‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৭:১২, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৩, সেপ্টেম্বর ০৫, ২০১৯

স্বদেশ রায়ছোট ভাই অলক বসু। তরুণ বয়সে যখন সচিত্র সন্ধানীতে কাজ করি, অলকও তখন যুক্ত ছিল সচিত্র সন্ধানীতে। সন্ধানীর শেষ পাতায় ওর লেখা নাটকের সমালোচনা থাকতো। ছাপা হওয়ার আগেই আমাকে সেটা পড়তে হতো। তবে শেষ পাতার লেখা হলেও পড়তে হতো আগে। কারণ, পত্রিকার প্রথম দিকে রাজনীতি। সে লেখাগুলো আসতো একেবারে শেষ মুহূর্তে। আর আতাউস সামাদ ভাই ও আমি থাকার কারণে সন্ধানীতে তখন একটু রাজনীতি ভারী হয়ে উঠেছিল। রফিকুল ইসলাম স্যার তো একদিন গাজী ভাইকে (সন্ধানী সম্পাদক গাজী শাহবুদ্দিন) বললেন, গাজী, সন্ধানী একটু বেশি পল্টনের দিকে হাঁটছে না! গাজী ভাই আমাকে দেখিয়ে বললেন, তাকে আর খোকনকে (আতাউস সামাদ) বলো। স্যার আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বাস্তবে গাজী ভাই ছিলেন ৯৮ ভাগ সাহিত্য ও সংস্কৃতিসেবী, ২ ভাগ রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট। তার রাজনীতি বলতে ছিল স্বাধীনতার আগে ও পরে বঙ্গবন্ধু এবং তারপরে শেখ হাসিনা। তিনি বলতেন, রাজ্জাক ঠাজ্জাক ( আব্দুর রাজ্জাক) এরা কাপুরুষ। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পরে তাদের আর রাজনীতি করা উচিত নয়। তাই গাজী ভাইয়ের কারণে সন্ধানী ছিল প্রকৃত অর্থে সাহিত্য ও সংস্কৃতির আড্ডার জায়গা। পত্রিকাটি ছিল ওই আড্ডার ফসল। বাঙালিকে আড্ডাপ্রিয় জাতি বলে ঠাট্টা করা হয়, কিন্তু আড্ডার যে প্রাণরস আছে, আড্ডা একজন মানুষকে পরিবর্তন ও পরিশীলিত করতে পারে, তাকে নিয়ে যেতে পারে মনোজগতের একটি গভীর প্রদেশে, সেটা সৃষ্টিশীলতার প্রদেশ—তা মনে হয় জীবনে সচিত্র সন্ধানী’র আড্ডায় বছরের পর বছর না কাটালে বুঝতাম না। বরং আমিও বাঙালি আড্ডাপ্রিয় বলে কষে গালি দিয়ে কখনও হয়তো একটা প্রবন্ধ লিখে দুই পয়সা কামিয়ে নিতাম। বিকালে সন্ধানীর আড্ডাটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যেতো। একটি সিনিয়রদের, আরেকটি নবীনদের। অলক ছিল বিকালের নবীন তরুণদের আড্ডার এক কুশীলব। তার গলার স্বরটি বেশ ভালো লাগতো। আর তার প্রতি শুধু ছোট ভাই হিসেবে নয়, তার লেখা পড়ে পড়ে একটা ভালোবাসা জন্মে গিয়েছিল। তার নাটকের সমালোচনাগুলো পড়তে পড়তে মনে হতো, অলক শুধু নাটককে ভালোবাসে না ও পুরোপুরি নাটকের মানুষ।

যাহোক, বাংলাদেশে সন্ধানী যুগ নানানভাবে শেষ হয়েছে। এখন আর সে স্মৃতিচারণ নয়। আমরাও সবাই বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে সন্ধানী ছেড়েছি। তারপরে সবাই নানান দিকে ছড়িয়ে পড়েছি। অলকের কর্মস্থল আমি জানি। আর চাকরি তার যাই হোক, নাটক যে এখনও ধ্যান জ্ঞান, তাও জানি। মাঝে মাঝে পত্রিকায় দেখি, আজ অলক বসুর নির্দেশনায় অমুক নাটক শিল্পকলা একাডেমিতে বা মহিলা সমিতি মঞ্চে। মাঝখানে সংস্কারের জন্য দীর্ঘদিন মহিলা সমিতি মঞ্চ বন্ধ ছিল। তারপরে শেখ হাসিনা মহিলা সমিতির বিশাল বিল্ডিং করে দিয়েছেন। চমৎকার মঞ্চও। কিন্তু কেন যেন আমার ছুটির দিনে অলকের নাটক পড়ে না। তাছাড়া নানান ব্যস্ততা থাকে। অলক নাটকের মানুষ আর সত্যি অর্থে নাটক আমাদেরও ভালোবাসা। এখনও কোথাও কোনও দেশে গেলে নাটক, কনসার্ট এগুলো দেখার চেষ্টা করি। জনকণ্ঠে থাকতে ছুটি খুবই কম ভোগ করেছি, করিনি বললেই চলে। তাও যে দুই-একদিন ছুটি ভোগ করেছি, তার ফাঁকে নাটক দেখার চেষ্টা করেছি। দেখেছিও অনেক নাটক। আমাদের মঞ্চ নাটক অনেক ভালো। কিন্তু ভাগ্যে অলকের নাটক জুটতো না। কারণ, আমার ছুটি আর ওর নাটক কেন যেন ভাগ্যদেবতা একসঙ্গে মেলাতেন না। ৩০ আগস্ট শুক্রবার ভাগ্যদেবতা সুপ্রসন্ন হলেন। সকালে ড্রাইভারকে পাঠিয়ে মহিলা সমিতিতে কী নাটক চলছে তা জেনে আসতে বললে, সে লিখে নিয়ে এলো, ‘আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে’। নির্দেশনা অলক বসু। ভাবি আজ যত কাজই থাকুক না কেন, অলকের নাটক দেখতে যাবো। তাছাড়া তার সঙ্গে দেখাও হবে। সেটাও একটা বাড়তি লাভ। দেখে আসবো নাটক পাগল সেই অলক এখন কতটা পরিণত অভিনেতা মঞ্চে। বাস্তবে মঞ্চই বুঝিয়ে দেয় কে কত বড় অভিনেতা।

ভাগ্য ভালো কোনও জরুরি কাজ এসে বাগড়া দেয়নি। চিত্রা ও আমি সময়মতো নাটক দেখতে যেতে পারি। পৃথিবীর সব জায়গার মঞ্চে ঢোকার আগে ঘণ্টিটি বাজলে আমার খুবই ভালো লাগে। মনে হয় এবার সময় হলো নতুন একটা জগতে যাবার। অন্তত ঘণ্টা দুয়েক পৃথিবীর সব প্রয়োজন ভুলে অন্য একটা জগতে থাকতে পারবো। আষাঢ়স্য প্রথম দিবস নাটকটি সম্পর্কে এক লাইনে বলা যায়—নাটকটি দুই ঘণ্টা যে কাউকে অন্য জগতে রাখতে পারবে। অলক যে সময় সন্ধানীতে নাটকের সমালোচনা লিখতো, সে সময় সে এ নাটক দেখলে এখানে কিছু ত্রুটি বের করতো, কিছু সাজেশন দিতো। কিন্তু আমি রাজনীতির সমালোচক, কখনও সাহিত্য বা সংস্কৃতির সমালোচক নই। সত্যি কথা বলতে কি, শিল্পের সমালোচনা করতে আমার কষ্ট হয়। বরং ভালোলাগাটুকু মনে রাখতেই ভালো লাগে। তবে আমার মনে হয় অলককে যদি সেই কল্পকাহিনির টাইম মেশিনে ফেলে আবার সন্ধানী যুগে ফিরিয়ে নেওয়া যায়, সেও খুব বেশি সমালোচনা করতে পারবে না আষাঢ়স্য প্রথম দিবসের।

মহাকবি কালিদাসের জীবনের ওপর ভিত্তি করে লেখা এ নাটকটি। এ নাটকের কাহিনি অনেকেই জানেন। এখানে মূল উপজীব্য প্রকৃতির সন্তানকে নাগরিক সন্তান বানানোর দ্বন্দ্বটি। আমাদের সমাজ এখনও নাগরিক সমাজে প্রবেশ করেনি। আমরা শহরেও গ্রামীণ সমাজ ও প্রকৃতির কোলে বেড়ে ওঠা জীবন নিয়েই বাস করি। তাই তো দুই ঈদে দেখা যায় প্রকৃতির কোলে ফেরার টান। তেমনি আমাদের সাহিত্যেও দেখা যায় যারা তাদের প্রকৃত জীবন অর্থাৎ গ্রামীণ জীবনের চার পাশ সাহিত্যে তুলে এনেছেন, তারা সাহিত্যকে কিছু না কিছু দিতে পেরেছেন। যারা নিজে নাগরিক না হয়ে নগরকে উপজীব্য করতে চেয়েছেন, তারা আসলে আর্টিফিসিয়াল সাহিত্যই উপহার দিয়েছেন। মানুষ সাময়িক সেগুলোতে বিনোদন পেয়েছে, চিন্তার কিছু পায়নি। আমাদের সাহিত্যে যে একটা খরা চলছে, তার বড় কারণটি এখানে মনে হয়। যাক এত বড় মন্তব্য আমার মতো একজন অর্ধ শিক্ষিত সাংবাদিকের করা উচিত নয়। বরং ফেরা যাক অলকের নির্দেশনার নাটকে।

নাটকের অভিনয় কেমন হয়েছিল সেটা বলার মানুষ আমি নই, কারণ আমি অভিনেতা নই, দর্শক মাত্র। ছোটবেলা থেকে কেবল নাটক দেখে দেখেই বড় হয়েছি। যে কারণে বেইলী রোড আজো প্রিয়। নাটক ভালোলাগার। নাটক নিজেকে ডুবিয়ে দেবার একটি মাধ্যম। আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে নাটক ভালো লাগবে সবার। তবে আমার খারাপ লাগে এখানে যে আমাদের জনসংখ্যা বেড়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে, অথচ নাটক দেখতে ভিড় উপছে পড়ে না— কী শিল্প কলা একাডেমিতে, কী মহানগর মঞ্চে, কী মহিলা সমিতির মঞ্চে। বরং দুর্ভাগ্য হলো, ঘুরেফিরে আমাদের সেই পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গেই দেখা হয় বেশি। নতুন যে কিছু নেই, তা নয়। তবে তাদের সঙ্গে পরিচয় না থাকলেও সব মঞ্চে দর্শক হিসেবে ঘুরেফিরে তাদেরই দেখি।

অথচ মঞ্চে যারা কাজ করেন, সেটা তাদের একটা সাধনা। একটি মঞ্চ নাটক সেই সাধনার ফল। এর পেছনে শুধু শ্রম আর মেধা থাকে না, আর একটা বাড়তি বিষয় থাকে, তা হলো আত্মত্যাগ। একজন মঞ্চ অভিনেতাকে অনেক আত্মত্যাগ করতে হয়। যে কারণে মঞ্চের অভিনেতা সব সময়ই অনেক বড় অভিনেতা হন। যেমন টেলিভিশন নাটকে আসাদুজ্জামান নূর অনেক জনপ্রিয় হয়েছেন, মন্ত্রিত্ব ও রাজনীতিতে তিনি অনেক ক্ষমতাবান ব্যক্তি হয়েছেন, তবে মঞ্চের আসাদুজ্জামান নূর ছিলেন এক অনন্য সাধারণ। তেমনিভাবে টিভি পর্দার হুমায়ুন ফরীদি, টেলিভিশনের হুমায়ুন ফরীদি সবাইকে ছাড়িয়ে ছিলেন মঞ্চের হুমায়ুন ফরীদি। তাই ভালো লাগে যখন আত্মত্যাগী এসব অলক বসুকে দেখি মঞ্চে। তার দলের প্রত্যেকেই যে সাধনার মধ্যে, তা বোঝা যায়। তারপরে মনে হয় ছোটবেলায় যে মহল্লায় মহল্লায় মঞ্চ দেখতাম, সেগুলো কি আর ফিরে আসা সম্ভব নয়? একটু চেষ্টা করলে কি ফিরে আসে না। কষ্ট লাগে ভেবে। আবার ভালো লাগে যখন দেখি সেই ভাঙ্গাচোরা বিল্ডিংয়ের মহিলা সমিতি’র স্থানে শেখ হাসিনার উদ্বোধন করা বহুতল ভবন। তার চমৎকার মঞ্চ। শিল্পকলা একাডেমিতেও তাই। তখন আশা জাগে, হয়তো আবার মহল্লায় মহল্লায় মঞ্চ হবে। অনেকে আমার এ চিন্তার জন্য আমাকে সেকেলে ভাবতে পারেন। তবে আমি মনে করি মঞ্চই মূলত অভিনেতা গড়ার মূল স্থান। মঞ্চ নাটকই সব থেকে বেশি দর্শককে প্রভাবিত করে। আর একটি চিন্তা আমার মাথায় আসে, হয়তো এটা কেউ কেউ ভুলও প্রমাণিত করতে পারবেন। তারপরেও চিন্তাটি শেয়ার করি, সত্যজিত রায় অনেককে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিয়েছেন ঠিকই। তবে ওই সময়ে তিনি কলকাতার মঞ্চের নিবেদিত একঝাঁক অভিনেতা পেয়েছিলেন বলেই তার পক্ষে কলকাতার ওপর ট্রিলজি, বা আগন্তুকের মতো ছবি করা সম্ভব হয়েছিল।   

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ