তিনি সম্রাট!

Send
হারুন উর রশীদ
প্রকাশিত : ১৬:০২, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩২, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৯

হারুন উর রশীদযার নাম ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, যিনি আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে চাঁদা দাবি করেছেন, যিনি ঢাকায় ক্যাসিনোর নিয়ন্ত্রক—তাকে কেন গ্রেফতার করা হচ্ছে না? তার ক্ষমতার উৎস কী? তার গডফাদার কারা? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।
তার নাম জানি। তিনি আর কেউ নন। ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। ব্যাপক অভিযান আর গ্রেফতারের মধ্যেও তিনি আছেন মুক্ত। রাতে বসেন তার কাকরাইলের অফিসে। তাকে পাহারা দেয় তার দলীয় ক্যাডাররা। যেন এক সম্রাট দেখাচ্ছেন তার ক্ষমতা। ক্ষমতা এমনই, স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সরাসরি বলতে পারছেন না পুলিশ তাকে খুঁজছে। তাকে গ্রেফতার করা হবে। তিনি বলেন, প্রমাণ পেলে সম্রাটকেও গ্রেফতার করা হবে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে যার বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে, তাকে গ্রেফতারে এখন প্রমাণ খুঁজতে হচ্ছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে।
এই সম্রাটের বিরুদ্ধে প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে অভিযোগ যায় গত বছরের সেপ্টেম্বরে। তখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে যাওয়ার আগে প্রধানমন্ত্রী গণভবনে ওই অভিযোগ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান। ভেঙে দিতে বলেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের কমিটি। আর প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের কারণ ছিল আঞ্জুমানের ভবন নির্মাণে সম্রাটের চাঁদা দাবি। কিন্তু গত এক বছরে কমিটি তো ভাঙেইনি। সম্রাটও টিকে আছেন। শুধু টিকে থাকা নয়, মনে হচ্ছে আরও শক্তি সঞ্চয় করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর ক্ষোভের পর কিছু দিন তাকে সিঙ্গাপুরে গিয়ে থাকতে হয়েছে মাত্র। তার গডফাদাররা তাকে রক্ষায় সব কাজ করেছেন। কারণ সম্রাট তাদের কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁস।

কিন্তু বছর ঘুরে এই সেপ্টেম্বরে আবারো প্রধানমন্ত্রী তার পুরনো ক্ষোভ নতুন করে প্রকাশ করেন। এবার আরও নতুন তথ্য-প্রমাণসহ। ১৪ সেপ্টেম্বর গণভবনে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে তিনি যুবলীগকে ধরার নির্দেশ দেন। পরিষ্কার করার নির্দেশ দেন। এবার তিনি ছবিসহ আরও তথ্য-প্রমাণ হাজির করেন। আর এবারও মূল অভিযোগ ওই সম্রাটের বিরুদ্ধেই।

অভিযান শুরু হয়েছে। ক্যাসিনো থেকে এখন স্পা সেন্টারে যাচ্ছে র‌্যাব-পুলিশ। কিন্তু তাতে সম্রাটের কোনও অসুবিধা হচ্ছে না। তার কাছে পুলিশ বা র‌্যাব ঘেঁষতে পারছে না। তিনি তার দফতরে আছেন নিজ পাহারায়।

পারবে কীভাবে? যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী তো আগেই পাল্টা হুমকি দিয়ে বসে আছেন। যুবলীগের কাউকে গ্রেফতার করা হলে তিনি বসে না থাকার হুমকি দিয়েছেন। হুমকি দিয়েছেন র‌্যাব-পুলিশকে অ্যারেস্ট করার। আর তাদের আঙুল চোষার  কথা বলেছেন।

অভিযান শুরুর পর এখন অবশ্য কৌশল পাল্টে বলেছেন, যাকে অ্যারেস্ট করা হবে, তাকেই সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হবে। আর অবাক করা ব্যাপার হলো—‘আসল’ যুবলীগের কেউই এখনও গ্রেফতার হননি। দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ফ্রিডম পার্টি থেকে যুবলীগে এসেছেন। আর কেন্দ্রীয় সমবায় সম্পাদক জি কে শামীম নাকি যুবলীগেরই কেউ নন। তিনি আগে যুবদল করতেন।
তাহলে যুবলীগের কে গ্রেফতার হলেন? যারা তাদের দিয়ে এই ক্যাসিনো আর টেন্ডার ব্যবসা করাতেন, তারা কই। ‘জিন্দাবাদের’ লোক ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে সব দখল করে নিলো। তাহলে যুবলীগের এই মহান নেতারা কি তখন আঙুল চুষছিলেন?

আসলে এখন ‘বলির পাঁঠা’ প্রকল্প চলছে। সবাই জানে ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি সম্রাট শুধু দক্ষিণ নয়, পুরো ঢাকার নিয়ন্ত্রক। তার নাম ধরেই ক্যাসিনো ব্যবসা বিস্তার লাভ করে। পোক্ত হয় যুবলীগের টেন্ডারবাণিজ্য। আর এই বাণিজ্যের টাকা ভাগে যুবলীগে ক্যাশিয়ারও আছে। এই টাকা গড়ায় ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত চেইনের মাধ্যমে।

সম্রাটের সঙ্গে ওমর ফারুক চৌধুরীর নানা ভঙ্গিতে হাস্যোজ্জ্বল ছবি প্রমাণ করে তিনি কতটা ক্ষমতাধর। কিন্তু সেই ক্ষমতার দৌড় কতদূর? না অনেক সিনিয়রের ‘কাহিনি’ ফাঁস হওয়ার ভয়ে সবাই মিলে তাকে প্রোটেকশন দিচ্ছেন। জি কে শামীমের ভিআইপিদের সঙ্গে ছবি দেখে আমি যতটা বিস্মিত, সম্রাটের এখনও টিকে থাকার ঘটনায় আমি তার চেয়েও বেশি বিস্মিত। ভাবছি তার ক্ষমতার আসল রহস্য কী?
সম্রাট এখন পাহারা বসিয়েছেন। অভিযান শুরুর দিন থেকেই তিনি নিজস্ব বাহিনীর পাহারায় আছেন তার কাকরাইলের অফিসে। রাতে কয়েকশ’ তরুণ নাকি থাকছেন তার পাহারায়। তিনি এই অবস্থান নিয়ে কাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। তাকে কি ধরা হবে না? আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কি তাকে ভয় পায়? পুলিশ কি যুবলীগ সভাপতির হুমকিতে ভীত হয়ে পড়েছে? না কোনও অদৃশ্য শক্তি তাকে রক্ষা করছে?
তিনি কি কোনও সম্রাট? আমরা তো জানি তিনি অপরাধী। রাষ্ট্রযন্ত্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো কোনও সম্রাট তো থাকার কথা নয়। তাহলে এই সম্রাট আছেন কীভাবে?
লেখক: সাংবাদিক

ইমেইল: swapansg@yahoo.com

/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ