‘আমি যেন তার নিরাপত্তা হই’

Send
জোবাইদা নাসরীন
প্রকাশিত : ১৬:৪৩, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০১৯


জোবায়দা নাসরিনশিক্ষকতা নিছক কোনও চাকরি নয়, দায়িত্বপূর্ণ পেশা। বারবার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আমাদের দায় ও দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এ কারণেই এটি আর নিছক কোনও চাকরি নয়, বরং অন্যভাবে বলতে গেলে শিক্ষার্থীরাই একজন শিক্ষককে ‘শিক্ষক’ হয়ে ওঠার মানসিকতা তৈরি করে দেন। শিক্ষার্থী না থাকলে কেউ শিক্ষক হতে পারবেন না। এই শিক্ষার্থীরাই প্রতিদিনের দেন-দরবারের মধ্য দিয়ে আমাদের শিক্ষক বানান, কিংবা আমাদের শিক্ষক রূপটিকে চেনানোর চেষ্টা করেন।

শিক্ষকতা পেশায় চাকরি পেলেই কি শিক্ষক পরিচয়ের সুযোগ আছে? স্পষ্টভাবে বলতে গেলে এর উত্তর হবে ‘না’। কারণ যদি সব শিক্ষকই ‘শিক্ষক’ হতে পারতেন, তাহলে কোনও শিক্ষার্থীর গায়ে কখনও আঁচড় পড়তো না। শিক্ষার্থীর ওপর কোনও ধরনের হামলা হলে শিক্ষকরা বুক পেতে সেটি প্রতিহত করতেন। কারণ, একজন শিক্ষকই শিক্ষার্থীর কাছে সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা। কিন্তু বাস্তবে আমরা ভিন্ন চিত্র দেখি। সেই শিক্ষার্থীদের ভয় দেখিয়ে, শোকজ করে ছাত্রত্ব বাতিলের হুমকি দিয়ে কিংবা মামলা দিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণে না থাকলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। আর সেগুলো চালানো হয় খোদ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেই।
গত সাত-আট মাস ধরে গোপালগঞ্জে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিষয়ে আন্দোলন চলছে। তবে শোকজ ‘মন্ত্র’ দিয়েই আন্দোলন দমানো হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি একজন ছাত্রীকে বহিষ্কার নিয়ে আবারও আন্দোলনে উত্তাল হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়টি এবং একপর্যায়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানো হয়। গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত শিক্ষার্থীদের শুধু রক্তাক্ত দেহই নয়, দিশেহারা ছোটাছুটি, খাল-বিল, ধানক্ষেতে নিজেকে লুকিয়ে রেখে নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা শিক্ষকতার দায়কে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করে? এই কষ্ট ও  রাগ-ক্ষোভের জায়গাগুলো বুকে আরও চেপে বসে, যখন জানা যায়, শিক্ষার্থীদের ওপর বহিরাগতদের হামলার আদেশ সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছ থেকে এসেছে বলে অভিযোগ করছেন সদ্য পদত্যাগ করা সহকারী প্রক্টর মো. হুমায়ুন কবির (বিবিসি বাংলা, ২২ সেপ্টেম্বর)। শুধু তাই নয়, এই আন্দোলনের কারণে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি এবং শিক্ষার্থীদের দ্রুত হল ছাড়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।

তবে আরও মজার বিষয় হলো—প্রশাসন বলছে, তারা এই হামলার বিষয়ে কিছুই জানতো না। মানলাম তাদের কথা সত্য। তাহলে একেবারেই একটি নিরীহ প্রশ্ন করতে চাই, যখন আপনারা শুনতে পান, আপনাদের শিক্ষার্থীদের কে বা কারা মারছে, তাদের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তি হিসেবে ভিসি তখন কী করেছেন? সেই সময়ই কি আপনি তাদের হামলা থেকে রক্ষা করার জন্য কোনও ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন? কয়জনকে রক্ষা করার জন্য আপনি শিক্ষক হিসেবে বুক পেতে দিয়েছেন? কিংবা শিক্ষার্থীদের এই আহত হওয়ার চিত্র শিক্ষক হিসেবে আপনাকে কি মানিসকভাবে বিপর্যস্ত করেছে? আর এই ‘না’ করার মধ্য দিয়েই আপনি বা আপনারা প্রমাণ দেন যে শিক্ষার্থীদের ওপর এই হামলা-মামলায় আপনাদের সায় আছে, কিংবা আপনাদের নির্দেশেই এগুলো হয়। এ বিষয়ে মিডিয়াকে ভিসি আরও বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুই কিলোমিটার দূরে হয়েছে হামলার ঘটনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরেও না। তাই এই ঘটনার দায় কোনোভাবে তার ওপর দোষ চাপানো অন্যায়। শুধু তাই নয়, কারা এই হামলা করেছে, সেটি জানাও তার এখতিয়ারভুক্ত নয়। কিন্তু এই আপনিই তো কয়দিন আগে মিডিয়ায় বলছিলেন, আপনি তাদের অভিভাবক। তাদের ভালো-মন্দ দেখভাল করার অংশ হিসেবে আপনি তাদের শোকজ করেছেন। তাহলে দুই কিলোমিটার কেন দরকার হলে দুই হাজার কিলোমিটার দূরে থাকলেও আপনি তাদের অভিভাবকের দায়িত্ব পালনের কথা।

ভিসি যখন নিজেকে শিক্ষার্থীর অভিভাবক দাবি করেন, আপনি তাদের শাসাতে পারেন, সেই শিক্ষার্থীর শরীর থেকে কীভাবে রক্ত ঝরে? শিক্ষক হিসেবে কেন জোরালো কণ্ঠে বলতে পারেন না, আমি থাকতে আমার শিক্ষার্থীদের গায়ে কেউ আঘাত করতে পারবে না?  শুধু পড়াশোনাই নয়, আমরা শিক্ষার্থীদের জন্য সব করতে প্রস্তুত। কারণ এই শিক্ষার্থীরাই আমার শিক্ষক পরিচয় মজবুত করান, আমাকে ভেতর থেকে শিক্ষক হিসেবে তৈরি হতে সবচেয়ে বেশি সহায়তা করে। শোকজ করে তাদের চিন্তার দুয়ার বন্ধ করে অভিভাবকত্ব ফলানোর যে আস্ফালন দেখিয়েছেন ভিসি, অথচ তিনি এই ঘটনায় লিখিতভাবে শুধু নিন্দাই প্রকাশ করলেন। হামলাকারীকে অতি দ্রুত আইনের আওতায় আনার জন্য তিনি কী কী পদক্ষেপ নিয়েছেন এখন পর্যন্ত? কতজন গ্রেফতার হয়েছে? নাকি দুই কিলোমিটার দূরত্বের দোহাই আপনার ‘দায়িত্ব’ পালনের  অস্বীকৃতিকে বৈধ করে?

শিক্ষার্থীদের মেরে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাড়িয়ে আপনি শিক্ষক হিসেবে থাকবেন? তা কীভাবে সম্ভব? শিক্ষার্থীদের ঝলমলে অস্তিত্ব না থাকলে আমার বা আপনার শিক্ষক পরিচয়ের কোনও ধরনের সুযোগই নেই? শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে মাথা উঁচু করে টিকে না থাকতে পারলে, তাদের ওপর আক্রমণ ঠেকাতে না পারলে, তাদের নিরাপত্তার ব্যারিকেড হয়ে উঠতে না পারলে আমাদের শিক্ষক হিসেবে পরিচয়ের কী সামাজিক অর্থ আছে? কী হবে উচ্চতর ডিগ্রি দিয়ে, পদ আর পদবি পেয়ে? কাদের জন্য আমাদের এই শিক্ষক হয়ে থাকা। ক্ষমতার জন্য? ক্ষমতা পাল্টাবে, গদি হয়তো ছুটে যাবে, আবার ফিরে যেতে হবে শিক্ষার্থীদের কাছে। কিন্তু শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষকদের এই নৈতিক চেহারা সারা জীবন মনে রাখবে। মনে রাখতে হবে পেশার জোরে নয়, শিক্ষার্থীদের জন্যই আপনি চিরদিন শিক্ষক হিসেবে থাকবেন। আমাদের শিক্ষক পরিচয়ের আসল কারিগর যে শিক্ষার্থীরাই। তাই শিক্ষার্থীদের কাছে আমরাই যেন হই তার প্রথম নিরাপত্তা নিশ্চিতকারী।

জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইমেইল: zobaidanasreen@du.ac.bd

/এমএনএইচ/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ