শিক্ষককে ভয় কেন?

Send
তুষার আবদুল্লাহ
প্রকাশিত : ১৫:২৯, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, সেপ্টেম্বর ১৪, ২০১৯

তুষার আবদুল্লাহআমি তখন ক্লাস ফাইভে পড়ি। ইংরেজি ক্লাস চলছে। ক্লাসের মাঝামাঝি সময়ে একজন অভিভাবক এসে দাঁড়ালেন দরজায়। ক্লাসে ঢুকতে অনুমতি চাইলেন শিক্ষকের। অভিভাবকের চোখে সানগ্লাস। তাকে এর আগে কখনও সানগ্লাস চোখে দেখিনি। শিক্ষক অভিভাবকের দিকে তাকিয়েই চটে গেলেন। কেন তিনি সানগ্লাস পরেছেন, এজন্য পুরো ক্লাসের সামনে তাকে অপমান করলেন। দেখলাম তার সন্তানের চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে। আমি কেন সেদিকে তাকালাম তাই বেত নিয়ে অমানবিকভাবে চড়াও হলেন আমার ওপর। আমি হতভম্ব। ওই অভিভাবকও অপমানে বিধ্বস্ত। চোখ অপারেশন করিয়ে এসেছেন বলে সানগ্লাস ছিল চোখে। কিন্তু আমাদের শিক্ষক এতোটাই আত্মদম্ভে ভুগছিলেন যে, অভিভাবককেও ছাত্র ভেবে নিয়েছিলেন। অপমান করতে বাধেনি তার। ওই শিক্ষকের কাছ থেকে আমাদের শেখার কী থাকতে পারে? হয়তো আমরা পরের দিনগুলোতে তাকে ভয় পেয়েছি। সেই ভয় শ্রদ্ধার নয়, ঘৃণার। কথাগুলো নতুন করে মনে পড়েনি। স্কুলে বেশ কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষিকা ছিলেন, যারা কারণে-অকারণে ছাত্র-ছাত্রীদের মারধর করতেন। শুধু আমাদের স্কুলে নয়, গ্রামে শহরে সব স্কুলে এমন অত্যাচারী শিক্ষক ছিলেন। তারা তাদের অন্যায়, অমানবিক শাসন দিয়ে নিজেদের ডাকসাইটে শিক্ষক হিসেবে তল্লাটে পরিচিত করতে চাইতেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি, এমন গোত্রের লোকেরা শিক্ষক হিসেবে সফল ছিলেন না। পড়ানোর কৌশল -ভঙ্গি এবং জ্ঞান দিয়ে শিক্ষার্থীদের মুগ্ধ করতে ব্যর্থ হতেন বলেই তাদের এমন হিংস্র রূপ।

শিক্ষকরা সেই হিংস্র রূপ ধারণ করে আছেন বলেই, আদালত থেকে তাদের আচরণের ওপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। এক ব্যাংকার বন্ধু সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরেছেন রাজধানীর বনশ্রী জুনিয়র আইডিয়াল স্কুলের শিক্ষকদের হিংস্রতার কথা। তার ছেলে জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিল একবার সহপাঠীকে শিক্ষকের দেওয়া শাস্তি দেখে ভয়ে। স্কুলে যাওয়া নিয়েও তার মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। ক’দিন বাদে সে নিজেই আক্রান্ত হলো শিক্ষক দ্বারা। অপরাধ ছেঁড়া কাগজ ডাস্টবিনে ফেলতে যাচ্ছিল ছেলেটি। আবার জ্বর এসেছে তার। বাবা শিক্ষকের মারের চিহ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে দিয়েছেন। এই শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিভাবকরা অভিযোগ নিয়ে যাওয়ার সাহস করেন না। প্রধান শিক্ষক, অধ্যক্ষদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয় না। পৌঁছালেও বলেন সন্তানকে স্কুল থেকে সরিয়ে নিতে। তথাকথিত নামি স্কুলের শিক্ষকদের আচরণ আরো ভয়াবহ। অভিভাবকরা তাদের কাছে জিন্মি। কারণ এ প্রকারের স্কুলে ভর্তি করাতে পারা যুদ্ধ জয়ের সমান। সঙ্গে আছে ডোনেশনের চাপ। তাই তারা সয়ে যান।

শ্রেণিকক্ষের পাশে বইমেলা করতে দেশের বিভিন্ন স্কুলে যাওয়া হয়। সেখানে দেখেছি সন্তানের সামনে বাবা কিংবা মাকে কি বীভৎসভাবে শিক্ষকরা অপমান করছেন। ওই অভিভাবক সমাজে, রাষ্ট্রে যত পরিচিত বা প্রভাবশালীই হোননা কেন, রেহাই নেই। অভিভাবকদের তারা দাস বা প্রজা মনে করে অপমান করে যেন বিকৃত আনন্দ পান। এখন তো দেশজুড়ে নানা প্রকারের স্কুলের বাণিজ্য চলছে। সরকারি-বেসরকারি, বাংলা-ইংরেজি মাধ্যম, প্রি-ক্যাডেট, ক্যাডেট মাদ্রাসা এবং বাংলা সংস্কৃতির ধারকের ভনিতা দিয়ে স্কুল বাণিজ্য।  সবখানেই শিক্ষার্থী এবং তার অভিভাবকদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগ আছে। বলছি না অভিভাবকরা দেবদূত। তাদেরও সমস্যার শেষ নেই। তাদের আচরণও শিক্ষকদের সঙ্গে খুব শোভন বলা যাবে না। কিন্তু শিক্ষককে তো তাদের সঙ্গে সমান অবস্থানে এনে দাঁড় করানো যাবে না। তাদেরও এসে এক কাতারে দাঁড়ানো ঠিক হবে না। যে ছেলেটি বা মেয়েটি তার কাছে প্রাইভেট পড়ছে বা তার কোচিংয়ে যাচ্ছে, তাদের সঙ্গে আচরণ এক প্রকার। আর যারা যাচ্ছে না তাদের সঙ্গে আরেক প্রকার হবে কেন? আমি নিজেই তো কতোবার অকৃতকার্য হয়েছি ইংরেজি, অংকে। কখনও সমাজে, আরবিতে। অপরাধ স্কুলের ওই বিষয়ক শিক্ষকদের কাছে না পড়া। আর নিজের ছেলেমেয়েদের স্কুলে পাঠিয়ে দেখছি শিক্ষকদের আচরণের আরো কত অবনতি হয়েছে। আমার ভাগনে কেন ছবি আঁকে, সেজন্য ন্যাশনাল আইডিয়াল স্কুল, বনশ্রীর একজন শিক্ষক ছবি ছিঁড়ে ফেললেন। ঢাকার উদয়ন স্কুলের অধ্যক্ষের কাছে খাতা পূনর্মূল্যায়নের বিষয়ে কথা বলতে গেলে অশিক্ষকসুলভ আচরণ করেন। স্কুলের স্কাউট ক্যাম্প বিষয়ে একাধিক অভিভাবক জরুরি একটি বিষয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করলে তিনি প্রতিবারই বিরক্ত হয়ে ফোন কেটে দেন। নিজেরা সৃজনশীল পদ্ধতি বুঝে উঠতে পারেননি, এখনও সেই দায় চাপিয়ে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীদের ওপর। শিক্ষকদের হিংস্রতা সইতে না পেরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের আত্মহননের কথা আমরা জানি। এই সংখ্যার চেয়ে বহু গুণিতক হলো আতঙ্কে স্কুল ছেড়ে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণের ঘটনা তো এখন নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়।

এই বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে আসতে আমরা কয়েকজন ভাবছি সন্তানদের জন্য একটি ভালোবাসার স্কুল তৈরি করতে। এ খবর জেনে অগ্রজ এক বন্ধু লিখেছেন—‘আমার স্কুল জীবন কেটেছে শিক্ষকদের অনায় আচরণে ভুগতে-ভুগতে। আমার সন্তানদের অবস্থাও তাই। আশা করি আপনাদের স্কুলে কোনও ছাত্র-ছাত্রী শিক্ষকদের অন্যায়ের বলি হবে না।’ পাঠকরা ভাবতে পারেন আমি শুধু শিক্ষকদের উদ্দেশে ক্ষোভ বর্ষণ করে গেলাম। এই ক্ষোভ কতদূর নিগৃহীত হলে তৈরি হতে পারে ভেবে দেখুন? তবে যত ক্ষোভ তার চেয়েও উত্তাল শিক্ষকদের প্রতি আমার, আমাদের ভালোবাসা। এই যে আমি লিখছি, এর পেছনে প্রণোদনা আমার শিক্ষকদেরই। সেই পঞ্চম শ্রেণির বাংলা শিক্ষক বলেছিলেন, তুই লেখায় থাকিস। তিনি আমার লেখা ক্লাসে পড়ে শোনাতেন। আমি এবং আমার সহপাঠীরা স্কুলে-কলেজে এমন অনেক শিক্ষককে পেয়েছি, যাদের সততা, এমনকি দরিদ্রতা দেখেও আমরা শিক্ষক হতে চাইতাম। এখনকার শিক্ষকরা সম্পদশালী, সামাজিক, রাজনৈতিক প্রভাবশালী হওয়ার পরেও তাদের ছাত্র-ছাত্রীরা শিক্ষক হতে চাইছে না। এই দায় কেবল রাষ্ট্রের নয়। ব্যক্তি হিসেবে শিক্ষকেরও। তারপরও শ্রদ্ধা সব শিক্ষকের প্রতি।

লেখক: বার্তা প্রধান, সময় টিভি

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ