সঞ্চয়পত্রে লেজেগোবরে অবস্থা!

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৫:২৫, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৬, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামজাতীয় সঞ্চয় ব্যুরো প্রতিবছর মানুষকে সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করার জন্য নানা রকমের পোস্টার ছেপে থাকে। পোস্টারে সুন্দর সুন্দর কথা ছন্দ মিলিয়ে ছড়ার মতো করে লেখা থাকে। যাতে করে সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে যারা নিম্ন-মধ্যবিত্ত, তাদের নিত্যদিনের খরচের পরে সামান্য যা কিছু অর্থ বাড়তি থাকে, তা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করতে উৎসাহী হন। সেই অর্থ সরকারের কাছে রেখে মাসে মাসে একটি নির্দিষ্ট অংকের মুনাফা পেতে পারেন।
সঞ্চয় ব্যুরো ছাড়া কোথায় অর্থ রাখবে? ব্যাংকে রাখবে? ভরসা পায় না। হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। কোনও বিচার নেই। পত্রপত্রিকায় কিছুদিন লেখালেখি হচ্ছে, তারপর আর খবর নেই। শেয়ারবাজারে টাকা খাটাবে? সেখানে সব ‘টাউট-বাটপারে’ ভরে গেছে।
সরকারের ওই সঞ্চয় ব্যুরোই যখন একমাত্র ভরসাস্থল হয়, তখন সরকার কিছুটা নিয়মের কড়াকড়িসহ উৎসে কর বৃদ্ধি করে দিলো। সরকারের এই কড়াকড়ি আসলে কাদের জন্য? অবশ্যই কড়াকড়ির প্রয়োজন আছে। কারণ একজন মানুষ ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত তিন মাস অন্তর মুনাফার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন। পাঁচ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন ওই একই পরিমাণ টাকার। ১৮ বছরের ওপরের যেকোনও নারী পরিবার সঞ্চয়পত্র কিনতে পারবেন ৪৫ লাখ টাকার। এর বেশি কিনতে পারবেন না। কিন্তু যাদের অনেক টাকা আছে। তারা সঞ্চয় ব্যুরোর বিভিন্ন শাখা থেকে সঞ্চয়পত্র কিনছেন। অর্থাৎ তার টাকা আছে বলেই এটা করতে পারছেন। কেউ দেখার ছিল না। ৩০ লাখ টাকার চেয়ে পাঁচ গুণ টাকার সঞ্চয়পত্র কিনে মাসে মাসে মুনাফা তুলে টাকার পাহাড় বানাচ্ছেন। সেই টাকার উৎস সম্পর্কে সরকার জানতে পারছে না। নতুন কড়াকড়ির কারণে সঞ্চয়পত্র কিনতে গেলে তার টিন সার্টিফিকেট দিতে হবে, ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর দিতে হবে। জাতীয় পরিচয়পত্র আগেও লাগতো, এখনও লাগবে। এ পর্যন্তই ঠিক ছিল। কিন্তু সরকার গত বছর থেকেই বলে আসছিল সঞ্চয়পত্রের মুনাফা কমিয়ে দেবে। কারণ মানুষ ব্যাংকে টাকা না রেখে, শেয়ারবাজারে টাকা না খাটিয়ে সঞ্চয় ব্যুরোতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। যেটা সরকারের জন্য বাড়তি চাপ হয়ে যাবে ভবিষ্যতে। কারণ এই যে সুদের টাকা, এটা তো সরকারকে অন্য কোথাও থেকে এনে দিতে হচ্ছে। সেজন্য গত বছর মুনাফা না কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়, কারণ নির্বাচনের বছর ছিল।

ভোট ব্যাংক বাঁচাতে ঝুঁকিটা নেয়নি বলে আমার মনে হয়। তবে এ বছরও সুদের হার কমায়নি। কিন্তু যেটা করেছে, সেটা ওই সুদের হার কমানোই বলা যায়। যার কর কাটতো ৭০ টাকা, তার এখন কাটছে ১৪০ টাকা। এই আর কী।

এতে করে ধনীদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না। সমস্যা হচ্ছে যাদের জন্য এই সঞ্চয়পত্র খোলার উদ্দেশ্য, সেই নিম্ন-মধ্যবিত্তের।

ইতোমধ্যে এই কড়াকড়ির কারণে আর উৎসে কর দ্বিগুণ করায় সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে ভাটা পড়েছে। গত জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্র নিট বিক্রি হয়েছে দুই হাজার ১৬০ কোটি টাকার, যা গত বছর জুলাই মাসে ছিল পাঁচ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। অর্ধেকেরও কম বিক্রি হয়েছে। এভাবে হয়তো আবার সঞ্চয় ব্যুরো থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে সাধারণ মানুষ।

তবে এর মধ্যে গত ১ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়েছে, সব ধরনের সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ পাঁচ লাখ টাকার বেশি না হলে বিনিয়োগ থেকে অর্জিত সুদের ওপর আগে নির্ধারণ করা উৎসে কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ কাটা হবে।

তাহলে গত জুলাই-আগস্ট মাসে যাদের ১০ শতাংশ কাটা হয়েছে, তাদের টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে কোনও কথা বলা হয়নি।

আরেকটি বিষয়, যারা পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র কিনেছেন, তাদের কী হবে? ধরা যাক, ১৬ সালের জুন মাসে কেউ ১০ লাখ টাকার ওই সঞ্চয়পত্র কিনেছেন। তাদের মেয়াদ শেষ হবে ২১ সালের জুন মাসে। তারা যখন কিনেছেন তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে মেয়াদ শেষে ৫ শতাংশ হারে অর্জিত মুনাফা থেকে উৎসে কর কেটে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দেওয়া হবে। এখন তারা যদি অন্য মাসিকভিত্তিক সঞ্চয়পত্র কিনতেন, তাহলে প্রতি মাসেই মুনাফা তুলতেন। এবং সেটা ৫ শতাংশ হারে সুদ কেটে নেওয়ার পর। এখন তারা যখন পাঁচ বছরের সুদসহ মুনাফা তুলতে যাবেন, তখন পুরো পাঁচ বছরের জন্য ১০ শতাংশ হারে সুদ কেটে বাকি টাকা তাদের দেওয়া হবে। তাহলে সেই ব্যক্তি তিন বছরে, অর্থাৎ যে সময়টায় তার টাকা পড়ে ছিল, গত জুলাই মাসের আগে, তখন কেন ১০ শতাংশ হারে সুদ দেবেন?

একজন মানুষ এক লাখ টাকার ওপরে সঞ্চয়পত্র কিনতে চাইলে তাকে টিন সার্টিফিকেট দিতে হবে। বিষয়টা খুবই হাস্যকর। কারণ এই সঞ্চয়পত্র কেনেন এমন অনেক নারী আছেন, যিনি জানেন না টিন সার্টিফিকেট কী? হয়তো বাবার বাড়ি বা স্বামীর অল্প অল্প সঞ্চয়ের টাকা অন্য কোথাও রাখার ভরসা না পেয়ে দুই লাখ টাকা সঞ্চয় ব্যুরোতে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাস শেষে ১৮শ’ টাকা পাবেন, এই ভরসায়। কিন্তু যখন তাকে বলা হয় টিন সার্টিফিকেট নিয়ে আসেন। তখন তিনি কিছুটা নিরুৎসাহই হন এবং সঞ্চয় ব্যুরো থেকে পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেন।

অবশ্যই টিন সার্টিফিকেট প্রয়োজন আছে। যারা কোটি কোটি টাকা রাখছেন, তাদের জন্য। কিন্তু অল্প আয়ের মানুষের জন্য এই টিন সার্টিফিকেট চাওয়া মানে সঞ্চয় ব্যুরোর সঞ্চয়ে জনসাধারণকে উৎসাহিত করার মানসিকতায় পেরেক ঠোকা ছাড়া আর কিছু না।

সব মিলিয়ে মনে হচ্ছে সঞ্চয় ব্যুরোর এই যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে দীর্ঘ চিন্তার কোনও ছাপ নেই। কারণ হিসেবে বলা যায় ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপন। হুট করে ১ জুলাই থেকে ১০ শতাংশ কাটা। আবার ১ সেপ্টেম্বর বলে দেওয়া ৫ লাখের কম বিনিয়োগ হলে আগের মতোই ৫ শতাংশ হারে সুদ কাটা হবে।

হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়ে যাচ্ছে। আবার কেউ বলছেন এটা কোনও টাকাই না। তাদের মতো চিন্তাশীল ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের ওপরই যত খড়্গ চালাতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। পারেন না দুর্নীতিবাজদের টিকিটিও ধরতে।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ