নারীর ক্ষমতায়ন: বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

Send
লীনা পারভীন
প্রকাশিত : ১৫:৩৩, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩৩, সেপ্টেম্বর ০৮, ২০১৯

লীনা পারভীনজাতিসংঘ ঘোষিত মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন করে বাংলাদেশ এখন সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জনের পথে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে, যার একটি অন্যতম ধাপ হচ্ছে নারীর ক্ষমতায়ন। পরিসংখ্যান দিয়ে হিসাব করতে গেলে এ অর্জন নেহাত কম নয়। বেশ কিছু প্রশাসনিক পদে নারীরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে পরপর দুই মেয়াদে নির্বাচিত হয়েছেন একজন নারী। বিমানবাহিনী, সেনাবাহিনীর মতো সশস্ত্র বাহিনীগুলোতে উচ্চপদে কাজ করেছেন নারীরা। নারী পাইলটরা এখন বাইরের অনেক দেশেই আদর্শ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত। বিচারপতি পদেও আসীন হয়েছেন। এমন অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে। কেবল সরকারি বা রাষ্ট্রীয় পদেই নয়, এই উন্নয়ন এসেছে বেসরকারি খাতেও। সর্বশেষ বিজিএমইএ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো একজন নারীকে আমরা পেয়েছি প্রেসিডেন্ট হিসেবে। এসব অর্জন নিঃসন্দেহে আশাজাগানিয়া এবং প্রশংসার দাবিদার।
সেজন্যই উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশ এখন রোল মডেল। প্রধানমন্ত্রীর কথা এখানে না হয় নাইবা আনলাম। তিনি এখন সব উদাহরণের ঊর্ধ্বে উঠেই কাজ করছেন সফল নেতা হিসেবে। প্রশাসনিক নানা পদে নারীদের ক্ষমতায়ন চোখে পড়ার মতো হলেও রাজনৈতিক দলগুলোতে আসলে কী অবস্থা? নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের মাত্রা কি বাড়ছে না কমছে? সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। এর প্রভাব মাঠপর্যায়ে কতটা পড়েছে? সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদদের রাজনৈতিক জ্ঞান ও মানের বাস্তবতা কী? ক্ষমতার প্রয়োগের ক্ষেত্রেই বা তাদের অবস্থান কোথায়? প্রায়ই অভিযোগ পাওয়া যায় যে সংরক্ষিত আসনের নারী সাংসদরা তাদের এলাকায় সফলতার সঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারেন না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও নারীরা সরাসরি নির্বাচিত হচ্ছেন, কিন্তু বাস্তবে তাদের এই জয়কে কতটা ক্ষমতায়নের মাত্রায় বিবেচনা করা যায়?

পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজব্যবস্থায় যখন ক্ষমতাকাঠামো থাকে পুরুষদের জন্য ডিজাইন করা, তখন আসলে কেবল পদে আসীন হলেই নারীর ক্ষমতায়ন হয়েছে বলে তৃপ্ত থাকার উপায় নেই। একজন নারীকে যে পদেই বসানো হোক না কেন, প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও দায়িত্ব যদি সমানভাবে বণ্টন ও সুযোগ সৃষ্টি না করা যায়, তাহলে সবকিছুই কথার কথা হয়ে যায়।

সংখ্যাগত উন্নয়ন অস্বীকার করলে বাস্তবতাকে অস্বীকার করা হবে। তবে সামাজিক বাস্তবতা আসলে নারীর ক্ষমতায়নের গুণগত উন্নয়নকে সমর্থন করছে না। যে কোনও সমাজেই উন্নয়নকে হতে হয় দুই দিককে কেন্দ্র করে। ১. সংখ্যাগত  ২. গুণগত। সংখ্যাগত ও গুণগত দুটি বিষয় একদম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তাই একটিকে টেনে তুলে আরেকটিকে অস্বীকার করলে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব আসে না।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীরা যতটা এগুচ্ছে, তার বেশিরভাগটাই হচ্ছে সংখ্যাগত উন্নয়নের চিত্র। সামাজিকভাবে এখনও নারীকে মনে করা হয় একজন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক। এখনও একজন কন্যাশিশুকে হতে হয় নানামুখী অবহেলা ও নিগ্রহের শিকার। সমাজে ক্রমবর্ধমান ধর্ষণ ও নির্যাতনের চিত্র আমাদের শংকিত করে তুলছে নিয়মিত। নয় মাসের কন্যাশিশু ধর্ষণের সংবাদে বাস্তবিক অর্থে জ্ঞানশূন্য হয়ে পড়ি। যখন সংবাদ পাই একজন শিক্ষক দিনের পর দিন নানা বাহানায় ধর্ষণের মতো অপরাধ করে চলেছে, তখন ভেবে পাই না তাহলে নারীরা নিরাপদ কোথায়? বাবা কর্তৃক কন্যার ধর্ষণে সংবাদ আমাদের মানসিকভাবে বিকৃত একটি সামাজিক বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ছাত্রীকে ছুরিকাঘাত, খাদিজাকে যখন মাথা দুখণ্ড করে দেয়, তনু ধর্ষণ ও হত্যা, পাঁচ বছরের পূজার গোপনাঙ্গ ব্লেড দিয়ে কেটে ধর্ষণ করার মতো নৃশংস ঘটনা যখন আমাদের চারপাশে ঘুরছে, তখন ভাবতেই হয় নারীরা আসলেই কি ক্ষমতার কাছাকাছি গিয়েছে? আসলেই কি বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে? বরগুনার মিন্নির দুই মাসের বিবাহিত জীবনে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে, সে বিপর্যয় কি আসলেই নারীর উন্নয়ন বা নারীর ক্ষমতায়নকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়? প্রশ্নাতীতভাবে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।

দিনের পর দিন এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। কেবল নারী হওয়ার অপরাধেই নির্যাতন ও নিগ্রহের শিকার হচ্ছে, আর অন্য কোনও কারণে নয়।

আলোচনায় আসতেই হবে তাহলে নারীর ক্ষমতায়ন কীভাবে করা যেতে পারে? এসব ঘটনা তো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এগুলোর সঙ্গে কি নারীর উন্নয়ন বা ক্ষমতায়নকে এক করে দেখা উচিত? পরিষ্কার উত্তর হচ্ছে, কেন না? যখন আমরা দেখি কোনও একটি নারী নির্যাতনের সঠিক বিচার হচ্ছে না। একের পর এক খুন ধর্ষণ ঘটে চলেছে, অথচ কিছু ঘটনায় আসামিরা ধরা পড়লেও হচ্ছে না দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি বা আইনের দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় আটকে থাকে। তখন এগুলোকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলার মতো সুযোগ আমাদের সামনে থাকে না।

কিছুদিন আগে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন সম্পত্তিতে নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। অসম্ভব আশাজাগানিয়া একটি বক্তব্য। কারণ, নারীরা যতই আয়বর্ধক কাজের সঙ্গে যুক্ত হোক না কেন, তাদের নিজেদের আয়ের ওপর শতভাগ অধিকার থাকে না। একজন নারী যত টাকাই আয় করুক না কেন, সেখানে থাকে না তার নিজের কোনও পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের সুযোগ। পুরোটাই হয়তো তুলে দিতে হয় সংসারের কর্তার হাতে, আর না হয় সিংহভাগ ব্যয় হয় সংসারের কাজেই। এখানে নারীর নিজের স্বাধীনতা কোথায়? দিন শেষে সেই নির্ভরশীল হয়েই বাঁচতে হয়। তাই কেবলমাত্র কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধি করেই নারীর সঠিক ক্ষমতায়ন সম্ভব নয়। আমাদের উত্তরাধিকার আইনগুলো কোনোভাবেই নারীর এই ক্ষমতায়নকে সমর্থন করে না। প্রকৃত ক্ষমতায়নের জন্য দরকার তার স্থায়ী মালিকানা ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। একজন নারী যদি তার ভবিষ্যৎকে নিশ্চিত করতে না পারে, তাহলে নির্ভরশীলতা তাকে মানসিকভাবেই শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে। ছোটকালে পিতামাতা, বিয়ের পর স্বামী বা শ্বশুরবাড়ি আর বয়সকালে সন্তানের দয়ায় থাকাই যেন নারীর নিয়তি।

লিখতে গেলে ঘটনার শেষ নেই। তবে দরকার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ। একদিকে আইনের শাসনকে শক্ত করে তোলা, নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিচারের প্রক্রিয়া দ্রুত করার মাধ্যমে সামাজিকভাবে নারীর মর্যাদাকে প্রতিষ্ঠায় যেমন কাজ করতে হবে, তেমনি সমাজ থেকে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূরীকরণের প্রয়োজনে দরকার সার্বিক ব্যবস্থাপনায় হাত দেওয়া। শিক্ষাব্যবস্থা থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে সংস্কারের প্রয়োজন আছে। নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে হতে হবে কঠোর ও সক্রিয়। প্রশাসনিকভাবে ক্ষমতায়নের পাশাপাশি রাজনীতি, অর্থনীতি এবং সামাজিকভাবেও ক্ষমতায়ন দরকার। সম্পত্তিতে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার কোনও বিকল্প নেই। কেবল আয় করলেই ক্ষমতায়ন আসে না, আয়ের ওপর মালিকানা প্রতিষ্ঠা অন্যতম পূর্ব শর্ত। নারীর মর্যাদা সঠিকভাবে নিশ্চিত করতে না পারলে যেকোনও উন্নয়নই বিফল হয়ে যাবে।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ