‘আমি কেরানি হবো’

Send
মাহমুদুল হক
প্রকাশিত : ১৭:৫৩, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:০১, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯

মাহমুদুল হকশার্ল বোদলেয়ারের একটি কবিতা পড়ছিলাম—সেখানে তিনি বলছেন, মানুষকে নিরপেক্ষ হতে হলে কসাইয়ের মতো হতে হবে। কসাই যেমন মাংস কাটার সময় কোনও আবেগ জড়ান না। ঠিক তেমনিভাবে কোনও বিষয়ে নিরপেক্ষ হতে হলে আবেগকে পাশে রেখে ঘটনার সামগ্রিকতা উপলব্ধি জরুরি। তবে আজকাল নিরপেক্ষতার অর্থ মনে হয় নিজেরপক্ষ। 
সম্প্রতি উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তাকেই কোনও এক শ্রেণিকে অপদস্থ করতে সরল মনে সলিল বিশ্বাসের একটি বই থেকে উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। বিষয়টি ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের ব্যাপার হলেও কোথায় যেন মনে হয়, একটি জটিলতা তৈরি করার ব্যাপার লুকিয়ে আছে। বঙ্গদেশে রঙ্গ করে করে একটা সব আমজনতাই বিশ্বাস করে, আরামে থাকলে এদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরাই আছেন।
বিষয়টি আমাদের দেশের মসজিদের ইমামদের মতো মনে হয়। ইমামেরা পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ানোর জন্য নিয়োগ পান কিন্তু তাদের সম্মানী নিতান্ত নগণ্য। জনতার দাবি, সমাজে এই কয় বেলা নামাজে এত টাকা কেন লাগবে তার? তিনি তো আরামেই আছেন। অথচ এটি ভাবা হয় না যে, তার পরিবার আছে, তিনিও মানুষ, তারও টাকার প্রয়োজন হতে পারে। আবার যদি তিনি কোনও আলাদা করতে যান, তবে বলা হয়–দেশটা শেষ করে ফেলা হচ্ছে। 
প্রতিটি জেলা, উপজেলা কার অধীনে? প্রতিটি জেলা, উপজেলায় প্রাথমিক থেকে কলেজ পর্যন্ত সব  শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার আওতায়? প্রায় ১২ বছর সে সব প্রতিষ্ঠানে পড়ে আসার পরও যে শিক্ষার্থী কিছুই শিখলো না, তাকে মাত্র ৫ বছরে রত্ন করে বের করার দায়ভার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের?

সারাদেশে সরকারি তেল খরচ করে গাড়িতে বাচ্চাকে স্কুলে আনা নেওয়া কারা করেন? কারা শপিং মলে যাওয়া-আসা করেন? কিংবা হাজার কোটির ভুয়া ঋণে স্বাক্ষর করেন কারা? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে নিশ্চয় শিক্ষকদের নাম আসবে না।   

সমগ্র গবেষণা খাতে বাজেট যখন শত কোটি টাকাও হয় না, তখন উপজেলা কর্মকর্তাদের জন্য একটি করে গাড়ির দাম ১ কোটি টাকা। বলেছিলেন, তখন কেন এমন হলো? নাকি বগল বাজিয়ে কয়েকজন অফিস সহায়ক (বাজার, মালি, পিওন ইত্যাদি) দিয়ে সাজিয়েছিলেন আপনার সাজানো রাজ্য? যদি ইনিয়ে-বিনিয়ে ডিসির  সাফাই গান আর জোরে গলা বাড়ান,  দেখেছি কত পরিমল পড়ানোর দায়ভার নেয়। তবে বলবো, আপনি নিরপেক্ষ বলতে নিজের পক্ষকেই বোঝেন। কিছুদিন আগে এক লেখায় আমি শিক্ষক হওয়ার পরও দায়ভার নিয়েই আমার এই জীবনের কৈফিয়ত চেয়েছিলাম। বলেছিলাম, নিজেই নিজের কৈফিয়ত চাই। সবার প্রতি সম্মান রেখেই আজ মনে হয়, শিক্ষক নয় ‘কেরানি’ হতে চাই। 
এ কথা শুনে অনেকে চমকে উঠতে পারেন। আমি বলি, মুক্তি দিন অধমকে। আজ পর্যন্ত শুনেছেন, কোনও ম্যাজিস্ট্রেটের বসার জায়গা নেই? কোন ইউএনও আরেকজনের সঙ্গে রুম শেয়ার করেন? কোনও এএসপি মুভ করার জন্য গাড়ি পাচ্ছেন না? অথচ বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষক রাহু-কেতু-শনির চোখ টাটানোতে পাচ্ছেন না বসার জায়গা, অধ্যাপক শেয়ার করছেন রুম, প্রক্টরিয়াল বডি মুভ করার জন্য পাচ্ছেন না গাড়ি।

এতে আমার সমস্যা কী? কেন দম আটকে যায়? যখন শুনি কেরানির কাজ করেও অনেকে তরতর করে ওপরে উঠে যায়, আর আমাকে কোনও ল্যাপটপ, কম্পিউটার কিংবা নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট সুবিধা না দিয়েই বলা হচ্ছে, গবেষণাপত্র ছাড়া তোমাকে ছাড়া যাচ্ছে না বাপু। দৈনিক কয়েক শত সিগনেচার আর মিটিং করলে যদি গবেষণাপত্র হয়, তবে তাই ভালো। কেরানির কাজ ওপর থেকে করা অর্ডারের মাধ্যমে হলেও গবেষণাপত্র তৈরির মতো মস্তিষ্কজাত চাপ থেকে অন্তত বাঁচা গেলো। 

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় 
anthromahmud@gmail.com

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ