ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও শুদ্ধি অভিযানের ইলিউশন

Send
ডা. জাহেদ উর রহমান
প্রকাশিত : ১৪:০৩, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০৫, সেপ্টেম্বর ২০, ২০১৯

ডা. জাহেদ উর রহমান

 

বাংলাদেশে ইয়াবার আগ্রাসন শুরু হয় ২০১৮ সালের মার্চে। এর আগে বাংলাদেশ তো মাদকমুক্ত ছিলই। এর আগে ইয়াবা বলে কোনও বস্তুর কথা এই দেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, জানতো না পুলিশও। রাতারাতি এই দেশে একদিন ইয়াবা ঢুকতে শুরু করলো এবং কয়েক দিনের মধ্যেই এই মাদক দেশের যুবসমাজকে নেশায় বুঁদ করে তুললো। আমাদেরও অসাধারণ জনদরদি সরকারের অসাধারণ করিৎকর্মা প্রশাসন মুহূর্তেই জাগ্রত হলো, এবং নেমে পড়লো মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে।

‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’—স্লোগান দিয়ে মাদক নির্মূলের এক অভিযান শুরু হয় গত বছর মার্চে। এই অভিযানে গত বছরই বিচার বহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয় ২৭৬ জনকে। এই বছর বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের হার এখন পর্যন্ত গত বছরের চেয়ে বেশি হলেও মাদকের অজুহাতে তার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবু এখন পর্যন্ত এই সংখ্যা কমপক্ষে ৬০/৭০ হবে। মানে তথাকথিত মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গত বছর থেকে এখন পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৩৫০।

মাদকের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধে যাওয়া’ হলো, ৩৫০ জন মানুষের প্রাণ সংহার করা হলো। কিন্তু মাদক কি কমলো? যখন ভীষণভাবে এই অভিযানটি চলছিল গত বছর, তখনও পত্রিকায় নিয়মিতভাবে খবর এসেছে মাদকের সরবরাহ ও প্রাপ্যতা কমেনি খুব একটা। ‘পাখির মতো’ মানুষ মারার মধ্যেও এই ঢাকাসহ সারাদেশে ভালোভাবেই ইয়াবা পাওয়া গিয়েছিল।

ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে পদচ্যুত করার পর সম্প্রতি আরেকটা খবর টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হলো—যুবলীগ নেতার পরিচালিত ক্যাসিনোতে পুলিশের অভিযান এবং সেই নেতা গ্রেফতার।

এই আবহের মধ্যেই গতকাল (১৮ সেপ্টেম্বর) একজন বিখ্যাত সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষকের (যিনি নিয়মিত টক শোতে যান, কলাম লেখেন) সঙ্গে সন্ধ্যায় আড্ডা হচ্ছিল। মোটামুটি নিরপেক্ষভাবে সব কিছু দেখার চেষ্টা করলেও তার মধ্যে এক ধরনের মৃদু আওয়ামী সমর্থন আছে। দীর্ঘদিন খুব কাছে থেকে মিশে আমার বিশ্বাস তার মধ্যে যতটা না আওয়ামী সমর্থন, তার চেয়ে বিরোধীদের প্রতি ভীতিটাই সম্ভবত বড়।

এই সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক গতকাল বলছিলেন, সরকার তো দলের ভেতরে খুব ভালো শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছে। অন রেকর্ড তিনি যাই বলুন বা লিখুন না কেন, ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি তার মনের সত্যিকারের অবস্থানটাই প্রকাশ করেন। এর মানে হলো, তিনি সত্যিকারভাবেই মনে করছেন সরকার তার দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালু করেছে। তার মতো মানুষের মুখে এই কথা শুনে আমি সত্যিই ভীষণ অবাক হয়েছিলাম তখন। তিনি তো বটেই যেটায় ধরা পড়েছে অন্যতম বিরোধী দল বিএনপিও স্বয়ং। এই প্রসঙ্গে পরে আসছি।

স্বাধীনতার পর পরই এই দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ইতিহাস থাকলেও সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিএনপিই এই দেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড শুরু করে। বিভিন্ন চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ হত্যা করতে শুরু করা হয় তখন। এর মধ্যে খুব উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছিলেন বিএনপি নেতাকর্মী। আমার স্পষ্টভাবে মনে পড়ে, সমাজের বহু শিক্ষিত সচেতন মানুষ এই ধরনের পদক্ষেপের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। তৎকালীন সরকার সমাজ থেকে সত্যিকার অর্থেই সন্ত্রাস-চাঁদাবাজি এসব দূর করতে চাইছে, দলীয় কর্মীদেরও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এই ধারণাটাকে পোক্ত করতে অনেকটাই সাহায্য করেছিল। বাংলাদেশ সন্ত্রাস চাঁদাবাজিমুক্ত দেশ হয়ে গিয়েছিল এরপর?

এই কলামের শুরুতে পুলিশের মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার ব্যাপারে বলছিলাম। প্রশাসনকে দেখে মনে হচ্ছিল এই দেশে মাদকের সমস্যা হঠাৎ করে কোনও একদিন হয়ে গেছে। হঠাৎ করে কোনও একদিন যুবসমাজের বিরাট একটা অংশ ইয়াবার নেশায় বুঁদ হয়ে গেছে। হঠাৎ করে খোঁজ পেয়ে সরকার সেটার বিরুদ্ধে অভিযানে নেমেছে। না, ইয়াবা এই দেশে প্রশাসনের নির্লিপ্ততায় (অনেক ক্ষেত্রে সহযোগিতায়) দিনে দিনে কীভাবে একটা প্রজন্মকে গ্রাস করেছে, সেটা ঘটেছে একেবারেই আমাদের চোখের সামনে।

বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের (সেটা যাই হোক না কেন বিএনপি কিংবা আওয়ামী লীগ) ছাত্রসংগঠন কিংবা যুব সংগঠন চাঁদাবাজি এবং নানা অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল না বা নেই এটা বিশ্বাস করার মতো বোকা এই দেশের মানুষ না। কিন্তু সরকারের আচরণ দেখে মনে হয় এই প্রথম কোনও ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের নামে এমন অভিযোগ এসেছে এবং সরকার তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। অনুমান করি, এই শুদ্ধি অভিযানের ইলিউশন আরও পোক্ত হবে কারণ সম্ভবত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিও অপসারিত হবেন। তিনি জাবি ছাত্রলীগকে চাঁদা দিয়েছেন, এমন অডিও ফাঁস হওয়ায় তার পক্ষে এই পদে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।

এই দেশে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ভয়ঙ্করতম সব লুটপাট করে যাওয়া মানুষরা বহাল তবিয়তে থাকতে দেখার মধ্যে তাদের দুর্নীতির দায়ে পদ হারানো তাদের প্রতি কিছুটা করুণা তৈরি করতেও পারে।

শোভন-রাব্বানীকে সরিয়ে দিয়ে সরকার খুব দৃঢ়ভাবে বলতে পারছে অপরাধী যেই হোক না কেন তার বিরুদ্ধে সরকার ব্যবস্থা নেয়। এরপর যদি জাবি ভিসিকে সরিয়ে দেওয়া হয় তাহলে সরকার আরও দৃঢ়ভাবে বলতে পারবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে আছে সরকার।

ঠিক এই ফাঁদেই পা দিয়েছে বিএনপি। যখন শোভন-রাব্বানীর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে তখন বিএনপি’র সর্বোচ্চ পর্যায়ের নেতারা তাদের অপসারণ চেয়েছিলেন, এখন ভিসির অপসারণ চাইছেন। শোভন-রাব্বানী যেহেতু ক্রিমিনাল অফেন্স করেছেন, বিএনপির নেতৃত্ব তাদের গ্রেফতারও চাইছে। এখন যদি তাদের সরকার সত্যি সত্যি গ্রেফতার করে? কিছুদিনের জন্য গ্রেফতার করে দুর্নীতির প্রতি জিরো টলারেন্স দেখানোর একটা মাইলেজ সরকার নিতেই পারে।

বিএনপি’র উচিত ছিল খুব স্পষ্টভাবে বলা, এসব ঘটনা একেবারেই ‘ফালতু স্টান্টবাজি’, এর মাধ্যমে জনগণকে বোকা বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তাদের উচিত ছিল বলা, যে সিস্টেমটা এই সরকারি দল তৈরি করেছে, যেন এরকম শোভন-রাব্বানী কিংবা যুবলীগ নেতা কিংবা জাবি ভিসি তৈরি হয়। সেই সিস্টেমটা ভাঙতে হবে এখনই। তা না করে তারা সেই সিস্টেমের কাছেই তাদের বিচার চাইছেন!

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের নৈতিকতা এবং এর আইনগত দিক সরিয়ে রাখা যাক। শুধু এই যুদ্ধের নামে এমনকী এর আগেও যত মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করা হয়েছে, সেখানেও হত্যা করা হয়েছিল কতগুলো চুনোপুটিকে। মাদক দমনের নামে ৩৫০ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে একটা ফালতু ইলিউশন তৈরি করার চেষ্টা করা হয়েছে। ইয়াবার ক্ষেত্রে যে ব্যক্তিটির নাম গোয়েন্দা সংস্থাসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থার তদন্তে সবার ওপরে এসেছিল, সেই মানুষটির বিরুদ্ধে কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বদনাম আছে বলে গত সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন তাকে দেওয়া হয়নি, কিন্তু এমপি রাখা হয়েছে তার ঘরেই, মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে তার স্ত্রীকে। এতই লম্বা তার হাত।

ছাত্রলীগ এবং যুবলীগ এর ওপরে সাম্প্রতিক পদক্ষেপগুলো (আরও কিছু হয়ত এর সঙ্গে যুক্ত হবে) আসলে কতগুলো ইলিউশন। একটা সরকার যখন একের পর এক নির্বাচনের নামে প্রহসনের মাধ্যমে ক্ষমতায় থাকে, তখন তাকে এরকম কতগুলো ইলিউশন তৈরি করতে হয় মাঝে মাঝেই‌। যে সরকার শুধু ক্ষমতায় থাকার জন্য সম্ভব সব রকম বিভৎস অপরাধ করতে ন্যূনতম কুণ্ঠা বোধ করে না, সেই সরকার দুর্নীতি দমন করে রাষ্ট্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে এই প্রত্যাশা স্রেফ ‘আহাম্মকি’। এরপরও সরকার এটা করে। কারণ সরকার খুব ভালোভাবেই জানে, এই দেশের সাধারণ মানুষ তো বটেই, অনেক গুরুত্বপূর্ণ মানুষও এসব ইলিউশন বেশ ‘খায়’।

লেখক: সদস্য, স্টিয়ারিং কমিটি, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, নাগরিক ঐক্য

এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ