জাপায় আ. লীগ বা বিএনপিতে পৌঁছার অনুশীলন!

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৭:০৪, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৬, সেপ্টেম্বর ১২, ২০১৯

আহসান কবিরএরশাদবিহীন জাতীয় পার্টি (জাপা) আবারও আলোচনায় এসেছে। দলটির দুই গ্রুপের মধ্যে উত্তেজনাও দেখা দিয়েছিল, যা পার্টির বর্তমান মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গার ‘দ্যুতিয়ালি’তে আপাতত প্রশমিত হয়েছে। পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত এরশাদের ভাই জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যানই থাকছেন আর এরশাদের স্ত্রী রওশন থাকছেন জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রী। অবশ্য কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন যে, যা হয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ‘ইশারাতে’ই হয়েছে। জাপার প্রাণভোমরা নাকি সরকার তথা ক্ষমতার খাঁচায় বন্দি। সে যাইহোক, জাপার এই ‘ভাঙন আশঙ্কা’ এবারই প্রথম নয়। ‘নদী ভাঙনের মতো জাতীয় পার্টির পূর্ণ ভাঙন’ এ পর্যন্ত কমপক্ষে পাঁচবার সম্পন্ন হয়েছে। সেসব কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার আগে ২০১৪ সালে জিএম কাদের সাহেবের একটা ডায়ালগ স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে–‘আপনি ইতালির গোলকিপার হবেন আবার একইসঙ্গে স্পেনের স্ট্রাইকার হবেন, তা হবে না। আপনাকে যে কোনও একদলে নির্দিষ্ট অবস্থানেই খেলতে হবে। সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনি সরকার না বিরোধী দলে থাকবেন!’  জি এম কাদের (জাপার নেতা ও সাবেক এই মন্ত্রী ২০১৪ সালের জুন মাসে জাপার এক সভায় এ কথা বলেন। এ কারণে সভা থেকে বেরিয়ে যান জিয়াউদ্দীন বাবলু। রুহুল আমীন হাওলাদারকে সরিয়ে জিয়াউদ্দীন বাবলুকে মহাসচিব বানানোর পরেও দলের ভেতরে দ্বিধাবিভক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল।)

এবার জাতীয় পার্টি গঠন ও ভাঙনের ইতিবৃত্ত:

এক. সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ। জেনারেল আইয়ুব খান ও জিয়াউর রহমান যে প্রক্রিয়ায় ক্ষমতায় থেকে দল গঠন করেছিলেন, এরশাদও সেই পথে হাঁটেন। বিএনপির ১৮ দফার মতো এরশাদ ১৯ দফা ঘোষণা করেন ১৯৮৩ সালের ১৭ মার্চ। এরপর এরশাদের সময়কার রাষ্ট্রপতি আহসানউদ্দীন চৌধুরী ১৯৮৩ সালের নভেম্বরে এক সমাবেশে ‘জনদল’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন। কিন্তু দল ঘোষণার ১৫ দিনের মাথায় আহসানউদ্দীন চৌধুরীকে  রাষ্ট্রপতি ও জনদলের আহ্বায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়াতে হয়, এরশাদ নিজেই রাষ্ট্রপতি হন।  জনদলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হন মিজানুর রহমান চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হন রিয়াজউদ্দীন আহমেদ ভোলা মিঞা। এরপর ‘জনদলের’ কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে, উল্টো ১৯৮৫ সালের জুনে এরশাদের উদ্যোগে ‘জাতীয় ফ্রন্ট’ নামে নতুন এক রাজনৈতিক মোর্চার জন্ম হয়। ক্ষমতার হালুয়া-রুটির লোভে বিএনপির শাহ আজিজ গ্রুপ, জনদল, মুসলিম লীগের একাংশ, গণতান্ত্রিক পার্টি, কাজী জাফরের ইউনাইটেড পিপলস পার্টি, অ্যাডভোকেট মাহবুব, মওদুদ আহমেদ ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জু  এই মোর্চায় যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি জনদল বা জাতীয় ফ্রন্ট শেষমেষ ‘জাতীয় পার্টি’ নামে আত্মপ্রকাশ করে, হোসেইন মোহাম্মাদ এরশাদ হন জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান।

দুই. জাতীয় পার্টি প্রথম সংকটে পড়ে ১৯৯০-৯১ সালে এরশাদের পতনের পর। এরশাদ জেলে যাওয়ার পর ১৯৯১ সালে জাপা নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ৩৫টি আসন লাভ করে। যার ভেতর এরশাদ একাই পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেন। জাতীয় পার্টির আরেক পরিচয় দাঁড়ায়—বৃহত্তর রংপুরের দল। সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারা বা নির্বাচনের রাজনীতিতে স্বৈরাচার এরশাদ ক্রমশ পরিণত হতে থাকেন ‘ফ্যাক্টর’ কিংবা ‘সিনড্রোম’-এ! এই সুবিধার জন্য স্বৈরাচার এরশাদ আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সহযোগিতায় ‘রাজনীতিবিদ’-এ পরিণত হতে থাকেন। রাজনীতিতে নৈতিকতা ক্রমশ বিদায় নিতে নিতে এমন অবস্থা হয়েছে যে, এই প্রজন্মের কোনও রাজনৈতিককর্মী জানতে চাইতে পারেন—নীতি-নৈতিকতা আবার কী জিনিস? এরশাদবিরোধী আন্দোলনে যত হরতাল জ্বালাও-পোড়াও হয়েছে এবং যত মানুষ নিহত হয়েছেন, যত মানুষ জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, শিক্ষাঙ্গনে যত সেশন জট বেড়েছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কোনও আমলে সেটা হয়নি। তবু এদেশের বড় দুই দলের কাছে এরশাদ ছিলেন ‘ক্ষমতায় যাওয়ার সহায়ক’ ব্যক্তি!

তিন. ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন পর্যন্ত জাতীয় পার্টি প্রথম ভাঙনের সম্মুখীন হয়। প্রথম জাতীয় পার্টি ভাঙেন ডা. এম এ মতিন ওরফে ‘চক্ষু মতিন’। এম এ মতিন দারুন ভালো ছাত্র এবং পরবর্তীকালে বড় মাপের চক্ষু ডাক্তার ছিলেন। ভাঙনের জন্য তার খ্যাতি ছিল কারণ তিনি এরশাদের আমলে এরশাদের প্ররোচনায় বিএনপিকে ভাঙেন এবং এরশাদের দলে যোগ দেন। জাতীয় পার্টি প্রথমবার ভাঙার পর এরশাদের বিরুদ্ধে মঞ্জুর হত্যা মামলা দেওয়া হয়েছিল খালেদা জিয়ার প্রথম শাসন আমলে (১৯৯৫)। এরশাদ সেবার বিএনপির ভালোবাসা গ্রহণ না করে আওয়ামী ভালোবাসা ও আতিথেয়তার সুযোগ নেন। ১৯৭৫-এর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবারও ক্ষমতায় আসে, বিনিময়ে ১৯৯৭ সালে জেল থেকে ছাড়া  পান এরশাদ। জাপার নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু মন্ত্রী হন। এরপরও দ্বিতীয়বার ভাঙনের সম্মুখীন হয় জাপা এবং দল ভাঙেন কাজী জাফর ও শাহ মোয়াজ্জেম। এই দু’জনের পার্টির নাম হয় জাতীয় পার্টি (জা-মো)। পরবর্তীকালে এরশাদের কাছেই ফিরেছিলেন কাজী জাফর এবং ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের একতরফা নির্বাচনে এরশাদের দোদুল্যমানতার কারণে পঞ্চম বারের মতো তিনি জাপা ভেঙেছিলেন।

চার. জাপা তৃতীয় ও চতুর্থবার ভাঙেন দুই মঞ্জু। এর মধ্যে নাজিউর রহমান মঞ্জু এরশাদের মুক্তির জন্য ভিক্ষা করতেও রাজি ছিলেন। সেই তিনি ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের বেশ আগেই এরশাদের দল ভেঙে চারদলীয় অর্থাৎ বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেন। তার মৃত্যুর পরে তার পুত্র আন্দালিব রহমান পার্থ বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি নিয়ে এখনও খালেদা জিয়ার সঙ্গেই আছেন। আর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জাতীয় পার্টি ভেঙে ‘একলা চলো’র নীতি নিয়েছিলেন। টিকতে পেরেছেন কিনা তিনিই ভালো জানেন।

যাইহোক,অনেক নাটকের পর ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসের বিতর্কিত নির্বাচনে এরশাদের জাপার সঙ্গে আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর জাতীয় পার্টিও অংশ নিয়েছিল। ২০০১ সালে নাজিউর রহমান মঞ্জু দল ভেঙে বিএনপির সঙ্গে চারদলীয় জোটে যোগ দেন এবং এরশাদ তার জাপা নিয়ে আলাদাভাবে নির্বাচন করলে এরশাদের জাপা মাত্র ১৪টি আসন পায়। এরপর এরশাদ নিজেই ঘোষণা দেন ‘একা একা নির্বাচন করাটা ভুল’ ছিল। তবে, তার এই ভুলের জন্য লাভবান হয়েছিল বিএনপি এবং জেলখানা থেকে এরশাদ নিজেকে দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর বাতাস বদলাতে থাকলে এরশাদ আবারও ‘ডিগবাজি’ খান এবং ২০০৯ এর ডিসেম্বর মাসের সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মহাজোটের শরিক হিসেবে জাপা ২৯টি (পরে এরশাদ সাহেবের ছেড়ে দেওয়া দুটো আসনের উপ-নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জয়লাভ করে) আসন পায়।

আর কাজী জাফর হাসপাতালে শুয়ে দীর্ঘদিন পর অনুভব করেছিলেন যে, এরশাদের সঙ্গে আর পথ চলা নয়। এরশাদের সঙ্গে আর কোনও তামাশা নয়, এই ঘোষণা দিয়ে তিনি পঞ্চম বারের মতো জাপা ভেঙে আপাতত খালেদা জিয়ার ভালোবাসায় বসবাস করছিলেন! চক্ষু মতিনেরটা বাদ দিলে দেশে চারটি জাতীয় পার্টি বিদ্যমান ছিল। এরশাদ ও কাজী জাফর দু-জনই মৃত্যুবরণ করেছেন। ২০১৯ সালের ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যুর পর তার শূন্য হওয়া আসনের উপ-নির্বাচন নিয়ে জাপার মধ্যে আবারও ‘ভাঙন অবস্থা’ ও উত্তেজনা দেখা দেয়। আপাতত যে সমাধান হয়েছে, তা কোনও বড় ঝড়ের পূর্বাভাস হয়তো নয়, অন্তত আওয়ামী লীগ যতদিন ক্ষমতায় আছে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর অনেকেই ব্যঙ্গ করে জিজ্ঞাসা করতেন—সমাজতন্ত্র কী? উত্তর মিলতো—পুঁজিবাদে পৌঁছানোর দীর্ঘতম পথ। তেমন করে কেউ যদি জানতে চায়, এরশাদবিহীন জাপার মূলমন্ত্র কী? উত্তর হয়তো মিলবে এমন– আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে যোগ দেওয়ার বা পৌঁছানোর দীর্ঘতম অনুশীলন! এখন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে সমাধান দিচ্ছে তাই হয়তো মেনে নিচ্ছে জাপা। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮, ২০১৪ বা ২০১৮ এর নির্বাচন পরিস্থিতিতে জাপা যা করেছে, ভবিষ্যতেও কি তাই করবে?

উত্তর হচ্ছে ‘হ্যাঁ’ পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে জাপা অর্থাৎ এখন আওয়ামী লীগের কথা মতো কাজ করছে ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকলে তারা হয়তো বিএনপির সঙ্গেই হাত মেলাবে।

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ