নামা যাবে না, থামা যাবে না

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৭:৪৪, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৪৬, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০১৯

মোস্তফা হোসেইনঢাকায় নাকি টাকা ওড়ে বাতাসে। এখন দেখি এই দেশে টাকা রাস্তায়ও গড়াগড়ি খায়। ব্যাংকে রেখেও নিরাপত্তাহীনতায় কাটানো দেশে কোটি কোটি টাকা ঘরে পাওয়া যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতে পারে—জনসংখ্যাধিক্যের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের বদনামটা বদলে হচ্ছে টাকাধিক্যের দেশ। হাতেনাতেই তো ধরা পড়ছে, এই টাকার মালিকেরা। এমন এমন মানুষের হাতে হাতকড়া লাগছে, যা হয়তো আমজনতা ভাবতেও পারেনি কদিন আগেও।
এতদিন বলা হতো রাঘববোয়াল ও গডফাদারদের না ধরা হলে কিছুই হবে না। অবৈধ টাকার মালিকদের ধরতে না পারলে দুর্নীতি থেকেই যাবে। আর সরকার রাঘবদের ধরবে না এটাও ফলাও করেই প্রচার হয়েছে। চাঁদা চাওয়ার অভিযোগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় দুই শীর্ষনেতাকেই পদচ্যুত করা হলো। তখনও সমালোচনা হয়েছে, আরে রাঘবদের তো আর ধরা হবে না। কিন্তু যে মুহূর্তে জি কে শামীকে ধরা হলো—সঙ্গে সঙ্গে দুই রকম বক্তব্য আসতে শুরু করলো। বলা হলো—সে যুবলীগের নেতা। আবার বলা হলো—তিনি কোনোকালেই যুবলীগ কিংবা আওয়ামী লীগের কেউ ছিলেন না। সরকারবিরোধী পক্ষ জি কে শামীমকে ক্যাশ করার চেষ্টায় ওঠে পড়ে লাগলো। একরকম আলোচনা হলো—নিজেদের দোষ চাপাতে গিয়ে জি কে শামীমকে যুবদলের সাবেক নেতা বানাতে চাইছে  আওয়ামী লীগ; আসলে সে সরকারি দলেরই নেতা একজন। বলা হতে থাকলো—বহিরাগত শামীমের কাছেই যখন শত শত কোটি টাকা ভিতরগত সম্রাটদের হাতে না জানি কত কোটি আছে। আর গডফাদাররা তো ধরাছোঁয়ারই বাইরে। আসলে সরকারের আইওয়াশই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য।

কিন্তু যে মুহূর্তে শামীম,সম্রাটসহ আরও আরও ক্ষমতাধরের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট তলব করা হলো ,তখনও বলা হলো—এ কিছু না, সরকার হারানো জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করছে। দেখবে, এই অভিযান হুট করেই বন্ধ হয়ে গেছে। মাঝখান থেকে বস্তায় বস্তায় টাকা চলে যাবে বিদেশে।

ওই মুহূর্তেই গেন্ডারিয়া থেকে যুবলীগের দুই নেতার বাড়ি থেকে কোটি টাকার বেশি উদ্ধার করে ফেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এবারও সন্দেহ দূর হয় না। সোমবার বিএনপি নেতা বললেন, ‘দুর্নীতির রাঘব-বোয়ালরা ধরা না পড়ায় শুদ্ধি অভিযান আইওয়াশ কিনা, জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।’

সপ্তাহের বেশি সময় ধরে একের পর বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো, গ্রেফতার, জুয়ার আড্ডা ভেঙে দেওয়া, মদ, ক্যাসিনোর সরঞ্জাম জব্দ করার পরও দৃষ্টি পড়েনি সরকারবিরোধীদের। তারা এমনভাবে অভিযোগ উত্থাপন করতে শুরু করেন যে, এসব অপরাধ যেন সাম্প্রতিক ঘটনাই। এর জবাব দিয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুব আলম হানিফ। তার কথায়—জিয়াই প্রথম জুয়া চালু করেন। চোখ বড় করে তাকাতেই পারেন নতুন প্রজন্মের বিএনপি কর্মী-সমর্থকরা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তোলপাড় তেমন ইঙ্গিতই দেয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে—স্বাধীনতার পরপর বঙ্গবন্ধু দেশ থেকে রেস খেলা এবং মদের লাইসেন্স বাতিল করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুকে খুন করার পর সামরিক সরকারই প্রথম এদেশে আবার মদের লাইসেন্স দেওয়া শুরু করে। সেই বিবেচনায় মাহবুব আলম হানিফের বক্তব্যকে অতিশয়োক্তি বলাও যায় না।

কিন্তু ক্যাসিনো, হাউজি বা জুয়ার আসর সম্প্রতি যেভাবে আলোচনায় এসেছে, সেভাবে আগে হয়নি। মনে থাকার কথা—প্রথম সামরিক শাসনামলে মানুষ যাত্রা প্যান্ডেলে পৌঁছেছে রাতের কারফিউ শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে। কারফিউ শেষ হওয়া পর্যন্ত মানুষগুলোকে প্যান্ডেলে ধরে রাখার জন্য চালু হয় উলঙ্গনৃত্য আর জুয়ার আসর। এরপর এমন অবস্থা হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী যাত্রাই বিলুপ্ত হয়ে গেছে প্রায় এই জুয়া আর উলঙ্গনৃত্যের কারণে। সুতরাং গেলো শতকের সত্তরের দশকের মাঝামাঝি যে জুয়া আর উলঙ্গনৃত্য চালু হয়েছিল, সেটা আমাদের তরুণদের নৈতিক অধপতনই ঘটায়নি, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক যাত্রাকেও বিদায় জানিয়েছে। যাত্রার জুয়া এখন পুরোটাই ভর করেছে বিভিন্ন ক্লাবঘরে।   

এ থেকে এমন বলার সুযোগ নেই আওয়ামী লীগ ধোয়া তুলসি পাতা। ধোয়া তুলসি পাতা হলে কি আর একের পর এক নেতাকে গ্রেফতার এবং ব্যাংক হিসাব তলব, নজরদারীদের রাখা হয়? সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে—আওয়ামী লীগ সভাপতি নিজেও তো বলেছেন তার দলের মধ্যে দুর্নীতিবাজ আছে। এই যে অভিযান, তাওতো তারই নির্দেশে পরিচালিত হচ্ছে। সুতরাং আওয়ামী লীগে দুর্নীতিবাজদের অবস্থান দৃঢ়—এটা বলতে দ্বিধা হওয়ার কথা নয়।

প্রশ্ন হচ্ছে—এখন যাদের ধরা হচ্ছে, আইনের ফাঁক গলিয়ে তারা বেরিয়ে পড়বেন কিনা। এই মুহূর্তে আমাদের আবারও পেছনে ফিরে যেতে হবে। অনেকেরই বিশ্বাস করতে কঠিন হবে, অপরাধীরা কতটা শাস্তি পাবেন?

সরকারের বিরোধীপক্ষ একবার বলছে, হঠাৎ করে এই অভিযান কেন? সরকারের জনপ্রিয়তা ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা কি এটা?

তারা প্রশ্ন করতেই পারেন। তবে হঠাৎ করে এই অভিযান তেমন বলার সুযোগ নেই। অন্যদিকে বলতে গেলে সরকারের জন্য এমন পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য শুধু সাময়িক দুর্নীতিকে বাধা দেওয়ার জন্যই নয়। তাদের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে গেলেও এর প্রয়োজন ছিল। আবার দুর্নীতিবাজদের আত্মশুদ্ধির সুযোগও কিন্তু দেওয়া হয়েছে। নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণার আগেও আওয়ামী লীগ সরকার দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কথা বলে আসছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী অনেকবার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন, দুর্নীতিবাজ যেই হোক, তাকে ছাড় দেওয়া হবে না। তার কঠোর মানসিকতার পেছনে অনেক যুক্তি আছে। কারণ তিনি অস্বাভাবিক পরিশ্রম ও মেধা খাটিয়ে বাংলাদেশকে আজকে ঈর্ষণীয় উন্নয়ন উপহার দিতে পেরেছেন। বিশ্বব্যাপী তার এই সাফল্য যখন প্রশংসিত হয়, ঠিকই একসময় বাংলাদেশকে দেখানো হয় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবেও। দেশের এই অর্জনকে কালিমামুক্ত করতে চাইবেন—এটাইতো স্বাভাবিক। সেই কাজটিই তিনি করছেন। সুতরাং চুনোপুঁটিদের ধরতে ধরতে এখন যখন রুইকাতলা ধরা শুরু হয়েছে, আশা করা যায়, শিগগিরই হয়তো রাঘবরাও জালে আটকা পড়বে।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সূত্র ধরে সংবাদ হয়েছে, শুধু যুবলীগই নয় আওয়ামী লীগেরও বেশ কিছু নেতা কঠোর নজরদারিতে আছেন। দেখার বিষয় শুধু আওয়ামী লীগই নয়, দলমত নির্বিশেষে সব দুর্নীতিবাজকেই ধরা হবে কখন।

আরেকটা বিষয়—যুবলীগ আওয়ামী লীগই কি দুর্নীতি করছে। গ্রেফতার হওয়া জি কে শামীম বলেছে হাজার কোটির বেশি টাকা সে ঘুষ দিয়েছে। যে ৩ হাজার কোটিরও বেশি টাকার ঠিকাদারি করে তার হাত দিয়ে শতশত কোটি টাকা ঘুষ বিতরণ হতে পারে এটা বিশ্বাসযোগ্য। প্রশ্ন হচ্ছে—এই ঘুষ তিনি কাকে দিয়েছেন। সেই ঘুষগ্রহীতাদের কবে আইনের আওতায় আনা হবে? দুর্নীতি দূর করতে হলে প্রশাসনের দিকেও নজর দিতে হবে। একজন কাস্টম ইনস্পেক্টরের মতো সাধারণ কর্মচারী যদি ঢাকা শহরে কোটি টাকার বাড়ির মালিক হয়, একজন ইনকাম ট্যাক্স ইনস্পেক্টর যদি কয়েক বাড়ির মালিক হয় তখন কি দুর্নীতি খোঁজাটা কঠিন হবে? মাত্র গোটা দশেক সরকারি প্রতিষ্ঠানের কয়েকটি পদের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত সম্পদের হিসাব নিলে দুর্নীতির মহাসাগরের সন্ধান পাওয়া যাবে। এরা চুনোপুঁটি এমন ভাবার কারণ নেই। আর যদি হয়ও তারা কিন্তু জি কে শামীম এবং তার মতো অসংখ্য শামীমকে প্রতিনিয়ত জন্ম দিচ্ছে।

দীর্ঘদিন দাবি ছিল রাজনৈতিক দুর্বৃত্তদের আইনের আওতায় আনতে হবে। উদ্যোগটা ফলপ্রসূ হোক। একইসঙ্গে প্রতিটি শাখা-প্রশাখাতেও হাত দেওয়া দরকার। তাহলে হয়তো দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের দুর্নাম কেটেও যেতে পারে। সেই প্রত্যাশা করতেই পারি।

সবশেষে মনে লুকিয়ে থাকা আশঙ্কার কথাটা বলি। দুর্নীতি বিরোধী অভিযানকে মনে হচ্ছে,বাঘের পিঠে সওয়ার হওয়া। যদি হুমকি-ধমকিতে সওয়ারি মাটিতে নামে তাহলে নির্ঘাত বাঘের পেটে। ১৯৭৪ সালে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের কথাও মনে থাকার কথা। ক্ষমতাপ্রাপ্তদের মধ্যে যেন ওই সময়কার ডালিমের মতো কারও জন্ম না হয়।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ