শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতিমালা নিয়ে ভিন্নমত

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৫:৪৯, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫০, সেপ্টেম্বর ২১, ২০১৯

মো. জাকির হোসেনসম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি সংক্রান্ত অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন নিয়ে পত্র-পত্রিকা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল আলোচনার ঝড় ওঠে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক হাজার শিক্ষক অভিন্ন নীতিমালা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে পত্রিকায় বিবৃতি দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিন শতাধিক শিক্ষক ঢাকায় মানববন্ধন করেছেন। প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি সাধারণ সভা করে এ অভিন্ন নীতিমালাকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দিয়েছে।
পৃথিবীর যেসব দেশ জ্ঞান-বিজ্ঞান-গবেষণায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগামী, সেসব দেশে এমন অভিন্ন নীতিমালার প্রচলন নেই। অতীতেও ছিল না। এটি বাস্তবসম্মতও নয়। এমনকী একই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অনুষদ ও বিভাগে ভিন্ন নীতিমালা অনুসরণ করতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়স, মান, অবকাঠামো, ফল, ভৌগোলিক অবস্থান যেখানে ভিন্ন, সেখানে অভিন্ন নীতিমালা কীভাবে সহায়ক হবে? হতে পারে নীতিমালার পরিবর্তন, অভিন্ন কখনোই নয়। একটি শত বছরের পুরনো-প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় ও একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয়কে এক কাতারে শামিল করা বিজ্ঞানসম্মত নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানে প্রভূত উন্নয়নসাধনকারী উন্নয়নশীল চীন প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়নের জন্য ভালো শিক্ষকদের বেশি বেতন, সুযোগ-সুবিধা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের আকর্ষণীয় বৃত্তি দিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত কম মানসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে টানছে।
মানের তারতম্য দূর করার জন্য অভিন্ন নয়, ভিন্ন নীতিমালা দিয়ে চিকিৎসা করছে চীন। তাহলে আমাদের কেন অভিন্ন নীতিমালা? বিষয়টি খোলাসা করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান ও একজন সদস্য। ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগম একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে বড় ধরনের অনেক করাপশনের (দুর্নীতি) অভিযোগ রয়েছে। টাকার বিনিয়মে পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। দেশের স্বার্থে এই নীতিমালা প্রণয়ন করা হলো। এভাবে চলতে থাকলে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে যাবে। বহুদিন ধরে এই বিষয়টা নিয়ে আমরা কাজ করছিলাম।’ অন্যদিকে, ইউজিসির চেয়ারম্যান অভিন্ন নীতিমালা বিষয়ে বলেছেন, ‘শিক্ষার মান বজায় রাখতে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণের চেষ্টা করা হচ্ছে। শিক্ষক নিয়োগ নীতিমালা কার্যকর করা হলে গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে শিক্ষকদের গবেষণার প্রবণতা বাড়বে। মানসম্পন্ন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি হবে। শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য, রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য, পদোন্নতি জটিলতা, লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব কমাসহ স্বচ্ছতা আসবে। শিক্ষকদের মধ্যে পদোন্নতি বৈষম্যও দূর হবে।’
অভিন্ন নীতিমালার পক্ষে প্রধান যে কারণগুলো মঞ্জুরি কমিশন চিহ্নিত করেছে, তা হলো,  শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি বন্ধ, লেজুড়ভিত্তিক শিক্ষক রাজনীতির প্রভাব কমানো, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের একই মানে উন্নীতকরণ ইত্যাদি। কী আছে এ অভিন্ন নীতিমালায়? বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে হলে এসএসসি ও এইচএসসির প্রত্যেকটিতে ন্যূনতম জিপিএ ৪.৫ এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের প্রত্যেকটিতে ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫ থাকার বাধ্যবাধকতা, শিক্ষকদের পদোন্নতি পেতে হলে গবেষণা ও প্রকাশনার বাধ্যবাধকতা, রাজনৈতিক প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের লাগাম টানতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা এবং ডামি ক্লাসের বিধান চালু করা।

এ অভিন্ন নীতিমালা গ্রহণে শিক্ষকদের ক্ষোভের কারণ কী? যেসব কারণে শিক্ষকরা এ অভিন্ন নীতিমালার বিরুদ্ধে তা হলো—

এক.

এই অভিন্ন নীতিমালাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন কেড়ে নেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী আমলাতান্ত্রিক ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন শিক্ষকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগের জন্য বর্তমান নিয়মে ন্যূনতম তিনটি প্রথম শ্রেণি থাকার বাধ্যতামূলক বিধান রয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধান অনুযায়ী অধিকাংশ বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের প্রত্যেকটিতে ন্যূনতম সিজিপিএ কমিশন প্রস্তাবিত ৩.৫-এর বেশি থাকার বাধ্যবাধকতাও চালু রয়েছে। শিক্ষকদের পদোন্নতির ক্ষেত্রে কেবল চাকরির বয়স নয়, উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন ও নির্ধারিত সংখ্যক গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ বাধ্যতামূলক। বিদেশি ডিগ্রি অর্জন ও বিদেশি জার্নালে গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশনাকে উৎসাহিত করার জন্য প্রণোদনা হিসেবে পদোন্নতির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পয়েন্ট যোগ করার বিধান রয়েছে। এরপরও কেন এ অভিন্ন নীতিমালা? আর যাদের জন্য নীতিমালা, সে অভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন কমিটিতে কমিশনের সদস্য ছাড়া শিক্ষকদের প্রতিনিধি নেই কেন? সন্দেহ ও অবিশ্বাস এখানেই। বিশ্ববিদ্যালয় একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। তদুপরি ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও জাহাঙ্গীরনগর—এ চারটি বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। এ আইনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি ও অপসারণ সংক্রান্ত বিধান প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটসহ অন্যান্য পর্ষদকে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ১৯৭৩-এর ৬, ১৩, ২৬, ২৭, ২৯, ৩৬, ৪০, ৫৫ ও ৬৫ ধারায় শিক্ষক নিয়োগের শর্তাবলি প্রণয়ন, নিয়োগদান, পদোন্নতি ও অপসারণের ক্ষমতা কেবল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যলয়কে দেওয়া হয়েছে, মঞ্জুরি কমিশন বা অন্য কাউকে প্রদান করা হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, ধারা ৬-এ বলা হয়েছে, “the University shall have the powers to institute Professorships, Associate Professorships, Assistant Professorships, Lecturerships and any other research and teaching posts required by the University, and to appoint persons to such Professorships, Associate Professorships, Assistant Professorships, Lecturerships and such other research and teaching posts;” অভিন্ন নীতিমালার ধারণাটিই বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণার সঙ্গে আসামঞ্জস্যপূর্ণ। এরপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অভিন্ন নীতিমালা যদি প্রণয়ন করতেই হয়, তবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্বকারী পর্ষদের সদস্য বা তাদের মনোনীত অভিজ্ঞ শিক্ষকরা একত্রে বসে আলাপ-অলোচনার মাধ্যমে একটি খসড়া তৈরি করবেন। পরবর্তী সময়ে নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনানুগ পর্ষদ তথা অ্যাকাডেমিক কাউন্সিল ও সিন্ডিকেটে তা অনুমোদিত হবে। তা না করে কমিশনের ৪ জন সদস্য, কমিশনের সচিব ও একজন পরিচালককে নিয়ে ৬ সদস্যের কমিটি করে একটি নীতিমালা তৈরি করে তা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আরোপ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ ধরনের আরোপকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বায়ত্তশাসনের ওপর হস্তক্ষেপ বলে মনে করছেন।

দুই.
বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের সঙ্গে ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতির সঙ্গে সাধারণ শিক্ষকদের কোনও সম্পৃক্ততা নেই। এর সঙ্গে জড়িত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য ও উচ্চাভিলাষী কয়েকজন শিক্ষক। তদবিরে তকদির ফেরে—এমন রাজনৈতিক তদবির-লবিংয়ের মাধ্যমে উপাচার্য, উপ-উপাচার্য নিয়োগের পথ উন্মুক্ত রেখে শিক্ষক নিয়োগে দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও লেজুড়বৃত্তির রাজনীতি বন্ধ করা সহজ হবে না। এমনকী নিয়োগের ক্ষেত্রে লিখিত পরীক্ষার বিধান চালু করেও সুফল পাওয়া যাবে না। যাদের সুপারিশে, অনুগ্রহে উপাচার্য, উপ-উপাচার্যরা নিয়োগ পান, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে তাদের কোনও অনুরোধ-তদবির উপেক্ষা করা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা ব্যক্তিদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব। কাজেই শিক্ষক নিয়োগে অভিন্ন নীতি নয়, বরং উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগে রাজনৈতিক তদবির-লবিংকে অযোগ্য ঘোষণার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ ও অ্যাকাডেমিক ক্ষেত্রে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জনকারীদের নিয়োগ দিতে উপাচার্য ও উপ-উপাচার্য নিয়োগবিধির সংস্কার আবশ্যক। প্রায় তিন দশকের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতায় দেখেছি রাজনৈতিক তদবির-লবিংয়ে নিযুক্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্যরা শিক্ষক সত্তা হারিয়ে ভিন্ন মানুষ হয়ে যান। দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতিতে আকণ্ঠ নিমজ্জিত হয়ে যান।

তিন.
মঞ্জুরি কমিশন প্রস্তাবিত অভিন্ন বিধিমালাকে শিক্ষক সমাজ ত্রুটিপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত নয় বলে মনে করেন। স্থানীয় র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর তলানিতে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ-পদোন্নতির নীতিমালা অভিন্ন হবে, এটা কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না।

চার.
প্রভাষক  পদে আবেদনের যোগ্যতা নির্ধারণ করতে অনার্স ও মাস্টার্স পর্যায়ের পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পর্যায়ের জিপিএ ৪.৫০ বাধ্যতামূলক করা বাস্তবসম্মত নয়। একজন শিক্ষার্থী, এসএসসি পরীক্ষায় যদি কোনও কারণে ৪.৫০-এর নিচে পান, তাহলে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার সম্ভাবনা সেখানেই শেষ। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে যতই ভালো করুক, বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ও পোস্ট-ডক করুক, খ্যাতিমান জার্নালে প্রকাশিত গবেষণামূলক নিবন্ধ থাকুক, কোনও লাভ নেই। প্রথম ছাঁকনিতেই আটকে যাবে তার শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন। পৃথিবীর কয়টা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগের জন্য এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার ফলকে গুরুত্ব দেওয়া হয়? বহু দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগে স্নাতকের ফলকেও গুরুত্ব দেওয়া হয় না। তারা গুরুত্ব দেয় গবেষণার মানকে। পাবলিকেশন্সের মানকে। গুরুত্ব দেয় রিসার্চ প্রপোজালকে।
পৃথিবীর বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে যেখানে পিএইচডি অভিসন্দর্ভের মান, গবেষণায় দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাই মূল বিবেচ্য, তখন আমরা অধ্যাপক পদের জন্যও এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার ফলকে গুরুত্ব দেই। কমিশন প্রস্তাবিত অভিন্ন নীতিমালার খসড়া সম্পর্কে চীনের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপকের অভিমত প্রাসঙ্গিক বলে এখানে তুলে ধরছি, ‘আমি খুব মনোযোগ দিয়ে এটা পড়লাম। খুব আশ্চর্যের সঙ্গে উপলব্ধি করলাম, বাংলাদেশের কোনও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার পদেও আবেদন করার যোগ্যতা আমার নেই! আমেরিকার একটা আইভিলিগ স্কুল (UPenn) থেকে খুব ডাকসাইটে অধ্যাপকের অধীন পোস্টডক, স্টকহোম ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি, পৃথিবীখ্যাত জার্নালে সাতটি ফার্স্ট অথরশিপসহ মোট বারোটি পাবলিকেশন করে, সুইডিশ কেমিক্যাল সোসাইটি থেকে সাড়ে তিন লাখ ক্রোনরের স্কলারশিপ পেয়ে, নয়টি ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে (আমেরিকায় পাঁচটি) অংশ নিয়েও দেশের কোনও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক  পদে আবেদনের যোগ্যতা আমার নেই! অথচ চীনের সিয়ান জিয়াওতং ইউনিভার্সিটিতে (XJTU) সরাসরি সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগপত্র পেয়েছি। দুনিয়ার যেকোনো দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি আবেদনের যোগ্যতা রাখি। কিন্তু আমার দেশে আবেদনের যোগ্যতাই রাখি না। এর কারণ, ইউজিসির অভিন্ন নীতিমালা অনুযায়ী লেকচারার পদে আবেদনের জন্য স্নাতকে (অনার্সে) জিপিএ ৩.৫০ থাকতে হবে। কিন্তু অনার্সে আমার জিপিএ হলো ৩.৪৭। ভাবলাম, নিজভূমে অযোগ্য বলেই তো পরবাসী!’

পাঁচ.
অভিন্ন নীতিমালায় পদোন্নতির ক্ষেত্রে ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর গণনা হয় একটি জার্নালে প্রকাশিত প্রবন্ধ কী পরিমাণে অন্য গবেষকদের গবেষণা প্রবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছে, সে হিসাব কষে। কোনও জার্নালের কোনও নির্দিষ্ট সালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হলো—পূর্ববর্তী দুই বছরের প্রকাশিত সব প্রবন্ধ এবং সেই প্রবন্ধগুলোর মোট সাইটেশন (অন্য কোনও প্রবন্ধে ব্যবহৃত হওয়া) এর একটি পরিসংখ্যান। উদাহরণস্বরূপ, যদি একটি জার্নালে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে মোট ৫০টি পেপার প্রকাশিত হয়েছে এবং এই ৫০টি পেপার ২০১৮ সালে মোট ২০০ বার অন্য কোনও পেপারে উদ্ধৃত (সাইটেশন) হয়েছে, তাহলে ওই জার্নালের ২০১৮ সালের ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর হবে ২০০/৫০ = ৪.০০। ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর ০.০১ থেকে শুরু করে ৭০ বা ততোধিকও হতে পারে। যেমন, The New England Journal of Medicine-এর ২০১৫ সালের impact factor ছিল ৭০.৬৭০। শিক্ষকদের গবেষণার মান বাড়ানোর  জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এজন্য প্রচুর অর্থ খরচ করতে হবে। সে জোগান কে দেবে?
জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা সংক্রান্ত ব্যয় ২৩১ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ১৯,১৭৩ কোটি টাকা, মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক গবেষণা ব্যয় ১১,৩৭১ কোটি টাকা, ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯,৭৯৪ কোটি টাকা। ডিউক, স্টানফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা খাতে বার্ষিক ব্যয় যথাক্রমে ৮,৬৩২ কোটি, ৮,৪৬৬ কোটি এবং ৮,৩৮৩ কোটি টাকা। আর বাংলাদেশের ৪৬টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এ বছরের গবেষণা বরাদ্দ মাত্র ৬৪ কোটি টাকা। গত কয়েক দশক ধরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও জীববিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষকদের কাছে শুনে আসছি গবেষণাগারে আধুনিক যন্ত্রপাতি দূরে থাক, পরীক্ষা-নিরীক্ষার কেমিক্যাল ও গ্লাসওয়্যার কেনার জন্যও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নেই।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ গবেষণা খাতে তাদের জিডিপির কত শতাংশ ব্যয় করে, তার ভিত্তিতে UNESCO Institute for Statistics ১৩৫টি দেশের তালিকা করেছে। তালিকায় ভারত, পাকিস্তান এমনকী নেপালের নাম আছে, কিন্তু বাংলাদেশের নাম নেই। বিশ্বের যেসব রাষ্ট্র গবেষণা খাতে বছরে ন্যূনতম ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় করে, উইকিপিডিয়া তাদের তালিকা প্রকাশ করেছে। এ তালিকায় ৮৭টি রাষ্ট্রের নাম রয়েছে, যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু এ তালিকায়ও বাংলাদেশের নাম নেই।

ভারত, শ্রীলংকা ও পাকিস্তানে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য মাসিক বেতনের বাইরে অ্যাকাডেমিক ভাতা, গবেষণা ভাতা, এককালীন গবেষণা উন্নয়ন অনুদানের ব্যবস্থা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, শ্রীলংকায় একজন সিনিয়র অধ্যাপকের মূল বেতন প্রতি মাসে সর্বনিম্ন ৬৭ হাজার ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ৮৭  হাজার ৭৭৫ রুপি। এই মূল বেতনের বাইরে শিক্ষকরা বেশ কিছু ভাতা পান, যেমন—জীবনযাত্রার ব্যয় নির্বাহ ভাতা প্রতিমাসে ৭ হাজার ৮০০ রুপি, অ্যাকাডেমিক ভাতা হিসেবে একজন শিক্ষক মূল বেতনের ৮০-৯০ শতাংশ পেয়ে থাকেন। এছাড়া, রয়েছে গবেষণা ভাতা ও বিশেষ ভাতা যথাক্রমে মূল বেতনের ৩৫ এবং ২০ শতাংশ। পাকিস্তানের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের জন্যও ভিন্ন বেতন স্কেল রয়েছে।
ভারতের ষষ্ঠ বেতন কমিশনের সুপারিশে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে বলা হয়েছে, ‘Teachers in various categories should be given incentives by way of advance increments and higher grade pay to compensate them for higher qualifications at the entry point. Also, it would be a significant incentive for more meritorious scholars to join the teaching profession, particularly at this juncture when both the corporate sector and foreign educational institutions are luring the young talented persons away with higher salaries and better pay packages’. ভারতের বেতন কমিশন যেখানে মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে, শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষা ও বাড়ানোয় অবস্থান নিয়েছে, সেখানে বাংলাদেশের বেতন কমিশনের সুপারিশে শিক্ষকদের এই পর্যন্ত  উপভোগ করে আসা মর্যাদা ছিনিয়ে নিয়ে এর অবনমন ঘটানো হয়েছে।
মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, চীন, কাতারসহ বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে পিয়ার রিভিউড জার্নালে একটি প্রবন্ধ প্রকাশের জন্য ইমপ্যাক্ট ফ্যাক্টর অনুযায়ী শিক্ষক ও গবেষককে কয়েকশ’ থেকে কয়েক হাজার ডলার পর্যন্ত পুরস্কার দেওয়া হয়। আর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের বছরে ৩ হাজার টাকা বই কেনার জন্য দেওয়ার বিরুদ্ধে মঞ্জুরি কমিশন অডিট আপত্তি দিয়েছে। বাংলাদেশে হাজার হাজার সরকারি কর্মকর্তাকে ১ শতাংশ সার্ভিস চার্জের বিনিময়ে গাড়ি কেনার জন্য ৩০ লাখ টাকা ঋণ দেওয়ার বিধান আছে। এর মধ্যে মাত্র ১০ লাখ টাকা ফেরতযোগ্য। গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। অথচ শিক্ষকদের গবেষণার জন্য কোনও ভাতার ব্যবস্থা নেই। কম তেলে মচমচে ভাজা হয় না।

ছয়.
উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে স্কুল-কলেজ শিক্ষার মানের সম্পর্ক নিবিড়। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক একটি জরিপে প্রকাশ বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষায় ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলা পড়তে পারে না। ইংরেজি ও গণিতে দুর্বলতা আরও বেশি। মাধ্যমিক-উচ্চ মাধ্যমিকের অবস্থা এর চেয়ে ভালো নয়। আমার শিক্ষকতার জীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থী পেয়েছি, যারা অর্থ বোঝা দূরে থাক, ইংরেজি রিডিংও জানেন না এ যখন অবস্থা, তখন অভিন্ন নীতিমালার দাওয়াই দিয়ে কি উচ্চশিক্ষার মান বাড়ানো যাবে?

অভিন্ন নীতিমালা আরোপ নয়, আলোচনায় বসুন। দূর দেশ নয়, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগান। মানসম্মত শিক্ষা ও গবেষণার অসুখ চিহ্নিত করে চিকিৎসাপত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নিন।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: zhossain1965@gmail.com

 

/এসএএস/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ