বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা কি অপরাধ?

Send
মো. আবুসালেহ সেকেন্দার
প্রকাশিত : ১৭:১৭, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৮, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০১৯

মো. আবুসালেহ সেকেন্দারগোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জিনিয়াকে প্রশ্ন করার অপরাধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওই শিক্ষার্থী প্রশ্ন তুলেছিলেন—‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত?’ যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, উপাচার্যের ফেসবুক হ্যাক করেছেন জিনিয়া। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করার পরিকল্পনাও করেছেন এই জিনিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই দাবি যে ধান বানতে শিবের গীত, তা বোঝা গেছে  উপাচার্য ও জিনিয়ার কথোপকথনে। ওই ফাঁস হওয়া কথোপকথনে দেখা যায়, জিনিয়াকে উপাচার্য তার ফেসবুক হ্যাক করা অথবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট হ্যাক করা নিয়ে একটি প্রশ্নও করেননি। বরং সব প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কী হওয়া উচিত’ প্রশ্ন উত্থাপনকে কেন্দ্র করে। আর এই পরিপ্রেক্ষিতে মনে প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করা কি অপরাধ?
অবশ্যই বাংলাদেশে এখনও বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠেনি। এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠেনি, জিনিয়ার প্রশ্ন তার বড় প্রমাণ। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যয়নের পরও জিনিয়া জানে না আসলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী। আর জানে না বলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ কী, সেই প্রশ্ন তাকে উত্থাপন করতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়কে বড়জোর মহাবিদ্যালয় বলা যেতে পারে। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান উৎপাদনের কারখানা। জ্ঞান বিতরণের পাওয়ার হাউজ।

বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা শিক্ষার্থীদের বিবেচনা করবেন জুনিয়র স্কলার হিসেবে। আর শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের মূল্যায়ন করবেন সিনিয়র স্কলার হিসেবে। ওই জুনিয়র ও সিনিয়র স্কলারদের আন্তরিক প্রচেষ্টা ও পরিশ্রমে বিশ্ববিদ্যালয় হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সূতিকাগার। আর জ্ঞান সৃষ্টির প্রধান শর্ত প্রশ্ন উত্থাপন। প্রশ্ন উত্থাপন ছাড়া কোনও জ্ঞান সৃষ্টি হতে পারে না। আর সেই কারণে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখায়। ইতিহাসের পাতায় পাতায় স্বর্ণাক্ষরে তা লেখা আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী আর শিক্ষকের তর্ক-বিতর্কে, নতুন নতুন প্রশ্ন উত্থাপনে কত শত নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি হয়েছে, সেই ইতিহাস কে না জানে! অনেক সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থী ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারার কারণে দু’জনের দুটি পথ দু’দিকে চলে গেছে। সৃষ্টি হয়েছে নতুন মত ও পথ।

ইসলামের ইতিহাসে মুতাজিলা সম্প্রদায়ের উৎপত্তি ওই কথার বড় প্রমাণ। মুতাজিলা সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা ওয়াসিল বিন আতার গুরু ছিলেন ইমাম হাসান আল বসরি। একদিন এক ব্যক্তি হাসান বসরিকে প্রশ্ন করেন, কোনও মুসলমান গুরুতর পাপকাজ করলে তাকে মুসলমান হিসেবে গণ্য করা উচিত কিনা? উত্তরে বসরি ওই অপরাধী ব্যক্তিকে ভণ্ড বলে মত প্রকাশ করলেন। গুরুর পাশে বসে থাকা শিষ্য ওয়াসিল বিন আতা গুরু বসরির ওই উত্তর মেনে না নিয়ে তিনি বললেন, ‘ওই ব্যক্তি মুসলমান ও অমুসলমান কোনোটাই নয়। তার অবস্থান এই দুইয়ের মাঝামাঝি স্থানে।’ শুধু আতা নন, এমন হাজার হাজার উদাহরণ দেওয়া যাবে, যেখানে ছাত্র-শিক্ষকের মতের সঙ্গে শুধু দ্বিমত পোষণ নয়, শিক্ষকের বক্তৃতার ভুল ছাত্র ধরেছেন নির্দ্বিধায়। শিক্ষকও হাসিমুখে তার ভুল স্বীকার করে শিক্ষার্থীর বক্তব্য মেনে নিয়েছেন। দার্শনিক ও গণিতবিদ বার্ট্রান্ড রাসেল তার ‘দ্য অটোবায়োগ্রাফি অব বার্ট্রান্ড রাসেল’-এ ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘ছাত্র ভুল চিহ্নিত করে উত্থাপন করলেও শিক্ষকদের কেউ ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বলে আমার মনে পড়ে না। একবার উদস্থিতিবিদ্যার ওপর এক তরুণ শিক্ষক বক্তৃতা করছিলেন। বক্তৃতার একপর্যায়ে এক তরুণ শিক্ষার্থী শিক্ষককে বাধা দিয়ে বলেন, ঢাকনার ওপর কেন্দ্রবিমুখী বলের কথা কি আপনি ভুলে যাননি? শিক্ষার্থীকে শিক্ষক জাপটে ধরেন এবং বলেন, আমি বিশ বছর ধরে এই উদাহরণটি ওইভাবে ব্যবহার করছি, কিন্তু তুমিই সঠিক।’ এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনও শিক্ষক চল্লিশ বছর ধরে ভুল পড়ালেও কোনও শিক্ষার্থী যদি তা ধরিয়ে দেন, তাহলে ওই শিক্ষক তা কি মেনে নেবেন? ছাত্রকে কি ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্য সাধুবাদ জানাবেন?

গুরুর মতের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ! শিক্ষকের বক্তৃতায় ভুল ধরিয়ে দেওয়া। বাংলাদেশে ভাবা যায়! চিরুনি অভিযান দিয়েও এমন গুরু শিষ্য সত্যি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা, সন্দেহ আছে। আর ভুল ধরিয়ে দেওয়া তো দূরের কথা, যদি কোনও শিষ্য সাহস করে গুরুর মতের সঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করেন; তবে তার কপালে দুঃখ আছে। ওই গুরুর হাতে যদি পরীক্ষার নম্বর থাকে, তবে তো আর কথা নেই! কত ধানে কত চাল, তা ওই শিষ্য পরীক্ষার ফল বেরোলেই টের পাবেন! আর প্রশ্ন যদি উপাচার্যের বিরুদ্ধে হয়, তাহলে তো কথা নেই। বহিষ্কার অবধারিত। গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনিয়ার বহিষ্কার তার সর্বশেষ উদাহরণ।

যদিও এমন হওয়ার কথা ছিল না। কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে—কলেজে কাঠামোবদ্ধ পড়ালেখা হয়, সেখানে নতুন জ্ঞানের সৃষ্টি ও জ্ঞান বিকাশের সুযোগ থাকে সীমিত। ফলে ছাত্ররা শিক্ষকের ক্লাসের বক্তৃতা শোনেন আর পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে সনদ লাভ করেন। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে, শ্রেণিকক্ষের বাইরে গুরু-শিষ্যের আলাপ হবে, তর্ক-বিতর্ক চলবে, কাঠামোবদ্ধ বিষয়ের বাইরেও বিশ্বের নানা বিষয় নিয়ে জ্ঞানের নানা স্তরে সময়-অসময়ে আলোচনা জমবে। শিষ্য যেমন গুরুকে প্রশ্ন করবেন, তেমনি গুরুও শিষ্যকে প্রশ্ন করবেন। সক্রেটিসের ভাষায়, ‘জ্ঞানের শিক্ষকের কাজ হচ্ছে কোনও ব্যক্তিকে প্রশ্ন করা, তার কাছ থেকে উত্তর জেনে দেখানো যে জ্ঞানটা তার মধ্যেই ছিল।’ সক্রেটিসের এই দর্শনের চর্চা কি আদৌও আমাদের দেশের শিক্ষকদের মধ্যে আছে? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক হিসেবে বলতে পারি, সক্রেটিসের ওই দর্শনের চর্চা এদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে খুব কম পরিলক্ষিত হয়। অনেক স্বনামখ্যাত শিক্ষকও ক্লাসে ছাত্রদের প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেন না। অনেক সময় ছাত্ররা প্রশ্ন করলে এক ধমক দিয়ে বসিয়ে দেন। আমার এক বন্ধু বলছিলেন, ‘এক স্বনামখ্যাত শিক্ষকের ক্লাসে বক্তৃতা সংশ্লিষ্ট বিষয়ে এক প্রশ্ন করেছিল। স্যার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এক ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘এটা কি আনন্দ স্কুল পাইছ? বহ!’ এরপর ওই স্যারের ক্লাসে আর কারও প্রশ্ন করার দুঃসাহস হয়নি।”

মাঝে মাঝে ভাবি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন আনন্দ স্কুল হয় না। ছাত্ররা কেন ক্লাস করে আনন্দ পান না? শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতির নম্বর দিয়ে কেন আমাদের ছাত্রদের ক্লাসে ধরে রাখতে হয়।

জ্ঞানের সৃষ্টি ও বিকাশের জন্য প্রশ্ন করার বিকল্প নেই। আর ওই প্রশ্ন করার অনুমতি যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে না থেকে আনন্দ স্কুলে থাকে; তবে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ওই আনন্দ স্কুলই চাই। নামে কিছু যায়-আসে না। আনন্দ স্কুলই যদি শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন করতে শেখায়,  তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের বদলে আনন্দ স্কুলই আমাদের কাঙ্ক্ষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হওয়ায় কোনও দোষ নেই।

জ্ঞানপিপাসু মানুষদের একত্রিত হওয়ার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনা হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয় বা ইউনিভার্সিটির প্রকৃত অর্থও আমাদের সে কথা বলছে। ইউনিভার্সিটি অর্থ একদল মানুষের নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে কোনও এক স্থানে জড়ো হওয়া। আরও সহজ করে বললে বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে জ্ঞান অন্বেষণকারীদের গিল্ড বা সংঘ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অথবা গুরু-শিষ্য সবাই ওই সংঘের সদস্য। ১২ শতকে বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে ওঠার পূর্বেও জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে চর্চা হতো, সেখানে গুরু-শিষ্যের একে অন্যকে প্রশ্ন করা ও একে অন্যের মধ্যে নানা বিষয় নিয়ে তর্ক-বিতর্কের মাধ্যমেই জ্ঞানচর্চা হতো। মহান দার্শনিক সক্রেটিসের শিক্ষা দেওয়ার প্রকৃত পদ্ধতি ছিল প্রশ্নের পর প্রশ্ন তুলে ভালো-মন্দ অথবা ন্যায়-অন্যায় ইত্যাদি বিষয়ে জানা ও বোঝার চেষ্টা করা। প্লেটোর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ডায়ালগস অব সক্রেটিস’-এর পাতায় পাতায় এ কথার প্রমাণ রয়েছে। সক্রেটিসের মতো কনফুসিয়াসও শিষ্যদের সঙ্গে সংলাপের মাধ্যমে শিক্ষা দান করতেন। শিষ্যরা নির্দ্বিধায় সক্রেটিস ও কনফুসিয়াসকে প্রশ্ন করতে পারতেন। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় এখন কি সেই সংস্কৃতি তৈরি করতে পেরেছি, যেখানে শিক্ষার্থীরা নিঃসংকোচ চিত্তে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে পারে? নিজের কাছে নিজে বারবার প্রশ্ন করি, সত্যি কি এদেশের বিশ্ববিদ্যালয় প্রশ্ন করতে শেখায়?

প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা জিনিয়ার মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে যেদিন প্রশ্ন করতে শিখবে, সেদিন এদেশের অনেক সংকট দূর হয়ে যাবে। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে উঠবে গণতন্ত্রের সূতিকাগার। ছাত্ররাজনীতির নামে অছাত্রদের দৌরাত্ম্য কমবে। শিক্ষকদের স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটবে। অগণতান্ত্রিক মানসিকতার শাসকদের ভিত কেঁপে উঠবে। গণতন্ত্রের মুখোশ পরিহিত একনায়কদের পতন হবে। জেগে উঠবে বাংলাদেশ। কিন্তু বিলিয়ন ডলারে প্রশ্ন হচ্ছে, দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে নিঃসঙ্কোচ চিত্তে শিক্ষার্থীরা কার কাছে প্রশ্ন করবেন? শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন শোনার মতো কতজন শিক্ষক আছেন এদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে?

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

/এসএএস/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ