বিদ্যুতে অপরিকল্পিত বিনিয়োগ গলার কাঁটা হতে পারে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৪:০৪, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২২, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস)-ভিত্তিক একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র দক্ষিণ ভারতে স্থাপন করেছিল সে দেশের রিলায়েন্স কোম্পানি। কিন্তু উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় ওই কেন্দ্রে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারেনি তারা। শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিত্যক্ত করা হয়। অথচ এ মাসের শুরুতে ভারতের সেই রিলায়েন্স কোম্পানির সঙ্গে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড একটি ৭৫০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের চুক্তি করেছে। এর আগেও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড দুটি এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে এবং এর একটির সঙ্গে বিদ্যুৎ কেনার ব্যাপারে চুক্তিও সম্পাদন করেছে। অর্থাৎ সরকার এই বিদ্যুৎ কিনবে বেসরকারি কোম্পানি থেকে।

এই দু’টির একটি ইউনিক মেঘনা পাওয়ার লিমিটেড কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ৫৮৪ মেগাওয়াট। আর অন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন ক্ষমতা হচ্ছে ৪৫০ মেগাওয়াট, যার বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি এখনও হয়নি। এই দুটি কোম্পানি নাকি আগামী ২০২৫-২০২৬ সালের মধ্যে উৎপাদনে আসবে।

এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ পড়বে ৩১ টাকা প্রতি ইউনিট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো বিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বিক্রি করবে আগেই বলেছি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড তা গ্রাহকদের কাছে উচ্চ দামে বিক্রি করবে এটাই স্বাভাবিক। এসব প্রাইভেট কোম্পানি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নিতে সাহস করেছে তাদের উৎপাদিত সম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সরকার কিনবে বলে। সরকারকে এত উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে জলবিদ্যুৎ, তাপবিদ্যুতের সঙ্গে গড় করে দামের উচ্চমূল্য নির্ধারণ করতে হবে, যা সাধারণ গ্রাহকদের জন্য কষ্টকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াবে।

আর সরকার এত বিদ্যুৎ করবে কী! বিদ্যুৎ বেশি প্রয়োজন হয় শিল্প কারখানায়। এখন শিল্প কারখানার মালিকরা নিজেদের বিদ্যুৎ নিজেরা উৎপাদনে উদ্যোগী হয়েছে। বর্তমানে শিল্প মালিকরা ৩৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে, যাকে ক্যাপটিভ পাওয়ার বলা হচ্ছে। সরকার আরও ৮০০ শিল্প কারখানাকে ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের অনিয়মিত কর্মকাণ্ডে শিল্প মালিকরা বিরক্ত হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। এখন তারা প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণ। ধীরে ধীরে শিল্প-কারখানা থেকে বিদায় নিচ্ছে পিডিবি। অবস্থা যদি এমন হয় তবে সরকার এত বিদ্যুৎ উৎপাদন কার জন্য করছে? পিডিবির তথ্য অনুসারে, এখন পিডিবির ১৮ হাজার ৯৬১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে।

সাধারণ সময়ে বিদ্যুৎ প্রয়োজন হয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার মেগাওয়াট আর পিক-আওয়ারে বিদ্যুতের প্রয়োজন হয় সর্বোচ্চ ১২ হাজার মেগাওয়াট। নরমাল এবং পিক-আওয়ার কোনও সময়েই বিদ্যুৎ ঘাটতির সম্ভাবনা নেই। সুতরাং নতুন তিনটি এলএনজি-ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত কোনোভাবেই সঠিক সিদ্ধান্ত হয়নি। প্রাইভেট  বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো যারা পিডিবির কাছে বিদ্যুৎ বিক্রির চুক্তি করেছে তারা তো আনার আলী জমাদারের হাতির মতো। মরলেও লাখ টাকা।

১০০ মেগাওয়াট একটা বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন ছাড়া বসে থাকলে পিডিবিকে বছরে গড়ে ৯০ কোটি টাকা ভাড়া দিতে হবে ওই কোম্পানিকে। যে তিনটি এলএনজি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কথা বললাম এগুলো তো বছরের বেশিরভাগ সময় বসে থাকবে বলে মনে হচ্ছে। কারণ, সস্তা বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ব্যবহার কখনও কেউ পারতপক্ষে করবে না। অয়েল টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে এলএনজি থেকে অনেক সস্তা দরে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। বিদ্যুতের খরচ পড়বে ১৩ বা ১৪ টাকা, ইউনিটপ্রতি।

আশুগঞ্জ, ঘোড়াশাল, খুলনার গোয়ালপাড়া, কক্সবাজার প্রত্যেকটা বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র ছিল অয়েল টারবাইন। শুধু কাপ্তাই ছিল জলবিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। গ্যাস পাওয়ার পর ধীরে ধীরে সব বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রকে গ্যাস টারবাইনে রূপান্তরিত করেছে সরকার। এখন গ্যাস নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। আর কোনও নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া না গেলে মজুত গ্যাস দিয়ে ১০/১২ বছরের ওপর চলবে না। এখন তরলীকৃত গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে গৃহস্থালি ও কলকারখানায় গ্যাস সরবরাহ করার জন্য।

সরকার এখন পুনরায় দশটা অয়েল টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি দিয়েছে। আমেরিকার মতো দেশ তেলের ব্যবহার সীমিত করে ফেলেছে। মনে হয় আগামীতে তেলের মূল্য আরও কমে যাবে। সুতরাং আমাদের দেশে এলএনজি ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা না করে অয়েল টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা উচিত। গত দুই বছর তেলের দাম সস্তা ছিল। সম্ভবত বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারের উদ্যোগে তেলের দাম আরও কমে যাবে।

আমরা জানি মাতারবাড়িতে বিদ্যুতের হাব প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। সেখানে ১২৪০ মেগাওয়াটের দুটি তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে। বাঁশখালীতে এস আলমের অন্য একটি ১২৪০ মেগাওয়াটের তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা হচ্ছে। রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজ চলছে। যথাসময়ে এই প্রকল্পটিও উৎপাদনে আসবে। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাজটিও দ্রুত সম্পন্ন হতে যাচ্ছে। অনুরূপ পরিস্থিতিতে এলএনজি চালিত  বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমতি প্রদান কোনোভাবেই বিজ্ঞজনোচিত সিদ্ধান্ত হয়নি।

সুতরাং আমরা সরকারের কাছে অনুরোধ করবো, এই তিনটি এলএনজি-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের অনুমতি প্রত্যাহার করা হোক। প্রয়োজনে এলএনজির স্থলে এসব প্রতিষ্ঠানকে অয়েল টারবাইন বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অনুমতি প্রদান করা হোক। কোনও কিছু সুপরিকল্পিত না হলে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। শাসক সম্প্রদায়ের লোকেরা বলছেন ২০২১ সালে বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হবে। নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বার্ষিক মাথাপিছু আয়ের প্রয়োজন হয় ৪৫০০ ডলার আর আমাদের বর্তমান মাথাপিছু আয় হচ্ছে ১৯৫২ মার্কিন ডলার। আগামী দুই বছরের মাথায় ২৫৪৮ মার্কিন ডলার মাথাপিছু আয় কভার করা কি সম্ভব হবে?

মানুষ হতাশার মাঝে থাকুক সে কথা বলছি না। তবে অতিরিক্ত আশান্বিত করাও ভালো নয়। স্বাধীনতার পর দেখা গেলো যে ১৯৭০ সালের নির্বাচনের সময় প্রদত্ত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তা কিন্তু সরকারের অযোগ্যতার ফল নয়। তা ছিল বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু মানুষ সেই পরিস্থিতি মেনে নিতে চায়নি। মানুষ সরকারকে দোষারোপ করেছিল। সুতরাং আশা করবো সরকার অতিরিক্ত ও অবাস্তব আশান্বিত করার পথ যেন পরিহার করে চলে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ