শিল্পী শাহাবুদ্দিন: জন্মদিনে শুভেচ্ছা

Send
দাউদ হায়দার
প্রকাশিত : ০০:০২, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:০৩, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

দাউদ হায়দারবছর কুড়ি আগে বাংলাদেশের একজন নামী চিত্রকর বার্লিনে ভ্রামণিক, হঠাৎ-ই দেখা। অতঃপর তুমুল আড্ডা। যা হয় আড্ডায়, নানা প্রসঙ্গ। রাজনীতি থেকে শিল্পসাহিত্য, এঁর-ওঁর চরিত্র, নিন্দাবাদ সাধুবাদ, মায় তরুণ-তরুণীর অবাধ স্বাধীনতা, প্রেম, ডিভোর্স, ইত্যাদি।
বার্লিনে কতটি ছোট-বড় গ্যালারি দেখেছেন, জার্মান হালের শিল্পীর কাজ পছন্দ-অপছন্দ শুনিয়ে জানতে চান, ‘এখানে কয়টি গ্যালারি?’ বলি, ‘শতাধিক’। এও বলি, ‘ওয়াইন পানের অভ্যেস যদি থাকে, কানাকড়িও খরচ লাগবে না। প্রতি সপ্তাহে প্রায় এক ডজন গ্যালারিতে নতুন প্রদর্শনীর উদ্বোধন, প্রবেশ অবাধ, গেলেই ফ্রি ওয়াইন।’ বললেন, ‘আপনি বোধহয় কিনে খান না।’
কথা উঠলো বাংলাদেশের চিত্রকরদের চিত্রকর্ম নিয়ে। জানা ছিল না, তিনি এস. এম. সুলতানের দারুণ ভক্ত। শ্রেষ্ঠ মনে করেন। করতেই পারেন। যাঁর যা বোধ, রুচি। বললেন, ‘পিকাসোর সঙ্গে সুলতান প্রদর্শনী করেছিলেন।’ জিজ্ঞেস করি, ‘পিকাসো এবং সুলতান একসঙ্গে কী?’ দু’জন একই গ্যালারিতে? নাকি অনেক শিল্পীর সঙ্গে একটি বা দু’টি ছবি ছিল? কলকাতার পরিতোষ সেনও (আদিবাড়ি ঢাকার জিন্দাবাজার লেনে) পিকাসোসহ সম্মিলিত ছবি আঁকিয়েদের সঙ্গে প্রদর্শনী করেছিলেন। পরিতোষবাবু এই নিয়ে মৃত্যুকাল পর্যন্ত গর্ব করেছেন। করলেও, পিকাসো নিশ্চয় সুলতান, পরিতোষের নাম জ্ঞানে-অজ্ঞানে মনে রাখেননি কখনোই।

কী আছে সুলতানের ছবিতে? মিকেলেঞ্জো থেকে ধার করা। পেশীর যে চিত্রণ, মিকেলেঞ্জোর অঙ্কনে বিস্তর। দেবতাকেও পেশীবহুল করেছেন। বাংলাদেশে লোকে খেতে পায় না, চাষাভূষোর হাড় জিরজিরে শরীর, চোয়াল, মুখায়ব ত্রিভঙ্গ, কোটরগত চোখ, স্বপ্নহীন ভবিষ্যৎ। হাঁটাচলায়, এমনকি দৌড়ানোয় গতি নেই। শাহাবুদ্দিনের ছবি দেখুন। কী প্রচণ্ড গতিশীল। ছুটে চলার অদম্য ছন্দ, তরঙ্গের উদ্দামতা পরতে-পরতে। বাঁধাবন্ধনহীন। বাংলাদেশের অন্যান্য শিল্পী থেকে কেন তিনি আলাদা, অনন্য, কেন তাঁর ছবিতে তেজের পরম্পরা অবশ্যই শিক্ষণীয় এবং ভাবনার। আজকের পৃথিবীতে রাজনীতি ও অর্থনীতির দাপটে, করপোরেট মস্তানিতে মানুষের উদ্যম, গতিও স্তিমিত।’

-এতেক শোনার পর মন্তব্য তাঁর, ‘শাহাবুদ্দিনের ছবি নিয়ে খুব লেকচার ঝাড়ছেন কিন্তু জানেন কী, জয়নুল আবেদিনের ছবির গতিময়তা ‘নকলিফাই’ করেছে?’ বললুম, ‘বিশদ জানি নে, এইটুকুই জানি জয়নুলের ছাত্র শাহাবুদ্দিন, সেই অর্থে গুরুদেব। শিষ্যের কাজ গুরুদেবকে বিনীত শ্রদ্ধায় গ্রহণ, কিন্তু দেখতে হবে গুরুদেবকে কী করে অতিক্রম করেন একজন শিষ্য। যেমন অর্জুন করেছেন দ্রোণাচার্যকে, ভীস্মকেও। পিকাসো আফ্রিকার লৌকিক শিল্পকে আত্মস্থ করেছেন; তারপর? এক ঘরানা থেকে আরেক ঘরানায় মেজাজবোধ ঠিক রেখে ভিন্নমাত্রায় দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিত রচনা করা যায়, অনুকরণ সত্ত্বেও মৌলিক, যা সর্বকালীন। রবীন্দ্রনাথ আইরিশ লোকসংগীত শুনে ফর্ম বদলিয়ে লোকসংগীতের আদলে লিখলেন ‘ফুলে ফুলে ঢুলে ঢুলে।’ হলো আমাদেরই দেশীয়, নিজস্ব।’

কথার খৈ ফোটে মুখে, বা, ‘কথার তুবড়ি।’ আরও বলি, ‘ঠিক আছে, জয়নুলের ‘গতি’ নকলিফাই করেছেন শাহাবুদ্দিন, কিন্তু মনে রাখি, জয়নুল মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না, শাহাবুদ্দিন ছিলেন (ওঁর আরও দুই ভাই)। মুক্তিযোদ্ধার নিরলস সংগ্রাম, দুরন্ত গতি, স্থির লক্ষ্যে পৌঁছুনোই মূল, সব মিলিয়েই শাহাবুদ্দিনের ছবি। কোনও ফাঁকি নেই। দেশবিশ্ব তাঁর ছবিতে একাকার। ধরতে চেয়েছেন এবং ধরেছেন পেশীবহুল সংগ্রামী মানুষ। গান্ধি কিংবা বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকে যেভাবে অংকন করেছেন, বেদনাদায়ক ইতিহাস। দেশীয় এবং সর্বদেশীয়। এসব ছবিতে গতি নেই ঠিকই, আছে মানবিকতার অধঃপতন।’

চিত্রকরের প্রশ্ন, ‘শাহাবুদ্দিনকে কতদিন চেনেন?’ উত্তর; ‘শিল্পীকে, কবিকে, সাহিত্যিককে, অভিনেতা অভিনেত্রীকে প্রত্যক্ষ চিনতে হবে কেন? তাঁর কাজই তাঁকে চেনার জন্য যথেষ্ট।’

চিত্রকর বললেন, ‘শুনেছি শাহাবুদ্দিনের প্রথম কন্যা, নাম চিত্র। ছবি আঁকেন, ভিন্ন ধরনের ছবি। জনপ্রিয় হচ্ছে ছবিগুলি।’

বললুম, ‘শাহাবুদ্দিনের পরিবার সম্পর্কে অধিক জানেন, তাঁর কন্যার ছবি আঁকাআঁকিও। বিস্তর জানি নে। কেন জিজ্ঞেস করছেন।’

- না জানলেও, শাহাবুদ্দিনের বিষয়ে অল্প-স্বল্প পড়েটড়ে এইটুকু জানি, শাহাবুদ্দিনের স্ত্রী আনা ইসলাম সুলেখিকা। গবেষক। প্রাবন্ধিক। ছোট গল্পকার। ঔপন্যাসিক, আনা-শাহাবুদ্দিনের দুই কন্যা। বড় কন্যা চিত্র। ছোট চর্যা। চিত্রের জন্মদিন ২ সেপ্টেম্বর। শাহাবুদ্দিনের ১১ সেপ্টেম্বর (জন্ম ১৯৫০)। ঢাকায়।

শাহাবুদ্দিনকে, জন্মদিনে আত্মিক শুভেচ্ছা।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

 

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ