বন্ধ হোক ‘রাজনৈতিক দোকান’

Send
সারওয়ার-উল-ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:৪২, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৪৬, সেপ্টেম্বর ১৮, ২০১৯

সারওয়ার-উল-ইসলামবঙ্গবন্ধুর ছবি দিয়ে ‘রাজনীতির দোকান’ না খোলার আহ্বান জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত ৪ সেপ্টেম্বর বঙ্গবন্ধু এভিনিউস্থ আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে তাঁতি লীগ আয়োজিত শোক দিবসের আলোচনায় তিনি আরও বলেছেন, ‘‘বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের নাম ভাঙিয়ে অনেকেই ‘রাজনৈতিক দোকান’ খুলেছেন।’’
তার কথায় প্রমাণিত হয় যে, বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি দিয়ে ‘ব্যবসা’ খোলা যায়। ব্যবসাটা বেশ রমরমাও হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলা, এমনকী ইউনিয়ন পর্যায়েও এ ব্যবসাটা বেশ জমে উঠেছে। এটি লাভজনক ব্যবসা। কারণ, কোনও পুঁজি ও ঝুঁকি ছাড়াই চালানো যায়।  আগে ছিল শুধু নেতাকর্মী পর্যায়ে। যারা শুধু ছিলেন সমর্থক এবং জীবনেও আওয়ামী লীগ করেননি, তারাও নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত রাখতে এ  পসরা সাজিয়ে বসেছেন।
এই ব্যবসা সব দিক থেকেই লাভজনক। নিজের একটি ছবি দিয়ে ব্যানার বানাতে হবে। ওপরে একদিকে বঙ্গবন্ধুর ছবি, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আর সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি। বিশাল সাইজের ব্যানার বানিয়ে এলাকায় ঝুলিয়ে দিলেই চলবে। স্থানীয় কমিটিতে নাম থাকার কোনও প্রয়োজন নেই। নিজের পরিচয় হিসেবে সরকারি দলের ওয়ার্ড ‘টেম্পু সংগঠনের’ উপ-কমিটির সদস্য লিখলেই হবে।

থানা পুলিশ, সরকারি প্রশাসন কোনও সমস্যায় ফেলবে না। এলাকার খালি জায়গায় কিংবা ফুটপাতে দোকান বসিয়ে মাসে মাসে হাজার হাজার টাকা এবং জায়গাভেদে লাখ টাকাও চাঁদা ওঠানোর রাস্তা পরিষ্কার হয়ে যাবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিও দেখে না দেখার ভান করবেন। সাংবাদিক যখন জনপ্রতিনিধিকে প্রশ্ন করবেন, আপনার এলাকায় ফুটপাত বসিয়ে ওমুক-তমুক চাঁদাবাজি করছে, এ ব্যাপারে আপনার কোনও তদারকি নেই কেন? তখন সোজা বলে দেবেন, ওরা দুষ্টু ছেলে, পুলিশ এলে উঠে যায় আবার পুলিশ চলে  গেলে বসে পড়ে। কী করবো বলেন, কতক্ষণ আর নজরে রাখা যায়? কিংবা বলে দেবেন, আমার আগে যারা এই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন, তার ছেলেপেলেরাই ওই দোকানপাট বসিয়ে চাঁদাবাজি করছে।

সুতরাং এর চেয়ে ভালো ব্যবসা আর কী হতে পারে? পুলিশকে জনগণ গিয়ে বলবে রাস্তাঘাট দখল করে, ফুটপাত দখল করে দোকানপাট বসিয়ে ব্যবসা করছে, কিছু বলেন না কেন? খুব সুন্দর জবাব তৈরি করাই থাকে। ভাই বোঝেনই তো। সরকারি দল করে। এছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের লোকজন সব। কাকে কী বলবো? সুতরাং কোনও পুলিশি হয়রানির টেনশন নেই। ব্যানারে ওই তিনজনের ছবি ব্যবহার করলে টেন্ডারবাজি করতেও সুবিধা অনেক। এছাড়া, আছে দোকানপাট থেকে 'ফাউ' খাওয়ার ব্যাপার।  ব্যবসার কি শেষ আছে? এই শ্রেণির নেতাদের বলা হয় ‘হাইব্রিড’ নেতা।

এখন কথা হচ্ছে এই হাইব্রিডদের কারা দলে টানছে? সেটা ওবায়দুল কাদের ভালো করেই জানেন বলেই মনে করি। আর জানেন বলেই ওই ব্যবসার কথাটা বলেছেন।

আওয়ামী লীগে কি এখন আওয়ামী লীগ আছে? এই প্রশ্নটা এখন ব্যাপকভাবে আলোচিত হচ্ছে। যদি সত্যিকার আওয়ামী লীগার থেকে থাকে, তবে ওই ব্যবসার প্রসঙ্গ আসতোই না। আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য, বঙ্গবন্ধুকে চিরতরে জনগণের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রকল্প নিয়ে একটি চক্র সারাদেশে ওই নেতাদের ছবি সংবলিত ব্যানার-পোস্টার বানানোর উসকানি দিয়ে মাঠে ছেড়ে দিয়েছে। তারা এমন এমন কাজ করবে, যা দেখে সাধারণ মানুষ আওয়ামী লীগকে মন্দ চোখে দেখবে। এভাবে আস্তে আস্তে জনরোষ তৈরি হবে। যে জনরোষ তৈরি করেছিল দেশে একাত্তরের পরে তথাকথিত পরাজিত পাকিস্তানিদের দোসররা।

আড়াই শ’বছরের ইতিহাস কী বলে? সিরাজউদ্দৌলাকে কে ছুরি মেরেছিল? ইংরেজদের সঙ্গে আঁতাতকারী মীরজাফর পুত্র মীরনের সহযোগিতায় নবাবের আস্থাভাজন মহম্মদী বেগ। বঙ্গবন্ধুকে কাদের উসকানিতে মারা হয়েছিল? সেই পরাজিত পাকিস্তানিদের প্রেতাত্মা খন্দকার মোশতাক গং। আর এখন আমরা যা দেখছি, তা তো আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। সব জোয়ারের পানির মতো যোগ দিচ্ছে আওয়ামী লীগে। কারা যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে? কোটি কোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে সারা দেশে আওয়ামী লীগে নাম লেখানো হচ্ছে- এমন অভিযোগও আছে। এরা তাহলে কারা?

বাংলাদেশ যখন একটি উন্নত দেশের মডেল হিসেবে পরিণত হতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই এই আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার জোয়ারে গা ভাসাচ্ছে এই দুষ্টুচক্র। যেমনটা হয়েছিল ’৭১ পরবর্তীকালে। বঙ্গবন্ধুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে যাচ্ছিল, তখনই শত্রুরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। যোগ হয়েছিল আন্তর্জাতিক চক্র। ব্যবসা করার সুযোগ দিলে তো ব্যবসা করবেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে ব্যবসা করার সুযোগ কারা দিয়েছিল? একাত্তরে পাকিস্তানিদের কারা সহায়তা করেছিল? পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পেছনে কাদের হাত ছিল? তারা কিন্তু সাত সমুদ্দুর পাড়ি দিয়ে আসেনি। তারা ছিল এই দেশে। বঙ্গবন্ধুর খুব কাছেই।

সুতরাং সাবধান! বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা আর সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি দিয়ে ব্যবসা করা যাবে না—এ কথা না বলে আওয়ামী লীগে যোগ দেওয়ার এই জোয়ার বন্ধ করতে হবে আগে।  আর ব্যবসা তো বন্ধ করতেই হবে। একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে দেশে। ধর্ষণ থেকে শুরু করে পদ্মা সেতুর জন্য মাথা নেওয়া, ছেলে ধরা বলে গণপিটুনি। সামাল দিতে না পারলে মহম্মদী বেগরাই উপসংহারে জিতে যাবে। মোহন লালদের কিচ্ছু করার থাকবে না।

লেখক: ছড়াকার ও সাংবাদিক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ