যবহার করলেন, যেটা করাটা আইনত সম্ভব হলেও, ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটা ব্যবহার করার নজির নেই। তিনি রানিকে অনুরোধ করেছেন আগামী দেড় মাস সংসদ যেন না বসে। রানি সেটা অনুমোদন করেছেন (এটা আসলে অনুমোদন করা ছাড়া রানির আর কোনও অপশনই নেই)। ব্রিটেনের অসাধারণ গণতান্ত্রিক রাজনীতির এক ভয়ঙ্কর স্খলন হিসেবে বিষয়টিকে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্রিটেনের বিভিন্ন অংশে তুমুল প্রতিবাদ-বিক্ষোভ চলছে।

এই ঘটনাই আবার ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অসাধারণ সৌন্দর্য আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। জনসনের এই পদক্ষেপকে পাল্টে দেওয়ার জন্য বিরোধী লেবার পার্টি তো বটেই, ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দলের বেশ কিছু এমপিও একাট্টা হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় স্বার্থে ক্ষমতাসীন সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকার দলীয় এমপিরাও দাঁড়াচ্ছেন–এটা সংসদীয় গণতন্ত্রের এক অসাধারণ সৌন্দর্য।

কিছুদিন আগে টিআইবি পার্লামেন্ট ওয়াচ নামের রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। টিআইবির রিপোর্টে দেখা যায়, বাংলাদেশের আইন সভার সদস্যরা বাজেট অধিবেশন ছাড়া আইন প্রণয়নের জন্য সময় ব্যয় করেছেন মাত্র ১২ শতাংশ। একটি বিল পাস করতে গড়ে সময় লেগেছে প্রায় ৩১ মিনিট। অথচ প্রতিবেশী দেশ ভারতে ষোলতম লোকসভায় প্রতিটি বিল পাসের আলোচনায় গড়ে ১৪১ মিনিট ব্যয় হয়। যা আমাদের প্রায় পাঁচগুণ।

দশম সংসদে তিন-চতুর্থাংশের বেশি সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র ৩১ শতাংশ সদস্য, আর মন্ত্রীদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশ কার্যদিবসের বেশি উপস্থিত ছিলেন মাত্র ১৭ শতাংশ।

অনুপস্থিত থাকার এই মানসিকতার কারণে বার বার হয়েছে কোরাম সংকট। ৩৫০ সদস্যবিশিষ্ট সংসদে কোরাম পূর্ণ হতে লাগে মাত্র ৬০ জন। দশম সংসদের অধিবেশনে মোট ১৯৪ ঘণ্টা ৩০ মিনিট কোরাম সংকটের কারণে অপচয় হয়, যা ২৩টি অধিবেশনের প্রকৃত মোট সময়ের ১২ শতাংশ। কোরাম সংকটের কারণে অপচয় হাওয়া মোট সময়ের অর্থমূল্য ১৬৩ কোটি ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬৩ টাকা।

সংসদ সদস্যদের হাতে টিআর-কাবিখার মতো প্রকল্প এবং সংসদ সদস্যদের উপজেলা পরিষদের উপদেষ্টা করার মাধ্যমে সেখানে সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অন্তর্ভুক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাদের এমপি হিসাবে মূল কাজ অর্থাৎ আইন প্রণয়ন-সংশোধন, রাষ্ট্রীয় নীতি পর্যালোচনা-প্রণয়ন-পরিবর্তন, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে সরকারকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা, এসব বিষয়ের প্রতি অনাগ্রহী করে তোলে। এসব ‘লোভে’ যে সব মানুষ এমপি নির্বাচিত হন, তাদের বেশিরভাগেরই এসব বিষয়ে কথা বলার বা কাজ করার যোগ্যতা নেই।

কিন্তু আলোচনার খাতিরে ধরে নিলাম, সংসদ সদস্যদের এসব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হলো এবং সত্যিকার অর্থেই সংসদের ভূমিকা রাখার মতো যোগ্য, রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত মানুষরা সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে আসতেন। তাহলেও কি এই সংসদ আসলে মানুষের সঠিক কল্যাণের জন্য কাজ করতে পারতো?

শুরুর দিকে ব্রিটেনের সংসদের কথা বলছিলাম প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তার দলের এমপিরাও বিরোধী দলের সঙ্গে কাজ করছেন। এ রকম পরিস্থিতি বাংলাদেশে কল্পনাও করা যায় না। শুধু তাই নয়, অতি তুচ্ছ কোনও বিলেও কোনও সংসদ সদস্যরা তাদের দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারেন না। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এই প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছে। অনুচ্ছেদটি একটু দেখে নেওয়া যাক– 

৭০। কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনও ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি—

(ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা

(খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন,

তাহা হইলে সংসদে তাহার আসন শূন্য হইবে, তবে তিনি সেই কারণে পরবর্তী কোনও নির্বাচনে সংসদ-সদস্য হইবার অযোগ্য হইবেন না।

৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা যখন উঠলোই, তখন একটা বিষয় নিয়ে একটু কথা বলা দরকার। এটা এই কলাম এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়। কিন্তু এটাও বাংলাদেশ একটা অদ্ভুত জটিলতা তৈরি করেছে। এই অনুচ্ছেদের ক) ধারায় বলা হয়েছে ‘কোনও সংসদ সদস্য যদি দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল হবে’– এর মানে বহিষ্কৃত হলে তা হবে না। এটা আমাদের দেশে বেশ কয়েকবার জটিলতা তৈরি হয়েছে। পদত্যাগের কারণে যেই স্পিরিটে সংসদ সদস্যের সদস্যপদ বাতিল হয় (সংসদ সদস্য ভোট পান একটা প্রতীককে সামনে রেখে) ঠিক একই স্পিরিটে বহিষ্কৃত হলেও সেই পদ বাতিল হওয়া উচিত।

আমরা এই দেশের তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ান বললে হাতেগোনা কিছু মানুষের নাম আমাদের সামনে আসে। ধরে নিলাম, অতীতের অনেক তুখোড় পার্লামেন্টারিয়ানের মতো অনেক পার্লামেন্টারিয়ান বিরোধী দলে আছেন। এটাও ধরে নিলাম, এই সংসদ একটা অংশগ্রহণমূলক, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে।

এমন একটা সংসদে এবং অসাধারণ সব পার্লামেন্টারিয়ান থাকার পরও অসাধারণ যুক্তিতর্ক করা হলেও আদৌ কোনও লাভ কী আছে? সম্ভব কি জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য সত্যিকার অর্থে সংসদকে ব্যবহার করার?

টিআইবির রিপোর্টের খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য হলো–সংসদে আইনের ক্ষেত্রে বিরোধীদলের যে সব পরামর্শ নেওয়া হয়েছে, সেগুলো শুধু বাক্যের গঠন এবং বিরাম চিহ্ন পরিবর্তন সংক্রান্ত।

আমি মনে করি, বিদ্যমান অবস্থায় ৭০ অনুচ্ছেদ রেখে সংসদকে কোনোভাবেই জনগণের কল্যাণের জন্য কাজে লাগানো যাবে না। সেই সংসদে কেউ যুক্তি-প্রজ্ঞা-জ্ঞান-তথ্য দিয়ে দুর্দান্ত বিশ্লেষণ করলে দুর্দান্ত পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে তার খ্যাতি আসতে পারে, এর বেশি কিছু হবে না।

অনেকেই ৭০ অনুচ্ছেদ পুরোপুরি তুলে দেওয়ার কথা বললেও এর পক্ষে নই আমি। অনাস্থা ভোটের ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া গেলে কী হতে পারে, সেটা আমরা এমনকী আমাদের পাশের দেশ ভারতেও দেখেছি। তাই ‘হর্স ট্রেডিং’ বন্ধ করার জন্য ৭০ অনুচ্ছেদ থাকা উচিত। তবে, তাতে বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারানোর ক্ষেত্রে শুধু অনাস্থা ভোট এবং সেই সঙ্গে ট্রেজারি বিল থাকতে পারে। এছাড়া, আর সব ক্ষেত্রে দলের বিপক্ষে ভোট দিলে সংসদ সদস্য পদ হারাতে হবে না, এই বিধান থাকতে হবে।

আমি এটা মনে করি না একটা সংশোধনী আসা মানেই দলের এমপি’রা খুব সহজেই দলের বিরুদ্ধে ভোট দিয়ে দেবেন। ধীরে ধীরে সেই চর্চাও শুরু হবে। এই পদক্ষেপ আমাদের রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠার পথে একটা বড় মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই দেশে সরকারগুলো তাদের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত রাখার স্বার্থে এমন মাইলফলক স্থাপন করতে চাইবে, সেই আশা নেই প্রায়, তবে জনগণের উচিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর এই চাপ জারি রাখা।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ